সরকারি অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তর-এর ভেতরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে এক নির্বাহী প্রকৌশলীকে কেন্দ্র করে। নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রী এবং উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসী-এর বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগ এখন প্রশাসনিক মহল ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে প্রশাসনিক প্রভাব? দপ্তরের একাধিক সূত্রের দাবি, একই বিভাগে দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করার সুবাদে সমীরণ মিস্ত্রী ও সিফাত ওয়াসীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, এই সম্পর্কের কারণে একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়, যা দপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করতেও রাজি হননি। জাতীয় সংসদ ভবনের ই/এম বিভাগে দায়িত্বকাল নিয়ে প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে জাতীয় সংসদ ভবন-এর ইলেকট্রোমেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগের দায়িত্বকালকে কেন্দ্র করে। ই/এম সার্কেল–৩-এর অধীনে ই/এম বিভাগ–৭-এ প্রায় সাত বছর দায়িত্ব পালন করেন সমীরণ মিস্ত্রী। কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় তিনি বিভাগে অত্যন্ত প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। অনানুষ্ঠানিকভাবে কেউ কেউ তাকে ‘টাকাখেকো ইঞ্জিন’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে এ ধরনের মন্তব্যের কোনো প্রমাণিত নথি বা লিখিত অভিযোগ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ‘আমব্রেলা প্রজেক্ট’—উন্নয়ন না অর্থ আত্মসাত? অনুসন্ধানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো তথাকথিত ‘আমব্রেলা প্রজেক্ট’। অভিযোগ অনুযায়ী, সংসদ ভবন এলাকার ভেতরে ছোট ছোট অঙ্গভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প দেখিয়ে ৩০ থেকে ৪০টির মতো পৃথক দরপত্র আহ্বান করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি— প্রকল্পগুলো কাগজে-কলমে উন্নয়নমূলক হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তব কাজের পরিমাণ ছিল সীমিত; কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো যন্ত্রাংশ নতুন হিসেবে দেখানো হয়েছে; অপ্রয়োজনীয় সংস্কার কাজের নামে বড় অঙ্কের ব্যয় দেখানো হয়েছে; বিল উত্তোলন হয়েছে পূর্ণাঙ্গ অঙ্কে, যদিও কাজ ছিল আংশিক। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পের পরিকল্পনা, দরপত্র অনুমোদন এবং কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো নিরপেক্ষ অডিট বা তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ হয়নি। বদলি—প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নাকি কৌশল? গত ১ সেপ্টেম্বর সমীরণ মিস্ত্রীকে ই/এম বিভাগ–৭ থেকে পিএন্ডডি বিভাগ–১-এ বদলি করা হয়। একই সময় সিফাত ওয়াসীকেও একই বিভাগে বদলি করা হয়। এই একসঙ্গে বদলিকে ঘিরে দপ্তরের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি নিয়মিত প্রশাসনিক রদবদল, নাকি অভিযোগের চাপ সামাল দেওয়ার একটি কৌশল? এ বিষয়ে দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। প্রশাসনিক নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন এত গুরুতর অভিযোগের পরও দৃশ্যমান বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী। তাদের মতে— নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন জরুরি প্রকল্পভিত্তিক আর্থিক অডিট হওয়া প্রয়োজন সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া এই অভিযোগগুলো গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভাবমূর্তিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে মত বিশ্লেষকদের। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য সমীরণ মিস্ত্রী ও সিফাত ওয়াসীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি হবে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের ঘটনা; আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সুনাম রক্ষায়ও প্রয়োজন পরিষ্কার তদন্ত ফলাফল।
বাংলাদেশে প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় পর আবার নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের যাত্রা শুরু হচ্ছে আজ। সকালে সংসদ ভবনে নতুন এমপিদের শপথের পর বিকেলেই নতুন সরকারের শপথ নিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংসদ ভবনের খোলা মাঠে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রপতির কাছে আরো শপথ নিয়েছেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এই শপথ অনুষ্ঠানে দেশ বিদেশের অতিথিরাও অংশ নিয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিকেলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন। একই অনুষ্ঠানে নতুন মন্ত্রিসভাকেও শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এবার বঙ্গভবনের পরিবর্তে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশীয় বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিসহ বিপুল সংখ্যক দেশি ও বিদেশি অতিথি অংশগ্রহণ করেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর আগে সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ গ্রহণ করেন বলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। একই সাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথেরও আয়োজন করে কর্তৃপক্ষ। প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টি এবং জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছয়টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাতটি আসনে জয়ী হয়েছে। আদালতের নির্দেশনার কারণে দুটি আসনের ফল ঘোষণা করা হয়নি। আর একজন প্রার্থীর মৃত্যুজনিতকারণে একটি আসনে নির্বাচন হয়নি। এবার নির্বাচনে অন্তর্বর্তী সরকার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে রেখে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে দেয়নি। ফলে নির্বাচনটি হয়েছে বিএনপি ও তার পুরনো মিত্র জামায়াত ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন: বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সতের বছরের শাসনের অবসান হওয়ার তিন দিন পর ৮ই অগাস্ট সরকার গঠন করেছিলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এরপরই থেকে দ্রুত নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার জন্য দাবি জানাতে শুরু করে বিএনপিসহ কিছু রাজনৈতিক দল।ওদিকে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য সব মিলিয়ে এগারটি কমিশন ও পরে সংবিধান সংস্কারের জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। ওই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ স্বাক্ষরের পর কয়েকটি বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় নির্বাচনের সাথেই। এদিকে নির্বাচন প্রধান উপদেষ্টা প্রথমে ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে হবে বললেও পরে লন্ডনে গিয়ে তারেক রহমানের সাথে বৈঠকের পর দু পক্ষই রোজার আগে নির্বাচনে সম্মত হয়ে একটি যৌথ বিবৃতিতে প্রকাশ করে। এরপর নানা ঘটনার ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১২ই ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছিলেন সিইসি এবং এর মাধ্যমেই নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও শঙ্কার আপাত অবসান ঘটে। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত তারিখেই নির্বাচন হলো এবং তাতে বিএনপি এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়েছে। তারেক রহমান নিজেও দুটি আসনে জয়ের পর ঢাকা-১৭ আসন রেখে বগুড়া -৬ আসন ছেড়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।তবে সংবিধান অনুযায়ী নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর কথা বিদায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার কিংবা তার অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার। কিন্তু চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংসদ নেই, স্পিকারও নেই। এমনকি ডেপুটি স্পিকারও কারাগারে।এমন পরিস্থিতিতে সংবিধানে থাকা বিকল্প পন্থা হিসেবে সিইসি এবার এমপিদের শপথ পড়াবেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নির্বাচন তফসিল হয়ে গেলেও তখনো লন্ডন থেকে দেশে ফেরেননি তারেক রহমান। কিন্তু এক পর্যায়ে ঢাকায় তার মা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে সপরিবারে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর তিনি ২৫শে ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরেছিলেন এবং ৩০শে ডিসেম্বর তার মা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কয়েকদিন পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। ২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার প্রায় দুই দশক পর তার নেতৃত্বেই দলটি আবার ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হচ্ছে। ২০০৭ সালে মার্চে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয়েছিলেন তারেক রহমান। তখন আঠারো মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে সপরিবারে লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন তিনি।তিনিই দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন। অন্যদিকে এবারই প্রথম সংসদের প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি এককভাবে ৬৮ ও জোটগতভাবে ৭৭টি আসন পেয়েছে এবারের নির্বাচনে।দলটির নেতারা একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন বলে জানিয়েছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হতে যাওয়া নতুন এই মন্ত্রিসভার চেহারা কেমন হতে যাচ্ছে এবং সেখানে কারা জায়গা পেতে যাচ্ছেন, সেটি নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল লক্ষ্য করা যাচ্ছে।নতুন মন্ত্রিসভায় দলের তরুণ নেতারা কতটা স্থান পাচ্ছেন এবং সমমনা দলগুলোকে রাখা হচ্ছে কি-না, এসব প্রশ্ন ঘিরেও বিভিন্ন মহলে নানান আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা হতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি মন্ত্রিসভায় রাখার জন্য বিজয়ীদের কারো কারো পক্ষে ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালানোর ঘটনাও চোখে পড়ছে।