ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : কক্সবাজারের কুতুবদিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় টানা এক সপ্তাহের ভারি বৃষ্টিতে বেঁড়িবাধ ভেঙে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। গত দুদিন বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমলেও রোববার সকাল থেকে আবারও ভারি বৃষ্টি শুরু হলে পানির উচ্চতা বাড়তে থাকে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুই উপজেলার বহু ঘরবাড়ি এখনও পানির নিচে রয়েছে। অনেক পরিবার ঘরছাড়া হয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে, আবার কেউ কেউ নৌকাকে একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। স্লুইসগেট ও কালভার্ট নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে স্থানীয় বাসিন্দারা শুধু অতিবৃষ্টিকেই দায়ী করছেন না। তাঁদের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইসগেট ও কালভার্টগুলোতে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে কিছু অসাধু চক্র মাছ শিকারের ব্যবস্থা করেছে। এতে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে না পেরে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা। স্থানীয় বাসিন্দা ফরিদ আহমেদ বলেন, “অনেকেই মাছ ধরার জন্য ইচ্ছা করে স্লুইসগেটগুলো বন্ধ করে রাখে। তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিত।” এই অভিযোগের স্বাধীন যাচাই তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে ক্ষোভ বাড়ছে। কুতুবদিয়ার যেসব এলাকা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সরেজমিনে দেখা গেছে, কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী ইউনিয়নের মতির বাপের পাড়া, চিন্নি খাইয়ে পাড়া, শাহজীর পাড়া, গাইনে কাটা, নয়াঘোনা ও ধুপি পাড়া পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া দক্ষিণ ধূরুং ইউনিয়নের কিল্লার পাড়া ও বাতিঘর এলাকা, উত্তর ধূরুং ইউনিয়নের আজিম উদ্দিন সিকদার পাড়া, চাটি পাড়া, জইজ্যার পাড়া, ছাদের ঘোনা, জুম্মা পাড়া ও বাকখালী এলাকায়ও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বড়ঘোপ ইউনিয়নের আজম কলোনিতে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। পাশাপাশি আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের পূর্ব তাবালেরচর, আনিছর ডেইল ও জেলে পাড়া; বড়ঘোপ ইউনিয়নের বদাইয়ার পাড়া, মনোহরখালী, মিয়ার ঘোনা, কালাইয়া পাড়া ও দক্ষিণ অমজাখালী; এবং কৈয়ারবিল ইউনিয়নের মলমচর, কিল্লার পাড়া ও নজর আলী মাতবর এলাকায়ও মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পেকুয়ায় নৌকাই প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম পেকুয়া উপজেলার টইটং, বারবাকিয়া, শিলখালী, পেকুয়া সদর, উজানটিয়া, রাজাখালী ও মগনামা ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম এখনও পানির নিচে রয়েছে। অনেক এলাকায় রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় নৌকাই মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে। উজানটিয়া ইউনিয়নের কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শনে এলেও তাঁদের সমস্যার কথা যথাযথভাবে শোনা হয়নি। তাঁরা বলেন, “রাতে ঘুমাতে পারছি না, ছেলে-মেয়েরা না খেয়ে আছে। আমরা পর্যাপ্ত সাহায্য পাচ্ছি না।” ত্রাণ সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই উপজেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার সরবরাহ করা হয়নি। ফলে অনেক পরিবার খাবার সংকটে দিন কাটাচ্ছে। কৃষক হারুন বলেন, “বৃষ্টির প্রথম রাতেই আমার ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যায়। ঘরের হাঁড়ি-পাতিলসহ অনেক জিনিসপত্র ভেসে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে অন্যের ঘরে আশ্রয় নিয়ে আছি।” তিনি আরও বলেন, “আমার মাছের ঘেরটাই ছিল বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। সেটাও ভেসে গেছে। এখন আমি পুরোপুরি নিঃস্ব।” প্রশাসনের বক্তব্য কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান বলেন, “স্লুইসগেট ও কালভার্টগুলো নজরদারি করতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনও বিষয়টি তদারকি করছে। পানিবন্দি পরিবারগুলোর জন্য শুকনো খাবার বিতরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।” পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রশাসনের টিম কাজ করছে। সাতটি ইউনিয়নের জন্য ১০ মেট্রিক টন জিআর চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরও সহায়তা চাওয়া হবে। শুকনো খাবার বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।” তদন্তের দাবি কেন জোরালো হচ্ছে স্থানীয়দের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে এটি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা নয়; বরং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনার ইঙ্গিতও বহন করতে পারে। স্লুইসগেট ও কালভার্টের কার্যকারিতা, এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় স্লুইসগেট, কালভার্ট ও বেঁড়িবাধের কার্যকর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব অবকাঠামো সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে অতিবৃষ্টির সময় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ধস শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং বহুদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে রবিবার (১২ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জনে। দুর্যোগের মাত্রা জেলা মৃত্যু কক্সবাজার ২৮ জন চট্টগ্রাম ১৩ জন রাঙামাটি ৩ জন বান্দরবান ৬ জন মোট ৫০ জন সংখ্যায় ক্ষয়ক্ষতি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ৮,৬৬,৬১৪ জন খোলা আশ্রয়কেন্দ্র ১,৭২৭টি আশ্রয় নেওয়া মানুষ ৩৭,০৫৫ জন সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত ৪১২ মিমি কেন বন্যা এত প্রাণঘাতী হয়ে উঠল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই বিপর্যয়ের পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে। রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিপাত ৪৩ বছরের রেকর্ড ভেঙে একদিনে সর্বোচ্চ ৪১২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়। অল্প সময়ে এত বিপুল বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে সমতল এলাকার পানি দ্রুত বেড়ে যায়। উজানের পাহাড়ি ঢল ভারতের ত্রিপুরা ও সংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চল এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা ঢল সাঙ্গু, ডলু ও শঙ্খ নদীর পানির চাপ বাড়িয়ে দেয়। এসব নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালী দ্রুত প্লাবিত হয়। পাহাড়ধসের ঝুঁকি অতিভারী বর্ষণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে অন্তত ৯৭টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। পাহাড়ের পাদদেশে ও ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে গড়ে ওঠা অস্থায়ী ও অবৈধ বসতিগুলো মাটির নিচে চাপা পড়ায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যায়। নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা দখল এবং পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরতে পারেনি। ফলে অনেক এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা কৃত্রিম বন্যার রূপ নেয়। সতর্কতা উপেক্ষা ও সীমিত প্রয়োগ প্রশাসন মাইকিং ও অনুরোধের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বললেও অনেকে যাননি। তবে প্রশ্ন উঠেছে, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে মানুষকে সরিয়ে নিতে প্রশাসন কতটা কার্যকর ও আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছিল। সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে মানবিক সংকট চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র, এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। পশ্চিম বাঁশখালীর কাথারিয়া, বড়ইতলী, গণ্ডামারা, ডোমরা, কদমরসূল, খানখানাবাদ ও বাহারছড়াসহ উপকূলীয় এলাকায় অধিকাংশ বাড়িঘর পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্র বা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। কিছু মানুষ বাড়ির উঁচু অংশ বা টিনের ছাদে অবস্থান করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মোবাইল ফোন চার্জ দিতে না পারায় অনেক পরিবার আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জেলা ভিত্তিক চিত্র জেলা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ চট্টগ্রাম ৬,৬২,০০০ জন কক্সবাজার ১,৫৮,০২৭ জন রাঙামাটি ৩,৮২০ জন খাগড়াছড়ি ৩৪,৪১৭ জন বান্দরবান ৮,৩৫০ জন মোট ৮,৬৬,৬১৪ জন