Brand logo light

মতামত

সাইবার সুরক্ষা আইন..
সাইবার সুরক্ষা আইন: গুজব ঠেকানো নাকি কণ্ঠরোধ

বাংলা ট্রিবিউন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, এআই-নির্ভর বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও এবং মানহানিকর কনটেন্ট ঠেকাতে সাইবার আইনে কঠোর অবস্থানের কথা বলছে সরকার। সরকারের যুক্তি, ভুয়া তথ্য এখন শুধু ব্যক্তির সুনামহানি করছে না—কখনও কখনও তা সামাজিক অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং জনআস্থার সংকটও তৈরি করছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে অন্য জায়গায়। গুজব দমনের নামে আইনটি ভিন্নমত, রাজনৈতিক সমালোচনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তির্যক মন্তব্য, কিংবা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে কিনা। গুজব প্রতিরোধ বা সাইবার অপরাধ ঠেকাতে করা এই আইন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা নতুন নয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে সাইবার নিরাপত্তা আইন, এরপর সাইবার সুরক্ষা আইন—নাম পাল্টেছে একাধিকবার। কিছু ধারা বাতিল হয়েছে, পুরোনো কয়েকটি অপরাধে দায়মুক্তির কথাও এসেছে। কিন্তু সাংবাদিক, আইনজীবী ও নাগরিক অধিকারকর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ—আগের বিতর্কিত ধারাগুলোর অনেক বিষয়ই নতুন আইনের অন্য ধারায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ফলে আইন বদলালেও ভয় পুরোপুরি কাটছে না। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গুজব, অপপ্রচার, মানহানিকর কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও ও অডিও ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হবে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে বাধ্য করার বিধান যুক্ত করার কথাও আলোচনায় এসেছে। সরকারের ভাষ্য, ডিজিটাল পরিসরকে নিরাপদ রাখতে হলে অনলাইন অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতেই হবে।        তবে আইনটির সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ আছে সচেতন মহলে। কারণ বাংলাদেশে অতীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে মামলার অসংখ্য নজির রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মামলার চূড়ান্ত বিচার হওয়ার আগেই গ্রেফতার, রিমান্ড, কারাবাস ও সামাজিক হয়রানি অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে নতুন আইন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে— গুজব বা অপরাধ দমন হবে, নাকি মত প্রকাশের ক্ষেত্র আরও সংকুচিত হবে? প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা  বলেন, ‘‘গুজব, পরিকল্পিত অপতথ্য এবং এআইভিত্তিক বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দমনে কার্যকর আইন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে একইসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, আইনটি যেন ভিন্নমত, রাজনৈতিক সমালোচনা বা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবহার না হয়।’’   তার মতে, এ জন্য আইনে অপরাধের স্পষ্ট সংজ্ঞা, স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া, স্বাধীন বিচারিক তদারকি এবং প্রত্যেক অভিযুক্তের ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। কোনও কনটেন্ট অপসারণ বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে লিখিত কারণ জানানো, আপিলের সুযোগ রাখা এবং নিয়মিত স্বচ্ছতা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে আইনের প্রয়োগ নিয়ে জনআস্থা বাড়বে। তিনি বলেন, ‘‘একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত—ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। তবে একইসঙ্গে সংবিধানসম্মত মত প্রকাশের স্বাধীনতাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে সুরক্ষা দিতে হবে। এই দুইয়ের ভারসাম্যই আধুনিক, মানবাধিকার-সম্মত ও জবাবদিহিমূলক সাইবার আইন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।’’ সাইবার সুরক্ষা আইন ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে আছে কয়েকটি ধারা। ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ৮ ধারার বিষয় নতুন সাইবার সুরক্ষা আইনে প্রায় একইভাবে প্রতিস্থাপিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বরং নতুনভাবে আরও একটি উপধারা যুক্ত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—এই ধারার উদ্দেশ্য পূরণে প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। সমালোচকদের আশঙ্কা, “বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে” এ ধরনের বিস্তৃত ভাষা ভবিষ্যতে প্রশাসনিক ক্ষমতার পরিধি আরও বাড়াতে পারে। ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারায় আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ ও প্রকাশের বিষয় ছিল। নতুন সাইবার সুরক্ষা আইনে একই ধরনের অপরাধের বিষয় ২৩ ধারায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে। অন্যদিকে নতুন আইনের ২৫ ধারায় যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং বা অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ড আলাদাভাবে যুক্ত করা হয়েছে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, নারীর সুরক্ষা এবং অনলাইন ব্ল্যাকমেইলিং ঠেকাতে এ ধরনের বিধান জরুরি হলেও ‘মানহানিকর’, ‘আক্রমণাত্মক’ বা ‘ভীতি প্রদর্শক’ কনটেন্টের ব্যাখ্যা অস্পষ্ট থাকলে— তা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিপক্ষ দমনের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছে ২৬ নম্বর ধারাটি। ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’ এবং ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’-এর ২৮ ধারার সংশোধিত রূপ হিসেবে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬’-এর ২৬ ধারা এসেছে। আগের আইনে ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত’ করার অভিযোগে মামলা করার সুযোগ ছিল। নতুন আইনে ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ শব্দটি না থাকলেও ‘ধর্মীয় বা জাতিগত বিষয়ে সহিংসতা, ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক তথ্য প্রকাশ’ সংক্রান্ত অপরাধের বিধান রাখা হয়েছে। এই ধারায় সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শব্দ পাল্টালেও ঝুঁকির জায়গা রয়ে গেছে। কারণ কোন বক্তব্য ঘৃণা, কোনটি তীব্র সমালোচনা, কোনটি রাজনৈতিক মতামত আর কোনটি সহিংসতায় উসকানি—এসবের স্পষ্ট সীমারেখা না থাকলে অপব্যবহারের সুযোগ থেকেই যায়। বিশেষ করে ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, রাষ্ট্র, সরকার বা ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সমালোচনার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যাখ্যাই যদি একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ঝুঁকিতে পড়বে। আইনের অপব্যবহার ঠেকাতে সরকার জাতীয় সংসদে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬’-এর ২৮ ধারার কথা বলেছে। এই ধারায় মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ দায়েরকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার বিধান রয়েছে। সরকারের বক্তব্য, সাংবাদিক, ব্লগার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহার হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তার পরিবার মামলা করতে পারবে। একইসঙ্গে ১২ ধারায় ২৩ সদস্যের জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের কথাও বলা হয়েছে, যার চেয়ারম্যান হবেন প্রধানমন্ত্রী। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিথ্যা মামলা প্রতিরোধের বিধান থাকলেই কি অপব্যবহার বন্ধ হবে? কারণ বাস্তবে একটি মামলার পরপরই গ্রেফতার, ডিভাইস জব্দ, সামাজিক অপবাদ, পেশাগত ক্ষতি এবং দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া একজন নাগরিককে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই শুধু পরবর্তী প্রতিকার নয়, মামলা গ্রহণের আগেই প্রাথমিক যাচাই, স্বাধীন তদন্ত তদারকি, বিচারিক অনুমোদন এবং গ্রেফতারের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত থাকা জরুরি। তারা বলছেন, গুজব দমনে সরকার চাইলে কয়েকটি নীতিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে পারে। প্রথমত, ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘ভুয়া তথ্য’, ‘মানহানিকর কনটেন্ট’ ও ‘ঘৃণামূলক বক্তব্য’— প্রতিটি শব্দের আইনগত সংজ্ঞা স্পষ্ট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জনস্বার্থে করা সাংবাদিকতা, তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, মতামত, ব্যঙ্গ, কার্টুন ও রাজনৈতিক বক্তব্যকে অপরাধের বাইরে রাখার সুরক্ষা ধারা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষেত্রে লিখিত কারণ জানানো এবং দ্রুত আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, কতটি কনটেন্ট সরানো হলো, কতটি মামলা হলো, কতজন গ্রেফতার হলো এবং কতটি অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলো—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। গুজব প্রতিরোধে কাজ করতে গিয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনের অপব্যবহার ঠেকাতে পুলিশ কীভাবে ভূমিকা রাখে—এমন প্রশ্নে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সাইবার পুলিশ সেন্টারের ডিআইজি সানা শামিনুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আইনে বিভিন্ন ধারা রয়েছে। সিআইডির সার্বক্ষণিক অভিযোগ গ্রহণ কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে যেসব অভিযোগ আসে, সেগুলো আগে যাচাই-বাছাই করা হয়। এরপর আইন অনুযায়ী যেসব বিষয়ে আমাদের কাজ করার সুযোগ আছে, সেসব ক্ষেত্রেই আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। আইনের বাইরে গিয়ে বা যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই।” গত ৮ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে জানান, সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীতে গুজব, অপতথ্য ও মানহানিকর কনটেন্টের সংজ্ঞা নতুনভাবে নির্ধারণের পাশাপাশি এসবের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান যুক্ত করা হবে। আইনে মেটাসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে বাধ্য করার বিধান রাখা হবে। বর্তমানে আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে বিটিআরসি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুরোধেও মেটা দ্রুত ব্যবস্থা নেয় না বলে জানান মন্ত্রী। সংশোধনীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সাইবার সুরক্ষা সংস্থা, বিটিআরসি ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে কনটেন্ট অপসারণ, ব্লক বা স্থানান্তরের ক্ষমতা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। গত ২৭ জুন সংসদে সাইবার সুরক্ষা আইনের বিল উত্থাপন করা হয়। পরে ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সাইবার সুরক্ষা সংশোধন বিলটি সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটে পাস হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া, কিন্তু একইসঙ্গে সংবিধানসম্মত মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সমানভাবে সুরক্ষা দেওয়া। কারণ গুজব যেমন সমাজের জন্য ক্ষতিকর, তেমনই ভয়ভীতির পরিবেশও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। আইন যদি শুধু অপরাধীকে ঠেকায়, সেটি সুরক্ষা। কিন্তু আইন যদি প্রশ্নকারী নাগরিক, সাংবাদিক বা সমালোচককে চুপ করিয়ে দেয়, সেটি সুরক্ষা নয়—সেটি হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণ বা কণ্ঠরোধ। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, “গুজব আর অসত্য তথ্য—এ দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। গুজব হলো পরিকল্পিতভাবে কোনও কথা রটিয়ে দেওয়া, যাতে যিনি বা যে গোষ্ঠী সেটি রটাচ্ছেন, তাদের কোনও লাভ হয়। আর অসত্য তথ্য হলো— কেউ হয়তো বিষয়টি জানতেন না, কিন্তু শোনা কথা হিসেবে তা প্রচার করেছেন। ‘‘সুতরাং, গুজব ও অসত্য তথ্যের পার্থক্য নির্ণয় করতে না পারলে সব ক্ষেত্রেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি হয়। সরকার বলছে গুজবের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু গুজব আর অসত্য তথ্যের পার্থক্য আগে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। তা না হলে দেখা যাবে গুজবের অভিযোগে মানুষকে এমনভাবে হয়রানি করা হবে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে।’’ তিনি বলেন, ‘‘সরকারের সমালোচনার ক্ষেত্রেও যৌক্তিক সমালোচনা ও অযৌক্তিক সমালোচনার পার্থক্য বুঝতে হবে। আমি যদি সরকারের কার্যক্রম নিয়ে যৌক্তিকভাবে সমালোচনা করি, তাহলে সেটির জন্য আমাকে আইনের মুখোমুখি করা হলে, তা হবে আমার ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ। কিন্তু কেউ যদি আজগুবি কথাবার্তা বলে সরকারকে হেনস্থা করতে চায়, কিংবা কোনও গোষ্ঠীকে বিপদগ্রস্ত করতে চায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।”   স্বচ্ছতা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা কেন জরুরি? বিশেষজ্ঞদের মতে, গুজব দমনে কার্যকর আইন প্রয়োজন হলেও কিছু নীতিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য। এর মধ্যে রয়েছে: ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘ভুয়া তথ্য’, ‘মানহানিকর কনটেন্ট’ ও ‘ঘৃণামূলক বক্তব্য’-এর স্পষ্ট আইনগত সংজ্ঞা নির্ধারণ; জনস্বার্থে করা সাংবাদিকতা, তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, মতামত, ব্যঙ্গ, কার্টুন ও রাজনৈতিক বক্তব্যকে অপরাধের বাইরে রাখার সুরক্ষা ধারা; কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষেত্রে লিখিত কারণ জানানো এবং দ্রুত আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করা; কতটি কনটেন্ট সরানো হলো, কতটি মামলা হলো, কতজন গ্রেফতার হলো এবং কতটি অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলো—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা। ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ গুজব ও অপতথ্য সমাজের জন্য ক্ষতিকর—এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিস্তর ঐকমত্য রয়েছে। তবে একইসঙ্গে ভয়ভীতির পরিবেশও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। আইন যদি প্রকৃত অপরাধীকে ঠেকায়, সেটি সুরক্ষা; কিন্তু আইন যদি প্রশ্নকারী নাগরিক, সাংবাদিক বা সমালোচককে চুপ করিয়ে দেয়, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণ বা কণ্ঠরোধের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—ভুয়া তথ্য ও অনলাইন অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা এবং সংবিধানসম্মত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুলাই ৯, ২০২৬ 0
বায়ু ও সৌর বিদ্যুৎ
বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ: বিকল্প উৎস তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ

আব্দুর রহমান: বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে—শিল্প, পরিবহন, বিদ্যুৎ—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানির চাহিদা বেড়েই চলেছে। কিন্তু এই চাহিদার বড় অংশই পূরণ হচ্ছে আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের মাধ্যমে। বৈশ্বিক বাজারে দামের অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি—সব মিলিয়ে এই নির্ভরতা এখন বড় এক কৌশলগত প্রশ্নের মুখে ফেলেছে দেশকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনীতি, পরিবেশ রক্ষা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বিকল্প জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া ছাড়া আর কোনো বাস্তবসম্মত পথ নেই। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি উৎস বিশেষভাবে সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে। সূর্যের আলোয় শক্তির সম্ভাবনা বাংলাদেশে বছরের অধিকাংশ সময়ই সূর্যালোক পাওয়া যায়—এই প্রাকৃতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সৌর শক্তি হতে পারে জ্বালানি রূপান্তরের প্রধান ভরকেন্দ্র। গ্রামাঞ্চলে ঘরের ছাদে ছোট সোলার সিস্টেম, শহরে রুফটপ সোলার, এমনকি বড় আকারের সোলার ফার্ম—সবই এখন আলোচনায়। সেচের জন্য সৌরচালিত পাম্পও কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। এ ক্ষেত্রেইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড  এর নেতৃত্বে বাস্তবায়িত সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই সাফল্যকে কীভাবে শিল্প ও নগর পর্যায়ে বড় আকারে সম্প্রসারণ করা যাবে? উপকূলে বাতাসের শক্তি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল—বিশেষ করে কক্সবাজার, কুয়াকাটা এবং চট্টগ্রাম—বায়ু শক্তির জন্য সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এখানে গড় বাতাসের গতি তুলনামূলক বেশি হওয়ায় উইন্ড টারবাইন বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। তবে এখনো বড় পরিসরে এই খাতের উন্নয়ন সীমিত। গবেষকরা বলছেন, সঠিক ডেটা সংগ্রহ ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে বায়ু শক্তি দেশের জ্বালানি মিশ্রণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।  গ্রামে গ্রামে বায়োগ্যাস গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি উৎস হলো বায়োগ্যাস। গবাদিপশুর গোবর, কৃষি বর্জ্য ও জৈব বর্জ্য থেকে উৎপন্ন এই গ্যাস রান্নার কাজে যেমন ব্যবহারযোগ্য, তেমনি ছোট পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও কাজে লাগানো যায়। এটি শুধু জ্বালানির বিকল্প নয়—বরং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কৃষির জন্য জৈব সার উৎপাদনের ক্ষেত্রেও কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।  কৃষিভিত্তিক শক্তি: বায়োমাস ধানের তুষ, খড়, আখের বর্জ্য বা কাঠের অবশিষ্টাংশ—যা একসময় অপচয় হতো—সেগুলোই এখন শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে বায়োমাস শক্তি বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ। তবে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।  সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জলবিদ্যুৎ বাংলাদেশে বড় নদী থাকলেও উচ্চতার তারতম্য কম হওয়ায় বড় আকারের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সীমিত। বর্তমানে Kaptai Dam থেকেই মূল জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ি অঞ্চলে ছোট আকারের মিনি ও মাইক্রো হাইড্রো প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ এখনো কাজে লাগানো হয়নি পুরোপুরি।  শহরের বর্জ্য থেকেই জ্বালানি প্রতিদিন ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। এই বর্জ্যকে সমস্যা না দেখে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা থেকেই ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি’ প্রযুক্তির বিকাশ। ল্যান্ডফিল গ্যাস বা কঠিন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন—এই খাতটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটি নগর ব্যবস্থাপনার একটি বড় সমাধান হতে পারে।  ভবিষ্যতের দিকচিহ্ন: সবুজ হাইড্রোজেন বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য শক্তির পরবর্তী ধাপ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে সবুজ হাইড্রোজেন। নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে পানি থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদন করা যায়, যা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। বাংলাদেশে এখনো এই খাত প্রাথমিক পর্যায়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি কৌশলগত বিনিয়োগের একটি ক্ষেত্র হতে পারে। বাস্তবতা বনাম সম্ভাবনা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প জ্বালানি হলো সৌর শক্তি, বায়োগ্যাস, বায়োমাস, বায়ু শক্তি এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি। তবে বড় প্রশ্ন হলো—নীতিগত ধারাবাহিকতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ—এই চারটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি ছাড়া কি এই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে রূপ পাবে? বাংলাদেশ যদি এই খাতগুলোকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিতে পারে, তাহলে শুধু আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোই নয়—বরং একটি টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং নিরাপদ জ্বালানি ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।  

নিজস্ব প্রতিবেদক এপ্রিল ২০, ২০২৬ 0
খাল খনন: জিয়া থেকে তারেক

আলম রায়হান: বর্তমান সরকারের প্রধান কর্মসূচির মধ্যে একটি হচ্ছে পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন। কাগজপত্রের হিসাবে এ কাজ অতীব সহজ। বেকু দিয়ে কাটলেই হলো! উল্লেখ্য জনশক্তির ওপর নির্ভর করে এ কাজের সূচনা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। বলা হয়, এটি নিছক কোনো কাজ নয়, একটি আন্দোলন। বিপ্লবও বলা চলে। দেশকে স্বনির্ভর করাই ছিল তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য। গভীরে আরও অনেক বিষয় ছিল।  পানি নিয়ে ভাবতেন প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রেসিডেন্ট জিয়া পানি নিয়ে ভাবতেন। যে ভাবনা থেকেই ভারতের সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্সার ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পানি রক্ষায় নানান উদ্যোগ নিয়েছেন। এ উদ্যোগেরই আলোচিত ও আলোকিত দিক হচ্ছে খাল খনন। কয়েক দশক আগে সূচিত কাজটিই নতুন উদ্যমে হাতে নিয়েছেন জিয়াপুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কিন্তু মাঝখানে পদ্মা-মেঘনা দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে। ফলে জিয়াউর রহমানের পক্ষে যা বাম হাতের খেলা ছিল, তারেক রহমানের পক্ষে তা কতটা সহজ-এ নিয়ে অনেকেই ভাবছেন। সঙ্গে আরও অনেক প্রসঙ্গ নিয়ে নানান আলোচনা আছে। কিন্তু মূল কথাটি সম্ভবত এখনো তেমন আলোচনায় আসেনি। তা হচ্ছে, খাল কাটা হবে কোথায়, কীভাবে। এ প্রসঙ্গে কারও মনে পড়তেই পারে হাসন রাজার গান, ‘কী ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার।’ এ প্রসঙ্গে অতীতের একটি ঘটনার অবতারণা করা যাক। এবং বলে রাখা ভালো, কোনো বিচারেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতীয় নদী কমিশনের চেয়ারম্যানের তুলনা চলে না। তবে অনুমান করা যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নদী কমিশনের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর প্রসঙ্গ তো আনুপাতিকভাবে আসতেই পারে।    শেখ হাসিনার দিকে ফিরেও তাকাননি উল্লেখ্য শেখ হাসিনা সরকারের আমলে নদী কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী। তিনি শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবেও বেশ পরিচিত। এরপরও মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। যামিনী না পোহাতেই জাগাবার মতো ঘটনা ঘটেছে। যদিও অন্য রকম আকুতি আছে বরীন্দ্রনাথের গানে, ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না, বেলা হলো মরি লাজে।’ নদী কমিশনের উল্লিখিত চেয়ারম্যান নদী-পানি রক্ষায় নিজেকে ক্ষমতাধর মনে করেছিলেন, রথের মতো। যেটাকে সরকারের ঘনিষ্ঠ ‘নদীখোর’ সাঙাতরা খুব বেশি বাড়াবাড়ি বলে বিবেচনা করেছিলেন।  মনে রাখা প্রয়োজন, সব সরকারের আমলেই একদল সাঙাত জুটে যায়। এরা খুবই ক্ষমতাধর হয়। সরকারের সঙ্গে এদের সম্পর্কটা অনেকটা পরকীয়ার আদলে। ফলে সাঙাতদের বদনখানি মলিন হলেই সরকারের কেন্দ্রে এক প্রকার ঝাঁকুনি লাগে। যদিও নিদানকালে এসব সাঙাত কোনোই কাজে লাগে না। এটি শেখ হাসিনার পরিণতিতে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যাঁরা চিরকাল থাকার সংকল্প করেছিলেন, এমনকি একত্রে কবরেও যাওয়ার কথা বলেছিলেন তাঁরা ইউটার্ন করেছেন নিমেষে। শেখ হাসিনার দিকে ফিরেও তাকাননি। কবরে যাওয়া তো অনেক দূরের বিষয়।  কবর থেকে উঠতেই চাচ্ছিলেন না মোশতাক কবর প্রসঙ্গে একটি বিষয় উল্লেখ করা যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর বাবা ইন্তেকাল করেন। তাঁকে শেষবিদায়পর্বে যাঁরা কবরে নামিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে খোন্দকার মোশতাকও ছিলেন। কিন্তু তিনি এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে কবর থেকে আর উঠতেই চাচ্ছিলেন না। কিন্তু নির্মম ইতিহাস বলে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবার কবরে পাঠানোর ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন এই মোশতাক। বলাবাহুল্য এরকম অনেক বাস্তবতা আছে। কিন্তু কেউ তেমন বিবেচনায় নেন না। শিক্ষা নেওয়া তো অনেক দূরের বিষয়। ওয়ান-ইলেভেনের পরিণতি কি কেউ বিবেচনায় নিয়েছেন? অন্তত আওয়ামী লীগ নেয়নি। যদিও হাসপাতাল থেকে অচল অবস্থায় কর্মীদের কাঁধে চড়ে বের হওয়ার সময় ওবায়দুল কাদের ওয়ান-ইলেভেনকে ‘একটি শিক্ষা’ হিসেবে উচ্চারণ করেছিলেন আবেগঘন নাটকীয়তায়। কিন্তু ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি এবং তাঁর সরকার কী করেছে? আসলে এটি হচ্ছে দেশের সরকারগুলোর ইনবিল্ড প্রবণতা। আর আমাদের রাজনীতিকরা যতটা না সরকার গঠন করেন, তার চেয়ে অনেক বেশি দৈন্যে সরকার কাঠামোতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। একপর্যায়ে এই কাঠামোবলয়ে আশ্রিত হয়ে যান এবং সরকার কাঠামোকেই সুরক্ষার বর্ম হিসেবে বিবেচনার বিভ্রমে আক্রান্ত হন। হেলাল হাফিজের কবিতার প্রিয়ার গালে মাছিকে তিল ভেবে ভুল করার মতো। ফলে সামগ্রিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার অবস্থায় তারা থাকেন না।  শিরোমণি ছিলেন অতিবাচাল এক নারী কাজেই সরকার কাঠামোতে নদী-পানির বিষয়ে নদী কমিশনের চেয়ারম্যান তো নস্যি, মন্ত্রীও একপ্রকার তেজপাতা। কাজেই নদী কমিশনের চেয়ারম্যান যতই শেখ পরিবারঘনিষ্ঠ ও দক্ষ হন না কেন, তাতে কিছু যায় আসে না। ফলে নদী কমিশনের চেয়ারম্যানের সক্রিয় ভূমিকা বড় বেশি বাড়াবাড়ি মনে করা হয়েছিল ক্ষমতাকেন্দ্রের সাঙাতদের কাছে। তাঁর সবচেয়ে ‘বড় অপরাধ’ ছিল, তিনি ঢাকার চারদিকের চারটি নদী পরিষ্কার রাখার জন্য গোঁ ধরেছিলেন। যাকে বরিশালের স্থানীয় বয়ানে বলা হয়, ‘ছাগলের ঠেনি।’ চেয়ারম্যান এমনও বলেছিলেন, ‘নদীর পানি এমন স্বচ্ছ হবে যে ঝিনুক ফিরে আসবে, মাছ ধরার জন্য নদীর তীরে ধ্যানের মতো অপেক্ষায় থাকবে মাছরাঙা।’ কিন্তু এসবের কিছুই হয়নি। উল্টো খোদ প্রধানমন্ত্রীর রোষানলে অপমানিত হয়েই বিদায় নিয়েছেন।  তবে এ অপকর্মের জন্য খুব ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের গলদঘর্ম হতে হয়নি। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদী দখল করে ডকইয়ার্ড নির্মাণকরী এক ব্যবসায়ী মূল খেলা খেলে দিয়েছেন। এর প্রেক্ষাপট প্রস্তুত করার জন্য সক্রিয় ছিল পরিবেশবাদীর ছদ্মাবরণে কতিপয় ভুঁইফোঁড় এনজিও। আর এদের শিরোমণি ছিলেন নাটকীয় বচনের অতিবাচাল এক নারী। পরে তিনি ইউনূস সরকারের উপদেষ্টার আসন অলংকৃত করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারে থাকাকালে তাঁর অনেক অপকর্মের ফিরিস্তি এর মধ্যেই বেশ চাউর হয়েছে। এরপরও তিনি বাচালপ্রবণতা ত্যাগ করতে পারেননি। কয়েক দিন আগে সংসদ নির্বাচনের সময় তাঁদের তৎপরতা প্রশ্নে বচন দিয়ে জামায়াতের হাতে একটি বড় ইস্যু তুলে দিয়েছেন, সরকারকে ফেলেছেন বিব্রতকর অবস্থায়। তিনি এমনই এক জিনিস।  হাসিনার প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন ‘নদীখাদক’  এই অদম্য নারীর সঙ্গে যদি হাসিনা সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী যুক্ত হন তাহলে আর কিছু লাগে! প্রসঙ্গত এই প্রতিমন্ত্রীও ‘নদীখাদক’ হিসেবে কুখ্যাত। শুরুর দিকেই বলেছি, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো কমিশন চেয়ারম্যানের তুলনা না চললেও অনুমান করা যায়। এই আলোকেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার অনুকরণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খাল কাটা উদ্যোগ পানির মতো সোজা মনে হচ্ছে না। প্রসঙ্গত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শুরুতে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ছিলেন। তিনি ছিলেন একক ক্ষমতাধর। তাঁর হাতে ‘ডান্ডা’ ছিল। আর সেই সময়ে রাজনীতি ততটা কলুষিত হয়নি, যতটা হয়েছে পরবর্তী সময়ে ক্রমাগতভাবে। দ্রুত অধোগতির ধারায় রাজনীতির জার্সি গায়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের অপরাধী ও ধান্ধাবাজরা রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছেন। ফলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে রাজনীতিতে ঠগ বাছতে কম্বল উজাড় হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হতে পারে। রাষ্ট্রকাঠামোতে নানান কিসিমের অপরাধীতে গিজগিজ করে রাষ্ট্রকাঠামোর ওপর দিকের বিভিন্ন স্তর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নানান কিসিমের অপরাধীতে গিজগিজ করে। এরা নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কোনো কিছুকে বিবেচনায় নেয় না। এই অপশক্তি বিভিন্ন দলে সংযুক্ত। তাদের বাহারি পরিচয় ‘নেতা’। কথিত এই নেতারা সুযোগ পেলে পাবলিকের খাতা ধরে টানাটানি করে। বস্ত্র হরণের একাধিক খবর তো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। অনেক খবর অপ্রকাশিতই থেকে যায়। কাজেই খাল খনন করতে গিয়ে যখন উচ্ছেদ প্রসঙ্গ আসবে তখনই হবে জটিল খেলা। এ প্রসঙ্গে পানিসম্পদমন্ত্রী প্রকারান্তরে আগাম ধারণা দিয়ে রেখেছেন। তিনি ৮ মার্চ বলেছেন, ‘খাল এবং নদীর অনেক জায়গায় দীর্ঘ সময় পলি জমে ছিল, অনেক জায়গায় দোকানপাট বাড়িঘর গড়ে উঠেছিল। আমরা সব বাধাবিপত্তি দূর করে সবার সহযোগিতা কামনা করছি।’ প্রশ্ন হচ্ছে, যারা দখল করেছে তারা কি সহায়তা করার জন্য মুখিয়ে আছেন? এদের তো উচ্ছেদ করতে হবে। এটি মোটেই সহজ নয়, বরং খুবই কঠিন কাজ।  পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্পর্কে মন্ত্রীর সম্যক ধারণা আছে?  প্রশ্ন আছে, খাল কাটার উদ্দেশ্য কী? এ ব্যাপারে আগিলা সময়ের একটি পাঠ্য রচনা প্রসঙ্গে আসা যাক। সেই সময় রচনাবলির মধ্যে একটি ছিল, ‘যদি লাখ টাকা পাই’। শিশুতোষ রচনায় লাখ টাকা পেলে নানা পরিকল্পার কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সব ভাত গুড় দিয়ে খাওয়ার ভাবনা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, খাল কাটার প্রধান উদ্দেশ্যগুলো কী কী?  আতা গাছে তোতা পাখির মতো সরকারি বয়ান নিশ্চয়ই প্রস্তুত, ‘বর্ষাকালের পানি ধারণ, শুষ্ক মৌশুমে কৃষিতে সেচের ব্যবহার এবং জলাবদ্ধতা দূর করা।’ খুবই ভালো কথা। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করার দৃঢ়তা কি সরকারের বখেদমতে হুজুরেআলাদের আছে? এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এদিকে মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে খাল কাটা কাজ হচ্ছে। কিন্তু যতটুকু জানা গেছে, খাল খননের মাঠের কাজটি করবে প্রধানত তাঁর মন্ত্রণালয়ের অধীন পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বিএডিসি। কিন্তু নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীন পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্পর্কে মন্ত্রীর কী সম্যক ধারণা আছে? বলা কঠিন!  প্রয়োজনে ক মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি হাসিনা সরকারের পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীমের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারেন। আবার উপমন্ত্রী বলে অবজ্ঞা করা ঠিক হবে না। কারণ এনামুল হক শামীম খুবই ক্ষমতাধর ছিলেন।  এরপরও তিনি নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছুই করতে পারেননি। আরও অনেক কঠিন বাস্তবতা আছে। এসব অতিক্রম করেই খাল কাটা কর্মসূচি সফল করতে হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। যা পাহাড় লঙ্ঘনের মতোই কঠিন কাজ। যত জটিলতাই হোক না কেন, খাল কাটায় প্রধানমন্ত্রীর সাফল্য কামনা করি। কারণ দেশ বাঁচানোর প্রাণভোমরা কিন্তু পানি। আর পানির প্রথম ধাপটিই হচ্ছে খালবিল-পুকুর, পরে নদী। খাল খনন কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এটি বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক সহযোগিতা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ—উভয়ের জন্যই জরুরি। কিন্তু পরিকল্পনা আর বাস্তবতার ব্যবধান কমানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

নিজস্ব প্রতিবেদক এপ্রিল ২০, ২০২৬ 0
ইসরাইলের শতাধিক শহরে হামলা
মধ্যপ্রাচ্য-ইউক্রেন সংঘাত: জ্বালানি, বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির লড়াইয়ে কে লাভবান—যুক্তরাষ্ট্র নাকি অন্য কেউ?

