দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিগগিরই দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও চক্রের একটি সমন্বিত তালিকা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী এপ্রিল মাস থেকেই মাঠপর্যায়ে এই অভিযান শুরু হতে পারে। এতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে একটি যৌথ বাহিনী কাজ করবে। ইতোমধ্যে জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পৃথক তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। সূত্রগুলো বলছে, অপরাধের ধরন অনুযায়ী অভিযানের কাঠামো ও নাম নির্ধারণ করা হবে। অতীতে পরিচালিত ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এর মতো একটি উদ্যোগের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে সরকারি মহল থেকে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নতুন সরকারের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। প্রস্তুত করা তালিকায় সহিংসতা, নাশকতা, মাদক ব্যবসা, অনলাইন প্রতারণা এবং সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি অতীতে সহিংস কর্মকাণ্ড বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে—এমন কিছু রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিকেও নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। তবে পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, এই তালিকা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তৈরি করা হচ্ছে না। বরং যারা বাস্তবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করতে পারে—তাদেরই চিহ্নিত করা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে তালিকাটি তৈরি করা হচ্ছে এবং এটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, এবার ‘ঢালাও গ্রেপ্তার’ নয়, বরং ‘টার্গেটেড অ্যাকশন’-এ জোর দেওয়া হবে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ আন্দোলনের আড়ালে সহিংসতা বা নাশকতায় জড়ালে তাৎক্ষণিকভাবে আইনের আওতায় আনা হবে।
কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কামালপুর এলাকায় নদীভাঙন রোধে নির্মিত বেড়িবাঁধ বেষ্টনীতে রোপণ করা মেহগনি গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জ শহরের বত্রিশ এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. এসএম ফরহাদ হোসেন। এর আগে মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) উপজেলা প্রকৌশলী ফয়জুর রাজ্জাক বাদী হয়ে মিঠামইন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার পরপরই কেন্দ্রীয় বিএনপি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সব সাংগঠনিক পদ স্থগিত করে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত সরকারের আমলে নদীভাঙন প্রতিরোধে কামালপুর এলাকার বেড়িবাঁধে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে এসব মেহগনি গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বাঁধ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। অভিযোগ রয়েছে, জাহাঙ্গীর আলমের বাড়িতে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলে অসুবিধা হওয়ায় গত ৫ আগস্টের পর থেকে ধাপে ধাপে গাছ কাটা শুরু হয়। সর্বশেষ গত ২১ ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে ১২টি মেহগনি গাছ কেটে ফেলা হয়। প্রতিটি গাছের বাজারমূল্য আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে গাছের গুঁড়ি কেটে পরে তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি জানাজানি হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। খবর পেয়ে মিঠামইনের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) একটি স মিল থেকে কাটা গাছ উদ্ধার করে এবং এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করে। বর্তমানে পুলিশ ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। এ ঘটনায় এলাকায় চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, নদীভাঙন প্রতিরোধে নির্মিত বেড়িবাঁধে রোপণ করা গাছ কেটে ফেলা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও অবকাঠামোর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ তার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দিয়েছেন যে, 'মব কালচারের দিন শেষ'। কিন্তু দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা ঠেকানো সরকারের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং হবে, এই প্রশ্ন সামনে আসছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এ ধরনের প্রশ্ন উঠছে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই আলোচনায় ছিল 'মব ভায়োলেন্স' বা 'দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা' সৃষ্টির নানা ঘটনা। এর বিরুদ্ধে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। মব তৈরি করে কখনও নিরপরাধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, চাঁদাবাজি যেমন হয়েছে, তেমনি মারপিট করা হয়েছে ভিন্ন মতের রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের। এমনকি দলবদ্ধভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৫ সালে মব ভায়োলেন্স ' ডমিনেন্ট অ্যান্ড ডেডলি ট্রেন্ড বা প্রকট এবং প্রাণঘাতী ট্রেন্ড ' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল বলে মনে করে অনেক মানবাধিকার সংগঠন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২৫ সালেই বাংলাদেশে ৪৬০ জনকে মব জাস্টিস এবং ম্যাস বিটিং এর মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী এবং অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেঙে পড়া আত্মবিশ্বাস এবং 'মব ভায়োলেন্স' দমনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্লিপ্ততা অপরাধিদের উৎসাহ জুগিয়েছে। দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে সংগঠিত একের পর এক অপরাধের ঘটনা ঘটলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চুপ থেকেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। উল্টো তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার "মব ভায়োলেন্স বলতে কোনো কিছু নেই" এমন বক্তব্য নানা আলোচনা- সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। বাংলাদেশে ‘মব কালচার’ নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ভয়াবহতা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। নতুন সরকারের ঘোষিত কঠোর অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়— সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিরপেক্ষতা এবং দৃশ্যমান আইন প্রয়োগ ছাড়া ‘মব ভায়োলেন্স’ বন্ধ করা সম্ভব নয়— এমনটাই মনে করছেন অধিকাংশ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী। এমন প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে নতুন সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা ঠেকানো বিএনপি সরকারের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং হবে, এই প্রশ্ন সামনে আসছে। সরকারের জন্য পরিস্থিতি সামলানো "চ্যালেঞ্জিং হবে, তবে অসম্ভব নয়," বলে মনে করেন মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটন। তিনি বলছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব। তবে বিচারের নামে কেবল ভিন্ন মত দমন, নিজ দলের সমর্থকদের সব দোষ মাফ কিংবা দলবদ্ধভাবে ভিন্ন মতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পুরনো সংস্কৃতি চলতে থাকলে কোনো লাভ হবে না বলে মনে করেন সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক। বাংলাদেশে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক স্বার্থে 'মব ভায়োলেন্স' বা 'দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার' ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও ন্যায্য বা অন্যায্য দাবি আদায় কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হয়েছে এটি। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে মব জাস্টিস এবং ম্যাস বিটিংয়ে ২১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে মৃত্যু হয় ১২৮ জনের। আর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০২৫ সালের হিসেবে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দুইশো। 'মব ভায়োলেন্স' কেন এভাবে বৃদ্ধি পেল? এমন প্রশ্নের জবাবে দেশের বিশেষ পরিস্থিতি এবং বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নির্লিপ্ততাকে দায়ি করেছেন বিশ্লেষকরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক, গোষ্ঠীগত বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে স্বৈরাচারের দোসর কিংবা এ ধরনের 'তকমা' দিয়ে মব ভায়োলেন্স বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে বলে মনে করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। 'তৌহিদী জনতা' বা এ ধরনের ব্যানারে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু মব সৃষ্টির ঘটনাও ঘটেছে। ব্যক্তির ওপর হামলার পাশাপাশি মাজার কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হামলা হয়েছে। অনেক সময় যেখানে কট্টরপন্থি ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীকে সমর্থন দিতেও দেখা গেছে। দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে সংগঠিত একের পর এক অপরাধের পরও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর "মব ভায়োলেন্স বলতে কোনো কিছু নেই" এমন বক্তব্য নিয়ে নানা সমালোচনা হয়েছে। এছাড়া সরকারের দায়িত্বশীলদের কারো করো মধ্যে দলবদ্ধ অপরাধকে কিছু ক্ষেত্রে 'রাজনৈতিক বৈধতা' দেওয়ার চেষ্টা ছিল, যা এই ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের অনেকে। মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলছেন, একটি বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল, এটা যেমন ঠিক তেমনি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বিভিন্ন পক্ষের সামনে সরকারের নমনীয়তা অপরাধীদের সুযোগ করে দিয়েছিল। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "দৃশ্যমান মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গত সরকারের যথেষ্ট ঘাটতি ছিল, যথেষ্ট দুর্বলতা ছিল। এর পেছনে এটার প্রেক্ষাপটটাও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে।" এছাড়া একটি পক্ষ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল বলেও মনে করেন মি. লিটন। এই অপরাধ কী থামবে? জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৬ই ফেব্রুয়ারি রংপুরের পীরগঞ্জে সিলযুক্ত ব্যালট উদ্ধারের ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দলবদ্ধভাবে হেনস্তা ও গাড়ি ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ এটি বলা যায় যে, দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার উদাহরণ সঙ্গী করেই, পট পরিবর্তনের দেড় বছর পর বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছে রাজনৈতিক সরকার। এসব কারণে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতির চাকা সচল করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এই সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। যেখানে 'মব কালচার' পুরোপুরি বন্ধ করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। বুধবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রথম কর্মদিবসে মি. আহমদ বলেন, "মব কালচার শেষ। দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে না। তবে যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য মিছিল ও সমাবেশ করা যাবে, স্মারকলিপিও দেওয়া যাবে।" স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন মানবাধিকার কর্মী এবং অপরাধ বিশ্লেষকরা। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারবে, সে সন্দেহ রয়েছে অনেকের। মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলছেন, মব সহিংসতার পরিবেশ স্বাভাবিক হওয়া নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা- এই দুটি বিষয়ের ওপর। বিবিসি বাংলাকে মি. লিটন বলছেন, "নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এখন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা নিয়েছেন। অতীতে এই ধরনের সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে।" তবে বিচারের ক্ষেত্রে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে যেন প্রশ্ন না ওঠে, এমন কথাও বলছেন বিশ্লেষকরা।
চাঁদার দাবিতে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে দোকানে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় দোকানের ক্যাশবাক্স থেকে ২২ হাজার টাকা নিয়ে গেছেন তারা। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্রের জিরো পয়েন্ট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। দুপুরে কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্রের ‘তানিসা আচার ঘর’ নামের ওই দোকানের মালিক মনিরুল হাওলাদার মহিপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এতে কুয়াকাটার হুইসেন পাড়া মহল্লার মাকসুদ আকন, শাহীন মুসল্লী, আবদুর রহিমসহ অজ্ঞাতনামা পাঁচ-ছয় জন এ ঘটনায় জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা কুয়াকাটা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দোকানের মালিক মনিরুল হাওলাদার বলেন, ‘চাঁদার দাবিতে লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে হঠাৎ দোকানে ঢুকে ভাঙচুর চালান স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী-সমর্থকরা। এ সময় দোকানের কর্মচারী হাসানকে পেটানো হয়। একপর্যায়ে মাকসুদ আকন দোকানের ভেতরে ঢুকে গালাগাল করেন। পরে দোকানের ক্যাশবাক্স থেকে ২২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেন। খবর পেয়ে মহিপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এলে পালিয়ে যান তারা। এ বিষয়ে জানতে মাকসুদ আকনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিয়ে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। কুয়াকাটা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান হাওলাদার বলেন, ‘অভিযুক্তরা স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী-সমর্থক। দলে তাদের কোনও পদ-পদবি নেই। ওই দোকানের মালিকানা নিয়ে বিরোধ আছে। তারপরও কারও দোকানে হামলা-ভাঙচুর করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি দেখবো। এ ছাড়া দলের নেতাদের জানানো হবে। কোনও অপরাধীকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।’ মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহব্বত খান বলেন, ‘খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তার আগেই হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। ঘটনাটি তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও দুঃশাসনে ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে দেশকে বের করে আনতে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দলীয় প্রভাব বা জোরজবরদস্তি নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় আইনের শাসনই হবে শেষ কথা। বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ভাষণে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময়ের দুর্নীতি, দুঃশাসন ও অনিয়মের কারণে দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ বাস্তবতায় নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দুর্নীতিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তারেক