আশ্রয়কেন্দ্র ও বাস্তবতা পাঁচ জেলায় মোট ১,৭২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ৩৭,০৫৫ জন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তুলনায় আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক কম। জেলা আশ্রয়কেন্দ্র আশ্রিত মানুষ চট্টগ্রাম ৬৭০টি ২২,৬০০ জন কক্সবাজার ৬৪০টি ২,৯৭৪ জন রাঙামাটি ৪৭টি ৩,৮২০ জন খাগড়াছড়ি ১৫০টি ২,৯১৬ জন বান্দরবান ২২০টি ৪,৭৪৫ জন মোট ১,৭২৭টি ৩৭,০৫৫ জন প্রশাসনের পদক্ষেপ ও প্রশ্ন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন জানিয়েছেন, বন্যাকবলিত এলাকা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, দুর্গম এলাকায় স্পিডবোট ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে: ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনী উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে কাজ করছেন। চট্টগ্রাম মহানগরের ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়কে পাঁচটি জোনে ভাগ করে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও পানি দ্রুত সরতে পারেনি এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। মূল প্রশ্নগুলো ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি বসতি থেকে মানুষকে সরাতে প্রশাসন কেন আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি? খাল-নালা দখল ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ কতটা কার্যকর ছিল? আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত থাকলেও কেন বিপুল সংখ্যক মানুষ সেখানে যাননি? দুর্গম এলাকায় দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছাতে ভবিষ্যতে কী ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন? এই বিপর্যয় দেখিয়েছে যে অতি ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢল তাৎক্ষণিক কারণ হলেও, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা প্রাণহানিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে আগাম সতর্কতা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাধ্যতামূলক স্থানান্তর, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সমন্বিত উদ্ধার ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : চট্টগ্রামে টানা অতিবৃষ্টির কারণে রেললাইন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর আগে, দীর্ঘ ১১ ঘণ্টা আটকে থাকার পর মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাত ১১টার দিকে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রা বাতিল করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ভোর ৬টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে আসা ট্রেনটিতে প্রায় ৮০০ যাত্রী ছিলেন। ট্রেনটির বিকেল পৌনে ৩টায় কক্সবাজার পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু চট্টগ্রামের ষোলশহর স্টেশনের কাছে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এটি আটকে পড়ে। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে রেললাইনের ওপর পানি জমে যায়। প্রথমে ট্রেনটি মুরাদপুর সুন্নিয়া মাদ্রাসার সামনে আটকে থাকলেও পরে সেটিকে সরিয়ে ষোলশহর রেলওয়ে স্টেশনের সামনে নেওয়া হয়। রেললাইনে ২০ ইঞ্চি পানি রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফারহান মাহমুদ বলেন, রেললাইনের ওপর প্রায় ২০ ইঞ্চি পানি জমে ছিল। “পানি অন্তত ছয় ইঞ্চিতে না নামলে ট্রেনের ইঞ্জিন চালানো সম্ভব নয়। সন্ধ্যার দিকে পানি কিছুটা কমলেও রাতে বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ায় পানি আবার বাড়তে শুরু করে। এ কারণে পরিস্থিতি বিবেচনা করে যাত্রীদের সুরক্ষায় রাত ১১টার দিকে আমরা ট্রেনটির যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছি,” বলেন তিনি। যাত্রীদের দীর্ঘ দুর্ভোগ ট্রেনটির যাত্রা বাতিলের ঘোষণা আসে গভীর রাতে। এতে ট্রেনে থাকা শিশু, বৃদ্ধ ও অন্যান্য যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। দীর্ঘ সময় ট্রেনে আটকে থাকার কারণে খাবার, বিশ্রাম ও গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। অনেক যাত্রীকে পরে বিকল্প ব্যবস্থায় গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়। সকাল থেকেও ট্রেন চলাচল বন্ধ ষোলশহর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আরিফুল ইসলাম জানান, বুধবার সকাল থেকেও চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে কোনো ট্রেন চলাচল করেনি। “এখনও রেললাইনে পানি জমে আছে। পানি সরে গেলে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হবে,” বলেন তিনি। ঘটনার তাৎপর্য চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটটি পর্যটন ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় শুধু কক্সবাজারগামী পর্যটকরাই নন, স্থানীয় যাত্রীদেরও দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুমে রেললাইন প্লাবিত হওয়ার ঘটনা রেল অবকাঠামোর জলাবদ্ধতা-সংক্রান্ত ঝুঁকির বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : কক্সবাজারের উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভারী বর্ষণের মধ্যে পাহাড়ধসে একটি মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানার ওপর মাটি ও ধ্বংসাবশেষ চাপা পড়ে অন্তত আট শিশুশিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। আহত অবস্থায় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে আরও ১৩ শিশুকে। বুধবার (৮ জুলাই) দুপুর ২টার দিকে ক্যাম্পের এ-৩ ব্লকে অবস্থিত খাদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যা ৬টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের নেতৃত্বে পরিচালিত উদ্ধার অভিযান শেষ হয়। ঘটনার সারসংক্ষেপ স্থান: উখিয়া, কক্সবাজারের ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প, এ-৩ ব্লক সময়: বুধবার (৮ জুলাই), দুপুর প্রায় ২টা নিহত: ৮ শিশুশিক্ষার্থী জীবিত উদ্ধার: ১৩ শিশুশিক্ষার্থী আহতদের চিকিৎসা: ক্যাম্প-৩-এর জিকে হাসপাতাল, ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল ও ক্যাম্প-৬-এর আইআরসি হাসপাতালে উদ্ধারকারী সংস্থা: ফায়ার সার্ভিস, সিসিসিএম স্বেচ্ছাসেবক, এপিবিএন ও ক্যাম্প প্রশাসন কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, টানা ভারী বর্ষণের মধ্যে দুপুরে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। ধসের সঙ্গে পাহাড়ের খাদে নির্মিত একটি দেয়াল ভেঙে মাদ্রাসা ও হেফজখানার ওপর আছড়ে পড়ে। দুর্ঘটনার সময় সেখানে সাত থেকে ১৫ বছর বয়সী মেয়েশিশুরা কোরআন শিক্ষা নিচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ বিকট শব্দের পর মাটি ও ধ্বংসাবশেষে শ্রেণিকক্ষটি চাপা পড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ধার অভিযান খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তাদের সঙ্গে যোগ দেন এপিবিএন সদস্য, স্থানীয় রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থার কর্মীরা। প্রায় চার ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে আট শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং ১৩ শিশুকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। সরকারি তথ্য “পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাম্প-৫ এলাকা থেকে এ পর্যন্ত আট জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে চার জন ঘটনাস্থলেই এবং অপর চার জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ১৩ শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।” — মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) আরআরআরসি জানিয়েছে, আহত শিশুদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে এবং তাদের চিকিৎসা চলছে। নিহতদের পরিচয় নিহত আট শিশুর মধ্যে চার জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন: রাশিদা বেগম (১৩) উম্মে নেজাতুল (১৩) উম্মে সালমা (১২) উমাইসা বিবি (১৩) অপর শিশুদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। শিক্ষিকার বর্ণনায় দুর্ঘটনার মুহূর্ত “আমাদের এখানে ২৫ জনের মতো শিশু পড়ছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে পাহাড়ধসে খাদে নির্মিত দেয়াল মাদ্রাসার ওপর ধসে পড়ে। মুহূর্তেই চারদিক ধুলায় অন্ধকার হয়ে যায়। আমরা সবাই মাটির নিচে চাপা পড়ি। পশ্চিম পাশের দরজাটি খোলা থাকায় কয়েকজন বের হতে পেরেছিলাম, কিন্তু পূর্ব পাশে থাকা অনেক শিশু বের হওয়ার সুযোগ পায়নি।” — বেগম জাহান, শিক্ষিকা তিনি আরও বলেন, সাত জন নারী শিক্ষক সেখানে পাঠদান করাচ্ছিলেন এবং প্রায় ২৫ জন শিক্ষার্থী কোরআন শিক্ষা নিচ্ছিল। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান ও তদন্তের প্রশ্ন দুর্ঘটনাস্থলটি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকাল থেকেই আশ্রয়শিবিরে ভারী বর্ষণ হচ্ছিল এবং বৃষ্টির পানি পাহাড়ি মাটি নরম করে দেয়। এই ঘটনার পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে: মাদ্রাসা ও হেফজখানাটি পাহাড়ের এত কাছে কেন নির্মিত হয়েছিল? বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার বিষয়ে আগাম সতর্কতা বা স্থানান্তর ব্যবস্থা ছিল কি? রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ কতটা কার্যকর? ক্যাম্প এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলো দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন, অস্থায়ী কাঠামো নির্মাণ এবং বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টিপাত—সব মিলিয়ে এসব এলাকা দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে নিয়মিত নিরাপত্তা মূল্যায়ন, ঢাল সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে স্থানান্তর ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এই পাহাড়ধস শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত শিশুদের নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত ঝুঁকি এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। আট শিশুশিক্ষার্থীর মৃত্যুতে ক্যাম্পজুড়ে শোক নেমে এসেছে, আর জীবিত উদ্ধার হওয়া শিশুদের চিকিৎসা চলছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : টানা ভারি বর্ষণের এক রাতেই কক্সবাজারে পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে আটজন রোহিঙ্গা শরণার্থী, একজন স্থানীয় বাসিন্দা এবং পেকুয়ায় মারা যাওয়া এক শিশুও রয়েছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে, যেখানে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একাধিক পাহাড়ধসে একই পরিবারের সাতজনসহ মোট আটজন প্রাণ হারিয়েছেন। ঘটনার পর প্রশাসন এটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ঝুঁকি ও অবৈধ পাহাড় কাটার পরিণতি হিসেবে দেখছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের পাদদেশে অনিয়ন্ত্রিত বসতি, অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা এবং টানা বর্ষণের সম্মিলিত প্রভাবে এ ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এক রাতে চার স্থানে পাহাড়ধস রোববার গভীর রাত থেকে সোমবার ভোরের মধ্যে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। একই সময় পেকুয়ায়ও পাহাড়ধসে প্রাণ হারায় এক শিশু। মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার সদরের দরিয়ানগর এলাকায় আরেকটি পাহাড়ধসে এক নারীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শিশুসহ চারজন আহত হন। জামতলীর ট্র্যাজেডি: একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৬ ব্লকে। রাত দেড়টার দিকে পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ে মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর। মুহূর্তেই ঘরটি মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। উদ্ধার অভিযানে নিহত হন— কামাল হোসাইন (৪৪) তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) তাদের চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাস পরিবারের ১০ সদস্য ঘুমিয়ে থাকলেও অলৌকিকভাবে সাতজন জীবিত উদ্ধার হন। তবে তাদের সবাই আহত। উখিয়া ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে তিনজনের মরদেহ এবং দুইজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আরও পাঁচ প্রাণহানি জামতলীর ঘটনার কিছুক্ষণ পর রাত ২টার দিকে কুতুপালং ৭ নম্বর ক্যাম্পে পাহাড়ধসে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। এর প্রায় দেড় ঘণ্টা পর বালুখালী ১১ নম্বর ক্যাম্পের সি-১১ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে একই পরিবারের চার সদস্য নিহত হন। তারা হলেন— উম্মে হাবিবা (২৭) তানজিনা আক্তার (১৩) মোহাম্মদ রিহান (৫) হারুনুর রশিদ (৩) ক্যাম্পের বাইরে স্থানীয় বাসিন্দারও মৃত্যু রাত তিনটার দিকে কক্সবাজার শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আলী আকবর নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের খলিফা মুরা আলিম্যার ঝিরি এলাকায় সোমবার দুপুরে পাহাড়ধসে সাত বছরের শিশু মো. মিনহাজ উদ্দিনের মৃত্যু হয়। প্রশাসনের হিসাব কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান জানান, পাহাড়ধসে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আবহাওয়ার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছে। আতঙ্কের নাম বর্ষাকাল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারী আবদুস সালাম ও মাহ আলম বলেন, বর্ষা মৌসুম এলেই তাদের জীবনে নেমে আসে স্থায়ী আতঙ্ক। তাদের ভাষ্য, অধিকাংশ ঘর পাহাড় কেটে তৈরি ঢালের ওপর বাঁশ, ত্রিপল ও অস্থায়ী উপকরণ দিয়ে নির্মিত। ভারি বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে গেলে সামান্য ধসও মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিবারকে চাপা দিতে পারে। ঝুঁকিতে প্রায় তিন লাখ মানুষ শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্প নয়, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও রামুর পাহাড়ঘেরা এলাকাগুলোতেও প্রায় তিন লাখ মানুষ পাহাড়ের পাদদেশ বা ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় বসবাস করছেন। টানা বৃষ্টির কারণে এসব এলাকায় নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। অবৈধ পাহাড় কাটা নিয়ে প্রশাসনের কঠোর বক্তব্য শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় ও কিছু রোহিঙ্গার অবৈধ পাহাড় কাটার কারণে বহু এলাকা চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার দাবি, বারবার সতর্ক করার পরও একটি অসাধু চক্র পাহাড় কাটা অব্যাহত রেখেছে। তিনি বলেন, এই ঘটনা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়; অবৈধভাবে পাহাড় কেটে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরির কারণে এটি এক ধরনের মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। এ কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের হস্তক্ষেপের সংঘর্ষ প্রতিবছর বর্ষা এলেই কক্সবাজারে পাহাড়ধসের ঝুঁকি সামনে আসে। কিন্তু একই ধরনের প্রাণহানি বারবার ঘটলেও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরানো, পাহাড় কাটা বন্ধ করা এবং নিরাপদ পুনর্বাসনের মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এবারের ঘটনাও সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। যেখানে টানা বৃষ্টি ছিল তাৎক্ষণিক কারণ, আর অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি এবং দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছিল দীর্ঘদিনের নীরব বিপদের ভিত্তি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এ ধরনের মৃত্যু কতটা অনিবার্য, আর কতটা প্রতিরোধযোগ্য।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : টানা ভারী বর্ষণ, উজানের ঢল এবং পাহাড়ধসের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে রাঙামাটির অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়তে থাকায় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সন্ধ্যায় রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী স্বাক্ষরিত জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেকে সব ধরনের পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে এবং পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের প্রশাসনিক ঘোষণা নয়; বরং দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান জলবায়ুজনিত দুর্যোগের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরছে। পাহাড়ধসের আশঙ্কা কেন এত বেড়েছে? জেলা প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস এবং রাঙামাটিতে কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণের কারণে বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের উচ্চঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে— সাজেক ভ্যালির সব পর্যটনকেন্দ্র সব ঝর্ণা পাহাড়ি ট্রেইল দুর্গম এলাকা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পর্যটন স্পট প্রশাসন জানিয়েছে, পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা, ট্যুর অপারেটরসহ কারও প্রবেশ আপাতত অনুমোদিত নয়। শুধু সাজেক নয়, দেশের ১৭ জেলা বন্যার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ভারী বৃষ্টি এবং ভারতের উজানের ঢলের কারণে দেশের অন্তত ১৭ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী চার দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে— চট্টগ্রাম সিলেট ময়মনসিংহ রংপুর বিভাগে একই সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গেও ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। কোন কোন নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁতে পারে? বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে— উত্তর-পূর্বাঞ্চল সুরমা কুশিয়ারা নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল দ্রুত পানি বাড়ছে— গোমতী মুহুরী ফেনী সিলোনিয়া হালদা সাঙ্গু মাতামুহুরী এসব নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে— বান্দরবান কক্সবাজার ফেনী চট্টগ্রাম খাগড়াছড়ি নোয়াখালী লক্ষ্মীপুর উত্তরাঞ্চল আগামী ২৪–৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নীলফামারী ও লালমনিরহাটে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বান্দরবানে ৩০ হাজার পরিবার পাহাড়ধসের উচ্চঝুঁকিতে বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বান্দরবানে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী— সাত উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১২০টি আশ্রয়কেন্দ্র। মোতায়েন রয়েছে আটটি মেডিক্যাল টিম। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলছে মাইকিং। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় থানচি, রুমা, লামা ও আলীকদমে বন্যার আশঙ্কাও বাড়ছে। রুমার কেওক্রাডং এলাকায় ৫০ জনের বেশি পর্যটক আটকা পড়লেও থানচি ও রেমাক্রি থেকে পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত জেলার সব পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। কক্সবাজারে বাড়ছে প্রাণহানি, প্লাবিত ৩৩ ইউনিয়ন টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের নয়টি উপজেলার অন্তত ৩৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে শত শত পরিবার। দুই দিনে পাহাড়ধসে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। প্রশাসনের তথ্যমতে— এক হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। টেকনাফ–সেন্ট মার্টিন নৌপথে যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ। টানা পাঁচ দিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সেন্ট মার্টিনে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কুতুবদিয়ায় একটি সেতু ভেঙে স্থানীয় যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। রোহিঙ্গা শিবিরেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী— নিহত ১০ জন আহত ১০ জন ক্ষতিগ্রস্ত ১৫,৮১৩ জন বাস্তুচ্যুত ৩,১৮২ জন এ ছাড়া রেকর্ড করা হয়েছে— ৫২টি পাহাড়ধস ১৪টি বন্যা ৮৩টি ঝড়সংক্রান্ত ঘটনা মানবিক সংস্থাগুলো জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রামে রেকর্ড বৃষ্টি, বিমান ও রেল চলাচলে বিঘ্ন গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৩৩০.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এর ফলে— নগরের বহু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। তীব্র জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। রেললাইন ডুবে যাওয়ায় কক্সবাজারগামী ট্যুরিস্ট এক্সপ্রেস কয়েক ঘণ্টা আটকা পড়ে। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ঢাকায় ডাইভার্ট করা হয়। একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চট্টগ্রামে নামতে না পেরে ঢাকায় ফিরে যায়। বর্তমানে বিমানবন্দরে ঘণ্টায় ৮০–৯০ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইছে। রাঙামাটিতেও প্রাণহানি রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে পাহাড়ধসে উপড়ে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। কাপ্তাইয়ে পাহাড়ধস ও গাছ পড়ে সাময়িকভাবে চট্টগ্রাম–কাপ্তাই সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। পরে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হলেও প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর কী বলছে? আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক জানিয়েছেন, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমি লঘুচাপের প্রভাবে আগামী ৭২ ঘণ্টায়— চট্টগ্রাম ঢাকা রাজশাহী খুলনা বরিশাল সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। জলবায়ুজনিত দুর্যোগ কি নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠছে? সাজেক বন্ধের সিদ্ধান্ত বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়। একই সময়ে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামে একযোগে পাহাড়ধস, বন্যা, সড়ক বিচ্ছিন্নতা, পর্যটন স্থগিত, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং প্রাণহানির ঘটনা একটি বড় জলবায়ুগত সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত বসতি বিস্তারের কারণে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকি আরও বাড়ছে। ফলে কেবল জরুরি উদ্ধার নয়, দীর্ঘমেয়াদি ভূমি ব্যবস্থাপনা, পাহাড় সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : একদিকে টানা বর্ষণ, অন্যদিকে নরম হয়ে আসা পাহাড়ের মাটি। গভীর রাতে মুহূর্তের ব্যবধানে ধসে পড়া মাটির নিচে চাপা পড়ে নিভে গেল আটটি জীবন। কিন্তু সেই মৃত্যুর পরও বদলায়নি বাস্তবতা—কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে এখনও ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন লাখো মানুষ। প্রতি বর্ষা মৌসুমেই পাহাড়ধসের আশঙ্কা তৈরি হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কতা, মাইকিং এবং নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আশ্রয়ের সীমাবদ্ধতা, ঘনবসতি এবং বিকল্প জায়গার অভাবে বহু পরিবার এখনও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রয়ে গেছে। ফলে যেকোনও সময় আবারও ঘটতে পারে বড় ধরনের প্রাণহানি। পাহাড় কেটে তৈরি আশ্রয়, বর্ষায় বাড়ে বিপদ বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করছেন ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের পর প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষের জন্য পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কেটে বসতি গড়ে ওঠায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টিপাত হলেই এসব এলাকায় তৈরি হয় ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঝুঁকি। প্রতি বছরই ক্যাম্পগুলোতে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সোমবার গভীর রাতে উখিয়ার ৭ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় নারী ও শিশুসহ আটজন নিহত হন। ঘটনার পর ক্যাম্পজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একই সঙ্গে পাহাড়ঘেঁষা বসতিতে থাকা হাজারো পরিবারের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে নতুন আতঙ্ক। আট মৃত্যুর পরও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে মানুষ স্থানীয় প্রশাসন এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয় জানিয়েছে, ভারী বর্ষণের সময় অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। ক্যাম্পের লার্নিং সেন্টারগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কিছু পরিবার সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। তবে এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশের ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে অবস্থান করছেন। এ কারণে নতুন করে দুর্ঘটনার আশঙ্কা কাটছে না। ৭ নম্বর ক্যাম্প: পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা জনপদ উখিয়ার কুতুপালং টিভি টাওয়ারসংলগ্ন পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে ৭ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। এখানে ১০ হাজারের বেশি পরিবারের প্রায় অর্ধলাখ রোহিঙ্গার বসবাস। ক্যাম্পটির বড় একটি অংশ পাহাড়ের ঢাল ও নিচু এলাকায় অবস্থিত। বর্ষা এলেই এসব এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি হয় চরম উদ্বেগ। সোমবার রাতের পাহাড়ধসে এই ক্যাম্পে মো. একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ৭ নম্বর ক্যাম্পের চেয়ারম্যান রোহিঙ্গা নেতা আবদুল মাবুদ বলেন, পুরো ক্যাম্পই পাহাড় কেটে তৈরি হওয়ায় টানা বৃষ্টির সময় প্রায় অর্ধলাখ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কিছু পরিবারকে লার্নিং সেন্টারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাইকিং করে সবাইকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। নয়টি ক্যাম্পে বড় ঝুঁকি খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে অন্তত নয়টি ক্যাম্প পাহাড়ধসের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশ এবং খাড়া ঢালজুড়ে তৈরি হওয়া অসংখ্য বসতিতে বসবাস করছেন এক লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। বর্ষার ভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ায় এসব পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ক্যাম্প-১৫-এর বাসিন্দা মো. আক্তার বলেন, বর্ষা এলেই তাদের ভয় বেড়ে যায়। সোমবার রাতের পাহাড়ধসে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এমন ঘটনা ক্যাম্পবাসীর মধ্যে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে। তিনি বলেন, এখনও টানা বৃষ্টি চলছে। কেউ জানেন না কখন কোথায় আবার পাহাড় ধসে পড়বে। প্রশাসনের সতর্কতা, কিন্তু সংকট রয়ে গেছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বড় অংশ পাহাড় কেটে তৈরি হওয়ায় ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ে। তিনি বলেন, সোমবারের ঘটনায় নারী-শিশুসহ আটজনের মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে নিয়মিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ক্যাম্পের লার্নিং সেন্টারগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো—ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও বিকল্প জায়গার অভাবে বহু মানুষ এখনও বিপজ্জনক ঢালেই বসবাস করছেন। আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও বাড়াচ্ছে উদ্বেগ কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান জানান, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তিনি জানান, আগামী দুই দিন কক্সবাজারে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। বারবার সতর্কতার পরও কেন থামছে না ঝুঁকি? রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধস এখন শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, পাহাড় কেটে বসতি তৈরি, সীমিত পুনর্বাসন সুযোগ এবং বর্ষার তীব্রতা—সব মিলিয়ে প্রতিবছর নতুন করে তৈরি হচ্ছে প্রাণহানির আশঙ্কা। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—আর কত প্রাণহানির পর পাহাড়ের ঢালে বসবাসরত মানুষগুলোকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া সম্ভব হবে?
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আবারও দফায় দফায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দুপুর থেকে সীমান্তঘেঁষা রাখাইনের বলিবাজার ও কুমিরখালী এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে একের পর এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসে। এতে বাংলাদেশের হোয়াইক্যং ও হ্নীলা সীমান্তবর্তী এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে সীমান্তঘেঁষা এলাকার বাড়িঘর পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। ঘটনাটির পর সীমান্তের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এর আগে বুধবার (১ জুলাই) দিন ও রাতে রাখাইনের মংডু শহরে বিমান থেকে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। তবে এসব ঘটনার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হোয়াইক্যংয়ের বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, দুপুরের দিকে রাখাইনের বলিবাজার ও কুমিরখালী এলাকা থেকে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। তাঁর ভাষ্য, এ পর্যন্ত অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং প্রতিটি বিস্ফোরণেই সীমান্ত এলাকার বাড়িঘর কেঁপে ওঠে। হোয়াইক্যং ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু বলেন, প্রায় এক বছর আগে একই সীমান্ত এলাকায় আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়েছিল। সে সময় সীমান্ত এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন আতঙ্কে ছিলেন। নতুন করে বিস্ফোরণ ও সংঘর্ষের খবর স্থানীয়দের মধ্যে সেই উদ্বেগ আবারও ফিরিয়ে এনেছে। হ্নীলা মৌলভীবাজার এলাকার জেলে রহমত উল্লাহ জানান, সকালে নাফ নদীতে মাছ ধরতে গেলেও দুপুরের দিকে রাখাইন সীমান্ত থেকে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তিনি আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত তীরে ফিরে আসেন। এদিকে সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। উখিয়া ব্যাটালিয়ন (৬৪ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, বিস্ফোরণের শব্দের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে এবং বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি কেন গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের টেকনাফ অংশ অতীতে একাধিকবার সংঘর্ষের অভিঘাতের মুখে পড়েছে। সীমান্তের ওপারে সংঘর্ষ শুরু হলে স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের ঘটনাও সেই আশঙ্কাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বর্তমানে সীমান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে বিস্ফোরণ ও সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ এবং হতাহতের কোনো তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের সৃষ্ট বর্জ্যে স্থানীয়দের ৩০০ একর জমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হয়েছে। এসব জমি ময়লা-আবর্জনা সহ নানা বর্জ্যে এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এছাড়াও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গাদের অবাধ যাতায়াত, ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা সহ নানা অপরাধে স্থানীয়দের সাথে রোহিঙ্গাদের বড় ধরণের বিরোধের আশংকা করছেন। সোমবার (১১ মে) দুপুরে কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সম্মেলন কক্ষে ‘কক্সবাজারে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় সরকার ও জনগনের অংশগ্রহন জরুরী’ বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বক্তারা। কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরাম আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণের স্বার্থ, কর্মসংস্থান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গা কার্যক্রম বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে স্থানীয় জনগণের মতামত ছাড়া কোনো উন্নয়ন বা মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা না করার দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী রেজাউল করিম, সিসিএনএফের সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম ও উখিয়ার কুতুপালংয়ের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিনসহ আরো অনেকে। তাদের অভিযোগ, বর্তমানে তহবিল ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন প্রকল্পে স্থানীয় অংশগ্রহণ কম থাকায় বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় তহবিল ব্যবহারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা বাড়ানোর দাবি জানানো হয়। এছাড়া বিভিন্ন এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় স্থানীয়দের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে বলা হয়, জেলার বাইরে থেকে নিয়োগের প্রবণতা কমিয়ে স্থানীয় দক্ষ জনশক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় গঠিত আরসিটি কাঠামোতে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করারও দাবি জানায় সিসিএনএফ। তাদের মতে, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। এ কারণে একটি কার্যকর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন গঠনের দাবি জানানো হয়েছে, যা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম তদারকি করবে এবং স্থানীয় জনগণকে বাস্তব তথ্য জানাবে। সিসিএনএফ আরও উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে স্থানীয় এনজিও, জনপ্রতিনিধি ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। স্থানীয় জনগণের মতামত উপেক্ষা করে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করার আহ্বান জানানো হয়। সংগঠনটি দাবি করে, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে কক্সবাজারের হোস্ট কমিউনিটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই হোস্ট কমিউনিটির জন্য বরাদ্দকৃত ২৫ শতাংশ সহায়তার সঠিক ব্যবহার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং কারা সুবিধা পাচ্ছে সেসব তথ্য প্রকাশ করারও দাবি জানানো হয়।