মাসুদ করিম: ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় থেকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি ধারণা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—যুদ্ধ এখন আর শুধু ভূখণ্ড দখল বা সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি অর্থনীতি, জ্বালানি এবং বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক জটিল প্রতিযোগিতা। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা—বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত—এই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পরও ইরানে সরকার পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং পাল্টা হামলায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।  জ্বালানি: যুদ্ধের আসল কেন্দ্রবিন্দু? বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সংঘাতগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি ও বাণিজ্য পথ। বিশেষ করে: হরমুজ প্রণালি কৃষ্ণসাগর অঞ্চল বৈশ্বিক তেল সরবরাহ চেইন বিশ্বের প্রায় ২০% তেল এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলে।  এলএনজি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে আক্রমণ করার পর  ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য হয়। এর ফলে: যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠে বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক ইউরোপ স্পট মার্কেটে বেশি দামে গ্যাস কিনতে শুরু করে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর মুনাফা বৃদ্ধি পায় তবে এই লাভের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে ইউক্রেন যুদ্ধে বিপুল অর্থ ব্যয়ও করতে হয়েছে।  লাভ বনাম ঝুঁকি: জটিল সমীকরণ যদিও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি রপ্তানিকারকরা লাভবান, তবুও বড় কিছু ঝুঁকি রয়ে গেছে: দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ অর্থনীতিকে দুর্বল করতে পারে জোট রাজনীতিতে চাপ বাড়ে সামরিক ব্যয় বাড়তে থাকে এছাড়া, কাতারের মতো দেশ যদি হরমুজ প্রণালির ঝুঁকির কারণে রপ্তানি কমায়, তাহলে বিশ্ববাজারে এলএনজি দাম আরও বাড়তে পারে—যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বল্পমেয়াদে সুবিধা আনলেও দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।  বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ: নতুন ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাতগুলো আসলে তিনটি বিষয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণের লড়াই: জ্বালানি (তেল ও গ্যাস) সমুদ্রপথ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার সহজ হয়।  বাংলাদেশ: চাপের মুখে  অর্থনীতি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন: জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়ে ফলে বৈশ্বিক সংঘাতের সরাসরি অংশীদার না হয়েও বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ে।  নিরাপত্তা বনাম নির্ভরতা দশকের পর দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু যদি সেই নির্ভরতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তা শুধু সামরিক নয়—একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। শেষ কথা: যুদ্ধের শেষ কোথায়? বর্তমান বাস্তবতায় একটি বিষয় পরিষ্কার— এই যুদ্ধের কোনো সহজ সমাপ্তি নেই। এটি: আঞ্চলিক সংঘাতের বাইরে গিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে জ্বালানি বাজারকে পুনর্গঠন করছে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি করছে অতএব, প্রশ্নটি এখন আর শুধু “কে জিতবে?” নয়— বরং “এই যুদ্ধ থেকে কে কতটা লাভবান হবে, আর তার মূল্য কে দেবে?”

নিজস্ব প্রতিবেদক মার্চ ৩১, ২০২৬ 0
অধ্যাপক মেঘনা গুহ ঠাকুরতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকবাহিনীর হত্যাযজ্ঞে শহীদ অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা

মেঘনা গুহ ঠাকুরতা:  ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ—বাংলার ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় কালরাত। এই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে চালায় বর্বরোচিত গণহত্যা। তাদের লক্ষ্য ছিল বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। কিন্তু সেই রক্তাক্ত রাতই উল্টো বাঙালিকে স্বাধীনতার পথে আরও দৃঢ় করে তোলে। সেই রাতের ভয়াবহতার শিকার হন অসংখ্য নিরীহ মানুষ, শিক্ষক, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী। তাদেরই একজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক  জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা। সেদিন রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন তিনি। সেদিনের ভয়াবহতার কিছু স্মৃতি তুলে ধরেছেন তার একমাত্র মেয়ে অধ্যাপক মেঘনা গুহ ঠাকুরতা। 🔥 গণহত্যার বিভীষিকা ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনারা হঠাৎ করেই হামলা চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানায়। জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)-সহ বিভিন্ন হলে শিক্ষার্থীদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই নির্মম হত্যাযজ্ঞে শুধু ঢাকাতেই হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারান। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বন্ধ করে দেওয়া হয় টেলিফোন, রেডিও ও টেলিগ্রাম ব্যবস্থা। 🏠 ৩৪ নম্বর ভবনের সেই রাত অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা থাকতেন শহীদ মিনার আবাসিক এলাকার ৩৪ নম্বর ভবনে। তার মেয়ে মেঘনা গুহ ঠাকুরতা সেই রাতের স্মৃতি তুলে ধরেন। তার ভাষায়, ২৫ মার্চ রাত প্রায় ১১টার দিকে পাকিস্তানি সেনারা তাদের বাসায় হানা দেয়। এক কর্মকর্তা ও দুই সৈনিক এসে জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতাকে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এসে অন্য ফ্ল্যাটগুলোতে তল্লাশি চালায়। এক পর্যায়ে শিক্ষক মনিরুজ্জামান এবং তার সঙ্গে থাকা তিনজন তরুণকে টেনে-হিঁচড়ে এনে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। 💔 “আপনার হাজবেন্ডকেও হয়তো মেরেছে” মনিরুজ্জামানের স্ত্রী এসে মেঘনার মাকে জানান—“আপনার হাজবেন্ডকেও হয়তো মেরেছে।” আতঙ্কিত পরিবার দ্রুত বাইরে গিয়ে দেখতে পায়, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছেন। মেঘনা জানান, সেনারা তার বাবার নাম ও ধর্ম জিজ্ঞেস করার পর গুলি করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঘরে এনে রাখা হয়, কারণ তখন কারফিউ চলছিল। 🏥 মৃত্যুপুরীতে পরিণত ঢাকা মেডিক্যাল ২৭ মার্চ কারফিউ শিথিল হলে তাকে নেওয়া হয় হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে অবস্থা সংকটজনক হয়ে ওঠে। মেঘনার ভাষায়, হাসপাতালের করিডর, মেঝে—সব জায়গা লাশ ও আহত মানুষের ভিড়ে পূর্ণ ছিল। চারদিকে রক্তের গন্ধ, আর্তনাদ আর মৃত্যুর মিছিল। চিকিৎসকরা জানান, তাকে আর বাঁচানো সম্ভব নয়। অবশেষে ৩০ মার্চ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 🕯️ ইতিহাসের এক অমোচনীয় ক্ষত ২৫ মার্চের সেই কালরাত শুধু একটি হত্যাযজ্ঞ নয়—এটি বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক নির্মম অধ্যায়। এই রাতেই শুরু হয় দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, যার মাধ্যমে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা সহ অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ বাঙালির ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক মার্চ ২৬, ২০২৬ 0
জুলহাস আলম
অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান শুধু শিক্ষক নন, অনেকের শিক্ষাগুরু

জুলহাস আলম: আমাদের শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, সাখাওয়াত আলী খান ৯ মার্চ ২০২৬ প্রয়াত হয়েছেন। স্যারের মৃত্যুতে গণমাধ্যমে ও অন্যান্য খাতে ছড়িয়ে থাকা অগণিত শিক্ষার্থীর হৃদয় ভারাক্রান্ত। আমরা যারা স্যারের সরাসরি ছাত্র, স্যারের বিদায়ে আমরা আবেগাপ্লুত হয়েছি। খবরটা যখনই পেলাম, আমার সামনে একজন শিক্ষকের, একজন অভিভাবকের প্রতিকৃতি ভেসে উঠল। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, ব্যাকব্রাশ করা চুল, মোটা ফ্রেমের চশমা, স্মিত হাসি, পরিষ্কার কণ্ঠ, সৌম্য, সুদর্শন একজন মানুষ। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, নরম করে কথা বলার স্টাইল—যুক্তি আবার কখনো হিউমার মিশ্রিত বাক্য চয়ন। শ্রেণীকক্ষে তিনি গল্প বলে ক্লাস নিতেন। যা বলতেন তা ছবির মতো পরিষ্কার। সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা, ফিচার লেখা—এসব বিষয় পড়ানোর সময় ক্লাস প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। ২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত অধ্যাপনা থেকে অবসর নেন। তারপরও যুক্ত ছিলেন বিভাগে। অনারারি অধ্যাপক হিসেবে। যুক্ত ছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও। স্যারকে প্রথম জানা শুরু করি বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরপরই। বোধ হয় তখনো স্যারের কোনো ক্লাস পাইনি। এর মধ্যে আমি ম্যাস লাইন মিডিয়া সেন্টার (এমএমসি) নামের একটি গণমাধ্যম সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানে টুকটাক লেখালেখির কাজ শুরু করি। সেখানে একটা পাবলিকেশন বের হবে, তাই কিছু সাক্ষাৎকার লাগবে।এমএমসির প্রধান নির্বাহী কামরুল হাসান মঞ্জু ভাই আমাকে বললেন সবগুলো সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য। তিনি আমাকে সাখাওয়াত স্যারের কাছে যেতে বললেন। এদিকে আমি ভয়ে অস্থির। একেবারেই নবীন আমি। কেবল আমি সাংবাদিকতার ফাইভ ডবলিউজ ও ওয়ান এইচ (5W, 1H) এর সাথে পরিচিত হচ্ছি। ...ভয় কেটে গেল। তারপর সাক্ষাৎকার নিয়ে ফিরলাম। পরবর্তী জীবনে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এই ফর্মুলা আমার কাজে লেগেছে। কোনো সাক্ষাৎকার নিতে গেলে কী করে সাক্ষাৎকার প্রদানকারীদের সহজ করে নিতে হয়, আস্থার জায়গায় নিতে হয়, সেই শিক্ষা আমি সেদিন পেয়েছিলাম ক্লাসরুমের বাইরে। একজন প্রথিতযশা অধ্যাপককে ইন্টারভিউ করার সাহস আমার হওয়ার কথা নয়। তাও আবার গণমাধ্যমের পলিসি লেভেল নিয়ে। মুক্ত সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্র নিয়ে। দৌড়ে গেলাম পাবলিক লাইব্রেরিতে। প্রশ্ন তৈরি করতে হবে। শেষে একগুচ্ছ প্রশ্ন তৈরি করে গেলাম স্যারের বাসায়। ভয়ে ভয়ে গেলাম।স্যার একটা সাদা পায়জামা ও ফতুয়া পরে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কী আশ্চর্য! যেখানে আমি ভয়ে অস্থির—কী থেকে কী বলে ফেলি! তিনি মুহূর্তেই আমাকে সহজ করে দিলেন। বললেন, তোমার হাতে সময় আছে? তাহলে চা খেতে খেতে গল্প করা যাক। আমি বললাম, সময় আছে। স্যার খুশি হলেন, বললেন, শেষে সাক্ষাৎকার দেওয়া যাবে। আমার বাবা, মার খবর নিলেন। কোথায় থাকি, বাড়ি কোথায়, কেন সাংবাদিকতা পড়তে আসলাম ইত্যাদি। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে সাংবাদিকতা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলো, সেসব নিয়ে গল্প করলেন। নিজের অজান্তেই কখন যেন সহজ হয়ে গেলাম। মনে হলো, একজন অতি আপনজনের সাথে বহুদিন পর দেখা হয়েছে। ভয় কেটে গেল। তারপর সাক্ষাৎকার নিয়ে ফিরলাম। পরবর্তী জীবনে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এই ফর্মুলা আমার কাজে লেগেছে। কোনো সাক্ষাৎকার নিতে গেলে কী করে সাক্ষাৎকার প্রদানকারীদের সহজ করে নিতে হয়, আস্থার জায়গায় নিতে হয়, সেই শিক্ষা আমি সেদিন পেয়েছিলাম ক্লাসরুমের বাইরে। সেই থেকে বুঝতে পেরেছি একজন সোর্স কেবল একজন তাৎক্ষণিক সোর্স নয়, বরং এটা একটা সম্পর্ক, আস্থা ও বিশ্বাসের। বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় আমার শিক্ষক অধ্যাপক আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী স্যারের অনুপ্রেরণায় নিয়মিত একটা দেয়াল পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত নেই। আমরা কয়েকজন মিলে শুরু করি। হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকা বের করলাম। দেয়ালে টানালাম সেটা। একদিন সকালে দেখি সাখাওয়াত স্যার করিডোরে একা দাঁড়িয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে সেটা পড়ছেন। আমি পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি খুব প্রশংসা করলেন। বললেন, এটা ছাপা ফরম্যাটে বের করার চেষ্টা করো। খুব ভালো হবে। আমার মাথায় যথারীতি ভাবনাটা গেঁথে গেল। তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারপার্সন অধ্যাপক সিতারা পারভীন ম্যাডামকে বললাম যে একটা পত্রিকা বের করতে চাই। সাখাওয়াত স্যারের কথা বললাম। ম্যাডাম বললেন, কী করতে চাও সেটার একটা লিখিত প্রস্তাবনা দাও। তারপর গেলাম আহাদুজ্জামান স্যারের কাছে। তিনি তখন আমার টিউটোরিয়াল শিক্ষক। স্যার উৎসাহ দিলেন। লেখা সংগ্রহের কাজ শুরু হলো। আমি তখন সেগুনবাগিচায় অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নিয়ে একটা লেখা তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিলাম। পরবর্তীতে এডিটরিয়াল বোর্ড আমার লেখাটাকে কভার স্টোরি বা প্রধান লেখা হিসেবে ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিলো। পত্রিকা বের হলো। প্রথম সংখ্যার প্রথম প্রধান লেখাটা আমার। আমি খুশি অনেক। সাখাওয়াত স্যার আমাকে ডাকলেন। অনেক খুশি হয়েছেন স্যার। অনেক উৎসাহ দিলেন। শিক্ষক তিনিই, যিনি সাধারণত ক্লাসে পড়ান। অনেকেই শিক্ষক হতে পারেন, কিন্তু সবাই গুরু নন। সাখাওয়াত স্যার আমাদের অনেকের কাছেই শিক্ষাগুরু। বিভাগের বাইরে, কোনো টিভি স্টেশনে বা সেমিনারে, যতবারই দেখা হয়েছে, তিনি আদর করে কাছে ডাকতেন, পরম মমতায় খোঁজ খবর নিতেন। একজন ইতিহাস সচেতন, সংস্কৃতিমনা এবং যোগাযোগ ভাবনায় ডুবে থাকা মানুষ ছিলেন স্যার। সাংবাদিকতাকে তিনি অনেক দায়িত্বশীল পেশা হিসেবে তুলে ধরতেন। কবিতা ভালবাসতেন। বিভাগে একবার জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়তে সাহস করলাম। তিনি ছিলেন বিচারক। ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থ থেকে ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতাটি পড়লাম। তিনি পরে ডেকে আমাকে বললেন, জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যে মেলানকলি (Melancholy) আছে সেটা ধরতে কত গভীরে প্রবেশ করতে হয়, সে বিষয়ে কথা বললেন। আমি মুগ্ধ হয়ে স্যারের কথা শুনলাম। কত সহজ করে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন! তারপর থেকে জীবনানন্দ দাশ আমার কাছে অন্যরকম অর্থ তৈরি করলো। তিনি বললেন, তার কবিতায় প্রচুর রূপকল্প আছে। চোখ বন্ধ করলে তা অনুভব করা যায়। হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয় তা। সাখাওয়াত স্যারের সেই কথাগুলো এখনো আমার কানে বাজছে। সাখাওয়াত স্যার নিজে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছেন, শিক্ষকতা করেছেন, দেশ-বিদেশের জার্নালে প্রবন্ধ লিখেছেন, পত্রিকায় কলাম লিখেছেন। অভিজ্ঞতায় ভরপুর একজন মানুষ। বিনয়ী, আবার বাবার মতো অভিভাবকসুলভ ছিলেন। সাখাওয়াত স্যার নিজে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছেন, শিক্ষকতা করেছেন, দেশ-বিদেশের জার্নালে প্রবন্ধ লিখেছেন, পত্রিকায় কলাম লিখেছেন। অভিজ্ঞতায় ভরপুর একজন মানুষ। বিনয়ী, আবার বাবার মতো অভিভাবকসুলভ ছিলেন। মজাও করতেন। একবার বেসরকারি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত একটা তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্যারের সাথে আমিও অতিথি হিসেবে মঞ্চে ছিলাম। পাশাপাশি বসলাম। স্যারকে বললাম, খুব ভালো লাগছে স্যার আপনাকে পেয়ে। আপনার বয়স বাড়েনি স্যার। হাসলেন তিনি। বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ, আগে ছিলাম খোকা, আর এখন হয়েছি বুড়ো খোকা! বলেই হাসলেন। স্বভাবসুলভ খোঁজ খবর নিলেন আমার, আমার পরিবারের। জানতে চাইলেন আমার প্রতিষ্ঠান এপি কেমন চলছে ইত্যাদি। খুব খুশি হলেন তিনি। অন্য অতিথিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন এই বলে যে, ও আমার ছাত্র। বিদায়ের সময় মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করলেন, নিজের জন্য দোয়া চাইলেন। প্রিয় সাখাওয়াত স্যার আজ আর নেই। সাংবাদিকতা শিক্ষার একজন পথিকৃৎকে হারালাম আমরা। একজন অভিভাবককে হারালাম আমরা। স্যারের সাথে টুকরো টুকরো স্মৃতি বয়ে চলব সারা জীবন। স্যারের জন্য প্রার্থনা। জুলহাস আলম : ব্যুরো প্রধান, এসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)