রহমান বলেন, সারা দেশে জুয়া ও মাদকের বিস্তার সামাজিক অস্থিরতা এবং অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ইতোমধ্যে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনগণের জানমাল রক্ষা এবং নিরাপদ সমাজ গঠনে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি সাংবিধানিক ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিধিবদ্ধ নীতি ও নিয়ম মেনেই পরিচালিত হবে। কোনো ধরনের দলীয় প্রভাব, রাজনৈতিক চাপ বা ব্যক্তিগত ক্ষমতার অপব্যবহার বরদাশত করা হবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দলীয় প্রভাব বা জোরজবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা। সরকারের এই অবস্থান বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে।
বরিশাল অফিস: বরিশাল বিআরটিসি ডিপোতে বহিরাগতদের চাঁদাবাজি করতে গিয়ে হামলা লুটপাটের অভিযোগ। অতর্কিত হামলায় ডিপোর একজন সুপারভাইজার আহত হয়েছে।এ ঘটনায় আতংকে রয়েছে বিআরটিসির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। বিআরটিসি ডিপো ও যাত্রী সুত্রে জানা গেছে,২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট থেকে একদল চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা বিআরটিসি ডিপো দখলের পায়তারা করে আসছিল। তাদের দাবি ডিপো থেকে বিআরটিসির বাস বের হলেই চাঁদাবাজদের নির্দিষ্টহারে চাঁদা দিতে হবে।ডিপো ম্যানেজার শক্ত অবস্থানে থাকায় চাঁদাবাজদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। ১২ ফেব্রুয়ারী বিএনপি তিনশত আসনের ২১২ টা আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে। এখন বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে ১৬ ফেব্রুয়ারী'২৬ তারিখ বেলা দুটার দিকে লেবার সর্দার মোতালেব মোল্লা, বিআরটিসির চালক হাফিজ,ফিসারী রোডের রাব্বিসহ সাত -আটজনের একটি সন্ত্রাসী দল অতর্কিত হামলা করে বিআরটিসি ডিপোতে কর্মরতদের । হামলায় আহত হয়েছে বিআরটিসির সুপারভাইজার মিরাজ।এ সময় তার নিকট থেকে চাঁদাবাজরা টাকা হাতিয়েও নিয়ে যায়। এঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। সুত্র জানায়,লেবার সর্দার ও তার পুত্র বিআরটিসির চালক হাফিজের নেতৃত্বে একটি বড় সিন্ডিকেট নৈরাজ্য করে আসছিল ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনামলে।২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে কোনঠাসা হয়ে পরে।সুযোগবুঝে বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে তারা বিআরটিসি ডিপো দখলে নেয়ার জন্য গত সোমবার বাপ-পুত্রের নেতৃত্বে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ উপলক্ষে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ভোটের কারচুপি ও দুর্বৃত্তায়ন রোধে প্রশাসন একাধিক স্তরে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রে ভোটের সরঞ্জাম প্রেরণ শুরু করেছে। আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগের ৪২টি উপজেলার ২১টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৭৪ লাখ ২৩ হাজার ৫২২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৭ লাখ ৭৪ হাজার ১৪৮ জন ও নারী ভোটার ৩৬ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৭ জন। ভোটদানের সুবিধার্থে ২ হাজার ৮৩৮টি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বিভাগটি নদী দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায় অনেক উপজেলা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। জনবসতির কারণে এসব এলাকার জন্যও ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বিশেষভাবে ১৩টি উপজেলাকে দুর্গম চিহ্নিত করে অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মঞ্জুর মোর্শেদ আলম জানিয়েছেন, ভোট কেন্দ্রের অবস্থান বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভাগকে তিনটি জোনে (রেড, ইয়েলো ও গ্রিন) ভাগ করা হয়েছে। এতে নজরদারি এবং নিরাপত্তা কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়েছে। তিনি আরও জানান, দুর্গম এলাকার জন্য হেলিকপ্টার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং উপকূলীয় বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড দায়িত্ব পালন করবে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবসহ অন্যান্য বাহিনীর সমন্বয়ে নিরাপত্তা বলয় গঠন করা হয়েছে। বরিশাল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ফরিদুল ইসলাম বলেন, “সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে যাতে ভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। আমরা কোনো পক্ষপাতিত্ব না রেখে মূলত জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করছি। আশা করছি, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বিঘ্ন ভোট অনুষ্ঠিত হবে।” বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, “অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে কেন্দ্রে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। সকল স্টেকহোল্ডারকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।