ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রবিবার (১২ জুলাই) হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে মাত্র ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ। গত পাঁচ সপ্তাহে একদিনে এটিই সর্বনিম্ন সংখ্যা, যা নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কী দেখা যাচ্ছে শিপিং তথ্য বিশ্লেষণে? তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলোর মধ্যে ছিল 'হিউম্যানিটি' নামের একটি সুপারট্যাংকার, যা প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল বহন করছিল। এছাড়া 'ক্যাপিটান আন্দ্রেয়াস' নামের একটি ট্যাংকারে প্রায় পাঁচ লাখ ব্যারেল কুয়েতি পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহন করা হচ্ছিল। একই সময়ে তেল বোঝাইয়ের উদ্দেশ্যে তিনটি খালি ট্যাংকার পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছে। কেপলারের তথ্য আরও বলছে, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এড়াতে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় অধিকাংশ তেলবাহী জাহাজ তাদের স্বয়ংক্রিয় অবস্থান শনাক্তকারী এআইএস ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখছে। সপ্তাহান্তে কোনো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী জাহাজকে প্রণালিতে প্রবেশ করতে দেখা যায়নি। এদিকে, আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক)-এর একটি ট্যাংকার ১০ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে ভারতের দাহেজ বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করেছে বলে কেপলারের তথ্য উল্লেখ করেছে। নতুন করে সামরিক উত্তেজনা এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, রোববার ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, নির্ভুল নির্দেশিত অস্ত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। অন্যদিকে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সোমবার দাবি করেছে, আগের রাতে হরমুজ প্রণালিতে দুটি জাহাজের নেভিগেশন ব্যবস্থা অকার্যকর করে সেগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। তবে জাহাজ দুটির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ট্রাম্পের নতুন নৌ অবরোধের ঘোষণা এই উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আবারও কঠোর নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। তার ঘোষণায় বলা হয়েছে, এখন থেকে কোনো জাহাজ ইরানের বন্দরে প্রবেশ করতে বা সেখান থেকে বের হতে পারবে না। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে চলাচল করতে চাইলে কার্গো বা পণ্যবাহী জাহাজগুলোর কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ২০ শতাংশ হারে ক্ষতিপূরণ বা নিরাপত্তা ফি আদায় করবে। তবে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন পদ্ধতি, আন্তর্জাতিক আইনগত ভিত্তি কিংবা কার্যকর করার কাঠামো সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। পরস্পরবিরোধী অবস্থান ট্রাম্প একদিকে দাবি করেছেন, "হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত আছে এবং উন্মুক্তই থাকবে।" অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, অনুমোদনহীন পথে একটি জাহাজ চলাচল এবং সেটিতে হামলার ঘটনার পর তারা প্রণালিটি বন্ধ ঘোষণা করেছে। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র 'ইরানি অবরোধ' পুনর্বহাল করছে, যার আওতায় শুধুমাত্র ইরানের জাহাজ কিংবা তাদের ক্রেতাদের প্রবেশ ও প্রস্থান বন্ধ থাকবে। অন্য সব দেশ ন্যায্যভাবে প্রণালিটি ব্যবহার করতে পারবে। তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে "হরমুজ প্রণালির অভিভাবক" হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে পরিবহনকৃত সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ হারে ফি আদায় করবে। বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণার বাস্তবায়ন নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার বিনিময়ে সম্ভাব্য টোল বা ফি আদায়ের বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত তার আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা করেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে শুধু ইরান নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রপ্তানি, আন্তর্জাতিক শিপিং শিল্প এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি? বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা হয়। ফলে এই পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল, শিপিং ব্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক সংঘাত, পাল্টাপাল্টি হামলা, নৌ অবরোধের ঘোষণা এবং জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার ঘটনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আগামী কয়েক দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকে নজর রাখছে বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক শিপিং খাত।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : হরমুজ প্রণালিতে নৌ-নির্দেশনা সেবার বিপরীতে স্বেচ্ছাভিত্তিক ফি আরোপের প্রস্তাবকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, সামুদ্রিক আইন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। ইউরোপীয় কয়েকটি দেশের আলোচনায় থাকা এই প্রস্তাব বাধ্যতামূলক টোল নয়, বরং নৌ-নিরাপত্তা ও সহায়ক সেবার জন্য অর্থ প্রদানের একটি সম্ভাব্য কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথের ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে কোনো পরিবর্তন আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। মূল তথ্যসংক্ষেপ হরমুজ প্রণালিতে নৌ-নির্দেশনা সেবার বিপরীতে স্বেচ্ছাভিত্তিক ফি আরোপের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বাধ্যতামূলক টোল আরোপকে “বিপর্যয়কর” বলে মন্তব্য করেছেন। ওমান মালাক্কা প্রণালির সহযোগিতামূলক মডেলের আদলে একটি ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রস্তাব করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার প্রকাশ্য আশ্বাস চেয়েছে। আইএমওতে ইরানবিষয়ক একটি প্রস্তাবে রাশিয়া ও চীন সমর্থন দেয়নি। কী ধরনের ফি বিবেচনায় রয়েছে? ইউরোপীয় দেশগুলোর আলোচনায় থাকা প্রস্তাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের জন্য বাধ্যতামূলক টোল নয়, বরং নির্দিষ্ট নৌ-নির্দেশনা, নিরাপত্তা ও সহায়ক সেবার বিনিময়ে স্বেচ্ছাভিত্তিক ফি নেওয়ার ব্যবস্থা বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ধারণাটি মালাক্কা প্রণালি ও ইংলিশ চ্যানেলের মতো আন্তর্জাতিক জলপথে প্রচলিত কিছু সেবা-ভিত্তিক অর্থপ্রদানের মডেলের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। তবে প্রস্তাবটি কার্যকর করতে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-এর সমর্থন প্রয়োজন হবে বলে আলোচনায় উঠে এসেছে। ব্রিটেনের অবস্থান: টোল নয়, সেবা-ভিত্তিক ব্যবস্থা ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাধ্যতামূলক টোল আরোপ করা হলে তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য “বিপর্যয়কর” হবে। তার বক্তব্যে মূল উদ্বেগ ছিল, এমন পদক্ষেপ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ও জ্বালানি বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। তবে ব্রিটিশ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী মনে করেন, নৌ-নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলায় সহায়ক সেবার জন্য স্বেচ্ছাভিত্তিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান: নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে—এমন একটি প্রকাশ্য ঘোষণা দিতে। ওয়াশিংটনের দাবি, তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে এ বিষয়ে সমঝোতা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত নীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে দেশটির নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর ভেতরে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন মেনে চলা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ওমানের প্রস্তাব ও মালাক্কা মডেল হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমান মালাক্কা প্রণালির সহযোগিতামূলক মডেলের আদলে একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে। ব্রিটিশ আইন বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রস্তুত এই পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে নৌ-নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলার ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। ওমান জানিয়েছে, তারা এই পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে আইন বিশেষজ্ঞদের তেহরানে পাঠাতেও আগ্রহী। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির ওমান সফর এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের মন্তব্যও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিষয়টি আঞ্চলিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। আইএমওতে বিতর্ক: আন্তর্জাতিক আইন বনাম আঞ্চলিক দাবি লন্ডনে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) কাউন্সিল বৈঠকে ওমানের প্রতিনিধি খামিস বিন মোহাম্মদ আল শামাখি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ-চলাচলের অধিকার নিশ্চিত এবং সেখানে বাধ্যতামূলক ট্রানজিট ফি আরোপের সুযোগ নেই। তবে তিনি উল্লেখ করেন, নৌ-নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলায় স্বেচ্ছাভিত্তিক নৌ-সহায়তা সেবা চালুর বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এ বক্তব্যই বর্তমান আলোচনার কেন্দ্রীয় আইনি ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাশিয়া ও চীনের আপত্তি উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ও ইউরোপীয় রাষ্ট্র আইএমওতে ইরানের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করলেও রাশিয়া ও চীন তা সমর্থন করেনি। রাশিয়ার মতে, প্রস্তাবটি সংকটের মূল কারণগুলো উপেক্ষা করেছে। চীনের ভাষ্য, এটি একপেশে এবং আইএমওর এখতিয়ারের বাইরে। এই অবস্থান দেখায় যে হরমুজ প্রণালির প্রশ্নটি কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বরং বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক অবস্থানকেও প্রতিফলিত করছে। সমঝোতা স্মারক ও বর্তমান বাস্তবতা গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ইরান ৬০ দিনের জন্য কোনো অতিরিক্ত চার্জ ছাড়া বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই প্রতিশ্রুতির অর্থ এই নয় যে ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে না। অন্যদিকে আইআরজিসি নৌবাহিনী বলেছে, সমঝোতা অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব তারা পালন করেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি বাহিনীর কোনো ভূমিকা থাকার সুযোগ নেই। কেন হরমুজ প্রণালি এত গুরুত্বপূর্ণ? হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। পারস্য উপসাগর থেকে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মে মাসের শুরু থেকে তাদের বাহিনী ৮০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং প্রায় ৩৮ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে সহায়তা করেছে। ফলে এই প্রণালির ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য ব্যয় এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। মূল বিতর্ক কোথায়? কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, বর্তমান বিতর্ক মূলত দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে: হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি চালু হওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কী হবে। দীর্ঘমেয়াদে প্রণালির প্রশাসনিক কাঠামো কেমন হবে এবং মালাক্কা প্রণালির মডেল ইরানের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে কি না। এছাড়া ইরানের অভ্যন্তরে আইআরজিসির বিভিন্ন অংশের অবস্থানও ভবিষ্যৎ সমঝোতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান আলোচনা শুধু একটি সম্ভাব্য ফি ব্যবস্থার প্রশ্ন নয়; এটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির জটিল সমন্বয়ের প্রতিফলন। স্বেচ্ছাভিত্তিক নৌ-সহায়তা সেবা চালুর ধারণা আপাতদৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য সমাধান হিসেবে সামনে এলেও, এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে আইএমওর অবস্থান, ইরান-ওমান সমঝোতা, এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলোর পারস্পরিক আস্থার ওপর।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন পক্ষ দাবি করছে। সামরিক হামলা, পাল্টা হামলা, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বিরোধ এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে পুরো অঞ্চল আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান হোসেইন কেরমানপুরের দাবি অনুযায়ী, ৮ ও ৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটির পাঁচটি প্রদেশে অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৪৭ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন। খুজেস্তান প্রদেশের নিরাপত্তা বিষয়ক ডেপুটি গভর্নর ওয়ালিউল্লাহ হায়াতির ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে অন্তত তিনজন ওই প্রদেশের বাসিন্দা। সংঘাতের সূচনা কোথায়? ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, ৫ জুলাই হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে আইআরজিসির অভিযানকে কেন্দ্র করেই নতুন করে উত্তেজনা বাড়ে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক নৌপথে নিরাপদ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকম ইরানের বিপুলসংখ্যক সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি, নৌঘাঁটি এবং লজিস্টিক অবকাঠামো। এর জবাবে ইরান কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে তেহরান দাবি করেছে। কূটনীতির পথ কি বন্ধ? পরিস্থিতির মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে যে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা শেষ হয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ সীমিত। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনও শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল করেনি এবং কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে। 'প্ল্যান সি' নাকি পুরোনো কৌশল? যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও প্রশ্ন উঠছে—প্রশাসনের বিকল্প কৌশল কী? ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক বক্তব্যে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একই সময়ে নতুন নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ বৃদ্ধির আলোচনা আবার সামনে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে ওয়াশিংটন আবারও অর্থনৈতিক চাপ ও সামরিক শক্তিনির্ভর নীতিতে ফিরে যাচ্ছে। রিচার্ড হাসের মূল্যায়ন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক রিচার্ড এন. হাস মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি কৌশলগত অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যত সামরিক চাপ বাড়াবে, ইরানও পারস্য উপসাগরের জ্বালানি ও নৌপরিবহন অবকাঠামোর ওপর তত বেশি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নতুন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। হরমুজ প্রণালি কেন গুরুত্বপূর্ণ? বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি। সাম্প্রতিক বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে এই জলপথ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। ইরানের ব্যাখ্যায় নিরাপদ চলাচলের দায়িত্ব তাদের হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের মতে আন্তর্জাতিক নৌপথে কোনো একক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্লেষকদের মতে, সমঝোতা স্মারকের ভাষাগত অস্পষ্টতা দুই পক্ষের ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করেছে। ইরানের নতুন হুঁশিয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ বাকের জোলঘাদর সতর্ক করে বলেছেন, জাতীয় অবকাঠামোর ওপর যেকোনো হামলার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা হলে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী পাল্টা ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক উত্তেজনা কমার পরিবর্তে আরও বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকেরা। তবে উভয় পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি। ফলে সামরিক প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে ভারসাম্য কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটিই আগামী কয়েক দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : আবু মুসা দ্বীপ এবং ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক স্থানে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, সিরিক শহরের তাহরুই গ্রামের কাছেও তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এদিকে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পর হুমকির পর ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা শুরু করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচলের স্বাধীনতায় হুমকি দেওয়ার ইরানের সক্ষমতা আরও হ্রাস করার” উদ্দেশ্যে তারা অতিরিক্ত অভিযান শুরু করেছে। সেন্টকমের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর সাম্প্রতিক আগ্রাসনের জন্য ইরানকে “জবাবদিহি” করানোর লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি স্থানে বিস্ফোরণের খবর পাওয়ার পর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। বিস্ফোরণের খবর পাওয়া স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে সিরিক, বুশেহর, কোনারাক ও চাবাহার। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, বন্দর আব্বাসে আটটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। চাবাহারে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবরও পাওয়া গেছে। তবে এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। হরমুজ প্রণালী ও কৌশলগত গুরুত্ব হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই এলাকায় সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বাণিজ্যিক নৌচলাচলে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। সেন্টকমের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এ দাবির তাৎক্ষণিক আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়নি। আইআরজিসির হুঁশিয়ারি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বার্তায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। আইআরজিসি দাবি করেছে, অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য পাল্টা আক্রমণ মোকাবিলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। ট্রাম্পের মন্তব্য ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) “শেষ” হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দেন। ওই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরই ইরানের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের খবর সামনে আসে। এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তবে বর্তমান বিস্ফোরণগুলোর প্রকৃতি, লক্ষ্যবস্তু ও দায়ী পক্ষ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখনও সীমিত। আঞ্চলিক উদ্বেগ মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি সামরিক অবস্থান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বিবৃতির ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় নতুন তথ্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাইল কানি বলেছেন, শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনির ইরাকে অনুষ্ঠিত জানাজা ইরান ও ইরাকের জনগণের পারস্পরিক সংহতিকে আরও শক্তিশালী করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দুই জাতির ঐক্যবদ্ধ অবস্থানকে সুদৃঢ় করবে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) প্রকাশিত এক বার্তায় কানি বলেন, নাজাফ ও কারবালায় অনুষ্ঠিতব্য এই জানাজা শুধু দুই দেশের জনগণের ঐক্যই গভীর করবে না, বরং প্রতিরোধ আন্দোলনের শহীদ নেতাদের ন্যায়বিচারের দাবিকেও আরও জোরালো করবে। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক এই অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ইরাকি সরকারের উদ্যোগ এবং দেশটির জনগণের ব্যাপক প্রস্তুতি ইরান ও ইরাকের গভীর আধ্যাত্মিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতিফলন। কানি আরও উল্লেখ করেন, আয়াতুল্লাহ খামেনির সমর্থন এবং ইরাকের ধর্মীয় নেতৃত্বের ভূমিকা দেশটিতে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত আইআরজিসির সাবেক কুদস ফোর্স প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানি এবং ইরাকের জনপ্রিয় স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর উপপ্রধান আবু মাহদি আল-মুহান্দিসের প্রসঙ্গ টেনে কানি বলেন, তারা দুই দেশের জন্যই আত্মত্যাগের অভিন্ন প্রতীক। তিনি দাবি করেন, খামেনির শেষকৃত্যও সোলাইমানি ও আল-মুহান্দিসের জানাজার মতোই যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী প্রতিরোধকে আরও শক্তিশালী করবে। এদিকে, কারবালার গভর্নর ও প্রদেশের উচ্চ নিরাপত্তা কমিটির প্রধান নাসিফ জাসিম আল-খাত্তাবি জানিয়েছেন, জানাজা উপলক্ষে নিরাপত্তা ও লজিস্টিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ইরাকি গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, অনুষ্ঠানটি দেশটির সরকার ও জনগণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে ফেডারেল সামরিক বাহিনী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবা সংস্থার সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার থেকে শোকাহত মানুষ ও বিভিন্ন প্রতিনিধি দল কারবালায় আসতে শুরু করবে। নিরাপত্তা, পরিবহন ও জনসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। জানাজা তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান গভর্নর। প্রথম ধাপে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা, দ্বিতীয় ধাপে বুধবার নাজাফে জানাজার শোভাযাত্রা এবং শেষ ধাপে একই দিন বিকেলে কারবালায় চূড়ান্ত কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে ইরাকের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণের আশা করা হচ্ছে। এ উপলক্ষে বুধবার কারবালা প্রদেশে সরকারি ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ মিডিয়া কমিটির মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাদ মান জানান, নাজাফে শোভাযাত্রার পথ আল-সাদরাইন ওভারপাস থেকে ইমাম আলীর মাজার পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার এবং কারবালায় প্রায় ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। অংশগ্রহণকারীদের জন্য নাজাফে ৩৫১টি, কারবালায় ৪০০টির বেশি সেবাকেন্দ্র এবং শোভাযাত্রার পথে ১৫০টি অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন করা হয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : চার মাসেরও বেশি সময় আগে বিমান হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায়কে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিয়েছে তেহরান। সরকার বলছে, এটি কেবল একটি রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নয়; বরং জাতীয় ঐক্য, রাজনৈতিক প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উপস্থিতির এক বিরল প্রদর্শন। তবে এই আয়োজন ঘিরে একাধিক প্রশ্নও সামনে এসেছে। কেন চার মাস পর দাফন? কেন এত দীর্ঘ সময় ধরে মরদেহ সংরক্ষণ করা হয়েছে? কেন ইরান ও ইরাকজুড়ে ছয় দিনের অনুষ্ঠান? আর এই বিশাল আয়োজনের মধ্য দিয়ে কী বার্তা দিতে চাইছে তেহরান? ছয় দিনের রাষ্ট্রীয় আয়োজন, পাঁচ শহরে শেষ বিদায় সরকারি সূচি অনুযায়ী, আগামী শনিবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে খামেনির মরদেহ। পরবর্তী কয়েক দিনে রাজধানীতে বৃহৎ শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মরদেহ নেওয়া হবে পবিত্র শহর কুমে। সেখান থেকে মরদেহ যাবে ইরাকের নাজাফ ও কারবালায়—শিয়া মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র দুটিতে। রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা শেষে মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে এনে ৯ জুলাই জন্মভূমি মাশহাদে দাফন করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ পুরো অনুষ্ঠান ইরান ও ইরাকের মোট পাঁচটি শহরজুড়ে ছয় দিন ধরে চলবে। দুই কোটির সমাগম— বাস্তবতা নাকি রাজনৈতিক বার্তা? ইরানের প্রশাসনের ধারণা, পুরো কর্মসূচিতে দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন। যদি এই সংখ্যা বাস্তবে অর্জিত হয়, তাহলে এটি হবে ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠান। এই সম্ভাব্য জনসমাগম সামাল দিতে: সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। বাসিজ মিলিশিয়া মোতায়েন করা হয়েছে। তেহরানের বহু এলাকায় যান চলাচল সীমিত করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি অফিস কয়েকদিন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি শহরের আকাশসীমায় সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ৩০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি ইরান বলছে, বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি এই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। তালিকায় রয়েছে— রাশিয়া চীন পাকিস্তান ভারত জর্জিয়া কিউবা এছাড়া প্রায় ৯০টি দেশের ধর্মীয় নেতাদের উপস্থিতির কথাও জানিয়েছে তেহরান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নিজেই পার্লামেন্টে ভাষণ দিয়ে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশ থেকেও জাতীয় সংসদের স্পিকার সরকারি সফরে তেহরানের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। ৬০০ বিদেশি সাংবাদিক, প্রামাণ্যচিত্র ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ইরানের সংস্কৃতি ও ইসলামি দিকনির্দেশনা বিষয়ক মন্ত্রী আব্বাস সালেহি জানিয়েছেন, প্রায় ৬০০ বিদেশি সাংবাদিক অনুষ্ঠান কাভার করবেন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশেষ সম্প্রচার থাকবে। পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা হচ্ছে। আলোকচিত্র প্রদর্শনী আয়োজন করা হচ্ছে। সাংস্কৃতিক কর্মসূচিও থাকবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই আয়োজন শুধু শোক প্রকাশ নয়; বরং ইরানের সামাজিক সংহতি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রদর্শন। কেন চার মাস পর দাফন? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। ইসলামে সাধারণত দ্রুত দাফনের ওপর জোর দেওয়া হয়। তাহলে চার মাস পর কেন? বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ রয়েছে— ১. নিরাপত্তা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বড় জনসমাগম আয়োজন সম্ভব ছিল না। ২. যুদ্ধ পরিস্থিতি যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান স্থগিত রাখা হয়। ৩. রাজনৈতিক বার্তা বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ প্রস্তুতির মাধ্যমে ইরান আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের ঐক্য ও প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছে। মরদেহ কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে? এ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষক ড. মোহাম্মদ ওমরের মতে, ইসলামী শরিয়ায় রাসায়নিকভাবে মরদেহ সংরক্ষণ নিরুৎসাহিত। তবে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে শীতলীকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে মরদেহ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায়। তার মতে, ফরেনসিক মর্গে দীর্ঘ সময় মরদেহ রাখা অস্বাভাবিক নয়। খামেনির ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। তবে তিনি আরও বলেন, যদি হামলায় মরদেহ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তাহলে জনসমক্ষে সম্পূর্ণ মরদেহ প্রদর্শনের সম্ভাবনা সীমিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কঠোর সতর্কবার্তা শেষ বিদায়ের আগে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। খাতাম আল-আনবিয়া সদর দফতরের কমান্ডার আলি আবদোল্লাহি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের হামলার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এই অবস্থায় পুরো অনুষ্ঠান ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক মহল। শক্তির প্রদর্শন নাকি রাষ্ট্রীয় শোক? বিশ্লেষকদের মতে, এই আয়োজনের তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য থাকতে পারে— প্রথমত, অভ্যন্তরীণভাবে জাতীয় ঐক্যের বার্তা দেওয়া। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিকভাবে দেখানো যে নেতৃত্ব হারালেও রাষ্ট্রের কাঠামো অটুট রয়েছে। তৃতীয়ত, প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ও প্রতীকী বার্তা দেওয়া যে ইরান এখনও বড় জনসমর্থন সংগঠিত করতে সক্ষম। যা জানা গেছে এক নজরে ছয় দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায় ইরান ও ইরাকের পাঁচ শহরে অনুষ্ঠান সম্ভাব্য উপস্থিতি ১.৫–২ কোটি মানুষ ৩০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি প্রায় ৯০ দেশের ধর্মীয় নেতার অংশগ্রহণের দাবি ৬০০ বিদেশি সাংবাদিক সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ৯ জুলাই মাশহাদে দাফনের পরিকল্পনা বিশ্লেষণ খামেনির শেষ বিদায় শুধু একটি রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নয়—এটি ইরানের জন্য একটি রাজনৈতিক মঞ্চও। শোক, ধর্ম, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে এই আয়োজন মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : নিজেদের মধ্যে একটি যোগাযোগ চ্যানেল খোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কাতারে সংলাপ শেষ করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরকারি প্রতিনিধিরা। বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তাসংস্থা ইরনাকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি। এই চ্যানেল খোলার মূল উদ্দেশ্য হবে আগামী ৬০ দিন ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তির কোনো ধারা বা শর্ত লঙ্ঘন হলে উভয়পক্ষ যেন তাৎক্ষণিকভাবে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে দিয়েই শেষ হয়েছে কাতার সংলাপ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এবং তারপর টানা ৪০ দিন ধরে সংঘাত শেষে গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র এবং এ কারণেই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : দক্ষিণ লেবাননে চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ভল্ফগ্যাং পুস্তাইয়ের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল সীমান্ত সংঘাত হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ। আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশ্লেষণধর্মী সাক্ষাৎকারে পুস্তাই বলেছেন, তেহরানের প্রধান লক্ষ্য এখন দক্ষিণ লেবাননের সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করা। তার মতে, ইরান এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থানের পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কোথায় দেখছেন সুযোগ? পুস্তাইয়ের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ইরানের কৌশল শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সম্পর্ককে ঘিরে নয়। বরং এটি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের মধ্যকার সম্ভাব্য মতপার্থক্যকেও কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে। তার মতে, তেহরান বিশ্বাস করে যে চলমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে দুই মিত্র দেশের কৌশলগত অগ্রাধিকারের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হতে পারে। আর সেই ব্যবধানই ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারে। লেবাননে ইসরায়েলি অভিযান থামানো কি সম্ভব? বিশ্লেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান অবশ্যই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ দেখতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তিনি বলেন, তেহরান, বৈরুত, হিজবুল্লাহ, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র—সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই জানে যে এই লক্ষ্য অর্জন সহজ নয়। কারণ ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থে হামলার জবাবে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার নীতি দীর্ঘদিনের। ফলে সংঘাতের মাত্রা কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থাকলেও ময়দানের বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল বলে মনে করছেন তিনি। ট্রাম্পের কূটনীতি বনাম ইসরায়েলের নিরাপত্তা হিসাব পুস্তাই মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েল এমন অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করবে যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কূটনৈতিক উদ্যোগ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতির দিকে যায়, তাহলে ইসরায়েল প্রয়োজনীয় সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে দ্বিধা করবে না। অর্থাৎ কূটনৈতিক সমন্বয় বজায় রাখার চেষ্টা থাকলেও নিরাপত্তা প্রশ্নে তেল আবিবের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কৌশলগত সমীকরণ বিশ্লেষকের মূল্যায়নে, বর্তমান সংকটকে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে। কারণ সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়ে প্রতিপক্ষ জোটের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দূরত্ব সৃষ্টি করা তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর কৌশল হতে পারে। তার মতে, তেহরানের বর্তমান মনোযোগ মূলত ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্পর্কের ভেতরে সম্ভাব্য ফাটল তৈরি করার দিকে। আর দক্ষিণ লেবাননের চলমান পরিস্থিতি সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা কেবল সীমান্ত সংঘাত বা সামরিক অভিযানের প্রশ্ন নয়; এটি বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তার, জোট রাজনীতি এবং কৌশলগত ভারসাম্যের লড়াইও। ভল্ফগ্যাং পুস্তাইয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান এখন সরাসরি সংঘর্ষের চেয়ে প্রতিপক্ষের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে কাজে লাগানোর পথেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে শুধু নিরাপত্তা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : দীর্ঘ কয়েক দশকের বৈরিতা, পারমাণবিক উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তি সমঝোতার খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার দাবি সামনে এলেও এখনো পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরানের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ যৌথ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ইউরোপের চার দেশের অবস্থান যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বাস্তব ও ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেলে তেহরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। দেশগুলো বলেছে, ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সে লক্ষ্যেই তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রাখবে। এই অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সম্ভাব্য চুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার আওতায় সেটিকে সীমাবদ্ধ রাখা। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও হরমুজ প্রণালির প্রশ্ন কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে যে, সম্ভাব্য চুক্তি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌচলাচল পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত কমার সম্ভাবনা বিনিয়োগকারী ও জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক বার্তা পাঠিয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, কিন্তু আনুষ্ঠানিক নথি কোথায়? যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেছেন যে ইরানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, যিনি নিজেকে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী পক্ষগুলোর একজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এখনো পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, হোয়াইট হাউস কিংবা ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে চুক্তির প্রকৃত কাঠামো, বাস্তবায়ন পদ্ধতি কিংবা আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। জেনেভায় স্বাক্ষরের সম্ভাবনা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীও জানিয়েছেন, সম্ভাব্য স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পর উভয় পক্ষের মধ্যে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তবে নির্ধারিত তারিখে স্বাক্ষর সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে কূটনৈতিকভাবে ‘চলমান আলোচনা’ হিসেবেই দেখছেন অনেক পর্যবেক্ষক। বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া জাতিসংঘ মহাসচিব এই সমঝোতাকে সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বিশেষভাবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতার অগ্রগতি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ফরাসি প্রেসিডেন্ট দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টিকেও আঞ্চলিক শান্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, চূড়ান্ত স্বাক্ষরের আগে যেকোনো উসকানিমূলক বক্তব্য বা সম্ভাব্য নাশকতা পুরো প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের বার্তা অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং বলেছেন, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা প্রয়োজন। তারা একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ দূর করতে হবে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আশা প্রকাশ করেছেন যে, সম্ভাব্য চুক্তি হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ ও অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করবে এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিরোধ সমাধানে সহায়ক হবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রচার বনাম বাস্তবতা ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এবং কয়েকটি দেশীয় সংবাদমাধ্যম চুক্তিটিকে ‘ইরানের বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। তাদের দাবি, দীর্ঘ কূটনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়েছে। তবে এসব প্রতিবেদনে কোনো স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্র, আনুষ্ঠানিক যৌথ বিবৃতি বা আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইকৃত নথি প্রকাশ করা হয়নি। এছাড়া ইরান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা এখনো সরাসরি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেননি। কী বলছেন বিশ্লেষকরা? আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দাবি ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা। তাদের মতে, সম্ভাব্য চুক্তি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর, চুক্তির শর্ত প্রকাশ এবং বাস্তবায়ন কাঠামো নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য এই সমঝোতা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ঘটনা। তবে এখনো পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের বড় অংশই রাজনৈতিক বক্তব্য, কূটনৈতিক ইঙ্গিত এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবির ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রকৃতপক্ষে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে কি না, নাকি আলোচনা এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে—সেই প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া যাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, চুক্তির লিখিত নথি এবং আন্তর্জাতিক যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতগুলোতে বিস্ফোরক অস্ত্রের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘বিস্ফোরক অস্ত্র পর্যবেক্ষণ’-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালে বিস্ফোরক অস্ত্রের হামলায় নিহত বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে ৫৬ শতাংশের মৃত্যুর জন্য ইসরাইল দায়ী। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে এমন বিস্ফোরক হামলার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেড়েছে। এসব ঘটনার প্রায় ৯০ শতাংশই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নথিভুক্ত হয়েছে। বেসামরিক জনগণই সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সংস্থাটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিস্ফোরক অস্ত্র ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারী, শিশু ও বয়স্করা। বেসামরিক হতাহতের হার গত কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংস্থার গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাপক সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বিস্ফোরক অস্ত্রের ব্যবহার একটি বিপজ্জনক প্রবণতায় পরিণত হচ্ছে। তার ভাষায়, বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর ধারাবাহিক ক্ষয়ক্ষতি চলতে থাকলে এটি বৈশ্বিক সংঘাতের একটি ‘স্বাভাবিক বাস্তবতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানবিক আইন কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। যুদ্ধের অভিঘাত পৌঁছেছে ইউরোপের অর্থনীতিতেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। যুক্তরাজ্যের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস (ওএনএস)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশটির অর্থনীতি ০.১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। এর আগে মার্চ মাসে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ০.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, যা নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করেছে। ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস বলেন, সংঘাত শুরুর আগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ছিল এবং মূল্যস্ফীতি কমছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব যুক্তরাজ্যের ওপরও পড়বে বলে তিনি স্বীকার করেন। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ ভোক্তা উভয়ই চাপে পড়েছেন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথকে আরও কঠিন করে তুলছে। স্যাটেলাইট চিত্রে ইরানের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এদিকে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলমান সংঘাতের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের অন্তত ৫০টিরও বেশি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর সদরদফতর, বিমানঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র এবং নৌবাহিনীর বিভিন্ন অবকাঠামো। বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা একাধিক সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলায় ইরানের যুদ্ধবিমান, নৌযান এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে ১৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। যুদ্ধবিরতি, কিন্তু উত্তেজনা বহাল সাম্প্রতিক সময়ে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ইসরাইল ও ইরানও একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি হামলা চালায়। যদিও এক মাসের বেশি সময় ধরে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবুও আঞ্চলিক উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে ইরানকে পরাজিত করেছে। তবে বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ বলছে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও ইরান কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির টানেল প্রবেশপথ পুনর্নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ যুদ্ধের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্যাটেলাইট তথ্যের সীমিত প্রাপ্যতা। বিশ্লেষকদের দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর অঞ্চলটির স্যাটেলাইট চিত্রের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্চ মাসে পেন্টাগন স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেটকে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ এলাকার নতুন ছবি প্রকাশ সীমিত করার অনুরোধ জানায়। প্ল্যানেটের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল যাতে স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে কোনো প্রতিপক্ষ শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র বা ন্যাটো অংশীদারদের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে না পারে। সামনে কী অপেক্ষা করছে? সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি বজায় থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকট এখনো শেষ হয়নি। বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি, ইরানের সামরিক অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে এই সংঘাতের প্রভাব আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার ওপর।
ইত্তেহাদনিউজ,অনলাইন : মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন এক অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ধারণা ছিল, সামরিক চাপের মাধ্যমে তেহরানকে দুর্বল করে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিজেদের অনুকূলে আনা সম্ভব হবে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাস্তবতা তাদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে দ্রুত পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। বরং পরিস্থিতি এখন এমন এক দীর্ঘমেয়াদি ও ক্ষয়িষ্ণু সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে, যা যেকোনো সময় বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ইরানের সক্ষমতা নিয়ে নতুন হিসাব সাম্প্রতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, প্রণালির কাছে একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য এখনও প্রকাশিত হয়নি। এই ঘটনাকে অনেক পর্যবেক্ষক ওয়াশিংটনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘমেয়াদি চাপের মধ্যেও ইরান এখনও আঞ্চলিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। ইরানের দৃষ্টিতে, এই সংঘাতে টিকে থাকাই এক ধরনের বিজয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত নৌপথের ওপর প্রভাব বজায় রাখা তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ট্রাম্পের সামনে কঠিন সমীকরণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে তাকে শক্ত অবস্থান প্রদর্শন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত না করে কূটনৈতিক পথও খোলা রাখতে হচ্ছে। মার্কিন রাজনৈতিক মহলে যুদ্ধ নিয়ে সমর্থন আগের তুলনায় কমেছে বলেও বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ফলে ট্রাম্প এমন একটি সমাধান খুঁজছেন, যা অভ্যন্তরীণভাবে ‘বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে এবং একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার পথও তৈরি করবে। তবে ইতিহাসের বহু সংঘাতের মতো এখানেও একটি বাস্তবতা সামনে এসেছে—যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, স্পষ্ট বিজয়ের মাধ্যমে তা শেষ করা ততটাই কঠিন। নেতানিয়াহুর কৌশল নিয়ে প্রশ্ন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে ইসরাইলের প্রধান কৌশলগত প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে সামরিক শক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বারবার বলেছেন। তবে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সেই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ইসরাইলি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দেওয়ার যে লক্ষ্য ছিল, তা এখন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কোথায় ভুল হয়েছিল? ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ ধারণা করেছিলেন যে, দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট এবং আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে ইরান অভ্যন্তরীণভাবে ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং কয়েক দশক ধরে বহিরাগত চাপ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো এবং আদর্শিক ভিত্তির কারণে দেশটি এখনও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সহনশীলতা ও অভিযোজন ক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছিল। কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণ এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের কেশম দ্বীপে নতুন করে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরানি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ জানিয়েছে, বুধবার স্থানীয় সময় দুপুরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। তবে বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজগান প্রদেশ এবং পারস্য উপসাগর উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব দিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। পাল্টাপাল্টি হামলা ও উত্তেজনা মার্কিন প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলীয় কয়েকটি স্থাপনায় হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তীতে উভয় পক্ষই হামলা বন্ধের ঘোষণা দেয়। তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড সতর্ক করে জানিয়েছে, নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার জবাব আরও কঠোর হবে। আঞ্চলিক কূটনীতির তৎপরতা মার্কিন হামলার পর সৌদি আরব ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথকভাবে টেলিফোনে কথা বলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে তেহরান। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সামনে কী? বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বড় কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়া সংকট দ্রুত নিরসনের সম্ভাবনা সীমিত। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য নতুন নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়তে পারে। ফলে যুদ্ধ ও কূটনীতির মধ্যকার টানাপোড়েন এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইরান বা ইসরাইলের নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন মোড় নিয়েছে। একদিকে ওমান উপসাগরে অবস্থানরত একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করেছে ইরান, অন্যদিকে নতুন করে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে লেবানন ও ইসরায়েল। পরস্পর-সংযুক্ত এই দুই ঘটনাকে বিশ্লেষকরা বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটের অংশ হিসেবে দেখছেন। ইরানের অভিযোগ, ওমান উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে পরিচালিত মার্কিন কর্মকাণ্ডের সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের দাবি কী? বার্তাসংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার (৩ জুন) ইরানের নৌবাহিনী দাবি করে যে তারা ওমান উপসাগরে অবস্থানরত একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারকে লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নিয়েছে। ইরানি নৌবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘন, মার্কিন আগ্রাসী আচরণ এবং ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে পরিচালিত কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছিল। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর জাহাজটিকে শনাক্ত করা হয় এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ইরান আরও দাবি করেছে, তারা ওই জাহাজকে একটি “শত্রুতামূলক তৎপরতার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র” হিসেবে বিবেচনা করে পদক্ষেপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ইরানের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বার্তায় সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানের উপস্থাপিত তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ নিরাপদ রয়েছে এবং নির্ধারিত কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, অঞ্চলে তাদের নৌ-উপস্থিতি আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক চলাচল নিশ্চিত করার অংশ। কেন গুরুত্বপূর্ণ ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি? বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত সামুদ্রিক করিডর হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগর দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি তেল ও গ্যাস এই নৌপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য সামরিক উত্তেজনাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক অবস্থানগত সংঘাতের ঝুঁকি নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। একই সময়ে যুদ্ধবিরতিতে লেবানন ও ইসরায়েল অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি সংঘাতপূর্ণ ফ্রন্টে আপাতত উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, লেবানন ও ইসরায়েল নতুন করে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হামলা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখার বিষয়ে দুই পক্ষ নীতিগত সমঝোতায় পৌঁছেছে। এ চুক্তির আওতায় দক্ষিণ লিতানি নদী অঞ্চল থেকে হিজবুল্লাহ সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব গ্রহণ করবে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী। সংঘাতের পেছনের প্রেক্ষাপট গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। পরবর্তী সময়ে মার্চ মাসে দক্ষিণ লেবাননে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। এর জবাবে হিজবুল্লাহও পাল্টা হামলা চালায়। সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়ে সীমান্ত অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে এক হাজারেরও বেশি লেবাননি নিহত হয়েছেন। এছাড়া বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বহু মানুষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অবকাঠামো। আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য কী বার্তা? মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি একটি দ্বৈত বাস্তবতা তুলে ধরছে। একদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমুদ্রপথে উত্তেজনা বাড়ছে, অন্যদিকে লেবানন-ইসরায়েল ফ্রন্টে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে সীমান্ত এলাকায় সহিংসতা কমতে পারে। তবে একই সময়ে ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে বৃহত্তর অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা পুরোপুরি কাটবে না। মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং লেবাননকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আগামী সপ্তাহগুলোতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানী ইউনিট ‘বিবিসি ভেরিফাই’-এর এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অন্তত ২০টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে লেবানন ও ইসরাইলকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান পরোক্ষ শান্তি আলোচনা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। স্যাটেলাইট ছবি, ভিডিও ফুটেজ এবং উন্মুক্ত উৎসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবিসি ভেরিফাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডান, বাহরাইন ও ওমানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। কোথায় কী ধরনের ক্ষতি? বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল রুওয়াইস ও আল সাদাদ বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে মোতায়েন অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে মার্কিন নজরদারি বিমান ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাঙ্কার বিমানের অবস্থানস্থলেও ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি ও ক্যাম্প আরিফজান এলাকায় অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ শনাক্ত করা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে জ্বালানি সংরক্ষণ বাঙ্কার, হ্যাঙ্গার এবং আবাসিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি। তবে এসব দাবির বিপরীতে হোয়াইট হাউস দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের সামরিক সক্ষমতাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মার্কিন বাহিনীর কার্যক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি। কূটনৈতিক যোগাযোগে বিরতি সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম জানিয়েছে, ইসরাইলের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান এবং লেবাননের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান পরোক্ষ শান্তি আলোচনা স্থগিত করেছে তেহরান। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যে যোগাযোগ চলছিল, তা আপাতত বন্ধ রাখা হবে। ইরানের অভিযোগ, গাজা ও লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় আলোচনার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। তেহরানের অবস্থান হলো—লেবাননে হামলা বন্ধ হওয়া যেকোনো আঞ্চলিক সমঝোতার মৌলিক শর্ত। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় খসড়া চুক্তি ও বার্তা বিনিময় কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়েছে। তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ইরানের ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : ডেলিভারির ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারের বেশি পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯২ ডলারের ওপরে ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে নতুন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। কুয়েতে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি উত্তেজনার মধ্যেই কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দায় স্বীকার করেছে ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। তাদের দাবি, দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাস অঞ্চলে মার্কিন হামলার জবাবে স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। হামলায় চার মার্কিন সেনা এবং তিনজন বেসামরিক ঠিকাদার আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্রটি সফলভাবে প্রতিহত করেছে এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এর আগে হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী সিরিক দ্বীপে মার্কিন হামলার জবাবেও পাল্টা আঘাত হানার দাবি করেছিল তেহরান। লেবাননকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য লেবাননে কার্যকর যুদ্ধবিরতি অপরিহার্য। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, সংঘাত বন্ধ না হলে কূটনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইসরাইলবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনে হিজবুল্লাহকে সমর্থন অব্যাহত রাখবে তেহরান। অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৈরুতের উপকণ্ঠে নতুন করে বিমান হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে ইসরাইলি বাহিনী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বোফোর্ট দুর্গ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে। নেতানিয়াহু বলেছেন, হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে সামরিক অভিযান আরও সম্প্রসারণ করা হবে। আঞ্চলিক সংঘাত কি আরও বিস্তৃত হচ্ছে? সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আর কেবল গাজা বা লেবাননে সীমাবদ্ধ নেই। সামরিক হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর আঘাত, কূটনৈতিক আলোচনা স্থগিত হওয়া এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি আরও বিস্তৃত সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে হিজবুল্লাহকে ঘিরে ইরানের অবস্থান এবং ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক সংঘাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সরাসরি সামরিকভাবে জড়িত ছিল বলে দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। পত্রিকাটির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের শুরু থেকেই আবুধাবি কেবল কূটনৈতিক বা গোয়েন্দা সহায়তা দেয়নি; বরং ইরানের অভ্যন্তরে একাধিক বিমান হামলায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। শুক্রবার (৩০ মে) প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পাশাপাশি ইউএই কার্যত এই সামরিক অভিযানের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে। এমনকি গত এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও আমিরাতের সামরিক তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কোন কোন স্থাপনায় হামলার দাবি? প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সরবরাহ করা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হামলাগুলো সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়েছিল। লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও জ্বালানি অবকাঠামোকে। এর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালির কিশমি ও আবু মুসা দ্বীপ, বন্দর আব্বাস, লাভান দ্বীপের তেল শোধনাগার এবং আসালুয়েহ পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স। বিশেষ করে আসালুয়েহ কমপ্লেক্সে কথিত যৌথ হামলাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ঘটনার পর ওয়াশিংটন ইসরাইলকে ইরানের জ্বালানি খাতে হামলা সীমিত রাখার আহ্বান জানাতে বাধ্য হয়। প্রকাশ্য অবস্থান ও গোপন বাস্তবতা? সংঘাত শুরুর আগে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল যে, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে তারা নিজেদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আবুধাবি সেই অবস্থান থেকে সরে এসে সরাসরি অভিযানে অংশ নেয়। এই অভিযোগ সত্য হলে তা উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামো এবং আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। ইরানের পাল্টা হামলা ও আঞ্চলিক ঝুঁকি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইউএইর ভূমিকার প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন শহর, বিমানবন্দর এবং জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। সংবাদমাধ্যমটির দাবি অনুযায়ী, পুরো সংঘাতের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রায় ২ হাজার ৮০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখোমুখি হয়। যদিও এসব সংখ্যার বিষয়ে স্বাধীন আন্তর্জাতিক সূত্রের যাচাইয়ের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। সৌদি-আমিরাত সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন? প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউএইর এই ভূমিকা উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার নীতিগত বিভাজনও সামনে নিয়ে এসেছে। গত এপ্রিলের শুরুতে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গোপনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলে দাবি করা হয়েছে। রিয়াদের আশঙ্কা ছিল, আমিরাতের সামরিক পদক্ষেপের কারণে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা পুরো অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি নেতৃত্ব ওয়াশিংটনকে কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগোতে এবং আবুধাবির ওপর চাপ প্রয়োগ করতে অনুরোধ জানায়। একই সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে সমন্বিত সামরিক অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন ইউএইর প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ। অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সংঘাতের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতিও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়া, পর্যটন খাতে রাজস্ব হ্রাস এবং আবাসন বাজারে স্থবিরতার কারণে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক খাতগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বাধ্যতামূলক ছুটি এবং জনবল ছাঁটাইয়ের পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া এপ্রিলের শেষ নাগাদ দুবাই ও আবুধাবির শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য হারিয়ে যায় এবং প্রায় ১৮ হাজার ৪০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিবেদন? মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশগ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বরং উপসাগরীয় জোটরাজনীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য কৌশল নিয়েও নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই দাবিগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং স্বাধীন যাচাই এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোর হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রণালির ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান, অন্যদিকে কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি এবং ওমানের জলসীমায় সন্দেহভাজন নৌ-মাইন শনাক্ত হওয়ার ঘটনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা শুধু সামরিক উত্তেজনার ইঙ্গিত নয়; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। হরমুজে কঠোর নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা ইরানের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর খাতাম আল-আম্বিয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর পূর্ণ কর্তৃত্বের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব বাণিজ্যিক জাহাজ, তেলবাহী ট্যাংকার এবং অন্যান্য নৌযানকে নির্ধারিত রুট ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি যাত্রার আগে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর অনুমতি নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের দাবি, নির্ধারিত বিধিনিষেধ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট জাহাজের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রণালিতে অবস্থানরত বিদেশি সামরিক বাহিনীকেও সতর্ক করা হয়েছে। তেহরান বলছে, সামুদ্রিক চলাচল বা প্রণালির ব্যবস্থাপনায় বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না। কাতারের আপত্তি: স্থায়ী টোলের বিরোধিতা এদিকে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত শাংরি-লা ডায়ালগে কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আব্দুল রহমান আল-থানি হরমুজ প্রণালিতে স্থায়ী ট্রানজিট ফি বা টোল আরোপের সম্ভাবনার বিরোধিতা করেন। তার মতে, এমন কোনো ব্যবস্থা কার্যকর হলে এর অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক ভোক্তাদের ওপরই পড়বে। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মাইন অপসারণ বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য সীমিত সময়ের অস্থায়ী চার্জ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এই অবস্থান এমন সময়ে এসেছে, যখন ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য একটি কাঠামো নিয়ে আলোচনা করছে বলে আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। ওমানের জলসীমায় সন্দেহভাজন নৌ-মাইন উত্তেজনার মধ্যেই ওমানের মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টার (এমএসসি) জানিয়েছে, দেশটির জলসীমায় একটি ভাসমান বস্তু শনাক্ত করা হয়েছে, যা নৌ-মাইন হতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, হরমুজ প্রণালির ইনশোর ট্রাফিক জোনের পশ্চিম অংশে এই বস্তুটি দেখা গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজ, নাবিক এবং জেলেদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সন্দেহজনক কোনো বস্তু দেখা গেলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এর কয়েকদিন আগেই মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছিল যে তারা দক্ষিণ ইরানের কাছাকাছি এলাকায় মাইন স্থাপনকারী কিছু নৌযানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে চালানো এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত পাঁচজন মার্কিন সেনা ও বেসামরিক ঠিকাদার আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হামলায় মার্কিন বাহিনীর দুটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং অন্যটি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। মার্কিন পক্ষের দাবি অনুযায়ী, কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি ইরানি ফাতেহ-১১০ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করলেও এর ধ্বংসাবশেষ ঘাঁটির ভেতরে পড়ে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়। অন্যদিকে আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই ওই মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে একই ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হয়েছিল এবং ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ছিল তারই প্রতিক্রিয়া। আইআরজিসি আরও সতর্ক করেছে, ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। ট্রাম্পের মন্তব্যে নতুন বিতর্ক এমন পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইরান বা ইরাকে সামরিকভাবে জড়ানো উচিত ছিল না। তিনি ইরাক যুদ্ধকে ‘অত্যন্ত বোকামিপূর্ণ সিদ্ধান্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে থাকা উচিত ছিল না। তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, কয়েক মাস আগে মার্কিন বি-২ বোমারু বিমান ব্যবহার করে ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর হামলা না চালানো হলে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে যেত। ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানের সামরিক কাঠামোর একটি অংশকে সরাসরি ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তু বানায়নি। তার ভাষায়, সামরিক বাহিনীর কিছু অংশকে তারা তুলনামূলকভাবে ‘মধ্যপন্থী’ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি? বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করে। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা, টোল আরোপ, মাইন বিস্ফোরণের আশঙ্কা কিংবা জাহাজ চলাচলে বাধা—সবকিছুই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সাম্প্রতিক অবস্থান, মার্কিন-ইরান উত্তেজনা এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ভিন্নমুখী অবস্থান মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি আবারও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়; বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। ইরানের নতুন সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ‘পারসিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথোরিটি’র ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ। একই সময়ে ওমানকে প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির পরও হরমুজকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কৌশলগত সংঘাত থামেনি; বরং তা এখন অর্থনীতি, সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। নতুন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য কী? যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ বুধবার এক বিবৃতিতে জানায়, ইরানের ‘পারসিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথোরিটি’ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায় করছে এবং কার্যত আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ইরানের এই উদ্যোগ “বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্য থেকে অর্থ আদায়ের একটি মরিয়া প্রচেষ্টা”, যা দেশটির গভীর অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। ওয়াশিংটনের দাবি, যারা এই ফি পরিশোধ করবে তারাও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মতে এই অর্থ শেষ পর্যন্ত ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হতে পারে। মার্কিন প্রশাসন আরও দাবি করেছে, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে তারা ইতোমধ্যে ইরানকে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্ভাব্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত করেছে। হরমুজে ইরানের নতুন নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গত ২০ মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক পোস্টে ‘পারসিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথোরিটি’ হরমুজ প্রণালির একটি “নিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক অঞ্চল” ঘোষণা করে। সেখানে প্রকাশিত মানচিত্রে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যবর্তী জলসীমায় বিশেষ নিয়ন্ত্রণ রেখা দেখানো হয়। ইরানের দাবি, এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, ইরান “নেভিগেশনাল সার্ভিস” বাবদ ফি নিচ্ছে, এটিকে টোল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আশঙ্কা, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান কার্যত আন্তর্জাতিক জলপথের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথে যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করে। যুদ্ধবিরতির আড়ালে অব্যাহত সামরিক উত্তেজনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে নতুন হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে বড় আকারের সংঘাত শুরু হয়। জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। যুদ্ধের সময় তেহরানে বিমান হামলায় নিহত হন ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি। পরে তার ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে তিনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি। তবে বৃহস্পতিবার ফার্স নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক লিখিত বার্তায় তিনি জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহের ভয়াবহ হামলার পরও ইরান “শক্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে” এবং দেশের পুনর্গঠনের জন্য রাজনৈতিক বিভাজন এড়িয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি আইন প্রণয়ন ও নজরদারি আরও জোরদারের আহ্বান জানান এবং পার্লামেন্টকে দেশের অগ্রযাত্রার “সম্মুখ সমরের পরিখা” হিসেবে বর্ণনা করেন। ওমানকে ট্রাম্পের সরাসরি হুমকি এই উত্তেজনার মধ্যেই নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে ওমানকে নিয়ে। দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে যৌথভাবে ফি আদায়ের বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর প্রতিক্রিয়া জানান। মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি বলেন, “হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। কেউ এটি নিয়ন্ত্রণ করবে না।” এরপর ওমানকে উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, “ওমানকে ভদ্র আচরণ করতে হবে। না হলে আমাদের তাদের উড়িয়ে দিতে হবে।” ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু ওমানকে লক্ষ্য করে নয়; বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতি একটি কৌশলগত বার্তা। কূটনীতি কেন স্থবির? যুদ্ধবিরতির পর তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পর্দার আড়ালে পরোক্ষ আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমঝোতা হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে আলোচনা দীর্ঘায়িত করছে এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত সময়ক্ষেপণের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে মার্কিন সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার সম্ভাব্য ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করে বলেছেন, এতে সামরিক অভিযানের অর্জন “বৃথা” যেতে পারে। বৈশ্বিক অর্থনীতির সামনে নতুন ঝুঁকি ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেল সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ইরান হরমুজে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে অথবা যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ বাড়ায়, তাহলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন ধাক্কা সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সামরিক সংঘাত, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে নতুন মোড়ের ইঙ্গিত মিলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) খসড়া কাঠামো হাতে এসেছে বলে দাবি করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। খসড়াটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম কৌশলগত পথ হরমুজ প্রণালিতে আবারও যুদ্ধ-পূর্ব স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা। বুধবার (২৭ মে) ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য এই সমঝোতার আওতায় এক মাসের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করবে তেহরান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশপাশে সামরিক উপস্থিতি কমাবে এবং নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের পথে এগোবে। তবে খসড়া কাঠামোয় সামরিক জাহাজ চলাচল অন্তর্ভুক্ত নয়। এতে ওমানের সহযোগিতায় হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ইরান পালন করবে বলেও উল্লেখ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যকর হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন ধরনের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হতে পারে। ‘চূড়ান্ত যাচাই ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নয়’ ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বাস্তব যাচাই ও পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা ছাড়া তারা কোনো ধরনের চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবে না। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হলে সেটিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাব হিসেবে অনুমোদনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা চরমে পৌঁছালে পরিস্থিতিতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে; অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যায় এবং সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়। আলোচনায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে বলে একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। আইআরজিসির কড়া হুঁশিয়ারি কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। বাহিনীটির নৌবাহিনীর উপরাজনৈতিক প্রধান মোহাম্মদ আকবরজাদেহ ইরানের দক্ষিণ উপকূলকে “আগ্রাসনকারীদের কবরস্থান” বানানোর হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “শত্রুর দুর্বলতার কারণে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।” ইরানের দীর্ঘ দক্ষিণ উপকূলের দুই প্রান্তের স্থান—চাবাহার থেকে মাহশাহর পর্যন্ত—উল্লেখ করে আকবরজাদেহ বলেন, “এই পুরো অঞ্চল আগ্রাসনকারীদের জন্য কবরস্থানে পরিণত হবে।” বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে কূটনৈতিক সমঝোতার বার্তা, অন্যদিকে সামরিক হুঁশিয়ারি—এই দ্বৈত কৌশলের মাধ্যমে ইরান আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্ত রাখতে চাইছে। যুদ্ধবিরতিতে চীনের সক্রিয় কূটনীতি মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি রক্ষায় সক্রিয় অবস্থান নিয়েছে চীনও। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক উন্মুক্ত বিতর্কে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়াকে দেওয়া বক্তব্যে ওয়াং ই বলেন, “আমরা আশা করি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে এবং পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছাবে, যাতে দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে আসে।” চীনের দাবি, তারা সংঘাত নিরসনে সংশ্লিষ্ট প্রধান পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রেখেছে। এর আগে মার্কিন বাহিনী দক্ষিণ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং মাইন পাতার চেষ্টা করা নৌকাগুলোর ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। ইরান এটিকে যুদ্ধবিরতির পরিপন্থী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তেহরান ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে পাল্টা প্রতিশোধের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। হরমুজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বের মোট জ্বালানি পরিবহনের বড় একটি অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে এই পথের যেকোনো অস্থিতিশীলতা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা বাস্তব রূপ পায়, তাহলে তা শুধু উপসাগরীয় নিরাপত্তা নয়, বরং বৈশ্বিক তেলবাজার ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তবে এখনো চুক্তিটি আনুষ্ঠানিক নয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই ভঙ্গুর শান্তি কতটা স্থায়ী হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে শক্তির ভারসাম্য। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র সৌদি আরব স্পষ্ট করে দিয়েছে—স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে না রিয়াদ। ফিলিস্তিন প্রশ্নে সৌদি আরব তাদের পুরোনো অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেনি। বরং চলমান আঞ্চলিক অস্থিরতা, ইরান ইস্যু এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়ার বাস্তবতায় রিয়াদ এখন আরও সতর্ক ও কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। ট্রাম্পের আহ্বান, সৌদির ‘না’ সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে একটি বৃহৎ সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হলে মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি মুসলিম দেশ আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে পারে। তবে সেই বক্তব্যের পরপরই সৌদি আরবের অবস্থান নতুন করে আলোচনায় আসে। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের অন্যতম কূটনৈতিক লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে আনা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে এক বৈঠকে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। জবাবে সৌদি যুবরাজ স্পষ্ট ভাষায় জানান, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য অগ্রগতি ছাড়া রিয়াদ কোনো চুক্তিতে যাবে না। সৌদি যুবরাজ ওই আলোচনাকে “গঠনমূলক” বলে উল্লেখ করলেও তিনি পরিষ্কার করেন, দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের রূপরেখা ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রশ্নই আসে না। পাকিস্তানের কড়া অবস্থান সৌদি আরবের পাশাপাশি পাকিস্তানও ট্রাম্পের উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সামা টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, মুসলিম-প্রধান দেশগুলোকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যুক্ত করার মার্কিন প্রচেষ্টা পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, ১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী সীমান্ত অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত ইসলামাবাদ কখনোই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে না। পাকিস্তান স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি পাকিস্তানি পাসপোর্ট ব্যবহার করে ইসরায়েল ভ্রমণও আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। ইরান যুদ্ধ বদলে দিয়েছে হিসাব আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত ও তার অর্থনৈতিক-নিরাপত্তাগত প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নতুন বাস্তবতায় ঠেলে দিয়েছে। যুদ্ধের ধাক্কায় উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পেরেছে, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে প্রস্তুত নয়। বরং সংকটকালে ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার ইসরায়েলকেই রক্ষা করা। লন্ডনের কিংস কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিয়েগ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল বিনিয়োগ করলেও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় ওয়াশিংটনের আচরণ তাদের হতবাক করেছে। তার ভাষায়, “আমরা সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের শেষ সময় দেখছি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের ওপর উপসাগরীয় দেশগুলোর আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।” নতুন শান্তি উদ্যোগে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও নতুন সমঝোতার রূপরেখা তৈরিতে পাকিস্তান ও কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। গত সপ্তাহে পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, মিসর, জর্ডান ও বাহরাইনের নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো প্রথমবারের মতো সমন্বিতভাবে ইসরায়েলের কঠোর অবস্থানের বাইরে গিয়ে একটি আঞ্চলিক শান্তি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে। টাইমস অব ইসরায়েল–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়, “ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে ইরান যুদ্ধ শুরু করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাইডলাইনে বসে যুদ্ধের সমাপ্তি দেখছে।” আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এখন চাপের মুখে ২০২০ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। এই উদ্যোগই ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ নামে পরিচিত। তবে বর্তমান বাস্তবতায় নতুন কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। সূত্র বলছে, সম্প্রতি ট্রাম্প যখন আরও দেশকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান, তখন অংশগ্রহণকারী নেতাদের অনেকেই নীরব থাকেন। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা সংকট, ইরান যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার কারণে এখন আরব বিশ্বে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো কূটনৈতিক সমীকরণ দাঁড় করানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ‘মুসলিম ন্যাটো’ বনাম নতুন জোট রাজনীতি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক জোট গঠনের আলোচনা ইতোমধ্যে কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে একটি নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরির আলোচনা চলছে, যেখানে তুরস্ক, কাতার ও মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ একে “মুসলিম ন্যাটো” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে গড়ে উঠছে আরেকটি কৌশলগত জোট, যা ‘I2U2’ নামে পরিচিত। লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ফেলো এইচ এ হেলিয়ার মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে—তেহরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা পুরো অঞ্চলকে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তার মতে, “উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এমন এক বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে সবচেয়ে প্রয়োজনের সময় যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তাদের পাশে নাও থাকতে পারে।” বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্ন নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। তবে একটি বিষয় এখনো অপরিবর্তিত—ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের অবস্থান। আর এই অবস্থানই আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারক ঘিরে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। তবে আলোচনার টেবিলে শান্তির ইঙ্গিত মিললেও, একইসঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি জোরদার করছে তেহরান। ফলে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে তৈরি হয়েছে দ্বৈত বাস্তবতা—একদিকে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা, অন্যদিকে আরও ভয়াবহ সংঘাতের হুঁশিয়ারি। ইরানের সংবাদমাধ্যম ‘তাসনিম নিউজ’ জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তবে আলোচনা ভেস্তে গেলে সম্ভাব্য সামরিক পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুত রয়েছে ইরান। দেশটির কর্মকর্তারা আগেই বলেছিলেন, “ট্রিগারে হাত রেখেই” তারা আলোচনায় বসেছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও “জায়নবাদী শাসন” ইসরাইলের অতীত ভূমিকা এবং বর্তমান সামরিক অবস্থান বিবেচনায় রেখে তারা সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে রয়েছে। তাসনিমকে দেওয়া এক সামরিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও “ভুল হিসাব” করে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসন বা “অপরাধমূলক পদক্ষেপ” নেয়, তাহলে তারা “ইরানের তৃতীয় ধাপের মোকাবিলা”র মুখে পড়বে। সূত্রটি দাবি করেছে, এই নতুন সামরিক কৌশল আগের দুই দফা সংঘাত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। লক্ষ্য নির্বাচন, সামরিক পদ্ধতি, প্রযুক্তি এবং ব্যবহৃত সরঞ্জাম—সব ক্ষেত্রেই ভিন্ন মাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের। যুদ্ধবিরতির খসড়ায় কী থাকছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ জানিয়েছে, আলোচনায় থাকা সম্ভাব্য চুক্তিতে বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর অতিরিক্ত কোনো টোল আরোপ করা হবে না। এছাড়া ওই অঞ্চলে স্থাপন করা নৌ-মাইন সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও ইরান নিতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ইঙ্গিত আলোচনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কিছু বন্দর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া এবং দেশটির তেল খাতে আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ও বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা ইরানের বৈদেশিক তহবিল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ কমানোর বিনিময়ে ইরানের কাছ থেকে কৌশলগত ছাড় আদায়ের চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন সমীকরণ সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উঠে এসেছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা না করার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। একইসঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রস্তাবনায় ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। যদিও তেহরান অতীতে বারবার দাবি করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে ওয়াশিংটন। একই ধরনের ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগরেহিও দুই দেশের অবস্থান আগের তুলনায় “অনেক কাছাকাছি” এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত কার হাতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো চুক্তি সর্বোচ্চ নেতাআলী খামেনি-এর অনুমতি ছাড়া চূড়ান্ত হবে না। তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “দেশে কোনো সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোর বাইরে এবং সর্বোচ্চ নেতার অনুমতি ছাড়া নেওয়া হবে না।” তিনি আরও বলেন, সমাজে বিভাজন তৈরি করে এমন যেকোনো বক্তব্য কার্যত “শত্রুর অবস্থানকে শক্তিশালী করে।” বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য ইরানের ক্ষমতা কাঠামোয় সর্বোচ্চ নেতার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধ থামলেও উত্তেজনা কি থামবে? সম্ভাব্য সমঝোতা কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি ইরানের ধারাবাহিক সামরিক হুঁশিয়ারি স্পষ্ট করছে, অবিশ্বাস এখনো পুরোপুরি কাটেনি। চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পুরো সময়জুড়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকতে পারে। যদিও দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা কার্যকর হলে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এই আলোচনা কেবল যুদ্ধ থামানোর প্রচেষ্টা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণেরও একটি বড় পরীক্ষা।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : ২০২৪ সালের জানুয়ারির শুরুর দিকে, নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)-এর সামনে জড়ো হয়েছিলেন কয়েকজন বিক্ষোভকারী। গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে শীত উপেক্ষা করে তারা সেখানে অবস্থান নিয়েছিলেন। তখন গাজায় যুদ্ধ চলছিল প্রায় ১০০ দিন ধরে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরতির দাবিতে তীব্র চাপ, আন্তর্জাতিক মহলের নিন্দা এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ সত্ত্বেও ইসরাইল সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত, ২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ গাজায় নিহত হন ৭০ হাজারের বেশি মানুষ এবং আহত হন অন্তত ১ লাখ ৭১ হাজার। এই সময়ের মধ্যেই ইসরাইলে অব্যাহতভাবে প্রবেশ করেছে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আইসিজে গণহত্যার ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা জারি করার পরও অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে ইসরাইলে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। আইসিজের রায়ের পর বেড়েছে অস্ত্র আমদানি ইসরাইলের কর কর্তৃপক্ষের (আইটিএ) আমদানি তথ্য, শুল্ক নথি এবং তথ্য অধিকার আইনের আওতায় সংগৃহীত রেকর্ড বিশ্লেষণ করে আল-জাজিরা জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইসরাইলে মোট ২ হাজার ৬০৩টি সামরিক সরঞ্জামের চালান পৌঁছেছে। এসব চালানের মোট মূল্য ছিল প্রায় ৩.২২ বিলিয়ন ইসরাইলি শেকেল, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় ৮৮৫ মিলিয়ন ডলারের সমান। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো—এই চালানের ৯১ শতাংশই এসেছে আইসিজের রায়ের পরবর্তী সময়ে। অধিকাংশ সরঞ্জাম ছিল গোলাবারুদ, বিস্ফোরক এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত সামরিক উপকরণ। তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলের জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। মোট সামরিক আমদানির ৪২ শতাংশের বেশি এসেছে দেশটি থেকে। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ভারত, যার অংশ প্রায় ২৬ শতাংশ। শীর্ষ পাঁচ সরবরাহকারীর তালিকায় আরও রয়েছে রোমানিয়া, তাইওয়ান ও চেক প্রজাতন্ত্র। প্রকাশ্য সমালোচনা, আড়ালে সরবরাহ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যেসব দেশ প্রকাশ্যে ইসরাইলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছে বা যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তাদের অনেকেই বাস্তবে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করেনি। চীন আইসিজের রায়কে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু শুল্ক তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালেও দেশটি থেকে সামরিক চালান গেছে ইসরাইলে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরাইলের কঠোর সমালোচনা করলেও, বাণিজ্য নথিতে দেখা যায় অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। একইভাবে ব্রাজিলও আইসিজের পদক্ষেপকে “বাধ্যতামূলক” বলে উল্লেখ করেছিল। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশটি থেকেও কিছু সামরিক সরঞ্জাম ইসরাইলে গেছে। ‘গণহত্যা প্রতিরোধের দায়িত্ব আগে থেকেই শুরু হয়’ আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণহত্যার আশঙ্কা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পরও অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক স্টিফেন হামফ্রেস এবং ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের অধ্যাপক গেরহার্ড কেম্প বলেছেন, গণহত্যা প্রতিরোধের দায়িত্ব কেবল চূড়ান্ত রায়ের পর শুরু হয় না; ঝুঁকির ইঙ্গিত দেখা দেওয়ার মুহূর্ত থেকেই রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব কার্যকর হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনও তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, গাজায় ইসরাইল গণহত্যা চালিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষক প্যাট্রিক উইলকেন বলেন, “ইসরাইল একা এত বড় পরিসরের বোমাবর্ষণ পরিচালনা করতে পারত না। এর পেছনে বৈশ্বিক অস্ত্র সরবরাহ শৃঙ্খলের বড় ভূমিকা রয়েছে।” বৈশ্বিক নীরবতার বাইরে সক্রিয় সহায়তা আল-জাজিরার অনুসন্ধান এমন এক বাস্তবতা সামনে এনেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক আদালতের সতর্কতা, মানবাধিকার উদ্বেগ এবং গণহত্যার অভিযোগের পরও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ হয়নি। বরং বহু দেশ প্রকাশ্যে কূটনৈতিক সমালোচনা করলেও বাস্তবে সামরিক সহায়তা চালিয়ে গেছে। গাজা যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি সংঘাত নয়—এই অনুসন্ধান দেখাচ্ছে, এটি একটি বৈশ্বিক অস্ত্র নেটওয়ার্কেরও প্রতিচ্ছবি; যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থেকেও বহু রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশাসন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এ তথ্য জানিয়েছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার (২২ মে) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক পদত্যাগপত্রে গ্যাবার্ড জানান, তার স্বামী বিরল ধরনের হাড়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। পরিবারের পাশে থাকা এখন তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলেই তিনি প্রশাসন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। চিঠিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে গ্যাবার্ড বলেন, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাওয়া তার জন্য ছিল ‘সম্মানের বিষয়’। প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনকালে ট্রাম্প প্রশাসনের আস্থা ও সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। অন্যদিকে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে গ্যাবার্ডের পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আগামী ৩০ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশাসন ছাড়বেন গ্যাবার্ড। ট্রাম্প তার কাজের প্রশংসা করে বলেন, দায়িত্ব পালনে তিনি দক্ষতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন এবং প্রশাসন তাকে ‘মিস করবে’। হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স বিভাগের প্রিন্সিপাল ডেপুটি ডিরেক্টর অ্যারন লুকাস অন্তর্বর্তীকালীন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ডেমোক্র্যাট থেকে ট্রাম্প শিবিরে তুলসি গ্যাবার্ডের রাজনৈতিক যাত্রা বরাবরই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তিনি ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হয়ে মার্কিন কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সামরিক পটভূমির অধিকারী গ্যাবার্ড ইরাক যুদ্ধে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিদেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ওয়াশিংটনের অবস্থানের বিরুদ্ধে একাধিকবার প্রকাশ্যে মত দেন। পরবর্তীতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ত্যাগ করে ট্রাম্পকে সমর্থন জানান গ্যাবার্ড। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে সামরিক সম্পৃক্ততা কমানোর প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে তার রাজনৈতিক অবস্থানের মিলই এ ঘনিষ্ঠতার অন্যতম কারণ। এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন -এর প্রশাসনের সমালোচনা করে দাবি করেছিলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সংঘাত ও পারমাণবিক উত্তেজনার ঝুঁকি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। তবে ভেনিজুয়েলা ও ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে গ্যাবার্ডের কিছু নীতিগত মতপার্থক্য ছিল। পরে তিনি ইরান প্রসঙ্গে প্রশাসনের অবস্থানকে সমর্থন করেন। তার ভাষ্য ছিল, জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি মূল্যায়নের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব প্রেসিডেন্টের কাছেই থাকা উচিত। রাজনৈতিক বার্তা না ব্যক্তিগত সংকট? গ্যাবার্ডের পদত্যাগকে আপাতদৃষ্টিতে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হলেও ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে এটি নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো, বৈদেশিক নীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যের প্রশ্নে এ পদত্যাগ ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।