নিজস্ব প্রতিবেদক মার্চ ১৮, ২০২৬ 0
অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান।
অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান এক জীবনের অফুরান প্রেরণার বাতিঘর

ড. মো. অলিউর রহমান:  তিনি নি নেই-এই সত্যটি আজও মেনে নিতে পারছিনা। তাই দুদিন ধরে মনটা খুব ভারী হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, আমার খুব চেনা এক পৃথিবী হঠাৎ নিঃশব্দে হারিয়ে গেছে। তার চলে যাওয়া মানেই আমার একান্ত চেনাজগৎ থেকে আলো নিভে যাওয়া। যেন পরিচিত অক্ষরগুলো হঠাৎ ঝাপসা হয়ে যাওয়া। বলছি, আমার-আমাদের শিক্ষাগুরু অধ্যাপক সাখাওয়াত স্যারের কথা, যিনি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। সম্প্রতি স্ট্রোক করার পর কয়েক দিনের চিকিৎসা শেষে রবিবার রাতে রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে আমার শিক্ষক, পথপ্রদর্শক ও পিতৃসম অভিভাবক 'শিক্ষাগুরু সাখাওয়াত আলী খান স্যার'। আমার একাডেমিক জীবনের প্রতিটি বাঁকেই তার স্নেহময় নির্দেশনা পেয়েছি। প্রায় ৯ বছর ধরে নানা চড়াই-উতরাই অভিজ্ঞতায় তার তত্ত্বাবধানে পিএইচডি গবেষণার সময় আমি শুধু গবেষণার কর্মপদ্ধতিই শিখিনি, অধিকন্তু শিখেছি সততা, নৈতিকতা আর মানবিকতার এক নির্মল পাঠ। এমফিল অধ্যয়নকালেও তার স্নেহময় দিকনির্দেশনা আমাকে অধ্যয়ন-গবেষণার মর্মসন্ধানে অনুপ্রাণিত করেছিল। স্যারের বাসায় গিয়ে দীর্ঘ আলাপ, তার স্নেহময় পরামর্শ-সবই আজ স্মৃতির ভান্ডারে সমুজ্জ্বল। করোনাকালে খালাম্মা মালেকা খান ও স্যারের ছেলে নওশের আলী খানের কড়া অনুশাসন জারি থাকায় স্যারের সঙ্গে দেখা হতো না ঠিকই; কিন্তু স্যারের সঙ্গে মানবিক জীবনের ফোনালাপ ছিল নিয়মিত। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শিক্ষার ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে সাখাওয়াত স্যারের নাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় স্নাতক (সম্মান) কোর্সের প্রবর্তন তারই হাত ধরে। তিনি বিভাগের চেয়ারম্যান থাকাকালে সাংবাদিকতা শিক্ষার একাডেমিক জগতের যে সম্প্রসারণ ঘটে, তা সময়ান্তরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক ধরে এ দেশে সাংবাদিকতা শিক্ষায় তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদ সম্পাদনা ও ফিচার লিখন কোর্সে আমি আজও তার বিকল্প খুঁজে পাইনি-সম্পাদনার শিল্প, কৌশল ও দর্শনের গভীরতা তিনি যেভাবে বোধগম্য করে তুলতেন, তা ছিল সত্যিই অতুলনীয়। সাংবাদিকতায় ফিচার লেখাকে তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতার নিরিখে মানবিক জীবনের গল্প বলার সংবাদ-শিল্পকলায় উন্নীত করতে আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। 'সাখাওয়াত স্যার' এক উষ্ণ মানবিক সম্পর্কের নাম। তিনি ছিলেন আমার কাছে পরশ-মানবব্যক্তিত্ব। দেশ, কাল, সমাজ ও রাজনীতিসচেতন মানুষ ছিলেন তিনি, কিন্তু জাতীয় রাজনীতি তথা সুবিধাবাদী পালাবদলের পঙ্কিল রাজনীতির সামান্য কলুষতাও কোনো দিন তার পরিচ্ছন্ন ও সমুজ্জ্বল ব্যক্তিত্বকে এতটুকু কলুষিত করতে পারেনি। পরিস্থিতির শিকার হয়ে কর্মস্থলের নানা টানাপড়েন ও চড়াই-উতরাইয়ে যখন হতাশ হয়ে পড়তাম, তখন তিনি সান্ত্বনা দিতেন। পিতৃতুল্য অনুশাসনের স্বরে বলতেন- 'আর একটু ধৈর্য ধরো, সামনেই তোমার ভালো দিন অপেক্ষা করছে। তুমি আমাকে না জানিয়ে চাকরি বা দায়িত্ব ছাড়ার আর কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না কিন্তু।' তার এই স্নেহময় বাক্যগুলো আজও আমাকে নিয়ত পথ দেখায়। তার হাস্যোজ্জ্বল, যুক্তিবাদী ও সহিষ্ণু ব্যক্তিত্ব, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধাভরে গ্রহণের গুণাবলি-এসব কাছ থেকে না দেখলে বা তার সান্নিধ্যে না এলে বোঝানো যাবে না। তিনি ছিলেন একাধারে অভিজাত পরিবারের সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় সংগঠক এবং প্রগতিশীল চেতনার ধারক ও বাহক। স্যারের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষকতার জীবন অবধি বিভিন্ন পরিমণ্ডলে তার যে অপরিমেয় সান্নিধ্য আমি পেয়েছি, তা জ্ঞানচর্চার সততা ও নৈতিকতার কঠিন পাঠ, যা আজীবন আমাকে প্রেরণা জুগিয়ে যাবে। গ্রিন ইউনিভার্সিটিতে সাংবাদিকতা বিভাগ চালুর সময় তিনি শুরু থেকেই পাশে ছিলেন। ২০১৮ সালের ২২ নভেম্বর বিভাগের উদ্বোধন করেছিলেন তিনি নিজ হাতে। পাঠক্রম পরিকল্পনা থেকে ক্লাস পরিচালনা অবধি-সব ক্ষেত্রেই তার মূল্যবান পরামর্শ ছিল আমার অনন্য পাথেয়। জাতীয় জীবনে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রশ্নে তিনি আমাকে প্রায়ই খোঁজ নিতে বলতেন। কে জানত, তার সেই অনুসন্ধিৎসু যোগাযোগ স্মৃতি একদিন হয়ে উঠবে এমন অফুরান প্রেরণার বাতিঘর। তিনি চলে গেছেন-এ কথা মনে হয় ভুল। কারণ, স্যার আসলে চলে যাননি। তিনি ফিরে এসেছেন আমাদের মূল্যবোধ জাগ্রত করতে-আমাদের চেতনার বর্ধিত পরিসরে। তার পরশ, তার উপস্থিতি আমরা চিরকাল টের পাব। সাংবাদিকতা শিক্ষার এই মহিরুহ, বহু শিক্ষকের শিক্ষক, আমার প্রিয় শিক্ষাগুরু অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। স্যার, আপনার কাছে আমরা চিরঋণী। লেখক: ড. মো. অলিউর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারপার্সন, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম যোগাযোগ বিভাগ গ্রিন ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ। Ph.D. on RTI [1st Ph.D. Degree on the Right to Information Act in Bangladesh]; Title of Thesis: “Journalists’ Access to Information: Pre and Post-Situation Analysis of the Right to Information Act” Fellow of IIJ (Berlin) Germany,M. Phil. in Mass Communication, B.A (Hons.) & M. A in Mass Communication and Journalism।   এই নিবন্ধটি অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্মরণে তাঁর ছাত্র ড. মো. অলিউর রহমানের একটি আবেগঘন শ্রদ্ধাঞ্জলি। নিবন্ধটির মূল বিষয়বস্তু নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:   এক জীবনের অফুরান প্রেরণার বাতিঘর বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা: লেখক তাঁর প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি তাঁকে একজন শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং 'পিতৃসম অভিভাবক' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতায় অবদান: অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার প্রসারে অসামান্য অবদান রেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগ চালু করার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে তিনি এই পেশায় অসংখ্য শিক্ষার্থী তৈরি করেছেন। ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ: তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল, যুক্তিবাদী এবং সহনশীল একজন মানুষ। লেখক উল্লেখ করেছেন যে, কঠিন সময়ে স্যার তাঁকে সাহস জোগাতেন এবং সততা ও নৈতিকতার সাথে পথ চলার শিক্ষা দিতেন। তাঁর সান্নিধ্য লেখকদের গবেষণায় এবং পেশাগত জীবনে গভীর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। শেষ জীবন: সম্প্রতি স্ট্রোক করার পর রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও শিক্ষা অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে।     ১. শোকের সূচনা নিবন্ধের শুরুতেই লেখক তাঁর প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, স্যারের চলে যাওয়া মানে তাঁর পরিচিত জগতের আলো নিভে যাওয়া। সম্প্রতি স্ট্রোক করার পর রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।   ২. শিক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে স্যার লেখক দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে স্যারের সান্নিধ্যে ছিলেন। তিনি তাঁকে শুধু শিক্ষক নয়, বরং একজন 'পিতৃসম অভিভাবক' ও পথপ্রদর্শক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ড. অলিউর রহমান তাঁর অধীনে পিএইচডি গবেষণা করেছিলেন এবং দীর্ঘ ৯ বছর স্যারের তত্ত্বাবধানে কাজ করার সময় তাঁর সততা, নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলী কাছ থেকে দেখেছেন।   ৩. সাংবাদিকতা শিক্ষায় অবদান বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার বিকাশে সাখাওয়াত আলী খানের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগ (বর্তমানে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ) চালুর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি সাংবাদিকতা শিক্ষার প্রসারে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। রিপোর্টিং, ফিচার লিখন এবং সংবাদ সম্পাদনার মতো জটিল বিষয়গুলোকে তিনি অত্যন্ত সহজ ও দর্শনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরতেন।   ৪. ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য লেখক স্যারের কিছু অনন্য গুণের কথা উল্লেখ করেছেন: তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও যুক্তিবাদী। কর্মক্ষেত্রের নানা চড়াই-উতরাইয়ে লেখক যখন হতাশ হতেন, তখন স্যার তাঁকে সাহস জুগিয়ে বলতেন, "আর একটু ধৈর্য ধরো, সামনে তোমার ভালো দিন অপেক্ষা করছে।" তিনি ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা জানাতেন এবং সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। পরিবার ও সমাজের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ ছিল অনুকরণীয়।   ৫. শেষ বিদায় ও কৃতজ্ঞতা নিবন্ধের শেষে লেখক অত্যন্ত আবেগপূর্ণভাবে বলেছেন যে, যদিও স্যার শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ ও শিক্ষা চিরকাল বেঁচে থাকবে। তিনি গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর সাংবাদিকতা বিভাগে স্যারের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। সবশেষে তিনি স্যারের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।   নিবন্ধটি শেষ হয়েছে স্যারের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা এবং তাঁর প্রতি চিরস্থায়ী কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে।

নিজস্ব প্রতিবেদক মার্চ ১৪, ২০২৬ 0
অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান
সাংবাদিকতার শিক্ষাগুরু অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান

ড. মো. অলিউর রহমান:  বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ শিক্ষক অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত আলী খান ৮৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন ৮ মার্চ। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে সাংবাদিকতার একাডেমিক শিক্ষাঙ্গনে আলোকবর্তিকারূপে অবদান রেখে গেছেন। তিন যুগের বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন আমার শিক্ষাগুরু। অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান শুধু আমারই শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বহু সফল শিক্ষকের শিক্ষক। তাঁর সান্নিধ্যেই আমার একাডেমিক ও গবেষণাজীবনের ভিত্তি নির্মিত হয়েছে। প্রায় ৯ বছর তাঁর তত্ত্বাবধানে পিএইচডি গবেষণা করেছি; এমফিল অধ্যয়নকালেও তাঁর নির্দেশনায় অধ্যয়ন-গবেষণার গভীরে নিবিষ্ট হতে পেরেছি। একজন শিক্ষক কীভাবে ছাত্রকে চিন্তার স্বাধীনতা দেন, গবেষণায় ধৈর্য শেখান এবং নৈতিকতার ভিত গড়ে দেন—স্যারের কাছেই তার অফুরান বাস্তব শিক্ষা পেয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় স্নাতক (অনার্স) কোর্স প্রবর্তনের মাধ্যমে স্যার সাখাওয়াত আলী খান বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শিক্ষায় নতুন এক যুগের সূচনা করেছিলেন। এ দেশের সাংবাদিকতা শিক্ষা, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তিনি প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক সময় ধরে অবদান রেখে গেছেন, যা আজ গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা অধ্যয়নে একটি ঐতিহ্যের ধারক হয়ে উঠেছে। তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম সাংবাদিকতা শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষায় দীক্ষিত করেছেন। বিশেষ করে সম্পাদনা কোর্সে তাঁর দক্ষতা ছিল অনন্য—সম্পাদনার আর্ট, ক্রাফট ও দর্শনের যে গভীরতা তিনি তুলে ধরতেন, তার বিকল্প দেখিনি এ দেশে। স্যারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গণ্ডি ছাড়িয়ে এক গভীর মানবিক গুরু-শিষ্যের বন্ধনে আবদ্ধ। নিয়মিত তাঁর বাসায় যেতাম। গবেষণা, সাংবাদিকতা শিক্ষা, গণমাধ্যমের নৈতিকতা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের নানা প্রশ্ন—সবকিছু নিয়েই তাঁর সঙ্গে কথা হতো। করোনা মহামারির সময় সরাসরি দেখা কম হলেও ফোনালাপ ছিল নিয়মিত। তাঁর সহধর্মিণী মালেকা খান ও তাঁর সুযোগ্য সন্তান নওশের আলী খান স্যারকে যে নিবিড় যত্নে দেখাশোনা করতেন, তা সব সময় আমাকে গভীরভাবে আমার অন্তরতল স্পর্শ করত। গ্রিন ইউনিভার্সিটিতে ‘জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া কমিউনিকেশন’ বিভাগ চালুর সূচনা থেকেই তিনি আমাকে অকুণ্ঠ সহযোগিতা দিয়েছেন। ২০১৮ সালের ২২ নভেম্বর বিভাগের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও করেছিলেন তিনি। পাঠক্রম নির্মাণ, বিভাগীয় পরিকল্পনা, শিক্ষাদান—সব ক্ষেত্রেই তাঁর অমূল্য পরামর্শ ছিল। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, ইউল্যাব, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও গ্রিন ইউনিভার্সিটিসহ তিনি সাংবাদিকতা শিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন উদারমনস্ক, প্রগতিশীল ও গভীর মানবিকতার মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এই শিক্ষাগুরু ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করতেন, অন্যের কথা মন দিয়ে শুনতেন এবং যুক্তির আলোয় আলোচনাকে প্রাণবন্ত করতেন। কর্মজীবনের নানা সংকটে তিনি আমাকে ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছেন। বলতেন, ‘কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভেবে নেবে, তাড়াহুড়া কোরো না।’ তাঁর সেই মমতা ও প্রজ্ঞা আজও আমার পথচলার অপার প্রেরণা। সাখাওয়াত আলী খান স্যার আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন—এই সত্য মেনে নেওয়া কঠিন। তবু মনে হয়, তিনি হারিয়ে যাননি, তিনি ফিরে ফিরে আসবেন আমাদের মাঝে। তাঁর শিক্ষা, চিন্তা, নৈতিকতা ও মানবিকতার আলো আমাদের প্রজন্মের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবে অনাগতকাল। আমার শিক্ষাগুরু, সাংবাদিকতা শিক্ষার এই মহিরুহ ও দিশারি শিক্ষককে জানাই গভীরতম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।   ড. মো. অলিউর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারপার্সন, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম যোগাযোগ বিভাগ গ্রিন ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ।

নিজস্ব প্রতিবেদক মার্চ ১৪, ২০২৬ 0
খালি হাতে ত্যাগীরা
নতুন মন্ত্রিসভা: কেন বাদ পড়লেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা? রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ৪৯ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা, বিশ্লেষণ এবং সমালোচনা। কারণ, এই মন্ত্রিসভায় দেখা গেছে এক বড় ধরনের প্রজন্মগত পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে দলের কঠিন সময়ে রাজপথে সক্রিয় থাকা এবং খালেদা জিয়ার শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা অনেক প্রবীণ নেতা মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদ এবং জোটের তরুণ নেতাদের ওপর আস্থা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু মন্ত্রিসভা গঠন নয়—এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। নতুন মন্ত্রিসভায় বড় পরিবর্তন তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রিসভায় মোট সদস্য সংখ্যা ৪৯। এর মধ্যে প্রায় ৪০ জনই নতুন মুখ। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই মন্ত্রিসভার বৈশিষ্ট্য হলো— তরুণ নেতৃত্বের প্রাধান্য জোটের কিছু নতুন মুখের অন্তর্ভুক্তি টেকনোক্র্যাট নিয়োগ প্রবীণদের আংশিক সাইডলাইন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মন্ত্রিসভা বিএনপির ঐতিহ্যগত নেতৃত্ব কাঠামোর তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। বাদ পড়া হেভিওয়েট নেতারা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্যের নাম মন্ত্রিসভায় না থাকা। তাদের মধ্যে রয়েছেন: ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ড. আব্দুল মঈন খান এই তিনজনই অতীতে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্যদের মধ্যে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার এবং সেলিমা রহমানও মন্ত্রিপরিষদে স্থান পাননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির দুঃসময়ে দলকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে এই নেতাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তারেক রহমান বিদেশে নির্বাসনে এবং খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকার সময় দলকে সক্রিয় রাখতে তাদের ভূমিকা দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে স্বীকৃত। উপদেষ্টা পদে ‘সমঝোতা’? তবে পুরোপুরি বাদ পড়েননি দলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা। মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম খান এবং রুহুল কবির রিজভী আহমেদকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা। একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, “দলের প্রবীণদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলে রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। উপদেষ্টা পদ দিয়ে সেই অসন্তোষ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।” মঈন খানের প্রতিক্রিয়া মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়ার বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন, “মন্ত্রিপরিষদে স্থান পাওয়ার বিষয়টি দেখছেন দলের চেয়ারম্যান। এটা নিয়ে আমার মন্তব্য না করা ভালো।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংযত প্রতিক্রিয়া দলীয় শৃঙ্খলার ইঙ্গিত দেয়। জোট রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রিসভায় বিএনপির বাইরের কিছু রাজনৈতিক দল থেকেও নেতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন: গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ এই অন্তর্ভুক্তিকে অনেকেই জোট রাজনীতির নতুন বার্তা হিসেবে দেখছেন। যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীদের ক্ষোভ তবে সব জোটসঙ্গী সন্তুষ্ট নন। যুগপৎ আন্দোলনের দীর্ঘদিনের অংশীদার কয়েকটি দলের নেতারা মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক এবং ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলুর নাম আলোচনায় থাকলেও তারা শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এ নিয়ে প্রকাশ্যেই সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “প্রথমত এটি পুরোটাই বিএনপির সরকার। যুগপৎ আন্দোলনের দুই-তিনজন থাকছেন। বিএনপি বাস্তবে যুগপৎ সঙ্গীদের বাদ দিয়েই হাঁটছে।” তিনি আরও বলেন, “কঠিন সময়ের সঙ্গীদের বাদ দিয়ে সরকার গঠন করা হয়েছে। এর রাজনৈতিক অভিঘাত পরে বোঝা যাবে।” সবচেয়ে বড় চমক: খলিলুর রহমান এই মন্ত্রিসভার সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে খলিলুর রহমানকে। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বিএনপির ভেতরে অনেক নেতাকর্মী তার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। বিশেষ করে দুটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক ছিল— বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর ইজারা রোহিঙ্গা করিডোর প্রস্তাব তবুও এমপি না হয়েও টেকনোক্র্যাট কোটায় তাকে গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দলের ভেতরে অনেকেই এই সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। যাদের কপাল খুলল না সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে আরও কয়েকজনের নাম মন্ত্রিসভায় আসতে পারে বলে আলোচনায় ছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন— মীর নাছির আলতাফ হোসেন চৌধুরী বরকত উল্লাহ বুলু লুৎফুজ্জামান বাবর আমান উল্লাহ আমান কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা কেউই মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। এছাড়া দলের দুঃসময়ের কান্ডারি হিসেবে পরিচিত যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেলের নামও আলোচনায় ছিল। তাকেও টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে বলে গুঞ্জন ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সম্ভাবনাও বাস্তবায়িত হয়নি। নেতৃত্বের নতুন কৌশল? বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তারেক রহমান তার নিজের রাজনৈতিক কৌশল অনুযায়ী মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তার এখতিয়ার।” তিনি আরও বলেন, “মর্নিং শোজ দ্য ডে—এখন দেখার বিষয় এই মন্ত্রিসভা কতটা কার্যকর হয়।” যারা অবস্থান ধরে রেখেছেন তবে সব প্রবীণ নেতা বাদ পড়েননি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন— মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সালাহউদ্দিন আহমদ ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন হাফিজ উদ্দিন খান এদের অন্তর্ভুক্তি দলীয় অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই মন্ত্রিসভা তিনটি বার্তা দেয়। প্রথমত, বিএনপি নেতৃত্বে প্রজন্মগত পরিবর্তন শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট ও জোট রাজনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যৎ নির্বাচনের আগে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করার একটি প্রচেষ্টা থাকতে পারে। তবে এর ঝুঁকিও রয়েছে। প্রবীণ নেতাদের একটি বড় অংশ যদি নিজেকে উপেক্ষিত মনে করেন, তাহলে দলের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সামনে কী হতে পারে? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক মাসেই বোঝা যাবে এই মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা। যদি সরকার সফলভাবে প্রশাসন পরিচালনা করতে পারে, তাহলে তারেক রহমানের এই ‘নতুন নেতৃত্বের পরীক্ষা’ সফল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু যদি দলীয় অসন্তোষ বাড়ে, তাহলে তা সরকারের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। একজন বিশ্লেষকের ভাষায়, “এই মন্ত্রিসভা শুধু সরকার গঠনের ঘটনা নয়, এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখারও ইঙ্গিত।”

নিজস্ব প্রতিবেদক মার্চ ১০, ২০২৬ 0
জ্বালানি সংকট
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা: বাংলাদেশে কি সত্যিই জ্বালানি সংকট?

বাংলাদেশে হঠাৎ করে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন, রেশনিং করে তেল সরবরাহ এবং অতিরিক্ত তেল মজুতের অভিযোগ—সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় গাড়িচালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ তেল না পেয়ে গণপরিবহনে অফিসে যাওয়া শুরু করেছেন। এই পরিস্থিতির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশে শিগগিরই জ্বালানি তেলের বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি কি সত্যিই এতটা সংকটপূর্ণ? সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই। তবে বিপিসির সর্বশেষ মজুত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—বিভিন্ন জ্বালানি তেলের সরবরাহ সক্ষমতা ১৩ দিন থেকে ৭১ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এতে প্রশ্ন উঠেছে—এই মজুত কতটা নিরাপদ? পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইন: আতঙ্ক না বাস্তবতা ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরে গত কয়েকদিন ধরে পেট্রোল পাম্পে অস্বাভাবিক ভিড় দেখা যাচ্ছে। অনেক পাম্পে তেল রেশনিং করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়েছে। পাম্প মালিকদের একটি অংশ বলছেন, গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত তেল কিনে সংরক্ষণ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একজন পাম্প ব্যবস্থাপক জানান, “সাধারণত একজন গ্রাহক যে পরিমাণ তেল নেন এখন তার চেয়ে বেশি নিচ্ছেন। অনেকেই ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করছেন।” এই প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্কজনিত কেনাকাটা বা panic buying শুরু হলে বাজারে সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও সংকট তৈরি হতে পারে। বিপিসির দাবি: সংকট নেই বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তাদের মতে, পরিস্থিতি মূলত গুজব ও আতঙ্কের কারণে জটিল হয়ে উঠছে। একজন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তা জানান, “আগামী মাস পর্যন্ত চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। নতুন কার্গো ইতিমধ্যেই দেশে আসছে।” জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, সোমবার সকালে জ্বালানিবাহী একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। একই দিনে রাতে আরও একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে। কতদিন চলবে জ্বালানি মজুত বিপিসির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের মজুত নিম্নরূপ: ডিজেল দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জ্বালানি হলো ডিজেল। বর্তমানে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৯২১ মেট্রিক টন এতে প্রায় ১৩ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি হওয়ায় এই মজুত তুলনামূলকভাবে কম। অকটেন অকটেনের মজুত রয়েছে প্রায় ২৬ হাজার ২৫১ মেট্রিক টন এতে প্রায় ২৫ দিনের সরবরাহ দেওয়া সম্ভব। পেট্রোল পেট্রোলের মজুত রয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৬০৯ মেট্রিক টন এতে প্রায় ১৭ দিনের চাহিদা পূরণ করা যাবে। ফার্নেস অয়েল বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের মজুত রয়েছে প্রায় ৬৭ হাজার ৫০৯ মেট্রিক টন এতে প্রায় ৪৫ দিন সরবরাহ চালানো সম্ভব। জেট ফুয়েল বিমান চলাচলের জন্য ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের মজুত রয়েছে ৬০ হাজার ৬৯৮ মেট্রিক টন এতে প্রায় ৪২ দিন সরবরাহ দেওয়া যাবে। কেরোসিন কেরোসিনের মজুত রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৭৩ মেট্রিক টন এতে প্রায় ৭১ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। মেরিন ফুয়েল মেরিন ফুয়েলের মজুত রয়েছে ৫ হাজার ৪ মেট্রিক টন এতে প্রায় ১৯ দিন সরবরাহ দেওয়া সম্ভব। আমদানি পরিস্থিতি কী জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মাসে মোট ১৪টি জ্বালানি কার্গো আসার কথা ছিল। এর মধ্যে বেশিরভাগ ইতিমধ্যেই দেশে পৌঁছেছে এবং কয়েকটি পথে রয়েছে। আগামী মাসে ১৫টি কার্গোর মধ্যে ১৩টি নিশ্চিত হয়েছে। বাকি দুটি কার্গো মে মাসে পাঠানো হবে বলে সরবরাহকারী দেশগুলো জানিয়েছে। এছাড়া বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকেও তেল আমদানি করা হতে পারে। হরমুজ প্রণালী সংকট কতটা প্রভাব ফেলতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন রুট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বিশ্ব তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তবে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চীনা জাহাজগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা না থাকায় বাংলাদেশের তেল পরিবহনে বড় ধরনের সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা কম। অতিরিক্ত আমদানির পরিকল্পনা জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, আগামী মাস পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি চূড়ান্ত হয়েছে। এর বড় অংশ ইতিমধ্যেই দেশে আসতে শুরু করেছে। এছাড়া আরও প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। এই তেল ভারত, ব্রুনাইসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আতঙ্কের অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি খাতে সংকটের চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অর্থনীতিবিদ বলেন, “যখন মানুষ মনে করে কোনো পণ্য সংকট হতে পারে, তখন তারা বেশি করে কিনতে শুরু করে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়।” এটিকে অর্থনীতিতে বলা হয় self-fulfilling crisis। অর্থাৎ সংকটের ভয়ই শেষ পর্যন্ত সংকট তৈরি করে। বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় পুরোটা বিদেশ থেকে আমদানি করে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়া বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা দ্রুত ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি— ১. কৌশলগত জ্বালানি মজুত বাড়ানো ২. বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ ৩. নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের বিস্তার ৪. সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্য করা সামনে কী হতে পারে বর্তমান তথ্য অনুযায়ী দেশে জ্বালানি সরবরাহে তাৎক্ষণিক সংকট নেই। তবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: নিয়মিত আমদানি বাজারে আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি হঠাৎ অবনতি না ঘটে এবং আমদানি পরিকল্পনা ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে দেশে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে দীর্ঘ লাইনের পেছনে থাকা আতঙ্ক যদি কমানো না যায়, তাহলে সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।   বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত বর্তমানে ১৩ থেকে ৭১ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ—যা পরিস্থিতি অনুযায়ী যথেষ্ট হলেও খুব বেশি নিরাপদ বলা যায় না। তাই বাস্তব সংকটের আগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্ক। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো—স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে তথ্যের অভাবই অনেক সময় বাস্তব সংকটের চেয়েও বড় সমস্যা তৈরি করে।

নিজস্ব প্রতিবেদক মার্চ ১০, ২০২৬ 0
বিএনপি
বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থীদের ভাগ্যে কী আছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রার্থী হওয়ার কারণে শতাধিক নেতাকে বহিষ্কার।বহিষ্কৃত কেউ কেউ জয়ী হয়ে এখন দলে ফিরতে চাচ্ছেন কেউ।কী আছে  তাদের ভাগ্যে।        ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বহিষ্কৃত শতাধিক নেতাকে নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচনের পর তাদের অনেকেই আবার দলের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়নি। দলীয় সূত্র বলছে, বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কোনো ফোরামে আলোচনা হয়নি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কমিটির মতামতের ভিত্তিতে। শতাধিক নেতা বহিষ্কার মনোনয়ন না পেয়ে অন্তত ১৯০ জন বিএনপি নেতা ১১৭টি আসনে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। পরে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা মেনে অনেকেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেও শেষ পর্যন্ত ৭৮টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থনের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সহস্রাধিক নেতাকর্মীকেও বহিষ্কার করা হয়। সাত বিদ্রোহীর জয় নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, অন্তত সাতজন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি মনোনীত বা জোট সমর্থিত প্রার্থীদের হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এদিকে বেশ কয়েকটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের অংশগ্রহণের কারণে ধানের শীষ প্রতীকের ভোট বিভক্ত হয়ে যায়, যার ফলে দলীয় প্রার্থীরা প্রত্যাশিত ফল পায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, অন্তত ২৮টি আসনের ফলাফলে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরাসরি প্রভাব ছিল। ভোট বিভক্তির উদাহরণ ঢাকা–১২ এ আসনে বিএনপি সমর্থিত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক পেয়েছেন ৩০,৯৬৩ ভোট। অন্যদিকে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল আলম (নীরব) পান ২৯,৮৬৯ ভোট। দুই প্রার্থীর মোট ভোট দাঁড়ায় ৬০,৮৩২। কিন্তু ভোট বিভক্তির সুযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন ৫৩,৭৭৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। সিলেট–৫ এখানে বিএনপি সমর্থিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক পান ৬৯,৭৭৪ ভোট। বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশিদ পান ৫৬,৩৬৯ ভোট। ভোট বিভক্তির সুযোগে খেলাফত মজলিস প্রার্থী আবুল হাসান ৭৯,৩৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। নারায়ণগঞ্জ–৪ এ আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমী পান ৮০,৬১৯ ভোট। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো. শাহ আলম পান ৩৯,৫৮৯ ভোট এবং মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন পান ৪,৭৭৯ ভোট। ফলে ভোট বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টি প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন ১,০৬,১৭১ ভোট পেয়ে জয়ী হন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম–১৬, পাবনা–৪, বাগেরহাট–১, ঝিনাইদহ–৪, নড়াইল–২, যশোর–৫, মাদারীপুর–১, ঢাকা–১৪, সাতক্ষীরা–৩ ও ময়মনসিংহ–৬সহ আরও কয়েকটি আসনে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। দলে ফেরার চেষ্টা দলীয় সূত্র বলছে, বহিষ্কৃত অনেক নেতা ইতোমধ্যে নিজেদের ভুল স্বীকার করে দলীয় কর্মকাণ্ডে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আবার অনেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং দলের হাইকমান্ডের ইতিবাচক সংকেতের অপেক্ষায় আছেন। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বহিষ্কারাদেশ নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি দলের চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় কমিটির আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে।” কঠোর অবস্থানে হাইকমান্ড বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মতে, যারা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করেছেন তাদের ফেরার পথ সহজ হবে না। বিশেষ করে নির্বাচনে পরাজিত বিদ্রোহীদের ক্ষেত্রে দলের অবস্থান তুলনামূলক কঠোর। দলীয় সূত্র বলছে, দলের শীর্ষ পর্যায়ের বার্তা পরিষ্কার— “দল আগে, ব্যক্তি পরে।” তৃণমূলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া বহিষ্কৃত নেতাদের দলে ফেরানো নিয়ে তৃণমূলেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কিছু নেতাকর্মী মনে করেন, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করছেন, জনপ্রিয় ও সংগঠক নেতাদের বাইরে রাখলে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতে নির্বাচন ঘিরে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কার এবং পরে আবার দলে ফেরানোর নজির নতুন নয়। তাদের মতে, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী অনেক নেতাকে দীর্ঘদিন বাইরে রাখলে সাংগঠনিক ক্ষতি হতে পারে। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিএনপিও হয়তো বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক মার্চ ১৩, ২০২৬ 0
ফারুক ওয়াসিফ মহাপরিচালক পিআইবি
ফারুক ওয়াসিফ, পিআইবি ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি: নিরপেক্ষ তদন্তে সত্য উদঘাটন জরুরি

