ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : কোরবানির ঈদ মানেই পরিবার, আনন্দ আর উৎসব— বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে এমনই পরিচিত এক বাস্তবতা। কিন্তু রাজধানী ঢাকার অলিগলিতে ঈদের দিন দেখা মেলে ভিন্ন এক বাংলাদেশের; যেখানে উৎসবের চেয়ে জীবিকা বড়, আনন্দের চেয়ে প্রয়োজনের মূল্য বেশি। প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত মানুষ ঢাকায় এসেছেন শুধুমাত্র বাড়তি আয়ের আশায়। কেউ মৌসুমি কসাই, কেউ পশু ব্যবসায়ী, কেউ আবার সংগ্রহ করা মাংস বিক্রি করে সংসারের খরচ জোগান। তাদের অনেকের কাছেই ঈদ মানে পরিবার থেকে দূরে কাটানো আরেকটি কর্মদিবস। “অভাবী মানুষ, সংসারের জন্যই তো আমার ঈদ” পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার বাসিন্দা ১৩ বছর ধরে কোরবানির ঈদের সময় ঢাকায় আসেন আইয়ুব হোসেন। মৌসুমি কসাই হিসেবে কাজ করেন, পাশাপাশি সংগ্রহ করা মাংস বিক্রি করেন সড়কের পাশে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ এলাকায় তার সঙ্গে কথা হয়। সামনে সাজানো গরুর মাংস দেখিয়ে তিনি ক্রেতাদের ডাকছিলেন— “স্যার, মাত্র তিনশ টাকা কেজি।” ঈদের দিন পরিবার ছেড়ে ঢাকায় থাকার কারণ জানতে চাইলে আঞ্চলিক ভাষায় একটি গানের লাইন শোনান তিনি— “অভাবে স্বভাব নষ্ট, ভজনে কূল নষ্ট, বাড়ি নষ্ট বুড়ির কারণে।” এর ব্যাখ্যায় আইয়ুব বলেন, “অভাবী মানুষ। কষ্টের মধ্যে চলে আসছি। সংসার আছে, বৌ-বাচ্চা আছে। তাদের জন্যই তো আমার ঈদ।” তার ভাষায়, ঈদের পর পরিবারের মুখে হাসি দেখাটাই আসল আনন্দ। “আমার মতো অনেকেই ঈদের দিন অন্যের কোরবানির গরুর মাংস তৈরি করে বাড়তি টাকা আয় করেন। ঈদের পর বৌ-বাচ্চা নিয়ে আনন্দ বেশি হয়।” “আমাদের জীবনে তো আর ঈদ নেই” ৬৪ বছর বয়সী চাঁদ আলীর গল্প আরও দীর্ঘ। কুষ্টিয়ার পাটিকাবাড়ি এলাকার এই বাসিন্দা গত চার দশক ধরে কোরবানির ঈদের দিন কাটাচ্ছেন ঢাকায়। এবারও কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে পাঁচটি গরু জবাই ও মাংস প্রস্তুতের কাজ করেছেন তিনি। চাঁদ আলী বলেন, “জীবনের ৪০ বছর কোরবানির ঈদ কখনও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে করতে পারিনি। অভাবের সংসারে তিন বেলা খাবার জোগাড় করতেই বছর চলে যায়।” তার স্ত্রী মনোয়ারা খাতুন প্রায় সমবয়সী। তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এখনও এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে অপেক্ষা করেন ঈদের পরদিনের জন্য। ঈদের দিন বাড়িতে থাকতে না পারার আক্ষেপ আছে কি না— এমন প্রশ্নে কিছুক্ষণ নীরব থেকে চাঁদ আলী বলেন, “প্রথম দিকে খুব খারাপ লাগতো। এখন আর লাগে না। আমাদের জীবনে তো আর ঈদ নেই।” ঈদের দিনও রাজধানীতে শ্রমের বাজার শুধু আইয়ুব বা চাঁদ আলী নন— কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে তৈরি হয় এক অস্থায়ী শ্রমবাজার। দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ঢাকায় আসেন কয়েক দিনের কাজের আশায়। পঞ্চগড়ের শাহীন ও নূন হোসেন জানান, প্রতি বছরই তারা ঈদের সময় ঢাকায় থাকেন। কারণ একটাই— বাড়তি আয়। অন্যদিকে শরিয়তপুরের ছাগল ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন মাঝি বলেন, “১৯৮৮ সাল থেকে কোরবানির ঈদ পরিবারের সঙ্গে করিনি। আগে খুব খারাপ লাগতো। এখন মনে হয় লাভ বেশি হলেই আনন্দ।” ঢাকায় ঘর ভাড়া নিয়ে ছাগলের সঙ্গেই রাত কাটানোর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ঈদের কয়েকদিন তাদের জীবন পুরোপুরি রাস্তাকেন্দ্রিক হয়ে যায়। ২৫০ টাকার মাংসের বাজার ঈদের দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে কমদামের মাংসের অস্থায়ী বাজার। নারী ও শিশুরা বিভিন্ন বাসা-বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা মাংস বিক্রি করেন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে। এসব মাংসের ক্রেতাদের বড় অংশ নিম্নমধ্যবিত্ত ও স্বল্পআয়ের মানুষ। অনেকে হোটেল ব্যবসার জন্যও কিনে নেন। একজন ক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভালো মাংস পেলে কিনবো। বাজারের দামের চেয়ে অনেক কম।” একই এলাকায় কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী সরাসরি গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করছিলেন। সেখানে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায়। মোহাম্মদী হাউজিং এলাকায় ভ্যানে মাংস বিক্রি করছিলেন আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, “যারা কোরবানি দিতে পারেন না, তাদের জন্য মাংস বিক্রি করি। যা আয় হয়, সেটা ঈদের সময় সংসারে কাজে লাগে।” তবে এবার লাভ কম হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানান তিনি। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন গরুর উচ্চমূল্য। ঈদের অন্তরালের অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরবানির ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি একটি বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক চক্রও। পশু পরিবহন, কসাই, মাংস বিক্রি, পশুখাদ্য, চামড়া ও অস্থায়ী শ্রমবাজার— সব মিলিয়ে কয়েক দিনের জন্য তৈরি হয় বিপুল নগদ অর্থপ্রবাহ। কিন্তু এই অর্থনীতির সবচেয়ে নিচের স্তরে থাকা মানুষগুলোর বাস্তবতা ভিন্ন। তাদের কাছে ঈদ আনন্দের নয়, বরং বেঁচে থাকার একটি মৌসুমি সুযোগ। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে— যখন অনেক পরিবার কোরবানির মাংস ভাগাভাগি ও উৎসবে ব্যস্ত, তখন অন্য একদল মানুষ একই দিনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দরদাম করছেন, মাংস কাটছেন, কিংবা পরদিনের খাবারের টাকা জোগাড়ে ব্যস্ত রয়েছেন। কোরবানির ঈদের এই বিপরীত বাস্তবতা যেন বাংলাদেশের সামাজিক বৈষম্যেরও এক নীরব প্রতিচ্ছবি।
ঈদের আগে আগুন, ঘাম আর হাতুড়ির শব্দে জেগে ওঠে ঢাকার কামারপাড়া ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঢাকার কারওয়ানবাজার ও খিলগাঁওয়ের কামারপট্টিতে এখন যেন সময় চলে অন্য ছন্দে। আগুনের ভাটিতে লোহা গরম হচ্ছে, হাতুড়ির আঘাতে আকার নিচ্ছে ছুরি, দা, চাপাতি আর বটি। কোরবানির ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে ব্যস্ততা। বছরের অন্য সময় যেসব দোকানে কাজ চলে ধীরগতিতে, ঈদুল আজহার আগে সেখানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত থামে না কাজ। ছোট ছোট টিনশেড বা আধাপাকা দোকানের ভেতরে একসঙ্গে কাজ করছেন কয়েকজন কারিগর। কেউ আগুনে লোহা গরম করছেন, কেউ ধার দিচ্ছেন, কেউ আবার শেষ মুহূর্তের পালিশে ব্যস্ত। কারওয়ানবাজারের এক কামার, বিশ্বজিৎ, ঘামে ভেজা শরীরে হাতুড়ি চালাতে চালাতে বলেন, “ঈদের আগে প্রায় এক মাস আমাদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। সকাল ৮টা থেকে অনেক সময় রাত ২টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। এখন প্রতিদিন অন্তত ৫০ থেকে ৬০টা ছুরি ও দা বিক্রি হচ্ছে।” দেশীয় কারিগর বনাম কারখানার পণ্য কামারদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগেও হাতে তৈরি দেশীয় ছুরির চাহিদা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু এখন বাজারে চীনা ও স্টিল কারখানায় তৈরি রেডিমেড পণ্যের আধিপত্য বেড়েছে। তবুও কিছু ক্রেতা এখনো দেশীয় কারিগরদের ওপর আস্থা রাখেন। বিশ্বজিৎ বলেন, “আমাদের তৈরি জিনিস টেকসই হয়। একবার কিনলে কয়েক বছর ব্যবহার করা যায়।” কারওয়ানবাজারের আরেক কামার জামাল জানান, এবারের মৌসুমে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। “লোহার দাম, কয়লার দাম, শ্রমিকের মজুরি—সবই বেড়েছে। তারপরও খুব বেশি দাম বাড়াইনি। কারণ মানুষ এখন হিসাব করে খরচ করছে।” তার দোকানে ছোট ছুরি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা থেকে, আর বড় ও উন্নত মানের ছুরির দাম উঠছে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। বড় দা বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকায়। শেষ মুহূর্তের ভিড় ও বাড়তি চাপ খিলগাঁওয়ের কামার রহিম উদ্দিন বলেন, ঈদের আগে শুধু নতুন ছুরি বিক্রি নয়, পুরোনো দা ও চাপাতি ধার দেওয়ার কাজও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। “অনেক মানুষ নতুন না কিনে পুরোনো জিনিস ঠিক করেই ব্যবহার করতে চান। প্রতিদিন শতাধিক মানুষ ধার করাতে আসছেন।” তার ভাষায়, ঈদের আগের দিনগুলোতে দোকানে এত ভিড় হয় যে অনেক সময় বিশ্রামের সুযোগও থাকে না। “অনেকে শেষ মুহূর্তে এসে তাড়া দেন। তখন রাত জেগেও কাজ করতে হয়।” বাড়ছে খরচ, তবুও দেশীয় পণ্যে ভরসা কারওয়ানবাজারে ছুরি কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মাহবুব হাসান বলেন, গত বছরের কেনা ছুরিটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এবার আবার নতুন কিনতে এসেছেন। “বাজারে রেডিমেড জিনিস আছে, কিন্তু কামারের হাতে তৈরি ছুরির ধার ও মান ভালো।” তিনি জানান, এবার একটি মাঝারি ছুরি ও একটি দা কিনতে আগের বছরের তুলনায় বেশি খরচ হয়েছে। তারপরও তিনি দেশীয় পণ্যই বেছে নিয়েছেন। খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা সালমা আক্তারও একই অভিজ্ঞতার কথা বলেন। “কোরবানির সময় ভালো ধারালো ছুরি না হলে কাজ করতে সমস্যা হয়। তাই একটু বেশি দাম হলেও ভালো জিনিস নেওয়ার চেষ্টা করি।” তবে তার অভিযোগ, ঈদ সামনে রেখে কিছু দোকানি দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। “যে ছুরি কিছুদিন আগে ৫০০-৬০০ টাকা ছিল, এখন ৮০০ টাকা চাইছে। ধার দেওয়ার খরচও বেড়েছে।” পুরোনো দা-ই ভরসা অনেকের সব ক্রেতা নতুন ছুরি কিনছেন না। অনেকেই খরচ কমাতে পুরোনো দা বা চাপাতি ধার করিয়ে নিচ্ছেন। রিকশাচালক আবুল কালাম বলেন, “নতুন কিনতে গেলে খরচ বেশি। তাই পুরোনো দাটাই ধার করিয়ে নিচ্ছি। এতে কম টাকায় কাজ হয়ে যায়।” তার মতে, কোরবানির সময় পরিবারের সবাই মিলে কাজ করেন। তাই ধারালো দা বা ছুরি ছাড়া কাজ করা কঠিন। হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো পেশা? খিলগাঁওয়ের ব্যবসায়ী প্রদীপের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে গ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে দক্ষ কারিগররা মৌসুমি কাজের জন্য ঢাকায় আসতেন। কিন্তু এখন নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমে গেছে। “কঠোর পরিশ্রম, কম লাভ আর কারখানার তৈরি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে অনেকে পেশা বদল করছেন।” তার মতে, তারপরও কোরবানির ঈদ ঘিরে এই মৌসুমটাই কামারদের নতুন আশার সময়। “এই বাড়তি আয়ে কেউ সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালান, কেউ পুরোনো ঋণ শোধ করেন।” টিকে থাকার লড়াই ঈদের সময় ধার দেওয়ার জন্য বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কামার বিশ্বজিৎ বলেন, “সারা বছর কষ্ট করি এই সময়টার আশায়। কাজ ভালো হলে পরিবার নিয়ে একটু স্বস্তিতে থাকা যায়। স্বাভাবিক সময়ে আমরা যে টাকা রাখি, এখনও তাই রাখছি। তবে কেউ কেউ ক্ষেত্রবিশেষে একটু বেশি নিতে পারে।” ঢাকার কামারপট্টিগুলোর এই ব্যস্ততা শুধু কোরবানির প্রস্তুতির গল্প নয়; এটি নগর জীবনের এক প্রাচীন পেশার টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবিও। আগুন, লোহা আর ঘামের এই শিল্প এখনো বেঁচে আছে মূলত মৌসুমি চাহিদা আর কিছু ক্রেতার আস্থার ওপর ভর করে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঈদ এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঈদের প্রস্তুতি শুরু হয় পোশাক, আতর, জায়নামাজ আর টুপিকে ঘিরে। তবে উত্তরাঞ্চলের বগুড়ার কয়েকটি গ্রামে এই মৌসুম আসে অন্য এক ব্যস্ততা নিয়ে। সেখানে ঈদ মানেই হাজারো নারীর হাতে সুতা আর ক্রুশের ছন্দে জেগে ওঠা জালি টুপির কারিগরি শিল্প। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিযোগী হাফেজ সালেহ আহমাদ তাকরীম ব্যবহৃত ‘তাহফিজ টুপি’ জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর এই শিল্প নতুন মাত্রা পেয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জালি টুপি অ্যাসেসিয়েশনের নেতাদের দাবি, শুধু এই টুপিকেই ঘিরে কয়েক কোটি টাকার বাজার তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে রয়েছে কম মজুরি, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবের মতো বাস্তবতা। গ্রামীণ নারীদের হাতে গড়ে ওঠা শিল্প বগুড়ার শেরপুর ও ধুনট উপজেলার অন্তত ৩০টি গ্রামে ছড়িয়ে রয়েছে জালি টুপি তৈরির এই নেটওয়ার্ক। কাশিয়াবালা, তালপুকুরিয়া, চকধলী, জয়লা-জুয়ান, গুয়াগাছী কিংবা ধুনটের বোহালগাছা, ফড়িংহাটা, পাঁচথুপিসহ বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ৯০০ পরিবার প্রত্যক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় বেপারিদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ নারী এই কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সংসারের কাজ শেষে অবসর সময়ে নারীরা সুতা ও ক্রুশ কাঁটার সাহায্যে তৈরি করেন রঙিন জালি টুপি। অনেক শিক্ষার্থীও লেখাপড়ার পাশাপাশি এই কাজে যুক্ত হয়ে নিজেদের হাতখরচ চালাচ্ছেন। শেরপুরের তালপুকুরিয়া গ্রামের শানু খাতুন, আলেয়া ও মর্জিনা বিবির মতো নারীরা ছোটবেলা থেকেই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাদের ভাষায়, “কর্মহীন বসে থাকার চেয়ে কিছু আয় করা ভালো, আর এটি আমাদের বংশীয় ঐতিহ্যও।” শিক্ষার্থীদেরও আয়ের পথ স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, দিনে একটি টুপি তৈরি করতে পারেন তারা। প্রতিটি টুপি বিক্রি হয় ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। তবে সুতার দাম বাড়ায় লাভ কমে গেছে। আগে ৬০ টাকায় যে সুতা পাওয়া যেত, এখন সেটি কিনতে হচ্ছে ৭৫ টাকায়। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও শ্রমের মূল্য সেই অনুপাতে বাড়েনি। একজন শিক্ষার্থী বলেন, “স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি টুপি তৈরি করি। এতে নিজের খরচ চালাতে সুবিধা হয়।” মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও বগুড়ার টুপি স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, বগুড়ার জালি টুপি এখন শুধু দেশের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। সৌদি আরব, কাতার, দুবাই, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশেও এসব টুপি রপ্তানি হচ্ছে। ব্যবসায়ী সোহাগ মিয়া জানান, ৭৫ টাকার এক ববিন সুতা দিয়ে প্রায় ১২টি টুপি তৈরি করা যায়। পরে সেই সেট পাইকারি বাজারে প্রায় ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। বেপারিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সুতা সরবরাহ করেন এবং পরে প্রস্তুত টুপি কিনে নেন। এই সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেই টিকে আছে পুরো শিল্পখাতটি। ‘তাহফিজ টুপি’ বদলে দিয়েছে বাজার বাংলাদেশ জালি টুপি অ্যাসেসিয়েশনের বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি জুয়েল আকন্দ বলেন, করোনাকালে ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়লেও পরে ‘তাহফিজ টুপি’র জনপ্রিয়তা বাজারে নতুন চাহিদা তৈরি করে। তার ভাষায়, “বর্তমানে