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : আন্দামান সাগর-এ মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলারডুবির ঘটনায় বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাসহ অন্তত ২৬৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে শতাধিক বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশ কিশোর ও তরুণ। কী ঘটেছিল তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ এপ্রিল কক্সবাজার উপকূল থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রলারটি উত্তাল সাগর ও অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে ডুবে যায়। প্রায় ৩৬ ঘণ্টা ভেসে থাকার পর ৯ জনকে একটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ উদ্ধার করে। পরে তাদের সেন্ট মার্টিনে কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মামলা হয়েছে এবং বর্তমানে তারা কারাগারে আছেন। বাকি তিনজন রোহিঙ্গা নাগরিক, যাদের কাছ থেকে ট্রলারডুবির বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। নিখোঁজদের পরিচয় নিখোঁজদের বেশিরভাগই উখিয়ার বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত রোহিঙ্গা। তবে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬২ জন বাংলাদেশির পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে: টেকনাফ: ৪০ জন উখিয়া: ৬ জন রামু: ৪ জন পেকুয়া: ৭ জন বাঁশখালী (চট্টগ্রাম): ৫ জন স্থানীয় সূত্র জানায়, সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ এলাকা থেকেই ৩০ জনের বেশি যুবক নিখোঁজ রয়েছেন। পরিবারগুলোর অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা নিখোঁজদের পরিবারগুলো চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই থানায়, জনপ্রতিনিধিদের কাছে এবং বিভিন্ন দপ্তরে ছুটছেন স্বজনদের খোঁজে। পেকুয়ার রাজাখালীর বাসিন্দা সুমি আক্তার বলেন, তার স্বামী দালালের প্রলোভনে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছেন। “তিনি বলেছিলেন পৌঁছে ফোন দেবেন। এরপর আর কোনো খবর পাইনি,” বলেন তিনি। পাচারচক্রের ফাঁদ স্থানীয়দের মতে, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে টেকনাফ উপকূল থেকে অন্তত তিনটি ট্রলার মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা দেয়। এর মধ্যে একটি ডুবে গেলেও অন্য দুটি থাইল্যান্ডে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবপাচারকারীরা মূলত দরিদ্র, বেকার ও ঋণগ্রস্ত তরুণদের লক্ষ্য করে। বিনা খরচে বিদেশে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের বিপজ্জনক সমুদ্রপথে পাঠানো হয়। মানবপাচার প্রতিরোধে কাজ করা একটি বেসরকারি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক পারভেজ সিদ্দিকী বলেন, “বেকারত্ব ও দারিদ্র্যই মানবপাচারের মূল চালিকাশক্তি। কঠোর আইন প্রয়োগ ও সচেতনতা ছাড়া এ নেটওয়ার্ক ভাঙা কঠিন।” উদ্ধার অভিযান ও অনিশ্চয়তা কোস্টগার্ড জানিয়েছে, এখনও নিখোঁজদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এমনকি ডুবে যাওয়া ট্রলারটির ধ্বংসাবশেষও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সময় কিছু মানুষ পানির ড্রাম ও কাঠের টুকরো ধরে ভেসে ছিলেন—যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : একদিকে উত্তাল সমুদ্রের গর্জন, অন্যদিকে ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্ক—এই দুইয়ের মাঝখানে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ। দীর্ঘ ৩৫ বছরেও একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় ক্রমাগত ভাঙনের মুখে পড়ে দ্বীপটি ছোট হয়ে আসছে। স্থানীয়দের দাবি, এক সময় প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কুতুবদিয়া এখন সঙ্কুচিত হয়ে প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে। তাদের আশঙ্কা—দ্রুত ‘সুপার ডাইক’ নির্মাণ না হলে অদূর ভবিষ্যতে দ্বীপটি মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যেতে পারে। জোয়ারে ভাঙছে বাঁধ, ডুবছে ফসলি জমি সরেজমিনে দেখা গেছে, জোয়ারের চাপে আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের তাবলেরচর, কাহারপাড়া এবং বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকার অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে শত শত একর ফসলি জমি ও লবণের মাঠ লোনাপানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হাসেম বলেন, “নোনাপানি ঢুকে চাষাবাদ বন্ধ হয়ে গেছে। আগে নিজের জমিতে কাজ করতাম, এখন অন্যের জমিতে মজুরি করতে হচ্ছে।” বাস্তুচ্যুতি ও জীবিকার সংকট বসতবাড়ি হারিয়ে অনেক পরিবার ইতোমধ্যে এলাকা ছেড়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, প্রতি বছরই এই বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা বাড়ছে। কৈয়ারবিল এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে যায়। তিন দশকেও তা আর সংস্কার হয়নি। বর্ষা এলেই দুশ্চিন্তা বাড়ে। আশ্রয়কেন্দ্রও পর্যাপ্ত নেই—আমরা কি সাগরে ভেসে যাব?” ঝুঁকিতে দক্ষিণ ধুরং দক্ষিণ ধুরং ইউনিয়ন বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন স্থানীয় চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আজাদ। তিনি বলেন, “বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রতি বছর জোয়ারের পানিতে ঘরবাড়ি, লবণের মাঠ ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। দ্রুত সিসি ব্লক বা ‘সুপার ডাইক’ নির্মাণ জরুরি।” একই দাবি জানিয়েছেন কুতুবদিয়া সমিতির সহসভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক হুমায়ুন সিকদার। তার ভাষায়, “১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর ভয়াবহ ক্ষতি হলেও এখনো টেকসই বাঁধ হয়নি। সুপার ডাইক নির্মাণের পাশাপাশি যাতায়াতের সুবিধার জন্য সেতু বা ফেরি চালুর প্রয়োজন।” পরিকল্পনা আছে, বাস্তবায়ন নেই পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, কুতুবদিয়া অংশে ৬৩ কিলোমিটার সুপার ডাইক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিশাল বাজেটের কারণে প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। কক্সবাজার পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “কয়েকটি এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বর্ষা মৌসুমের আগেই ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : কক্সবাজার শহরের এন্ডারসন রোডের একটি আবাসিক হোটেল থেকে এক ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৮টার দিকে হোটেল নিশীতা’র ৪০৮ নম্বর কক্ষের দরজা ভেঙে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। নিহত ব্যক্তির নাম অর্জুন দাশ (৬০)। তিনি ফেনীর শ্রীধাম চন্দ্র দাশের ছেলে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ ও হোটেল সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ এপ্রিল অর্জুন দাশ এক অজ্ঞাত ব্যক্তির সঙ্গে হোটেলটির ওই কক্ষটি তিন দিনের জন্য ভাড়া নেন। নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও কক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় হোটেল কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয়। এরপর বুধবার বিকেলে কক্ষের সামনে গিয়ে কর্মীরা ভেতর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ পান। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানানো হলে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় পরে দরজা ভেঙে প্রবেশ করা হয়। ভেতরে অর্জুন দাশকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। দীর্ঘ সময় কক্ষে পড়ে থাকার কারণে মরদেহটি অর্ধগলিত হয়ে যায় বলে জানায় পুলিশ। উদ্ধারকালে মরদেহটি নগ্ন অবস্থায় ছিল এবং পাশে একটি গামছা পাওয়া গেছে। পরে মরদেহের সুরতহাল শেষে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। এ সময় ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলে কিছু সময় উদ্ধার কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হয়। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ছমিউদ্দিন বলেন, নিহতের সঙ্গে থাকা অজ্ঞাত ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। মৃত্যুর কারণ উদঘাটনে ময়নাতদন্ত করা হবে।
