মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে বলে দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের প্রতিশোধমূলক সামরিক অভিযান ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪’-এর ৭০তম ধাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নিয়ন্ত্রিত ৫৫টিরও বেশি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। শনিবার প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আইআরজিসি এই হামলাকে “ক্রমিক ক্ষয়সাধন কৌশলের অংশ” হিসেবে উল্লেখ করে। এতে বলা হয়, হামলার ফলে লক্ষ্যবস্তু এলাকায় ব্যাপক বিস্ফোরণ, আগুন এবং ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে। এই দাবি যদি সত্য হয়, তবে এটি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনার ইঙ্গিত বহন করে। লক্ষ্যবস্তু: কোথায় আঘাত হানা হয়েছে? আইআরজিসির বিবৃতি অনুযায়ী, হামলার মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি: সৌদি আরবের আল-খারজ সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা কুয়েতের আলী আল-সালেম ইরাকের ইরবিল (কুর্দিস্তান অঞ্চল) বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এছাড়া ইসরাইলের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানও হামলার আওতায় এসেছে বলে দাবি করা হয়। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: হাইফা বন্দর তেল আবিবের কৌশলগত অঞ্চল হাদেরা কিরিয়াত ওনো সাভিয়ন বেন আমি বিশ্লেষকদের মতে, এই স্থানগুলো নির্বাচন করা হয়েছে সামরিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায়। ব্যবহৃত অস্ত্র: উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি আইআরজিসি জানিয়েছে, হামলায় বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ‘কিয়াম’ ক্ষেপণাস্ত্র ‘এমাদ’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘খোররামশাহ-৪’ ‘কদর’ মাল্টি-ওয়ারহেড সিস্টেম এই অস্ত্রগুলো দীর্ঘ পাল্লার এবং উচ্চ ধ্বংসক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে মাল্টিপল ওয়ারহেড প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করা তুলনামূলক সহজ হয় বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ড্রোন ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আধুনিক যুদ্ধের নতুন মাত্রা তৈরি করেছে—কম খরচে নির্ভুল আঘাত হানার সক্ষমতা। কৌশলগত বার্তা: “ক্রমিক ক্ষয়সাধন” আইআরজিসি তাদের এই অভিযানকে “ধাপে ধাপে ক্ষয় করার কৌশল” হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হতে পারে: শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত করে ফেলা অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত ভারসাম্য বদলে দেওয়া বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পরিবর্তে “নিয়ন্ত্রিত সংঘাত” বজায় রাখার একটি পদ্ধতি। সময় নির্বাচন: রমজান ও ঈদের প্রেক্ষাপট আইআরজিসির বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, এই হামলার সময় নির্বাচন করা হয়েছে রমজান মাসের শেষ সময়ে, ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে। তারা এটিকে “নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থার ভিন্ন এক ভোর” হিসেবে বর্ণনা করেছে। এটি একটি প্রতীকী বার্তা হতে পারে: মুসলিম বিশ্বে সমর্থন অর্জনের চেষ্টা ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক কৌশলে ব্যবহার সংঘাতকে আদর্শিক রূপ দেওয়া আঞ্চলিক প্রভাব: উত্তেজনার বিস্তার এই হামলার দাবির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য প্রভাবগুলো হলো: ১. যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত তাদের সামরিক ঘাঁটিতে হামলার ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। ফলে পাল্টা হামলার ঝুঁকি রয়েছে। ২. ইসরাইলের অবস্থান ইসরাইল বরাবরই ইরানের সামরিক কার্যক্রমকে হুমকি হিসেবে দেখে। ফলে এই ঘটনার পর তাদের সামরিক প্রস্তুতি বাড়তে পারে। ৩. উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ সৌদি আরব, ইউএই এবং কুয়েতের মতো দেশগুলো সরাসরি হামলার আওতায় আসায় তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: নীরবতা নাকি প্রস্তুতি? এই ধরনের বড় হামলার দাবির পর সাধারণত আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রতিক্রিয়া আসে। সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে: জাতিসংঘে জরুরি বৈঠক কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধি নতুন নিষেধাজ্ঞা তবে অনেক সময় সরাসরি নিশ্চিত তথ্য না থাকলে দেশগুলো অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থান নেয়। তথ্য যাচাই: দাবি বনাম বাস্তবতা এই প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—আইআরজিসির দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। বর্তমানে: যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই স্যাটেলাইট বা ওপেন সোর্স বিশ্লেষণ প্রয়োজন ফলে এই ধরনের পরিস্থিতিতে “তথ্য যুদ্ধ” একটি বড় উপাদান হয়ে দাঁড়ায়। সম্ভাব্য ঝুঁকি: পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ কি সামনে? বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের হামলা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে তা বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ঝুঁকিগুলো হলো: সরাসরি ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব বিশ্লেষণ: কৌশল না সংকেত? আইআরজিসির এই ঘোষণা কয়েকটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য নির্দেশ করতে পারে: মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বার্তা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলানো ভবিষ্যৎ আলোচনায় প্রভাব বিস্তার ইরানের আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪’-এর ৭০তম ধাপ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। তবে এই ঘটনার বাস্তবতা, প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ভর করছে পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া, তথ্য যাচাই এবং কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর। বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্য আবারও একটি অনিশ্চিত ও সংবেদনশীল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে একটি ছোট ঘটনা বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ক্রমেই নতুন মাত্রা পাচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর সামরিক জোটের বিরুদ্ধে তুলনামূলক স্বল্প ব্যয়ে তৈরি ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আধুনিক যুদ্ধের এক নতুন কৌশল, যেখানে কম খরচের প্রযুক্তি দিয়ে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ আত্মঘাতী ড্রোন এখন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং তাদের মিত্রদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শত শত ড্রোনে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন শত শত শাহেদ ড্রোন বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। অত্যন্ত নিচু দিয়ে ধীরগতিতে উড়ার কারণে এগুলোকে শনাক্ত ও ধ্বংস করা কঠিন হয়ে পড়ছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও ঝাঁকে ঝাঁকে আসা সব ড্রোন প্রতিহত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফসের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন কংগ্রেস সদস্যদের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে জানান, ইরানের কাছে এখন হাজার হাজার আত্মঘাতী ড্রোন মজুত রয়েছে। সস্তা ড্রোন বনাম ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে ব্যয়ের পার্থক্য। একটি শাহেদ ড্রোন তৈরির খরচ প্রায় ৩৫ হাজার ডলার অন্যদিকে একটি প্যাট্রিয়ট বা থাড ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের খরচ কয়েক মিলিয়ন ডলার ফলে একটি সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যয় করতে হচ্ছে বহু গুণ বেশি অর্থ। এতে যুদ্ধের সামগ্রিক ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ব্যয় গড়ে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। যুদ্ধের প্রথম দুই দিনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় চার বিলিয়ন ডলার। ইরানের নতুন যুদ্ধকৌশল সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন মূলত ড্রোনের ঝাঁক ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্লান্ত করে দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে ফেলা। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এখন ড্রোন ধ্বংসের পাশাপাশি সেগুলোর উৎক্ষেপণস্থল বা লঞ্চিংপ্যাড ধ্বংস করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ড্রোন যুদ্ধের নতুন যুগ প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক স্টিভ ফেল্ডস্টাইনের মতে, এই সংঘাত বিশ্বকে ড্রোন যুদ্ধের নতুন যুগে প্রবেশ করাচ্ছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধে মানববিহীন বিমান বা ড্রোনের ব্যবহার আরও বাড়বে এবং এটি প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কাছে প্রায় ৮০ হাজার ড্রোনের মজুত রয়েছে এবং প্রতিদিন ৪০০-৫০০ ড্রোন ব্যবহার করা সম্ভব। এ হিসাবে শুধু ড্রোন দিয়েই দেশটি কয়েক মাস যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কবে শেষ হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। বিশ্লেষকদের মতে, এটি এমন এক যুদ্ধ যেখানে দ্রুত বিজয় পাওয়া কঠিন। অনেকে মনে করছেন, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।