বাজারে এই টুপির চাহিদা এত বেশি যে উৎপাদন করেও সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।” তিনি দাবি করেন, প্রতিবছর এই শিল্প থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আসে দেশে। তবে সরকারি কোনো সহায়তা বা প্রণোদনা না থাকায় শিল্পটি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কম মজুরি ও নীতিগত সংকট যদিও এই শিল্পকে ঘিরে কোটি টাকার বাণিজ্যের কথা বলা হচ্ছে, মাঠপর্যায়ের শ্রমিকদের আয় তুলনামূলক কম। অধিকাংশ নারী ঘরে বসে কাজ করলেও তাদের আয় মাসে দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, কাঁচামালের দাম বাড়া, প্রশিক্ষণের অভাব এবং সরাসরি বাজারে প্রবেশাধিকার না থাকায় উৎপাদকরা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে একসময় হারিয়ে যেতে পারে উত্তরাঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প। সম্ভাবনার পাশাপাশি প্রশ্নও জালি টুপি শিল্প এখন একদিকে যেমন গ্রামীণ নারীদের বিকল্প আয়ের উৎস, অন্যদিকে এটি বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবেও উঠে আসছে। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—যে শিল্প বছরে কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা এনে দেয়, সেই শিল্পের কারিগররা কেন এখনও ন্যায্য মজুরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত? ঈদের বাজার যতই বড় হোক, এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ওপর।
রাজধানীর মগবাজারের বিশাল সেন্টার মার্কেটে ‘নবীন’ ব্র্যান্ডের একটি পাঞ্জাবির দোকান বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগে হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)কে ক্লোজড করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো ঘটনায় তদন্তে কমিটি গঠন করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। বুধবার (২৫ মার্চ) ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, রাজধানীর মগবাজারের বিশাল সেন্টারে একটি দোকানে সৃষ্ট অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির তদন্তে ডিএমপি একটি কমিটি গঠন করেছে। গত শুক্রবার (২০ মার্চ) ওই মার্কেটের একটি পাঞ্জাবির দোকানে বিশেষ মূল্যছাড়ে বিক্রির অফারকে কেন্দ্র করে মার্কেট কমিটি ও সংশ্লিষ্ট শোরুমের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। ঘটনার প্রেক্ষিতে কোনো পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এরই মধ্যে হাতিরঝিল থানার ওসিকে ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হয়েছে এবং এক সহকারী উপ-পরিদর্শককে (এএসআই) রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন ডিএমপির এই কর্মকর্তা। এর আগে, ঈদুল ফিতরের আগের দিন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কম দামে পাঞ্জাবি বিক্রির কারণে আশপাশের কিছু ব্যবসায়ী ‘নবীন ফ্যাশন’-এর দোকান বন্ধ করে দেয়। তারা এই মূল্যছাড়কে ‘রিলিফ বিতরণ’-এর সঙ্গে তুলনা করে আপত্তি জানায়। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তখন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয় এবং দ্রুতই জনমনে প্রশ্ন ওঠে—বাজারে প্রতিযোগিতামূলক বিক্রি কি অপরাধ?
