Brand logo light

তৌহিদী জনতা

শাহ আলী বাগদাদীর (রহ.) মাজারের আছে হাজার কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ।
শাহ আলী মাজারে হামলা: মাদকবিরোধী অভিযান নাকি সম্পদ ও আধিপত্যের লড়াই?

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঢাকার মিরপুরে শাহ আলী বাগদাদী (রহ.) মাজারে সাম্প্রতিক হামলা ও সংঘর্ষ নতুন করে সামনে এনেছে বাংলাদেশের মাজারকেন্দ্রিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং ধর্মীয় মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের পুরোনো বাস্তবতা। ঘটনাটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। এক পক্ষের দাবি, মাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা মাদক বাণিজ্যের বিরুদ্ধে অভিযানে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে স্থানীয়দের একটি অংশ বলছে, ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ ছিল মূলত প্রভাব বিস্তার ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দখলের কৌশল। বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি কেবল আইনশৃঙ্খলা বা ধর্মীয় বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর পেছনে রয়েছে ওয়াকফ সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, স্থানীয় রাজনৈতিক আধিপত্য, অনুসারী নিয়ন্ত্রণ এবং মতাদর্শগত প্রভাব বিস্তারের বহুমাত্রিক সংঘাত। আধ্যাত্মিক কেন্দ্র থেকে অর্থনৈতিক বলয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে মাজার শুধু ধর্মীয় উপাসনাকেন্দ্র নয়; বরং এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত। মাজারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মসজিদ, মাদ্রাসা, বাজার ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। ভক্তদের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছেও এসব স্থান সামাজিক মর্যাদা ও ঐতিহ্যের অংশ। মাজারপন্থিদের বিশ্বাস, শরিয়তের অনুশীলনের মধ্য দিয়েই সুফিরা আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ অর্জন করেন। জিকির, ধ্যান ও আত্মসংযম আত্মশুদ্ধির পথ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, কিছু মাজারে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, শিরকচর্চা এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব বিস্তার করেছে। এই মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব বহু সময় সহিংস রূপও নিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও মাজারের প্রভাব দৃশ্যমান। বহু রাজনৈতিক নেতা গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির আগে মাজার জিয়ারত করেন। ফলে মাজারকে ঘিরে বিরোধ এখন আর কেবল ধর্মীয় নয়; বরং তা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। মাজারকেন্দ্রিক অপরাধ ও অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, কিছু মাজার এলাকায় মাদক গ্রহণ ও খুচরা মাদক বিক্রি এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বিপুল মানুষের সমাগম হওয়ায় বহিরাগতদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অভিযানের খবর পেলেই সংশ্লিষ্টরা দ্রুত সরে যাওয়ার সুযোগ পায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে মাজার এলাকা সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ চক্রের গোপন যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অবৈধ অস্ত্র গোপন রাখা, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, নতুন সদস্য সংগ্রহ কিংবা চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। এর পাশাপাশি তাবিজ-কবজ, অলৌকিক চিকিৎসা কিংবা সমস্যা সমাধানের নামে প্রতারণার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। জনসমাগমপূর্ণ পরিবেশের সুযোগে ছিনতাই, পকেটমার ও শিশু নিখোঁজের ঘটনাও মাঝে মধ্যে সামনে আসে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন অপরাধের দায় পুরো সুফি ঐতিহ্য বা সব মাজারের ওপর চাপানোও বাস্তবসম্মত নয়। হাজার কোটি টাকার সম্পদ ঘিরে দ্বন্দ্ব শাহ আলী মাজারকে ঘিরে বিরোধের বড় একটি কারণ এর বিপুল সম্পদ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাজারের মোট জমির পরিমাণ ৩২ দশমিক ১৪ একর বা প্রায় ৯৭ দশমিক ৪০ বিঘা। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ বিঘা ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত। এই সম্পত্তির ওপর গড়ে উঠেছে কাঁচামালের আড়ত, দোকান ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, দোকান বরাদ্দ, ভোগদখল ও তদারকিতে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণও হাতবদল হয়। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, মাজারকেন্দ্রিক এই অর্থনৈতিক বলয়কে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং সন্ত্রাসী চক্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্যের প্রতিযোগিতা চলছে। ২০২২ সালে ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট হওয়াও এই দ্বন্দ্বের গভীরতা নির্দেশ করে। ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়ের আড়ালে কারা? মাজারে হামলার ঘটনাগুলোতে বারবার উঠে আসছে ‘তৌহিদী জনতা’ শব্দবন্ধ। বিশ্লেষকদের একটি অংশের দাবি, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে সংগঠিত হামলাকে স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করতে এই পরিচয় ব্যবহার করা হচ্ছে। সুন্নি মতাদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব স উ ম আবদুস সামাদ বলেন, সরকার পরিবর্তনের পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিকভাবে মাজারে হামলার ঘটনা সামনে আসে। তার প্রশ্ন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হলো? তার দাবি, একটি সংগঠিত গোষ্ঠী নিজেদের প্রকৃত পরিচয় আড়াল করে ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয় ব্যবহার করছে, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে ঘটনাগুলোকে স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরা যায়। মাদকবিরোধী অভিযানের যুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ কেন আইন হাতে তুলে নেবে— সেই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। ধর্মীয় মতাদর্শ বনাম প্রশাসনিক দায় ইসলামিক বুদ্ধিজীবী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান শাহসুফি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল হান্নান আল হাদীও মাজারে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তার মতে, কোথাও শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে প্রশাসনের সহায়তায় তা বন্ধ করা উচিত; হামলা বা সহিংসতা কখনও সমাধান হতে পারে না। তিনি বলেন, কিছু স্থানে গাঁজা সেবন বা অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলেও সেগুলো দমনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। একইসঙ্গে মাজারে শায়িত অলি-আউলিয়াদের প্রতি সম্মান বজায় রাখাও জরুরি। জামায়াতের অস্বীকার, প্রশ্ন রয়ে গেছে শাহ আলী মাজারে হামলার ঘটনায় স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তা অস্বীকার করেছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ঘটনার সঙ্গে জামায়াতের কোনও সম্পৃক্ততা নেই এবং একটি মহলউদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, কেবল অস্বীকার যথেষ্ট নয়। তার মতে, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বিষয়ে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দুই বছরে ৬৮ মাজারে হামলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ৬৮টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৭০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সময়ে মাজারকেন্দ্রিক হুমকি নিয়ে ৪০টি সাধারণ ডায়েরি এবং ২৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে, ছয়টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে এবং ১২টি মামলা এখনও তদন্তাধীন। শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, শাহ আলী মাজার হামলার ঘটনায় ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তাদের রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। হামলার কারণ এবং সংশ্লিষ্টদের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই চলছে। সংঘাতের কেন্দ্রে মাজার, সম্পদ ও প্রভাব স্থানীয়দের মতে, শাহ আলী মাজারের ঘটনাকে শুধুমাত্র ধর্মীয় উগ্রবাদ বা মাদকবিরোধী অভিযানের ফল হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়বে না। এখানে জড়িয়ে আছে বিপুল ওয়াকফ সম্পত্তি, স্থানীয় অর্থনীতি, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ধর্মীয় মতাদর্শ এবং সামাজিক প্রভাবের জটিল সমীকরণ। ফলে প্রশ্ন উঠছে— মাজারকে ঘিরে চলমান এই সংঘাত কি কেবল ধর্মীয় মতভেদের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর গভীরে রয়েছে অর্থনৈতিক আধিপত্য ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের বৃহত্তর লড়াই?

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ১৯, ২০২৬ 0
Popular post
ফারুকীর সম্পদ কমেছে, তিশার বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি: সম্পদ বিবরণী ঘিরে আলোচনা

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবি