বাংলাদেশে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গত প্রায় আঠারো মাসের সাফল্য-ব্যর্থতার প্রশ্নে নানা আলোচনা চলছে রাজনৈতিক মহলে।
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর এই সরকারের বিদায় নেওয়ার কথা এবং সেই হিসেবেই তাদের সাফল্য- ব্যর্থতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
সরকারের দিক থেকে বরাবরই বলা হচ্ছে, এ সরকারের মূল্য লক্ষ্য ছিল তিনটি- সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত 'মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার' এবং সরকার ঘোষিত রূপরেখার মধ্যেই সংসদ নির্বাচন আয়োজন।এসব ক্ষেত্রে 'সফল' কিংবা যথেষ্ট অগ্রগতির দাবি করা হচ্ছে সরকারের দিক থেকে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার মোটা দাগে তিন এজেন্ডাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে কিছুটা সাফল্য দেখালেও সরকারের ভেতরেরই একটি অংশের কারণে সংস্কার কিছুটা পথভ্রষ্ট হয়েছে, আর বিচারের ক্ষেত্রে 'বিচার নাকি প্রতিশোধ' সেই প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তারা মনে করেন, শুরু থেকেই মব সংস্কৃতি এমনভাবে চলেছে এবং তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে একটি শক্তির কাছে সরকার আত্মসমর্পণ করেছে।
এছাড়া আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় ব্যর্থতার পাশাপাশি নারীর সমতার ক্ষেত্রটিও এ সরকারের আমলে বড় ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সরকার তুলনামূলক ভালো করলেও সামাজিক ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ হয়েছে। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নির্বাচনের দিকে এগুতে পারাটাও সরকারের একটা সাফল্য বলে মনে করেন তিনি।টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, সংস্কারের বিষয়ে সরকার কিছুটা পথভ্রষ্ট হয়েছে, আর বিচারের ক্ষেত্রে 'বিচার নাকি প্রতিশোধ' সেই প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা সরকার চাইলে এড়াতে পারতো বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মব সন্ত্রাস, যাদের হামলায় গত দেড় বছরে আক্রান্ত হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই সংবাদপত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবন থেকে শুরু করে বহু মাজার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারক।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০০৪ সালের ৮ই অগাস্ট ক্ষমতায় এসেছিল মি. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার। এরপর তিনি 'সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনকেই' তার সরকারের মূল এজেন্ডা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার চাপের মুখে প্রথমে প্রধান উপদেষ্টা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলেছিলেন। পরে এক পর্যায়ে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সাথে আলোচনার পর সরকার ও বিএনপি যৌথভাবে ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগেই নির্বাচনের ঘোষণা দেয়।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেদিন একই সঙ্গে সংস্কার প্রশ্নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
এর আগে সরকার শুরুতেই রাষ্ট্রসংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক মোট এগারটি কমিশন গঠন করে এবং সেসব কমিশনের সুপারিশসহ রাষ্ট্রসংস্কারের জন্য দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়।
শেষ পর্যন্ত অন্তত ত্রিশটি বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর মধ্যে চারটি প্রশ্নে গণভোট হতে যাচ্ছে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই। সরকার নিজেও সেই গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করেছে।
যদিও ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, সংস্কার কমিশন ও জুলাই চার্টারের কৃতিত্ব সরকার নিতে পারে।
"কিন্তু এটি পিক অ্যান্ড চুজ এবং এডহকিজমের শিকার হয়েছে। যে কারণে একদিকে শিক্ষাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংস্কার কমিশনই হয়নি, আবার যেসব বিষয়ে হয়েছে সেগুলোর অনেক কিছু সরকারের ভেতরেরই একটি অংশের কারণে পথভ্রষ্ট হয়েছে। আসলে সংস্কারের যে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেটি সরকারের বিবেচনাতেই ছিল না,' বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
যদিও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এর এক আলোচনায় বলেছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যতটা সংস্কার হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত কম সময়ে তেমনটি এর আগে আর হয়নি।
তবে গণভোটে 'না' ভোট জয়ী হলে শেষ পর্যন্ত সরকারের সব সংস্কার উদ্যোগ ভেস্তে যায় কি-না তা নিয়েও অনেকের মধ্যে কৌতূহল আছে।
বিচারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী সংস্কারের পরেই গুরুত্ব পেয়েছে 'মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার'। ইতোমধ্যেই একটি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
এ মামলার অপর আসামি পুলিশের আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে ( রাজসাক্ষী) পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ১৭ই নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করে।
এছাড়াও গত অক্টোবরে আইন মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, "জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্দেশে হত্যার অভিযোগে মোট ৮৩৭টি মামলা রেকর্ড হয়েছে"।
এর মধ্যে ৪৫টি মামলার বিচারকাজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে। এ ছাড়া তখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন ফৌজদারি আদালতে পুলিশ ১৯টি হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেছিল। এসব হত্যা মামলা বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে।
তবে সরকারের শুরু থেকেই ঢালাও হত্যা মামলা এবং এসব মামলায় শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে জড়িত করা নিয়ে সমালোচনা হয়ে আসছে।
ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, সাংবাদিকসহ অনেকের বিরুদ্ধে অনেক হত্যা মামলা হয়েছে যা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং প্রশ্নবিদ্ধভাবেও অনেককে আটক রাখা হয়েছে, যার স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।
"আবার যেসব মামলায় বিচার হচ্ছে, তাও কতটা প্রভাবহীন ও স্বচ্ছ- সেই প্রশ্নও আছে। তাই সত্যিকার অর্থেই বিচার নাকি প্রতিশোধ—সেই প্রশ্ন উঠবে। এটি সরকার চাইলে এড়াতে পারতো। ঢালাও মামলার কারণে সত্যিকার অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
বাংলাদেশে গত দেড় বছরের বেশি সময়ে মানবাধিকার সংগঠক ও সংস্থাগুলোর কাছে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, কারা ও নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, আর মব সন্ত্রাস। এই সময়কালে বারবার সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
এমনকি এবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে বসত বাড়িতে আগুন, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ভালুকায় পিটিয়ে আগুন দিয়ে দিপু চন্দ্র হত্যা এবং পর পর কয়েকজন হিন্দু ব্যবসায়ী খুন হওয়ার ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে।
তবে সরকারের দিক থেকে সবসময়ই বলা হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের বাড়ি ঘরে হামলার বেশিরভাগ ঘটনা রাজনৈতিক কারণেই ঘটেছে, ধর্মীয় কারণে নয়।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর – অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ১৪ মাসে দেশে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে।
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলছেন, অধ্যাপক ইউনূসের সরকার গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় এসেছিল এবং সে কারণে সরকারের সামনে তখন বড় চ্যালেঞ্জই ছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে।
"সবদিক বিবেচনা করলে এ তিনটির মধ্যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সরকার অন্যগুলোর চেয়ে তুলনামূলক ভালো করেছেন। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সফলতা হলো তার নির্বাচনের দিকে এগিয়েছে। কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ হয়েছে। একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী যেভাবে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটাই দুশ্চিন্তার বিষয়," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
সামাজিক ক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ প্রকট হয়ে এসেছে ঢাকায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনার পর। গত ১৮ই ডিসেম্বর রাতে কয়েক ঘণ্টা ধরে ওই হামলা চললেও সরকারের দিক থেকে কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।
ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, " এই মব কালচারের পেছনে থাকা অতি ক্ষমতায়িত শক্তিকে ম্যানেজ করতে সরকার ব্যর্থ হওয়ায় মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সরকারের ব্যর্থতায় এই শক্তি উৎসাহিত হয়েছে"।
এর আগে সরকারের শুরু থেকেই সারাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সূফী-দরবেশ-বাউলদের মাজার আক্রান্ত হতে শুরু করে। পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের আক্রান্ত হবার ঘটনাও গত আঠারো মাসে বারবার আলোচনায় এসেছে।
এক বছর আগে ২০২৫ সালের শুরুতেই বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিলো, ২০২৪ সালের ৪ঠা অগাস্টের পর থেকে পরবর্তী ৫ মাসেই সারাদেশের ৪০টি মাজারে (মাজার/সুফি কবরস্থান, দরগা) ৪৪ বার হামলা চালানোর অভিযোগ পেয়েছিলো পুলিশ।
এরপরেও সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। উল্টো নভেম্বরে মানিকগঞ্জে বাউল শিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে।
পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময় জুড়েই বিভিন্ন সময়ে নারীদের আক্রান্ত হবার ঘটনা ঘটেছে। একই সাথে নারী সংস্কার কমিশনের রিপোর্টকে ঘিরে নারীদের আক্রমণের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় নারীদের হেনস্থার ঘটনা ঘটেছে।
গত বছর মার্চে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই বলেছিলেন, "সম্প্রতি নারীদের ওপর যে জঘন্য হামলার খবর আসছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। এটি 'নতুন বাংলাদেশ' এর যে স্বপ্ন আমরা দেখছি তার সম্পূর্ণ বিপরীত"।
কিন্তু তার পর থেকে সেই পরিস্থিতির আদৌ উত্তরণ হয়েছে কি-না, সেই প্রশ্ন আছে।
"নারীর সমতার ক্ষেত্রে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কাই এসেছে এ সরকারের সময়ে। কারণ সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সরকারের ব্যর্থতায় মুক্তিযুদ্ধ, বাক স্বাধীনতা, নারীর সমতাসহ ৭১ ও ২৪ এর মৌলিক চেতনার বিষয়গুলোই ঝুঁকিতে পড়েছে। কারণ সরকার এসবের ওপর আঘাত প্রতিহত করার সৎ সাহস সরকার দেখাতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে যারা আঘাত করেছে সেই শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ডঃ ইফতেখারুজ্জামান।
প্রধান উপদেষ্টার দফতরের সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া গেছে তাহলো- সংস্কার ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করাকে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করে সরকার।
বিশেষ করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রে রূপান্তরের জন্য জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদ স্বাক্ষর এবং ২৫টির মতো ডান, বাম মধ্যপন্থী দলগুলোর মধ্যে অন্তত ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোকেই বড় অর্জন হিসেবে সরকারের লোকজন মনে করছে।
তাছাড়া সরকার মনে করে, সবকিছুতে সংস্কার বাস্তবায়ন না করা গেলেও কোন কোনো জায়গায় সংস্কার দরকার এবং সেখানে করনীয় কি সেটি সরকার চিহ্নিত করতে পেরেছে সংস্কার কমিশনগুলোর মাধ্যমে।
ইতোমধ্যেই সাংবিধানিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ হিসেবে আরপিওতে সংশোধনী আনা হয়েছে।
আর বিচারের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার একটি মামলার রায় ছাড়া গুম খুনের বিচার শুরু করাকে অর্জন হিসেবে দেখছে সরকার। কারণ সরকার বলছে, মামলাগুলোর তদন্তের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন ছাড়াও দ্রুত বিচারের জন্য যা যা করণীয় সেসব পদক্ষেপও যথাসময়ে সরকার নিতে পেরেছে।
এছাড়া গুম খুনের মামলায় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনাকেও সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক অর্জন বলে সরকারের দিক থেকে মনে করা হচ্ছে।
ক্ষমতায় আসার পরপরই আর্থিক খাতে সংস্কার এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। আওয়ামী লীগ আমলে হওয়া 'আর্থিক খাতের দুর্নীতি' নিয়ে একটি শ্বেতপত্রও প্রকাশ হয়েছে সরকারের উদ্যোগে।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন সম্প্রতি বলেছেন, "উত্তরাধিকার সূত্রে একটি চ্যালেঞ্জিং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পাওয়ার পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি সহনশীলতা দেখিয়েছে এবং ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে"।
সরকারের দাবি অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার যা আইএমএফ এর ঘোষিত পদ্ধতি অনুযায়ী এখন ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
এছাড়া ব্যাংক খাতেও স্বস্তি ফিরে আসার দাবি করছে সরকার এবং এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দুর্বল ৫টি ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে।
তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সফল হতে পারেনি। চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ডিসেম্বর মাসের মূল্যস্ফীতির যে চিত্র প্রকাশ করেছে, সে অনুযায়ী, ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর আগে নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।
গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
তবে এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সাথে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে পারাটা তাদের জন্য একটি সাফল্য, বিশেষ করে গত বছর রোজায় দ্রব্যমূল্য খুব একটা বাড়েনি বলেই মনে করছেন তারা
যদিও চালের দাম না কমার কারণে খাদ্যমূল্যস্ফীতি কমেনি বলে অর্থনীতিবিদরা বলছেন।
তবে সরকারের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ব্যর্থতা, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনা মোকাবেলায় ব্যর্থতার অভিযোগ সত্ত্বেও সরকার মনে করছে এর বেশিরভাগ ঘটনাই রাজনৈতিক।
সরকার বলেছে, এ সরকারের আমলে দুটি দুর্গাপূজায় অঘটন ঘটেনি।
সরকারের দিক থেকে সাফল্য হিসেবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথাও বলা হচ্ছে। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি হওয়ায় এখন বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি সুপ্রিম কোর্টই করবে।
অন্যদিকে আইন শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হলো 'অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করা ভয়াবহ চ্যালেঞ্জিং ছিলো। সে কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারতো কিন্তু সরকার পদক্ষেপ নেওয়ায় তা হয়নি'।
সরকার বলছে, জোরপূর্বক গুম, খুন বন্ধ হয়েছে এবং পুলিশ বাহিনীকে সক্ষম করে তোলা হয়েছে, যা ধীরে ধীরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে সরকার মনে করে।
তবে কারাগারে কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকার বলছে, আগের মতো সরকার এগুলো প্রত্যাখ্যান করেনি, বরং তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
সরকারের শুরুর দিকে ১৬৭ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল। পরে সরকার নিজেই সেটি ভুল পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এখন সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছে যে, এই ঘটনা ছাড়া সরকারের পদক্ষেপের কারণে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হয়নি বরং প্রেস ফ্রিডমের উন্নতি হয়েছে।
যদিও বেশ কিছু সাংবাদিককে আটক, টকশোতে সরকারের সমালোচনার পর সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে গ্রেফতার এবং সর্বোপরি প্রথম আলো-ডেইলি স্টারে হামলার ঘটনাগুলোকে মত প্রকাশ কিংবা স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপরই হামলা হিসেবে বলছেন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন মোড় নিয়েছে। একদিকে ওমান উপসাগরে অবস্থানরত একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করেছে ইরান, অন্যদিকে নতুন করে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে লেবানন ও ইসরায়েল। পরস্পর-সংযুক্ত এই দুই ঘটনাকে বিশ্লেষকরা বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটের অংশ হিসেবে দেখছেন। ইরানের অভিযোগ, ওমান উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে পরিচালিত মার্কিন কর্মকাণ্ডের সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের দাবি কী? বার্তাসংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার (৩ জুন) ইরানের নৌবাহিনী দাবি করে যে তারা ওমান উপসাগরে অবস্থানরত একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারকে লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নিয়েছে। ইরানি নৌবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘন, মার্কিন আগ্রাসী আচরণ এবং ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে পরিচালিত কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছিল। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর জাহাজটিকে শনাক্ত করা হয় এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ইরান আরও দাবি করেছে, তারা ওই জাহাজকে একটি “শত্রুতামূলক তৎপরতার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র” হিসেবে বিবেচনা করে পদক্ষেপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ইরানের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বার্তায় সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানের উপস্থাপিত তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ নিরাপদ রয়েছে এবং নির্ধারিত কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, অঞ্চলে তাদের নৌ-উপস্থিতি আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক চলাচল নিশ্চিত করার অংশ। কেন গুরুত্বপূর্ণ ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি? বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত সামুদ্রিক করিডর হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগর দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি তেল ও গ্যাস এই নৌপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য সামরিক উত্তেজনাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক অবস্থানগত সংঘাতের ঝুঁকি নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। একই সময়ে যুদ্ধবিরতিতে লেবানন ও ইসরায়েল অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি সংঘাতপূর্ণ ফ্রন্টে আপাতত উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, লেবানন ও ইসরায়েল নতুন করে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হামলা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখার বিষয়ে দুই পক্ষ নীতিগত সমঝোতায় পৌঁছেছে। এ চুক্তির আওতায় দক্ষিণ লিতানি নদী অঞ্চল থেকে হিজবুল্লাহ সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব গ্রহণ করবে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী। সংঘাতের পেছনের প্রেক্ষাপট গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। পরবর্তী সময়ে মার্চ মাসে দক্ষিণ লেবাননে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। এর জবাবে হিজবুল্লাহও পাল্টা হামলা চালায়। সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়ে সীমান্ত অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে এক হাজারেরও বেশি লেবাননি নিহত হয়েছেন। এছাড়া বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বহু মানুষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অবকাঠামো। আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য কী বার্তা? মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি একটি দ্বৈত বাস্তবতা তুলে ধরছে। একদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমুদ্রপথে উত্তেজনা বাড়ছে, অন্যদিকে লেবানন-ইসরায়েল ফ্রন্টে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে সীমান্ত এলাকায় সহিংসতা কমতে পারে। তবে একই সময়ে ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে বৃহত্তর অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা পুরোপুরি কাটবে না। মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং লেবাননকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আগামী সপ্তাহগুলোতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোর হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রণালির ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান, অন্যদিকে কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি এবং ওমানের জলসীমায় সন্দেহভাজন নৌ-মাইন শনাক্ত হওয়ার ঘটনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা শুধু সামরিক উত্তেজনার ইঙ্গিত নয়; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। হরমুজে কঠোর নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা ইরানের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর খাতাম আল-আম্বিয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর পূর্ণ কর্তৃত্বের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব বাণিজ্যিক জাহাজ, তেলবাহী ট্যাংকার এবং অন্যান্য নৌযানকে নির্ধারিত রুট ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি যাত্রার আগে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর অনুমতি নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের দাবি, নির্ধারিত বিধিনিষেধ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট জাহাজের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রণালিতে অবস্থানরত বিদেশি সামরিক বাহিনীকেও সতর্ক করা হয়েছে। তেহরান বলছে, সামুদ্রিক চলাচল বা প্রণালির ব্যবস্থাপনায় বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না। কাতারের আপত্তি: স্থায়ী টোলের বিরোধিতা এদিকে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত শাংরি-লা ডায়ালগে কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আব্দুল রহমান আল-থানি হরমুজ প্রণালিতে স্থায়ী ট্রানজিট ফি বা টোল আরোপের সম্ভাবনার বিরোধিতা করেন। তার মতে, এমন কোনো ব্যবস্থা কার্যকর হলে এর অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক ভোক্তাদের ওপরই পড়বে। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মাইন অপসারণ বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য সীমিত সময়ের অস্থায়ী চার্জ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এই অবস্থান এমন সময়ে এসেছে, যখন ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য একটি কাঠামো নিয়ে আলোচনা করছে বলে আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। ওমানের জলসীমায় সন্দেহভাজন নৌ-মাইন উত্তেজনার মধ্যেই ওমানের মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টার (এমএসসি) জানিয়েছে, দেশটির জলসীমায় একটি ভাসমান বস্তু শনাক্ত করা হয়েছে, যা নৌ-মাইন হতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, হরমুজ প্রণালির ইনশোর ট্রাফিক জোনের পশ্চিম অংশে এই বস্তুটি দেখা গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজ, নাবিক এবং জেলেদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সন্দেহজনক কোনো বস্তু দেখা গেলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এর কয়েকদিন আগেই মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছিল যে তারা দক্ষিণ ইরানের কাছাকাছি এলাকায় মাইন স্থাপনকারী কিছু নৌযানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে চালানো এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত পাঁচজন মার্কিন সেনা ও বেসামরিক ঠিকাদার আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হামলায় মার্কিন বাহিনীর দুটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং অন্যটি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। মার্কিন পক্ষের দাবি অনুযায়ী, কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি ইরানি ফাতেহ-১১০ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করলেও এর ধ্বংসাবশেষ ঘাঁটির ভেতরে পড়ে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়। অন্যদিকে আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই ওই মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে একই ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হয়েছিল এবং ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ছিল তারই প্রতিক্রিয়া। আইআরজিসি আরও সতর্ক করেছে, ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। ট্রাম্পের মন্তব্যে নতুন বিতর্ক এমন পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইরান বা ইরাকে সামরিকভাবে জড়ানো উচিত ছিল না। তিনি ইরাক যুদ্ধকে ‘অত্যন্ত বোকামিপূর্ণ সিদ্ধান্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে থাকা উচিত ছিল না। তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, কয়েক মাস আগে মার্কিন বি-২ বোমারু বিমান ব্যবহার করে ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর হামলা না চালানো হলে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে যেত। ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানের সামরিক কাঠামোর একটি অংশকে সরাসরি ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তু বানায়নি। তার ভাষায়, সামরিক বাহিনীর কিছু অংশকে তারা তুলনামূলকভাবে ‘মধ্যপন্থী’ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি? বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করে। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা, টোল আরোপ, মাইন বিস্ফোরণের আশঙ্কা কিংবা জাহাজ চলাচলে বাধা—সবকিছুই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সাম্প্রতিক অবস্থান, মার্কিন-ইরান উত্তেজনা এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ভিন্নমুখী অবস্থান মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি আবারও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়; বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : বছরের এই সময়টাতে গাজার খামারগুলোতে থাকার কথা ছিল ঈদুল আজহার ব্যস্ততা। কোরবানির পশুর হাঁকডাক, পশু কেনাবেচা, বাজারের ভিড়—সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু এখন সেই গাজায় নেই কোরবানির পশু, নেই উৎসবের আমেজও। যুদ্ধ, অবরোধ ও খাদ্য সংকটে টানা তৃতীয় বছরের মতো কার্যত থমকে গেছে ঈদুল আজহার প্রধান ধর্মীয় অনুষঙ্গ কোরবানি। গাজার পরিচিত পশু খামারি মাজেন আল-জেরজাউই একসময় ঈদের আগে শত শত ভেড়া ও গরু বিক্রি করতেন। এখন তিনি একটি ছোট রেস্তোরাঁ চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সেখানে পরিবেশিত খাবারের জন্যও তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে সীমিত পরিমাণে প্রবেশ করা হিমায়িত মাংসের ওপর। গাজা সিটির বাসিন্দা জেরজাউই বলেন, “এই সময়ে আমি প্রায় ২০০টি ভেড়া ও গরু বিক্রি করতাম। এখন আমার কাছে একটি পশুও নেই। গাজায় জীবন্ত পশু ঢুকতেই দেওয়া হচ্ছে না।” তার ভাষায়, ইসরায়েলের কঠোর নিয়ন্ত্রণ গাজার মানুষকে এমন অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে, যেখানে টিকে থাকাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। যুদ্ধের আগে বছরে আসত ৬০ হাজার পশু ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের আগে প্রতি বছর গাজায় ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার ভেড়া ও বাছুর আমদানি হতো। স্থানীয় খামারগুলোও ছিল সক্রিয়। কোরবানির পশুকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল বড় একটি অর্থনৈতিক চক্র। কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ ও অবরোধ পরিস্থিতি পুরো খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, গবাদিপশু খাতের ৯০ শতাংশের বেশি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। শুধু খামার নয়, ধ্বংস হয়েছে গোয়ালঘর, পশুখাদ্যের গুদাম, পশু চিকিৎসা কেন্দ্র এবং কৃষিভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থা। আকাশছোঁয়া পশুর দাম যুদ্ধের আগে গাজায় একটি ভেড়ার দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলারের মধ্যে। বর্তমানে হাতে গোনা যে কয়েকটি পশু টিকে আছে, সেগুলোর দাম পৌঁছেছে প্রায় ৭ হাজার ডলারে। এই পরিস্থিতিতে অনেক প্রবাসী ফিলিস্তিনি এখনও গাজায় থাকা স্বজনদের নামে কোরবানি দিতে চাইছেন। তবে জেরজাউই তাদের নিরুৎসাহিত করেন। তিনি বলেন, “একটি ভেড়ার পেছনে ২০ হাজার শেকেল খরচ করার চেয়ে সেই অর্থ দিয়ে একটি পরিবারের বিয়ের খরচ চালানো সম্ভব। এখন ৫০ কেজি হিমায়িত মাংস কিনে মানুষকে খাওয়ানোই বেশি বাস্তবসম্মত।” নিশ্চিহ্নের পথে গবাদিপশু জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরের মধ্যেই গাজার ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল মারা গেছে বা হত্যা করা হয়েছে। গাজার কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধের আগে যেখানে উপত্যকাটিতে প্রায় ৬০ হাজার ভেড়া ও ছাগল ছিল, এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩ হাজারে। গরু ও বাছুর প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া বলেন, “যে অল্পসংখ্যক পশু বেঁচে আছে, সেগুলো যাযাবর রাখালদের কাছে রয়েছে এবং ঈদের বাজারে আনার মতো পরিস্থিতি নেই।” তার মতে, পানির সংকট ও কৃষি অবকাঠামোর ধ্বংস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে এই খাত পুনরুদ্ধারের বাস্তব সম্ভাবনাও প্রায় নেই। বোমা হামলায় মারা গেছে পশু জেরজাউই জানান, যুদ্ধের মধ্যে পশু বাঁচিয়ে রাখাই হয়ে উঠেছিল অসম্ভব। তিনি বলেন, “পশুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে আমরা পাস্তা পর্যন্ত খাইয়েছি। কিন্তু পাশের বাড়িতে বোমা হামলার পর আমার অনেক ভেড়া মারা যায়।” শুধু বোমা হামলাই নয়, বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনাও গবাদিপশু খাতকে চূড়ান্ত ধসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালানোর সময় অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে কম দামে পশু বিক্রি বা জবাই করে দেয়। জেরজাউই বলেন, “প্রতিটি উচ্ছেদ আদেশের সঙ্গে সঙ্গে গাজায় গবাদিপশুর সংখ্যা কমে গেছে। শেষ পর্যন্ত মানুষ পরিবারকে বাঁচাবে, নাকি পশুর যত্ন নেবে—এই কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়েছে সবাই।” ‘কোরবানি ছাড়া ঈদ নেই’ গাজার সাধারণ মানুষের কাছেও ঈদের অনুভূতি এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবু রিয়ালা বলেন, “মনে হচ্ছে আমরা তিন বছর ধরে ঈদই উদযাপন করছি না। কোরবানির আনন্দ, ভাগাভাগি করার অনুভূতি—সবকিছু হারিয়ে গেছে।” তিনি জানান, সংকট শুধু পশুর অভাবেই সীমাবদ্ধ নয়। বহু পরিবার এখন দৈনিক খাবার জোগাড় করতেই সংগ্রাম করছে। তার ভাষায়, “অনেকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে হিমায়িত মাংসও খেতে পারেনি। গাজায় কী ঢুকবে, তা পুরোপুরি সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ফলে বাজারে জিনিসপত্রের দামও অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে।” খাদ্য সংকটে ১৬ লাখ মানুষ জাতিসংঘ সমর্থিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)-এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ গাজার প্রায় ১৬ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশে কড়াকড়ি অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ হয়ে গেলে বাজার থেকে খাদ্যপণ্য প্রায় উধাও হয়ে যায়। ধসে পড়ছে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিশেষজ্ঞদের মতে, গবাদিপশু খাত ধ্বংস হওয়ায় শুধু কোরবানির ঐতিহ্যই নয়, গাজার একটি বড় অর্থনৈতিক ভিত্তিও ভেঙে পড়ছে। মুহাম্মদ আবু রিয়ালা বলেন, “গবাদিপশু প্রবেশের অনুমতি থাকলে পশু চিকিৎসক, খামারি, কৃষক, কসাই ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা সবাই উপকৃত হতেন। কিন্তু পুরো সমাজকে অকার্যকর করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।” গাজার বাস্তবতা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ঈদ মানে আর উৎসব নয়; বরং বেঁচে থাকার সংগ্রামের আরেকটি দিন।