যদিও বিএনপি'র পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত নতুন মন্ত্রিসভার আকার ও চেহারার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।তবে তারেক রহমানের প্রথম মন্ত্রিসভা বা সরকারের আকার ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের তুলনায় 'অনেকটাই ছোট' । নিজ দলের বাইরে ভোটে জয় পাওয়া সমমনা অন্য দলগুলোর নেতাদের মধ্যেও অনেকে সেই মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে যাচ্ছেন বলে আভাস দিয়েছেন বিএনপি'র সিনিয়র নেতারা।নতুন মন্ত্রিসভায় নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা। ২০ বছর পর যেভাবে ক্ষমতায় এলো বিএনপি ২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা থেকে বিদায়ের প্রায় দুই দশক পর আবারও ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের সরকার গঠন করলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি। এর আগে সর্বশেষ বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারে ছিল ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। সেই সরকারের অন্যতম অংশীদার এবং দলটির দীর্ঘদিনের মিত্র রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এবার বসছে বিরোধী দলের আসনে। এবারই প্রথম দলের নির্বাচনী লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিলেন তারেক রহমান। তার নেতৃত্বেই সংসদ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়েছে দলটি। দীর্ঘদিন লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর গত ২৫শে ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। নির্বাচনের মাত্র মাসখানেক আগে মায়ের মৃত্যুর পর দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছিলেন তিনি। এর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিকে ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন-এই ইস্যুতে রাজনৈতিক সংকট তুঙ্গে উঠেছিল। সেই সরকারের সময়েই ২০০৭ সালে মার্চে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয়েছিলেন তারেক রহমান। তখন আঠারো মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে সপরিবারে লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন তিনি। খালেদা জিয়া ২০১৮ সালে একটি দুর্নীতি মামলায় কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবার পর লন্ডনে থেকেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন মি. রহমান। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা জানালেন মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যরা। মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ গ্রহণ শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন মন্ত্রিসভার সদস্যদের অনেকে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার কথা জানান মন্ত্রিসভার সদস্য ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, “রাজনীতিকে ডেমোক্রাটাইজেশন করলে হবে না অর্থনীতিকেও গণতন্ত্রায়ন করতে হবে।”এছাড়া বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তার সবই নিতে চান নতুন এই মন্ত্রী।দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে চান মন্ত্রিসভার নতুন সদস্য গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জোনায়েদ সাকি। তিনি বলেন, শহীদের আকাঙ্খা পূরণ করাই এই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলাসহ সব খাতে সরকারের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানান প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া বিএনপি নেতা শামা ওবায়েদ। নতুন মন্ত্রিসভায় জায়গা পেলেন যারা: নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সালাহউদ্দিন আহমদ ইকবাল হাসান মাহমুদ হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এ জেড এম জাহিদ হোসেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ মিজানুর রহমান মিনু নিতাই রায় চৌধুরী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আরিফুল হক চৌধুরী জহির উদ্দিন স্বপন মোঃ শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি আফরোজা খানম রিতা আসাদুল হাবিব দুলু মোঃ আসাদুজ্জামান জাকারিয়া তাহের দীপেন দেওয়ান সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল আ ন ম এহসানুল হক মিলন মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ খলিলুর রহমান (টেকনোক্র্যাট) ফকির মাহবুব আনাম শেখ রবিউল আলম প্রতিমন্ত্রী হিসাবে যারা শপথ নিয়েছেন: এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত অনিন্দ্য ইসলাম অমিত মোঃ শরীফুল আলম শামা ওবায়েদ ইসলাম সুলতান সালাউদ্দিন টুকু কায়সার কামাল ফরহাদ হোসেন আজাদ মোঃ আমিনুল হক (টেকনোক্ৰ্যাট) মোঃ নূরুল হক নূর ইয়াসের খান চৌধুরী এম ইকবাল হোসেন এম এ মুহিত আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর ববি হাজ্জাজ আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন হাবিবুর রশিদ মোঃ রাজিব আহসান মোঃ আব্দুল বারী মীর শাহে আলম মোঃ জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি ইশরাক হোসেন ফারজানা শারমীন শেখ ফরিদুল ইসলাম
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।