সাজ্জদুল ইসলাম,পেকুয়া : এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলাকালে কক্সবাজারের পেকুয়ায় ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, গৃহিণী ও ব্যবসায়ীরা। গত ২১ এপ্রিল থেকে পরীক্ষা শুরু হলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় পড়ালেখায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। দিনে মাত্র ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে, তাও আবার দীর্ঘ সময় নয়, বারবার লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয়রা জানান, রাত ১টার আগে অনেক সময় বিদ্যুতের দেখা মেলে না। মাঝেমধ্যে এলেও আধাঘন্টার বেশি স্থায়ী হয় না। একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এসএসসি পরীক্ষার্থী সুবর্ণা শাওরিন বলেন, পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছি না। রাতে পড়তে বসলে বিদ্যুৎ চলে যায়। গরমে ঘুমানোও যায় না, পড়ালেখাও সম্ভব হয় না। মাঝেমধ্যে উঠানে পাটি বিছিয়ে মোবাইলের আলো দিয়ে পড়তে হয়। এতে পরীক্ষার প্রস্তুতি খুব খারাপ হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম ও আব্দু শুক্কর বলেন, বিদ্যুতের অভাবে দোকানে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে গেছে। ফ্যান চলে না, কাস্টমার বসতে চায় না। ফ্রিজে রাখা পানীয় ও অন্যান্য পণ্য নষ্ট হওয়ার উপক্রম। অভিভাবক ও সচেতন মহল বলছেন, পরীক্ষা চলাকালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত লোডশেডিং কমানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে পল্লীবিদ্যুত জোনাল অফিস পেকুয়ার এজিএম ফিরোজ কবীর এর মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সাজ্জাদুল ইসলাম: কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা-এর একটি গ্রামে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে, যা স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের পানির সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। উপজেলার সদর এলাকার সিকদারপাড়া গ্রামে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটির আওতায় প্রায় ৫০০টি পরিবার সরাসরি নিরাপদ পানির সুবিধা পাবে। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পেকুয়া ছাড়াও পাশের চকরিয়া উপজেলা-এর বিভিন্ন ইউনিয়নে একই ধরনের পানি সরবরাহ প্রকল্প ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। পাশাপাশি পেকুয়ার মগনামা, রাজাখালী, বারবাকিয়া ও টইটং ইউনিয়নেও আরও কয়েকটি প্রকল্পের কাজ চলছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এর ফলে পানিবাহিত রোগ কমে আসবে এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে বলে তারা আশা করছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সরকার উপকূলীয় এলাকার মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভোগার পর এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরে আসবে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সমুদ্রপথে পালানোর চেষ্টায় ২০২৫ সাল রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ইউএনএইচসিআর বা জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার প্রকাশিত সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ওই বছরে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে বিপজ্জনক যাত্রাকালে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন। সংস্থাটি জানায়, ২০২৫ সালে ছয় হাজার ৫০০-র বেশি রোহিঙ্গা এই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে যাত্রা করেন। তাদের মধ্যে প্রতি সাতজনের একজনের মৃত্যু হয়েছে বা তারা নিখোঁজ হয়েছেন—যা বিশ্বব্যাপী শরণার্থী ও অভিবাসীদের সমুদ্রপথে চলাচলের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যুহার হিসেবে বিবেচিত। ২০২৬ সালেও এই বিপজ্জনক প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত দুই হাজার ৮০০-র বেশি রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। গত ২৬ মার্চ বাংলাদেশ থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকা উত্তাল সাগরে ডুবে গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে প্রায় ২৫০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। পরবর্তীতে ৯ এপ্রিল আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে নয়জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। কেন ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছেন রোহিঙ্গারা? মানবপাচার, শোষণ এবং সমুদ্রে মৃত্যুর উচ্চ ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও হাজারো রোহিঙ্গা এই পথ বেছে নিচ্ছেন। বেশিরভাগ নৌযাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশের কক্সবাজার বা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে, যার গন্তব্য ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়া। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে: মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও নিপীড়ন নাগরিকত্বের অনিশ্চয়তা নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের অভাব অন্যদিকে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। তহবিল সংকটের কারণে মানবিক সহায়তা কমে যাওয়া, নিরাপত্তাহীনতা এবং শিক্ষা ও জীবিকার সীমিত সুযোগ অনেককেই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে যাত্রায় বাধ্য করছে। নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জাতিসংঘ বলছে, রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ এখনো নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফিরে যেতে চায়। তবে মিয়ানমারে চলমান পরিস্থিতি তাদের সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে—ফলে সমুদ্রপথে অনিশ্চিত যাত্রাই হয়ে উঠছে অনেকের একমাত্র বিকল্প।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : দালালদের খপ্পরে পড়ে অবৈধ উপায়ে সাগরপথে ট্রলারযোগে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে ২৭৩ জন নারী-পুরুষকে বহনকারী একটি ট্রলার ডুবে গেছে। ডুবে যাওয়া ট্রলারে থাকা যাত্রীরা সকলেই কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। এদের মধ্যে ৯ জন জীবিত উদ্ধার করা হলেও অপর ২৬৪ জনের খোঁজ মিলছে না। ধারণা করা হচ্ছে, ডুবে যাওয়া ট্রলারের অধিকাংশেরই সলিল সমাধি হয়েছে। টেকনাফ থানা পুলিশ ও কোস্ট গার্ড বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছে। এই ঘটনায় ৬ জন দালালকে আসামি করে টেকনাফ থানায় মামলা করেছে কোস্ট গার্ড। উদ্ধার হওয়া ৯ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এদিকে ট্রলারডুবিতে নিখোঁজদের স্বজনদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম। স্বজনরা জানিয়েছেন, প্রিয়জনদের কোনো খোঁজ না পেয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা তথ্য দেখে তারা প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। তাদের মতে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের স্বজনরা সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পর এই ভয়াবহ ঘটনার পর থেকে পরিবারগুলো ভেঙে পড়েছে। তাদের স্বজনরা বেঁচে আছেন নাকি সাগরের ঢেউয়ে হারিয়ে গেছেন- তাও তারা জানেন না। মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবিতে উদ্ধার হওয়া ৯ জন হলেন- কক্সবাজার শহরতলীর শান্তি পাড়ার মো. হামিদ ও মো. সায়াদ আলম, মো. আকবর, টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকার সোহান উদ্দিন এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মো. হৃদয়, উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের রফিকুল ইসলাম, রাহেলা বেগম ও মো. ইমরান এবং টেকনাফ বড়বিল এলাকার মো. তোফায়েল আহমেদ। টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যংয়ের নিখোঁজ এনায়েতুর রহমানের বাবা মোহাম্মদ কালু বলেন, আমার ছেলে বাড়ির পাশের একটি ইটভাটায় দিনমজুর হিসেবে কাজ করত। তার আয়ে আমাদের সংসার ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু গত ২ এপ্রিল থেকে সে নিখোঁজ হয়। তিনি জানান, খোঁজখবর নিয়ে জানতে পেরেছেন- দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে তার ছেলে টেকনাফ হয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। একপর্যায়ে খবর আসে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে তাদের বহনকারী ট্রলারটি ডুবে যায়। মোহাম্মদ কালু বলেন, ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে কোনোভাবে ৯ জন উদ্ধার হয়ে ফিরে এলে তাদের কাছ থেকেই জানতে পারি, আমার ছেলে এনায়েতসহ আরও নারী-পুরুষ ট্রলারডুবির ঘটনায় সাগরে তলিয়ে গেছে। জিয়াউর রহমান নামের একজন জানান, সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় তার দুই ছেলে মোহাম্মদ জুনায়েদ ও মোহাম্মদ তারেক ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হয়েছে। তারা বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তিনি জানেন না। সূত্র বলছে, চার-পাঁচ দিন আগে ২৭৩ জন যাত্রী নিয়ে আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে। এতে ৯ জন কোনোভাবে উদ্ধার হয়ে জীবিত ফিরতে পারলেও বাকি ২৬৪ জনের এখনো কোনো খোঁজ মিলছে না। আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবির ঘটনায় বেঁচে ফেরা রোহিঙ্গা রাহেলা বেগম বলেন, আমার এক খালাতো ভাই আমাকে মালয়েশিয়ায় বিয়ে দেওয়ার কথা বলে সাগরপথে নিয়ে যাচ্ছিল। পথে ঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলারটি আন্দামান সাগরে ডুবে যায়। তিনি বলেন, আমরা ৯ জন সাগরে ভাসমান অবস্থায় ছিলাম। পরে একটি ট্রলারের সহায়তায় উদ্ধার হয়েছি। তবে বাকি নারী-পুরুষ কতজন উদ্ধার হয়েছে, তা তিনি জানেন না। তিনি নিজের চোখে দেখেছেন ১০-২০ জন নারীসহ অনেকেই সাগরে ডুবে গেছে। টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ৯ জনকে কোস্ট গার্ড থানায় আসে। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভিকটিমদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা সাব্বির আলম সুজন জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম থেকে ইন্দোনেশিয়াগামী বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমটি মেঘনা প্রাইড গত ৯ এপ্রিল দুপুরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে গভীর সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় ৯ বাংলাদেশিকে (৮ পুরুষ ও ১ নারী) ভাসতে দেখে উদ্ধার করে। পরে মধ্যরাতে উদ্ধারকৃতদের কোস্ট গার্ডের টহল জাহাজ মনসুর আলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। কোস্ট গার্ড তাদের টেকনাফ থানায় নিয়ে আসে।