ঈদুল ফিতর সামনে রেখে নিত্যপণের বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে, বিভিন্ন পণ্যের দামও আকাশছোঁয়া হচ্ছে। সেমাই, চিনি, মসলা ও সুগন্ধি চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম শুনে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ছে অনেক ক্রেতার। ঈদকে সামনে রেখে কয়েকদিনের ব্যবধানে কোনো কোনো পণ্যের দাম ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপণ্যের দোকানগুলোতে ঈদকে সামনে রেখে ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি কিনছেন সুগন্ধি চাল, সেমাই, চিনি, দুধ ও বিভিন্ন ধরনের মশলা। বাড়তি চাহিদা থাকা প্রায় প্রতিটি পণ্যের দামই গত কয়েকদিনের ব্যবধানে বড় অংকে পরিবর্তন হয়েছে। বাজারে খোলা ও প্যাকেটজাত সুগন্ধি চাল কিনতে কয়েকদিনের ব্যবধানে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি খরচ করতে হচ্ছে ক্রেতাদের। কালিজিরা ও চিনিগুঁড়া চালের এক কেজির প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে কোম্পানিভেদে ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকায়। অন্যদিকে খোলা চাল পাওয়া যাচ্ছে প্রতি কেজি ১৪০-১৫০ টাকায়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুগন্ধি চালের প্রতি কেজির দর ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৯০ থেকে ১৩০ টাকা। সে হিসেবে দাম বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। এরমধ্যে গত এক মাসে বেড়েছে ৮ শতাংশ। খুচরা বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ২০০ গ্রাম সেমাই ৪০-৪৫ টাকা, ৮০০ গ্রাম বোম্বাই সেমাই ২৮০ টাকা, আলাউদ্দিন সুইটের ৫০০ প্যাকেট সেমাই ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা, ৫০০ গ্রাম অলিম্পিয়া সেমাই ২৮০ থেকে ৭০০ টাকা, ২০০ গ্রামের বনফুল ও কুলসন সেমাই প্যাকেট ৪৫ টাকা। এছাড়া খোলা লম্বা সেমাইয়ের কেজি ৯০ টাকা এবং লাচ্ছার কেজি ১৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে কেজিপ্রতি বিদেশি চিনি ১০০-১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রোজার শুরুতেও যা ৯৫-১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। আর দেশি চিনি ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঈদকে সামনে রেখে চিনির দাম কেজিতে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে টিসিবির তথ্য অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় পণ্যটির দাম ১০ শতাংশ পর্যন্ত কম রয়েছে। বাজারে বিভিন্ন ধরনের মশলার দামও কয়েকদিনের ব্যবধানে বেড়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে দামি মশলা এলাচ প্রতিকেজি খুচরা পর্যায়ে ৫ হাজার টাকা দাম রাখা হচ্ছে। দারুচিনির দাম কেজিপ্রতি ৫৬০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে রয়েছে। অন্যান্য মশলার মধ্যে জয়ত্রি ৪ হাজার টাকা এবং জায়ফল প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া লবঙ্গ ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা, ধনিয়া ৩০০ থেকে ৩৬০ টাকা এবং তেজপাতা ২০০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর জিরা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। কিশমিশ, আলুবোখারা, কাজুবাদাম, কাঠবাদাম ও পেস্তা বাদামের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এদিকে ঈদকে সামনে রেখে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই সুযোগে খোলা তেলের দাম বেড়ে প্রতি ২১৫ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। বাজারে বিভিন্ন ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও সবজির বাজারে স্বস্তি দেখা গেছে। পেঁয়াজ, আলু, লেবু, শসা, বেগুনসহ প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কমেছে। পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ৩০-৪০ টাকা, আলু ১৮-২০ টাকা এবং টমেটো ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শসা ৩৫-৫০ টাকা এবং বেগুন ৫০-৬০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। আর কাঁচামরিচ ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ঈদের আগে লেবুর দাম অবশ্য বাড়তি রয়েছে। প্রতিহালি লেবু ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।