মামুনুর রশীদ নোমানী : দেশের সাংবাদিকতা উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ১৯৭৬ সালের ১৮ই আগস্ট  শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এর উদ্যোগে  প্রতিষ্ঠিত Press Institute of Bangladesh (পিআইবি) । দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিক প্রশিক্ষণ ও গবেষণার কাজ করে আসছে। বর্তমান  পিআইবি মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ–কে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটিতে বাজেট ব্যবস্থাপনা, ব্যয়ের নথি ও স্বচ্ছতার ব্যাপারে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে সাংবাদিক সমাজ, বিভিন্ন গণমাধ্যম সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলেছেন; তাদের দাবী—এই বিষয়গুলো স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।এতে করে পিআইবি–র ভাবমূর্তি, গণমাধ্যম উন্নয়নে এর ভূমিকা এবং সাংবাদিক সমাজের আস্থা, এই সব কিছুই ঝুঁকিতে পড়ে।   অভিযোগ:  ভুয়া সেমিনার ও ভাউচার প্রদর্শন সম্প্রতি একটি অনলাইন ও জাতীয় পত্রিকার রিপোর্ট উল্লেখ করেছে যে, পিআইবি থেকে প্রায় ২.৪ মিলিয়ন টাকার (২৩,৯৭,৫০০ টাকা) সেমিনার অ্যালাউন্স–এর নামে খরচ দেখানো হয়েছে, যেখানে ফাইনাল উপস্থিতি বা বাস্তব ব্যবস্থা ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে এবং অনেক নাম করা সাংবাদিকরা বলছেন যে তারা সেখানে উপস্থিতই ছিলেন না বা স্বাক্ষরও তাদের নয়।  রিপোর্ট অনুসারে: ভুয়া সেমিনার বা কর্মসূচির খরচ হিসেবে চারটি ভাউচার দেখানো হয়, যার প্রতিটির খরচের পরিমাণ মিলিয়ে মোট টাকা একই রকম খাতের হিসাবে ধরা হয়। •    অধিকাংশ নাম থাকা সাংবাদিকদের অভিযোগ—তাদের নাম বা স্বাক্ষর এমন কোনো ইভেন্টে তারা আসলে উপস্থিত ছিলেন না বা স্বাক্ষর করেছেনই না। •    এমনকি কিছু নামের ব্যক্তি বর্তমানে দেশেই নেই বা অন্য স্থানে ছিলেন বলে দাবি করেন। •    উপস্থিতি ও ব্যয়ের প্রত্যয়নযোগ্য ছবি, ভিডিও বা ফটো রিপোর্টে দেখা যায়নি। •    পিআইবি–র দুটি বড় হলেও সেগুলিতে দুই শতাধিক মানুষ একসঙ্গে বসে প্রশিক্ষণ করার মতো জায়গা নেই বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।  চারটি অনুষ্ঠানে প্রায় ২৪ লাখ টাকা ব্যয়: পিআইবির নথি অনুযায়ী ব্যয়ের হিসাব ছিল— 1️⃣ সংগীতসন্ধ্যা তারিখ: ১৮–১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ স্থান: পিআইবি অডিটরিয়াম ব্যয়: ৫,৭৩,০০০ টাকা 2️⃣ জুলাই অভ্যুত্থানের চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, গ্রাফিতি ও ভিডিও প্রদর্শনী তারিখ: ১৮–১৯ ফেব্রুয়ারি ব্যয়: ৪,৬৭,৫০০ টাকা 3️⃣ সেমিনার: ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান : সংহতি ও প্রত্যাশা’ তারিখ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ব্যয়: ৬,৯১,৫০০ টাকা 4️⃣ সেমিনার: ‘গণ-অভ্যুত্থানের দিশা ও দর্শন’ তারিখ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ব্যয়: ৬,৬৫,৫০০ টাকা সব মিলিয়ে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা। এই তথ্যগুলোর ভিত্তিতে সাংবাদিক সমাজের একটি অংশ বলছে, “এভাবে ব্যয়ের হিসাব দেখানো হলে সরকারী অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত থাকে না।”   সাংবাদিকদের স্বাক্ষর ও নাম ব্যবহার: অভিযোগ ও প্রেক্ষাপট রিপোর্ট অনুসারে সেখানে অন্তর্ভুক্ত নামগুলো •    অনেকেই বলেছেন তারা কোনো পিআইবি সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন না। •    তাদের স্বাক্ষর জাল বা অচেনা স্বাক্ষর হতে পারে। •    পিআইবি–র আর্কাইভ বা ভিডিও ফুটেজে সেসব ইভেন্টের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নি—যেমন নামগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছিল। •    একাংশ বলছেন, “এই টাকাটা নাকি ব্যয় দেখানো হয়েছে কিন্তু *আইনগতভাবে তা ব্যয় হয়নি।”  সাংবাদিক নেতারা এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বলেন— “যদি সরকারি ব্যয়ের হিসাব ও স্বাক্ষরের তথ্য খতিয়ে না দেখানো হয়, নিম্নমানের নথির উপর ভিত্তি করে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে—তবে তা সন্দেহজনক।” প্রতিষ্ঠানটির ক্ষমতা ও স্থাপত্যগত বাস্তবতা পিআইবির নিজের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম, অডিটরিয়াম ও সেমিনার রুমগুলোর ধারণ ক্ষমতা দেখানো হয়; যেখানে একটি ২৩৮ আসনের অডিটরিয়াম, ৬০ আসনের সেমিনার রুম ও আরও ছোট সেন্টার আছে।  যদিও এই ধারণক্ষমতা স্বীকারযোগ্য, দুইশো মানুষের একটি একদিনের প্রশিক্ষণ বা সেমিনার আয়োজনের জন্য বাস্তবসম্মত নয়—অনেক পেশাজীবী মনে করছেন দেখা উচিত যে সেই বিনিয়োগ কি বাস্তবে হয়েছে কি না।   মহাপরিচালকের বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া:  অভিযোগ উঠে আসার পর পিআইবি মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ অভিযোগগুলো সম্পর্কে বলেছেন, “প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কিছু বিদ্রোহী গ্রুপ  ভুয়া বিল তৈরি করেছে এবং আমি তা অনুমোদন করি নি; কোন টাকা ওই বিষয়ে ব্যয় হয়নি।” তারা বলেন তিনি প্রতিদিন অনেক ফাইল সই করেন, এবং পরে খানি ভুয়া/ভুল ফাইল সনাক্ত করেন। বিস্তারিত তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হবে বলে মনে করেন তিনি।  এই ধরনের প্রতিক্রিয়া সাংবাদিক সমাজের সব পক্ষেই সমালোচিত হচ্ছে, কারণ সত্য উদঘাটন ছাড়া সবকিছু অনুমান বা প্রত্যাশার উপরে স্থাপন করা কঠিন। সাংবাদিক সমাজ ও সংগঠনের দাবি :  সাংবাদিকদের একটি অংশ মনে করছে, পিআইবি–র মতো একটি প্রতিষ্ঠান যদি ব্যয়ের অডিট, উপস্থিতির ডকুমেন্টস, ভিডিও বা ফটোগ্রাফিক প্রমাণাদি প্রকাশ করে না—তবে জন আস্থা তৈরি হয় না। তাদের দাবি: •    দূরদর্শী তদন্ত কমিটি গঠন হতে হবে। •    অডিট রিপোর্ট ও পেমেন্ট ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা উচিত। •    অনিয়ম ও অসাধু আচরণের ক্ষেত্রে যথাযথ বিধান অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বিশ্লেষণ: স্বচ্ছতার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকেও নাগরিকদের কাছে দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক হতে হয়। পিআইবি–র মতো সাংবাদিকতা উন্নয়নের মুখ্য সংস্থায় অভিযোগ উঠলে— ১. দেখার বিষয়: * ব্যয়ের প্রমাণ—ভাউচার, ফটো, ভিডিও, উপস্থিতি যুক্ত নথি; ২. আদর্শ হয়: * অডিট রিপোর্ট খুলে দেওয়া যায় কি না; ৩. কি ঘটেছে: * অনেক নামের ব্যক্তির তো দাবি—সে অনুষ্ঠানেই উপস্থিত ছিলেন না। * কিছু শিক্ষকের নাম ভুল বা বাস্তবে সেই ইভেন্টে কেউ ছিলেনই না।  এগুলো দুর্নীতি কিনা—তা যাচাইয়ের জন্য দাবি ও তথ্যের যথাযথ যাচাই জরুরি। পিআইবি–র উদ্দেশ্য দেশের সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা বৃদ্ধি—অবশেষে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করা। তবে মহাপরিচালক পদে থাকা অবস্থায় যদি ভুল তথ্য, নাগরিকের স্বাক্ষর, ব্যয়ের অভিলেখ বা অন্যান্য পক্ষের দাবিকে উপেক্ষা করা হয়—তবে সেটি উদাসীনতা, ব্যয়ের অপব্যবহার, কিংবা স্বচ্ছতার অভাব—এমন প্রশ্ন তোলে। সাংবাদিক সমাজের একাংশ মনে করেন—এই দাবির যথাযথ তদন্ত হওয়া উচিত এবং সেই অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কোনো অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তা সহজভাবে ফেলে দেওয়া যায় না। পিআইবি–র শুদ্ধ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাজের স্বার্থে স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া আশা করা উচিত নয়। পিআইবিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক, তদন্তের দাবি সাংবাদিক মহলের •  প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ •  নিয়োগ, প্রকল্প বা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন •  কিছু কর্মকর্তার মধ্যে অসন্তোষের ব্যাপারে সাংবাদিক সমাজের দাবি: কিছু সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নজর দেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়, অর্থাৎ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। পিআইবি দেশের সাংবাদিকতা উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তাই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে ওঠা অভিযোগ বা প্রশ্নগুলো স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন—এমন মত প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই।   ২০২৪ সালে পিআইবির মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান ফারুক ওয়াসিফ।তিনি যোগদানের পরেই জাতীয়তাবাদ আদর্শের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে  বাধ্যতামুলক অবসর, অনত্র বদলীসহ বিভিন ভাে হয়রানী ষুরু করেন।   ফারুক  ওয়াসিফের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ:  ১. সেমিনার ও প্রশিক্ষণ ব্যয়ের অনিয়মের অভিযোগ কিছু সূত্র দাবি করেছে যে, কয়েকটি সেমিনার ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুয়া বিল ও স্বাক্ষরের মাধ্যমে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ ওঠে, যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।  ২. প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ পিআইবির কয়েকজন কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা নেই এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হচ্ছে—যা নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ৩. সাংবাদিক মহলের উদ্বেগ সাংবাদিকদের কয়েকটি সংগঠন ও পেশাজীবী মহলের একটি অংশ দাবি করেছে—পিআইবির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। ৪.একই দিনে ৪ কর্মশালা,কোটি টাকার ভুয়া বিল ৫.ভুয়া বিল ভাউচার বানিয়ে চার লক্ষ সাতষট্টি হাজার পাঁচশ টাকা আত্মসাত ৬.ণ আন্দোলনের দিশা ও দর্শণ বিষয়ক সেমিনারের নামে ছয় লক্ষ পঁয়ষট্টি হাজার পাঁচশ টাকা আত্মসাত: ৭.জুলাই গণ অভ্যুত্থান: সংহতি ও প্রত্যাশা বিষয়ক সেমিনারের নামে ৬ লাখ ৯১ হাজার পাচঁশত টাকা আত্মসাত: ৮.amera & Crowd: Covering Revolution নামে আলোচনা ও মতবিনিময় সভা দেখিয়ে ৫৫,০২৫ টাকা আত্মসাৎ: ৯.টেন্ডার ছাড়াই সংস্কার কাজ  ১০.অডিট নির্দেশ অমান্য ও তহবিল স্থানান্তর ১১.পিআইবির ডরমিটরিতে মদপান ও অসামাজিক কাজ: ১২.নিয়োগ বানিজ্য: অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজন : নথি যাচাই •    পিআইবির গত ১–২ বছরের সেমিনার বাজেট •    প্রশিক্ষণ ব্যয়ের বিল •    প্রকল্প অনুমোদন নথি •    অডিট রিপোর্ট ফারুক ওয়াসিফের নিকট প্রশ্ন?  •     সেমিনার ব্যয়ের অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছে? •    বাজেট অনুমোদনের প্রক্রিয়া কী? ,একই দিন ৪টি প্রোগ্রাম করা আদৌ সম্ভব?  •    পিআইবির প্রশাসনিক অভিযোগের বিষয়ে তথ্য মন্ত্রনালয়ে অবহিত করেছেন?   মন্ত্রনালয় তদন্তে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা?   •    মন্ত্রণালয় বা অভ্যান্তরিন কোন অডিট করেছেন?  •    অভিযোগগুলো সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী? •    কোনো তদন্ত হলে আপনি সহযোগিতা করবেন কি? সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া : পিআইবির সাম্প্রতিক প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে গণমাধ্যমে যে অভিযোগগুলো উঠেছে তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। দেশের সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিআইবির কার্যক্রম স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়া জরুরি। সাংবাদিক সমাজ মনে করে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আমরা তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কাছে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি। পিআইবি–র উদ্দেশ্য দেশের সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা বৃদ্ধি—অবশেষে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করা। তবে মহাপরিচালক পদে থাকা অবস্থায় যদি ভুল তথ্য, নাগরিকের স্বাক্ষর, ব্যয়ের অভিলেখ বা অন্যান্য পক্ষের দাবিকে উপেক্ষা করা হয়—তবে সেটি উদাসীনতা, ব্যয়ের অপব্যবহার, কিংবা স্বচ্ছতার অভাব—এমন প্রশ্ন তোলে। সাংবাদিক সমাজের একাংশ মনে করেন—এই দাবির যথাযথ তদন্ত হওয়া উচিত এবং সেই অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কোনো অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তা সহজভাবে ফেলে দেওয়া যায় না। পিআইবি–র শুদ্ধ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাজের স্বার্থে স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া আশা করা উচিত নয়। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা উন্নয়নে Press Institute of Bangladesh( PIB)  দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।তাই এই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।সাংবাদিক সমাজের অনেকেই মনে করছেন—পিআইবির ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থেই অভিযোগগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত।তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হলে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আস্থা আরও শক্তিশালী হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। লেখক : সাংবাদিক, [email protected] তথ্য সুত্র :  1. BD Digest, লিংক-  https://en.bddigest.com/pib-dg-faruq-wasifs-fraud-2-4-million-disappeared-through-fake-seminar-and-journalists-forged-signatures/?utm_source=chatgpt.com 2. দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, লিংক-         https://www.bd-pratidin.com/national/2026/03/05/1224362 3. দৈনিক কালের কণ্ঠ,       লিংক-                https://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2026/03/05/1655859 4.দৈনিক কালের কণ্ঠ,       লিংক-                   https://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2026/03/05/1655869 5.ইত্তেহাদ নিউজ :           লিংক-                   https://etihad.news/pib-tarunyer-utsob-24-lakh-corruption-allegation-bangladesh 6.ইত্তেহাদ নিউজ :           লিংক-                  https://etihad.news/pib-faruk-wasif-corruption-fake-bill-recruitment-scam 7.otnbangla                    লিংক-                   https://otnbangla.com.au/news/51830 8. somoynews.tv          লিংক-                       https://www.somoynews.tv/news/2026-03-06/LJ2U9TzR 9. ঢাকা টাইমস              লিংক-                     https://www.dhakatimes24.com/2026/03/05/402684 10. কালের কণ্ঠ             লিংক-                     https://www.youtube.com/watch?v=dXwwe8EzTME 11.বাংলানিউজ            লিংক-                      https://www.youtube.com/watch?v=449Y3K3uMP8 12.Somoy TV            লিংক-                        https://www.youtube.com/watch?v=xCZRP0vVHq8 13. বরিশাল খবর         লিংক-                                       https://www.barisalkhabar24.com/onusondhaninews/%E0%A6%AA%E0%A6%BF%E0%A6%86%E0%A6%87%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%AE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%95-%E0%A6%AB%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%95-%E0%A6%93%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%AB%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B2%E0%A7%81%E0%A6%9F%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%9F,-%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%9F%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE-%E0%A6%86%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A7%8E 13. বরিশাল খবর         লিংক-      https://www.barisalkhabar24.com/onusondhaninews/%E0%A6%AA%E0%A6%BF%E0%A6%86%E0%A6%87%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%87-%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%87-%E0%A7%A8%E0%A7%AA-%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%96-%E0%A6%9F%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AD%E0%A7%81%E0%A7%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B2:-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%B0-%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B2,-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%89%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AD%E0%A7%81%E0%A7%9F%E0%A6%BE,-%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE-%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%AC%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B0 14. বিডি২৪নিউজ                 লিংক-                    https://bd24news.com %e0%a6%aa%e0%a6%bf%e0%a6%86%e0%a6%87%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%ad%e0%a7%81%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b0/ 15.বিডি২৪নিউজ লিংক-    https://bd24news.com/%e0%a6%aa%e0%a6%bf%e0%a6%86%e0%a6%87%e0%a6%ac%e0%a6%bf-%e0%a6%ad%e0%a7%81%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b2-%e0%a6%b8/ 16.moheshpurnews         লিংক-                                    https://moheshpurnews24.com/%E0%A6%AA%E0%A6%BF%E0%A6%86%E0%A6%87%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A7%81%E0%A7%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B2-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%99%E0%A7%8D/    

নিজস্ব প্রতিবেদক মার্চ ৮, ২০২৬ 0
আমীন আল রশীদ
খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ ইরান কীভাবে নেবে?