কক্সবাজারের টেকনাফের সেন্টমার্টিন দ্বীপের আকাশে অজ্ঞাত ড্রোন উড়তে দেখা যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে দ্বীপের জেটি সংলগ্ন পূর্ব আকাশে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে লাল-সবুজ রঙের দুটি ড্রোন উড়তে দেখা যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ঘটনাটি জানাজানি হলে আশপাশের মানুষজন জড়ো হন এবং পরে বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করা হয়। সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, তিনি নিজেও ড্রোন দুটি দেখতে পেয়েছেন এবং ধারণা করছেন সেগুলো মিয়ানমারের দিক থেকে আসতে পারে। তার মতে, সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নজরদারির অংশ হিসেবেও ড্রোনগুলো ব্যবহৃত হতে পারে। দ্বীপের বাসিন্দা মোহাম্মদ আজিম জানান, রাতে আকাশে ড্রোন উড়তে দেখে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছেন, এগুলো সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় অস্থিরতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, এ ধরনের ড্রোন কার্যক্রম দেশের আকাশসীমা ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং সীমান্তে নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন দ্বীপের বাসিন্দারা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বন অধিদপ্তরের ‘সুফল (টেকসই বন ও জীবিকা)’ প্রকল্পে প্রায় ১.৫ কোটি টাকা বাগান সৃজন না করে আত্মসাৎ করার অভিযোগে তৈরি হয়েছে তীব্র অস্থিরতা। অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের এক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি তহবিল আত্মসাত ও ঘুষ প্রদান করে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করার — অথচ এক বছরেও কোনো কার্যকর তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকারি হিসাব ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের কুমিরা রেঞ্জে ৭০ ও ১০ হেক্টর জমিতে বাগান সৃজনের কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। নির্ধারিত মান পূরণে ব্যর্থতার বিষয়টি বন বিভাগীয় পর্যায়ে “ওপেন সিক্রেট” হলেও এখন পর্যন্ত সংঘবদ্ধ অভিযোগের কোনো প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।গত এক বছর ধরে এই অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি বন বিভাগে ‘ওপেন সিক্রেট’ হলেও এখনো কোনো কার্যকর তদন্ত হয়নি। বরং অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সাদেকুর রহমানকে শাস্তির পরিবর্তে ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দিয়ে কক্সবাজারের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা বন বিভাগের ‘লোভনীয় পোস্টিং’ হিসেবে পরিচিত। অভিযোগের মূল পয়েন্ট • পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটে ঘুষ দিয়ে প্রকল্পের সত্যতা লুকানোর চেষ্টা করা হয়েছে, অভিযোগ পাওয়া গেছে। • অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এক কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি পেয়ে কক্সবাজারের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জে বদলি হয়েছেন — বন বিভাগের মধ্যে এটিকে “লোভনীয় পোস্টিং” হিসেবেও দেখা হচ্ছে। • সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি ও পদোন্নতির মাধ্যমে এই ঘটনার অনুসন্ধান সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম অনিয়ম গত ২৬ নভেম্বর, উপবন সংরক্ষক উম্মে হাবিবা চট্টগ্রাম বিভাগের বন কর্মকর্তার কাছে চিঠি দেন, যাতে ৭ দিনের মধ্যে কুমিরা রেঞ্জে ব্যর্থতার দায়ে সংশ্লিষ্টদের তালিকা জমা দিতে বলা হয়। তবে সময়সীমা অতিক্রম করা সত্ত্বেও সেই তালিকা দপ্তরে পাঠানো হয়নি। এর আগের ২২ এপ্রিল পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ ছিল, • ১৭০ হেক্টর বাগানে জীবিত চারার হার ছিল মাত্র ৬০.২০%, • অন্য ১০ হেক্টরের বাগানে ছিল মাত্র ৫০.৪০%, যেখানে ন্যূনতম ৮০% জীবিত চারার হার থাকার কথা ছিল। অভিযুক্তরা এবং তাদের অবস্থান সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক ড. মোল্যা রেজাউল করিমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তিন কর্মকর্তা এই অর্থ আত্মসাতে জড়িত — সাদেকুর রহমান — কক্সবাজার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা এস.এম. কায়চার — উপবন সংরক্ষক (বর্তমানে চট্টগ্রাম বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক পরিচালক) জয়নাল আবেদীন — সহকারী বন সংরক্ষক (বর্তমানে হবিগঞ্জে কর্মরত) জিজ্ঞাসা করলে, সাদেকুর রহমান বলেন, “আমি এখানে নতুন দায়িত্বে আছি; এ বিষয়ে ডিএফও’র সঙ্গে কথা বলুন।” এস.এম. কায়চার ফোন রিসিভ করেননি। জয়নাল আবেদীন বলেন, “আমি অভিযুক্ত, তাই কিছু বলতে পারব না।” ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ওঠা কর্মকর্তার মন্তব্য পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটের উপবন সংরক্ষক উম্মে হাবিবার বিরুদ্ধেও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে, যদিও তিনি সেটা গণমাধ্যমে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। বন বিভাগে হতাশা ও দ্রুত তদন্তের দাবি এই দেড় কোটি টাকা আত্মসাত ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ নিয়ে বন বিভাগে ব্যাপক অস্থিরতা বিরাজ করছে। সরকারি হিসাব ও বন কর্মীদের অনেকে দাবি করেছেন — • দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক • দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক বাংলাদেশের সরকারি প্রকল্পে এমন ধরণের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে জনমত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জোরদার হচ্ছে।
উন্নত জীবনের প্রলোভনে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারকালে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে ৫৫ জনকে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। এ সময় মানবপাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে টেকনাফের বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া-সংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়। পরে শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় কোস্টগার্ড সদর দপ্তারের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে নারী ও শিশুসহ বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি টেকনাফের বাহারছড়া সমুদ্র এলাকায় অবস্থান করছে এমন গোপন তথ্য পাই আমরা। পরে বৃহস্পতিবার রাতে কোস্টগার্ডের ৩টি দল সেখানে বিশেষ অভিযান শুরু করে। অভিযানে সাগরে একটি সন্দেহজনক ট্রলারকে থামার সংকেত দেয়া হলে তা অমান্য করে ট্রলারটি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে কোস্টগার্ড সদস্যরা ধাওয়া করে টেকনাফের বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া-সংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় ট্রলারটি আটক করতে সক্ষম হন। তিনি আরও বলেন, পরে ট্রলারে তল্লাশি চালিয়ে মালয়েশিয়ায় পাচারকালে নারী ও শিশুসহ ৫৫ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করার পাশাপাশি ৫ জন মানবপাচারকারীকে আটক করা হয়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, কয়েকটি সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র বিদেশে উন্নত জীবনযাপনের স্বপ্ন, উচ্চ বেতনের চাকরি এবং অল্প খরচে বিদেশযাত্রার প্রলোভন দেখিয়েছিল। টেকনাফসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিকদের মালয়েশিয়ায় নিয়ে যেতে সাগরপথে পাচারের পরিকল্পনা করছিল তারা। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি ও আটক মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া মানবপাচার রোধে ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান কোস্টগার্ডের এই কর্মকর্তা।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।