আমীন আল রশীদ:  ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যার মতো অবিশ্বাস্য ঘটনা কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে? এর আগে আরও একাধিকবার ইরান-ইসরায়েল তথা ইরান অ্যামেরিকা সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর নানা শঙ্কা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধটা পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে গড়ায়নি বা রাশিয়া ও চীনের মতো পরাক্রমশালী দেশগুলো এই যুদ্ধে জড়ায়নি। কিন্তু খামেনিকে হত্যা পুরো দৃশ্যপট পাল্টে দিয়েছে কি না; যে খামেনিকে ইরানের সাধারণ মানুষ অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখে; একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করে—তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল ও অ্যামেরিকা সত্যিই ইরানের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিলো কি না—সেটি এখন বড় প্রশ্ন। আর সত্যিই যদি এই যুদ্ধে ইরানের পক্ষে রাশিয়া, চীন ও তুর্কিয়ে সমর্থন জানিয়ে তারাও যুদ্ধ ঘোষণা করে, তাহলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকানো হয়তো সত্যিই কঠিন হবে। গত বছরের ১০ মে দ্য গার্ডিয়ানের একটি বিশ্লেষণে নজর দেয়া যাক। Are we heading for another world war – or has it already started শিরোনামে গার্ডিয়ানের কূটনৈতিক সম্পাদক প্যাট্রিক উইন্টুরের ওই বিশ্লেষণে বলা হয়: বিশ্ব যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির ৮০তম বার্ষিকী পালন করলো, তখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা যেন আরও ঘণীভূত হচ্ছে। যুক্তরাজ্য সরকারের কৌশলগত প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ফিওনা হিলের বরাতে বলা হয়, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, আমরা কেবল তা স্বীকার করছি না। বিজ্ঞাপন সাবেক ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ড চ্যাথাম হাউসকে উদ্ধৃত করে ওই বিশ্লেষণে বলা হয়, বিশ্ব সব সময়ই পরিবর্তিত হচ্ছে—এ কথা আমরা শুনে থাকি। কিন্তু এবার সত্যিকারের ভূরাজনৈতিক রূপান্তর ঘটছে। ১৯৮৯-৯০ সালের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ, যখন শীতল যুদ্ধ থেকে একমেরু বিশ্বে রূপান্তর হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন এই পরিবর্তনের লক্ষণ এবং কারণ। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের ভাষায়: সবাই স্বস্তির জায়গা থেকে ছিটকে পড়েছে। রাজনৈতিক অরণ্যে যে শব্দ শোনা যাচ্ছে, তা বিকল্প খোঁজার মরিয়া প্রচেষ্টা। মানুষ নিজেদের অবস্থান ও সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করছে। এটি এক বিশাল ধাক্কা।ইসরায়েলের অতি-ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ গাজাকে ছয় মাসের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার কথা বলেছেন। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের ঘোষণাও দিয়েছেন। শনিবার ভোরে পূর্বঘোষণা ছাড়াই ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। নিশানা হয় একটি বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়সহ একটি বালিকা বিদ্যালয়ও। এতে শতাধিক শিক্ষার্থী প্রাণ হারান।রবিবার তেহরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও। এই হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরান। প্রসঙ্গত, গত বছরের ১৩ জুন ইরানের ওপর ইসরায়েলের আকস্মিক বিমান হামলার ঘটনায়ও এই প্রশ্নটি সামনে এসেছিল যে, এই যুদ্ধ কি আদৌ বিশ্বযুদ্ধের দিকে যেতে পারে? ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় ইসরায়েলের হামলা এবং তার পাল্টা জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণ—এই দুইয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়, তার পরিণতি আসলে কী হবে? তখন অবশ্য যুদ্ধটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং বিশশ্বযুদ্ধের মতো আরেকটি ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়নি এই গ্রহবাসীকে। কিন্ত এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার ইসরায়েল ও তার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইরানিদের কলিজায় আঘাত করেছে। তারা এমন একজন মানুষকে হত্যা করেছে, যিনি ইরানের কেন্দ্রবিন্দু। খামেনি ইরানিদের কাছে একটি অনুভূতির নাম। সেই অনুভূতিতে চরম আঘাতের জবাব ইরান কীভাবে দেবে এবং সেই জবাবে তার মিত্ররা তার পাশে থাকবে কি না বা থাকলেও তার ধরন কী হবে—এরকম নানা যদি কিন্তুর ওপর নির্ভর করছে বিশ্ব আরেকটি বিভীষিকাময় বিশ্বযুদ্ধের দিকে যাবে কি না এবং শেষ পর্যন্ত কোনো একটি দেশ পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করবে কি না। খামেনি নিহত হওয়ায় ইরানে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘মানবতার সবচেয়ে নিষ্ঠুর সন্ত্রাসী ও জল্লাদদের হাতে তার শহীদ হওয়া এই মহান নেতার বৈধতার প্রমাণ এবং তার আন্তরিক সেবার প্রতি জনগণের স্বীকৃতির নিদর্শন।’ আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘ইরানি জাতির প্রতিশোধের হাত তাদের ছাড়বে না।’ শেষ পর্যন্ত আলোচনা ও সমঝোতার পথ এড়িয়ে যদি উভয়পক্ষই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যেও আরেকটি ইউক্রেইন তৈরি হবে এবং যুদ্ধটা হবে দীর্ঘস্থায়ী—যার ফল ভোগ করতে হবে তেলসমৃদ্ধ ধনী আরব রাষ্ট্রগুলোকেও—যেসব দেশে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি তথা এশিয়ান মানুষ জীবিকা অর্জনের জন্য কাজ করেন। এই যুদ্ধ তখন বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশের ওপর সরাসরি আঘাত হানবে—যা মোকাবিলা করার শক্তি ও সামর্থ্য হয়তো বাংলাদেশের নেই তবে ইরান প্রতিশোধ নিলে ‘আরও কঠোর’ হামলার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেছেন, ইরান যদি প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এমন হামলা করবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। রবিবার নিজের ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান এই মাত্র বলেছে, তারা আজ খুব জোরালোভাবে আঘাত হানবে, এমনভাবে যা আগে কখনো হয়নি। তাদের এটি করা উচিত না। কারণ যদি তারা করে, আমরা তাদের বিরুদ্ধে এমন শক্তি প্রয়োগ করবো যা আগে কখনো দেখা যায়নি।’ মনে রাখতে হবে, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। শুধু ইউক্রেন যুদ্ধের ফলেই বিশ্বব্যাপী গম তথা আটাজাতীয় খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। এসব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এবার ইরানের আক্রমণের পরপরই তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। প্রসঙ্গত, হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের মধ্যে অবস্থিত একটা চ্যানেল বা খাল। এর প্রবেশ এবং প্রস্থানপথ প্রায় ৫০ কিলোমিটার প্রশস্ত। মধ্যবর্তী স্থানে এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ প্রায় ৪০ কিলোমিটার প্রশস্ত। তবে এই প্রণালির কেন্দ্রীয় অংশ বড় জাহাজের চলাচল করার জন্য যথেষ্ট গভীর। বিশ্ব তেল রপ্তানির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালী। উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানির বড় অংশ এই প্রণালী দিয়ে সম্পন্ন হয়। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশ এখান দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তেল পাঠায়। সরু এ সামুদ্রিক পথটি ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরকে যুক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) অনুমান, ২০২৩ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রতি বছর সমুদ্রপথে পরিবহন করা প্রায় ৬০ হাজার কোটি ডলার মূল্যের জ্বালানি বাণিজ্যের সমতুল্য এটি। সুতরাং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হলে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে দেরি হতে পারে এবং এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে তেলের দামের ওপর।এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য যেসব দেশ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা অনেকটা পারমাণবিক অস্ত্র রাখার মতোই। একে প্রতিরোধ ক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খামেনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইরান হয়তো সেই প্রতিরোধ ক্ষমতারই প্রয়োগ করলো। সেইসাথে এবার আক্রান্ত হওয়ার পরপরই ইরান পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সকল মিত্ররাষ্ট্রে হামলা চালিয়েছে। এই হামলাগুলো ব্যাপক বিধ্বংসী না হলেও এগুলো মধ্যে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, আক্রান্ত হলে জবাব দেয়ার মুরদ ইরানের আছে। এইসব হামলার আরেকটি ইঙ্গিত হলো, পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর শাসকরা এরকম পরিস্থিতিতে একযোগে ইরানের ওপর হামলা চালাবে নাকি নিজেদের জনগণ ও সম্পদ রক্ষায় যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা করবে, সেটি বড় প্রশ্ন। তাছাড়া ইরানের ওপর ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং মার্কিন মিত্র আরব দেশগুলো একযোগে হামলা চালালে তখন ইরানকে রক্ষার নৈতিক দায়িত্ব এসে বর্তাবে রাশিয়া, চীন ও তুর্কিয়ের ওপর। তখন বিশ্বযুদ্ধ ঠেকানো কঠিন হবে। তবে শেষ পর্যন্ত সেদিকে হয়তো যুদ্ধটা যাবে না। কেননা, এবার বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে পরমাণ অস্ত্রের ব্যবহার ঠেকানো মুশকিল হবে। এর ভয়াবহতা বিশ্ববাসী জানে। অতএব এরকমএকটি আত্মঘাতি যুদ্ধে পরাক্রমশালী দেশগুলো জড়াবে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন। তার চেয়ে বড় প্রশ্ন যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘ কী করছে? তেহরানে অ্যাস্ট্রেলিয়ার সাবেক কূটনৈতিক প্যাট্রিক গিবন্স মনে করেন, আগামী এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ অনেক কিছু স্পষ্ট করে দেবে। খামেনির চারপাশে থাকা কট্টরপন্থীরা প্রতিশোধের রাজনীতি চালিয়ে যেতে পারেন এবং ইসরায়েল, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করতে পারেন। আবার তারা বাস্তবতা মেনে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেও পারেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আসলে ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলতে চান। এর সঙ্গে ইরানে গণতন্ত্র তথা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রক্রিয়ার দাবিও রয়েছে। ইরান সরকার নিজেই সম্প্রতি বড় ধরনের বিক্ষোভ মোকাবিলা করেছে। সরকারের পতন হয়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার অনেকে এমনটাও বলছিলেন। সব মিলিয়ে একদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং স্বয়ং খামেনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হলো, সেটি ইরানকে সমঝোতার দিকে নিয়ে যাবে নাকি আরও বেশি প্রতিশোধপরাণ করবে, সেটি নির্ভর করবে ইরান তার মিত্রদের কাছ থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছে—তারওপর। তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনা ও সমঝোতার পথ এড়িয়ে যদি উভয়পক্ষই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যেও আরেকটি ইউক্রেইন তৈরি হবে এবং যুদ্ধটা হবে দীর্ঘস্থায়ী—যার ফল ভোগ করতে হবে তেলসমৃদ্ধ ধনী আরব রাষ্ট্রগুলোকেও—যেসব দেশে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি তথা এশিয়ান মানুষ জীবিকা অর্জনের জন্য কাজ করেন। এই যুদ্ধ তখন বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশের ওপর সরাসরি আঘাত হানবে—যা মোকাবিলা করার শক্তি ও সামর্থ্য হয়তো বাংলাদেশের নেই। আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।

নিজস্ব প্রতিবেদক মার্চ ১, ২০২৬ 0
আত্মহত্যা
আত্মহত্যা: নীরব মানসিক ব্যাধি

ফারজানা আক্তার: আত্মহত্যা একটি নীরব মানসিক ব্যাধি। এটি কেবল একটি শব্দ নয়, এর পিছনে লুকিয়ে আছে হাজারো নীরব আর্তনাদের বাস্তবতা। একটি অল্পবয়সী জীবন, যার বয়সটা রঙিন ফানুশের ওড়ানোর সময়, হাজার স্বপ্নের জাল বোনার কথা সেই মানুষটাই সাদাকালো পৃষ্ঠার মলাটে নিজেকে চিরবিদায় জানানোর ঘোর নেশায় মত্ত। প্রতিদিন নানা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হওয়া আত্মহত্যার বার্তা যেন এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এই নীরব আত্মঘাতক হাহাকার একটি নক্ষত্রের আলোকে অন্ধকারে ধাবিত করে। মানুষটি বুঝে ওঠার আগেই জীবনের ধ্বংসাত্মক খেলার কাছে হার মানে। আর পৃথিবীকে বিনিময়ে দিয়ে যায় তার নিথর সমাধি। আত্মহত্যার পিছনে সবচেয়ে দায়ী ভূমিকা রাখে মানসিক যত্নের অবহেলা তথা আত্মসচেতনতার অভাব। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে আমরা যেন ভুলতে চললাম মানসিক যত্নের গুরুত্ব কতটুকু! আমরা মানসিক যত্ন নিয়ে ততটা তৎপর নই, অথচ মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখাটা সহজ নয়। নেতিবাচকতা একজন মানুষকে নীরবে আত্মহত্যার মতো সর্বনিকৃষ্ট কাজের সম্মুখীন করে। ধীরে ধীরে সেই ব্যক্তি বোঝার পূর্বেই জীবনের সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হয়। তাই মনের যত্নের বিকল্প নেই। মনের যত্ন নেওয়ার অর্থ হলো শারীরিক যত্নের ন্যায় মানসিকভাবে নিজেকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখা। আত্মহত্যার কারণ বহুবিধ এবং জটিল কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা প্রতিরোধযোগ্য। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে আত্মহত্যা করেছে প্রায় ১৩ হাজার ৪৯১ জন। গড়ে প্রতিদিন আত্মহত্যার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১ জনে। ডিসেম্বর মাসের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনও প্রস্তুত না হওয়ায় সর্বশেষ চিত্র পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আর্থিক সহায়তায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) পরিচালিত জাতীয় জরিপ (২০২২-২৩) অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে আত্মহত্যা করেছেন ২০ হাজার ৫০৫ জন। পুলিশের হিসাবে ২০২৪ সালে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৯২০ জন। আত্মহত্যা ব্যক্তিগত, পারবারিক, সামাজিক নানা কারণে হয়ে থাকে। WHO অনুমান করে যে ২০% মানুষ আত্মহত্যা করে তারা কীটনাশক বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুলিশের বিবরণীতে ফাঁস, বিষপান, গায়ে আগুন, রেললাইনে ঝাঁপ ও অন্যান্যÑ এই পাঁচভাবে আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা। এরপর ব্যবহৃত পদ্ধতি বিষপান। কেবল ব্যক্তির জীবনই নিঃশেষ করে না, বরং সেই ব্যক্তির পরিবারেও আজীবনের কুপ্রভাব পড়ে। তা ছাড়াও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষরা আত্মহত্যা করা ব্যক্তিকে অনুসরণ করে। এর ঝুঁকি বর্তমান সমাজে বেড়েছে। ফলে এই বিষয়ে উদ্দীপনা হয় এমন বিষয়গুলোর প্রতি সচেতন হতে হবে। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস একটি সচেতনতামূলক দিন, যেটি বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ১০ সেপ্টেম্বর আত্মহত্যা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের অনেক দেশে ২০০৩ সাল থেকে পালন করা হয়। এই দিবসটি পালন করতে আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থার সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য ফেডারেশন একসঙ্গে কাজ করে। ২০১১ সালে অনুমনিক ৪০টি দেশ এই দিবসটি উদ্‌যাপন করে। ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার করা মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বের নিম্ন আয়ের কোনো দেশেই আত্মহত্যা প্রতিরোধে কোন কৌশল বা কর্মপন্থা ঠিক করা নেই, যেখানে নিম্ন মধ্য-আয়ের দেশসমূহের ১০% এবং উচ্চ আয়ের সব দেশেই এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে দিবসটি পালন করা হয়। তবে তা যেন বাস্তবায়িত হয় সে বিষয়ে সচেতন নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি যেন তৎপর চলতে থাকে। মনে রাখতে হবে মানসিক সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগ। এটি নিরাময়ে আমাদের তাদের প্রতি সহনশীল, বন্ধুত্বপরায়ণ হতে হবে। আমরা যদি সকলে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নির্মম তিক্ততা অনুধাবন করে সহনশীল হই এবং সরকার মানসিক ব্যাধির প্রতিরোধে বিভিন্ন ধরনের ক্যাম্পেইন ও নানা সৃজনশীল পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হই, তবে ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা মানসিক সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাবে। সামষ্টিক সচেতনতা নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আত্মহত্যার প্রবণতা ও হার তুলনামূলক হ্রাস পাবে। ফারজানা আক্তার  শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা 

নিজস্ব প্রতিবেদক ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬ 0
চা-পাতা সংগ্রহ করছেন এক নারী শ্রমিক।
সবুজ বাগানে জীবন যাদের অনুজ্জ্বল

চা-বাগান মানেই চোখ জুড়ানো সবুজ, কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ি ঢাল, সারি সারি চা-গাছ আর সেই গাছের ফাঁকে ফাঁকে নীরবে নুয়ে পড়া শ্রমজীবী মানুষ গজিয়ে ওঠা সবুজ কচি পাতা তুলছে। কি অপূর্ব এক দৃশ্য। এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাসÑ যেখানে চা-শ্রমিকদের জীবন আজও অচল হয়ে এক জায়গায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অবহেলা ও বৈষম্যের প্রতীক হয়ে। আমাদের দেশের চা-চাষের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ এবং পুরাতন। ১৮৫৪ সালে সিলেটে যখন ব্রিটিশরা চায়ের বাগান তৈরি করে চা উৎপাদন শুরু করে তখন সিংহভাগের দখলে ছিল ব্রিটিশ বণিকরা। মাইলের পর মাইল বিশাল এই চা-বাগানে কাজ করবার জন্য দরকার ছিল বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। বিহার, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে কর্মহীন, শিক্ষাহীন, ভিন্ন ভাষাভাষী ও শ্রমিকশ্রেণির হিন্দু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজনকে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চা-বাগান এলাকাগুলোতে নিয়ে আসা হয়। বাগানের মাঝে ছোট মাটির ঘরে চা-শ্রমিকদের বসবাস শুরু হয়। প্রতিশ্রুতি ছিল কাজ, বাসস্থান ও নিরাপদ জীবনের। বাস্তবে তারা পেয়েছে শোষণ, বন্দিত্ব আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা দরিদ্রতা। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র বদলেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু চা-শ্রমিকদের ভাগ্য কার্যত বদলায়নি। তাদের ঘরে রাত্রে ঘুমানোর খাট নাই, তাদের থাকার ঘরে বৃষ্টির রাতে তিন-চারবার ঘুমের স্থান বদলাতে হয়, কারণ বৃষ্টি বেশি হলে ওপরের ছাদ থেকে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় পানি পড়ে। এই হচ্ছে তাদের নিয়তি।    চা বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত চা-বাগানের সংখ্যা ১৭১টি। এই বাগানগুলোর মালিক হচ্ছে জেমস ফিনলে, ডানকান ব্রাদারস, নেশনেল টি কোম্পানি, দেউন্দি টি কোম্পানি, এম আহমদ টি অ্যান্ড ল্যান্ড। তার মধ্যে প্রায় ১০টি চা-বাগান সম্পূর্ণ অসুস্থ। এই বাগানগুলোতে চা-পাতা তোলা হয় না কর্মচারী/বাবুগণ বিগত ৪৮ মাস যাবৎ কোনো বেতন পান না। সবাই বাগানে থেকেই বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করে জীবন চালাচ্ছেন। বাগানের শ্রমিকরা দৈনিক ভিত্তিক মজুরিতে কাজ করেন, কেউবা তাদের বাগানের কাছে অবস্থিত খাসিয়াপুঞ্জিতে খাসিয়া মেয়েদের সঙ্গে পানগাছ থেকে পান তুলতে সাহায্য করেন। আবার অনেক বেকার শ্রমিক পাশের শহরে রিকশা, ঠেলাগাড়ি চালান অথবা দিনমজুরের কাজ করে থাকেন। এই বাগানগুলো মূলত সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, পঞ্চগড় ও রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত। সবচেয়ে বেশি চা-বাগান রয়েছে মৌলভীবাজারে ৯৬টি। বাগানগুলোতে শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। তবে, পরিবারসহ চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ বা তার বেশি। যাদের বেশিরভাগ নারী। জানা গেছে, প্রায় ৬৪ শতাংশই নারী, যাদের প্রায় সবাই খুব ছোটবেলা থেকেই চা-বাগানে কাজ করতে বাধ্য হন।    মৌলভীবাজার তথা পুরো সিলেটের চায়ের রাজ্যে আমার নিজের পর্যবেক্ষণের আলোকে বলছি, দেশে যখন শহুরে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি নিয়ে বিতর্ক হয়, তখন চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি যেন রাষ্ট্রীয় বিবেকের কাছে অদৃশ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্দোলনের পর মজুরি কিছুটা বাড়লেও তা এখনও ন্যূনতম মানবিক জীবনের জন্য যথেষ্ট নয়। দৈনিক কয়েকশ টাকায়Ñ যেখানে খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, পোশাক সবই জোগাড় করতে হয় সেখানে চা-শ্রমিক পরিবারগুলো দিনের পর দিন অপুষ্টি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। আসলে একজন চা-শ্রমিকের কাজ শুধু চা-পাতা তোলা নয়। পাহাড়ি ঢালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা, রোদবৃষ্টি উপেক্ষা করে কাজ করা, নির্দিষ্ট কোটা অর্থাৎ জনপ্রতি আড়াই কেজি কাঁচাপাতা প্রতিদিন বিকাল ৫টার মধ্যে তোলা পূরণ না হলে মজুরি কাটা যায়, সব মিলিয়ে এ এক কঠিন শ্রমযাপন। অথচ সেই শ্রমের ন্যায্যমূল্য তারা পান না।  বেশিরভাগ চা-শ্রমিক আজও বাগান কর্তৃপক্ষের দেওয়া কুঁড়েঘরে বসবাস করেন। জরাজীর্ণ ঘর, বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্যানিটেশনের ভয়াবহ অবস্থাÑ এসব যেন চা-বাগানের নিত্যচিত্র। আধুনিক বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার অগ্রগতির গল্প চা-শ্রমিকদের ছুঁতে পারেনি। ৭ ফুট বাই ১৪ ফুট ঘরে পুরো পরিবারের বাস, শিক্ষা-স্বাস্থ্য নিয়ে সুযোগই নেই। উপরন্তু দ্রব্যমূল্য পাল্লা দিয়ে বাড়লেও তাদের বেতন সেভাবে বাড়ে না। এভাবে নানা বঞ্চনা নিয়ে দুর্দশার জীবন কাটাচ্ছেন বাংলাদেশের চা-শ্রমিকরা। দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন হলেও চা-বাগান যেন এখনও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এখানে পৌঁছে না আধুনিকতার আলো, মেলে না জীবনধারণের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা।  দেশের চা-বাগানের মধ্যে ৯৬টির অবস্থান মৌলভীবাজারে। আর এখানকার চা-শ্রমিকদের বিশেষ করে নারীদের দুর্দশা-বঞ্চনা আর ক্রীতদাসের মতো জীবনের যেন শেষ নেই। চা-বাগানের নিজস্ব হাসপাতাল বা ডিসপেনসারিগুলোতে চিকিৎসা সীমিত। গুরুতর রোগে আক্রান্ত হলে শহরে যাওয়ার সামর্থ্য অনেকের নেই। মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি, শিশুমৃত্যু, অপুষ্টিÑ সব মিলিয়ে চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠী আজও এক প্রান্তিক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। বাংলাদেশের কোনো শিল্পাঞ্চলে কোনো মদের দোকান নেই শুধু ব্যতিক্রম চা-বাগান। প্রতিটি চা-বাগানে একাধিক মদের দোকান আছে। স্থানীয় ভাষায় মদের পাটটা বলে। প্রায় সব চা-শ্রমিকই মদপানে আসক্ত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত আছে ৮৪টি মদের পাটটা। আধো আলো আর আধো ছায়ার মধ্যে চা-বাগানগুলো তাদের উপস্থিতি টিকিয়ে রাখে। জানা গেছে, সেখানে চা-চাষে সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত ভূমির পরিমাণ ১,১৪,০১৪ হেক্টর কিন্তু বাস্তবে চাষ হচ্ছে ৫০,৪৭০ হেক্টরে। চা-বাগানে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হচ্ছে, তাই বন্যপ্রাণীও চা-বাগান এলাকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বিস্ময়কর সত্য হলো চাশিল্প ঘিরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রায় ১৫টি প্রতিষ্ঠান, সেখানে চা-শ্রমিকের উপস্থিতি নেই।  শিক্ষাই পারে দারিদ্র্যের শিকল ভাঙতেÑ এই সত্যটি চা-শ্রমিকদের জীবনে বারবার প্রমাণিত হয়নি। বাগানের ভেতরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা আর ঝরে পড়ার হার অত্যন্ত বেশি। শিশুরা অল্প বয়সেই কাজে নেমে পড়েÑ কারণ পরিবার চালাতে অতিরিক্ত আয়ের দরকার। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা-শ্রমিক হিসেবেই রয়ে যাচ্ছে। একজন চা-শ্রমিকের সন্তান চা-শ্রমিক ছাড়া অন্য কিছু হতে পারবেÑ এই স্বপ্ন এখনও অনেকের কাছে বিলাসিতা। চা-শ্রমিকদের বড় একটি অংশ আদিবাসী ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তারা সামাজিকভাবেও বৈষম্যের শিকার। জাতীয় মূলধারার রাজনীতি, প্রশাসন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। ভোটের সময় তারা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভোটের পরে তাদের দাবিদাওয়ার কথা ভুলে যাওয়া হয়। নাগরিক অধিকার থাকলেও বাস্তবে সেই অধিকার প্রয়োগের সুযোগ সীমিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চা-শ্রমিকদের আন্দোলন দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছে। মজুরি বৃদ্ধি, রেশন সুবিধা, চিকিৎসা ও শিক্ষা উন্নয়নের দাবি তুলেছেন তারা। সরকার ও মালিকপক্ষ আলোচনায় বসেছে, কিছু প্রতিশ্রুতিও এসেছে। কিন্তু বাস্তবায়নের গতি ধীর, অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ। এ কথা সত্য যে, বিগত সরকারের আমলে চা-শ্রমিকদের বিষয়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তাদের দুর্দশাকে রাষ্ট্রীয় আলোচনায় নিয়ে আসে। যদিও এসব উদ্যোগ প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত। সবচেয়ে আলোচিত অবদান ছিল চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি। দীর্ঘ ১৯ বছর পর ২০২২ সালে চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়। সরকারের মধ্যস্থতায় মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের আলোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত আসে। এতে চা-শ্রমিকদের আন্দোলনের একটি তাৎক্ষণিক সুরাহা হলেও মজুরি এখনও ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অপর্যাপ্ত রয়ে গেছে। তৎকালীন সরকার চা-শ্রমিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা কিছুটা অর্থ বাড়ায়। ভিজিডি, ভিজিএফ, মাতৃত্বকালীন ভাতা ও বয়স্ক ভাতা কর্মসূচিতে চা-শ্রমিক পরিবারের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি চা-বাগানে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র উন্নয়ন ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকার ‘চা-শ্রমিক উন্নয়ন নীতিমালা’ প্রণয়নের কথা বললেও তার পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও শিক্ষা ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই এসব দায়িত্ব মালিকপক্ষের ওপরই ন্যস্ত রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, সরকার চা-শ্রমিকদের সমস্যা স্বীকার করছে, তবে কাঠামোগত বৈষম্য দূরীকরণ ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর সংস্কার দরকার ছিল, তা এখনও অপূর্ণই রয়ে গেছে। আমি মনে করি, চা-শ্রমিকদের জন্য দয়া নয়, প্রয়োজন অধিকারভিত্তিক নীতি। তাই ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মানবিক জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করতে হবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবাকে বাগান কর্তৃপক্ষের দয়ার ওপর না রেখে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। তাদের নিরাপদ বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে হবে। চা-শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিতে হবে, যাতে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাদের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে। চায়ের কাপ হাতে আমরা যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি, তখন খুব কমই মনে রাখি এই চায়ের পেছনে রয়েছে নিঃস্ব মানুষের ঘাম, ক্লান্তি আর অদৃশ্য কান্না। বাংলাদেশের চা-শিল্প টিকে আছে চা-শ্রমিকদের শ্রমে। অথচ তারাই আজ সবচেয়ে অবহেলিত। মনে রাখতে হবে, চা-শ্রমিকদের উন্নয়ন মানে কেবল একটি শ্রমগোষ্ঠীর উন্নয়ন নয়Ñ এটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার এক অপরিহার্য শর্ত। আমি বলতে চাই, সবুজ চা-বাগানের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সেই সবুজের ভেতর থাকা মানুষগুলোর জীবনেও সবুজতা ফিরে আসবে। মতি লাল দেব রায় কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক

নিজস্ব প্রতিবেদক ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬ 0
Professional ethics and responsibility
গণমাধ্যম: পেশাগত নীতিনৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ

ড. মাহরুফ চৌধুরী: গণমাধ্যম কেবল সংবাদ পরিবেশনের একটি যান্ত্রিক মাধ্যম নয়; এটি সমাজের দর্পণ, রাষ্ট্রচিন্তার বাহক এবং নাগরিক চেতনা ও মূল্যবোধ নির্মাণের এক অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই কারণেই গণমাধ্যমকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যে স্তম্ভ রাষ্ট্রের নির্বাহী ও আইন প্রণয়নকারী ক্ষমতার পাশাপাশি নিরপেক্ষ সত্তা হিসেবে জনস্বার্থ রক্ষা এবং ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে গণমাধ্যম জনমত গঠন, সত্য উন্মোচন এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভূমিকা পালন করেছে। ফলে এই প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা যেমন ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বর্তমান সময়েও তা প্রশ্নাতীত। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক পেশাজীবীর, বিশেষ করে সাংবাদিক, সম্পাদক, কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে কলাম লেখক পর্যন্ত সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব, নৈতিকতা ও সৌজন্যবোধ চর্চা করা একটি নৈতিক দায়। কারণ গণমাধ্যমে ব্যক্তিগত আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি সরাসরি প্রভাব ফেলে জনচিন্তা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক মূল্যবোধের ওপর। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের বাস্তবতায় এই পেশাগত চরিত্র ও নৈতিক চর্চা এখনও ব্যতিক্রম, নিয়মনীতি হয়ে ওঠেনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গণমাধ্যম একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার বদলে ক্ষমতা, সুবিধা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঘেরাটোপে আবদ্ধ এক অপরিণত পেশার জগতে পরিণত হয়েছে। এখানে কোনো ব্যক্তিবিশেষকে অভিযুক্ত করা, আক্রমণ করা কিংবা খাটো করার উদ্দেশ্য নেই। বরং সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণে গণমাধ্যমের যে নিরন্তর ও অপরিহার্য ভূমিকা, সেই ভূমিকাকে গভীরভাবে স্বীকার করেই কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে পেশাদারত্ব ও নৈতিকতার প্রশ্নগুলো সামনে আনার একটি আন্তরিক প্রয়াস মাত্র। সমালোচনার লক্ষ্য এখানে ব্যক্তি নয়, বরং কাঠামো, সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ যেগুলো শক্তিশালী না হলে গণমাধ্যম তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে না ও জনমনে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। লেখক হিসেবে নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং অন্য লেখকদের কাছ থেকে শোনা তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই নিবন্ধে গণমাধ্যমে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত কিছু মৌলিক সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এসব সমস্যা একদিকে লেখকদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে লেখালেখির পরিবেশ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত মান আরও সুসংহত ও বলিষ্ঠ করার প্রয়োজনীয়তার কথাই এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে, সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকীয় পর্ষদে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের উদ্দেশে এই লেখার মূল আবেদন। পত্রপত্রিকার পক্ষ থেকে লেখকদের প্রতি ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন, পেশাগত সৌজন্য বজায় রাখা এবং দায়িত্বশীল আচরণের গুরুত্ব নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেওয়া। প্রথমত, লেখকদের সঙ্গে সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষের সৌজন্যবোধ ও পেশাগত শিষ্টাচারের ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয়। একজন লেখক যখন কোনো সংবাদপত্রে লেখা পাঠান বা ই-মেইলের মাধ্যমে সম্পাদকীয় দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন সেই লেখার প্রাপ্তি স্বীকার করা ন্যূনতম পেশাগত দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। এটি কোনো অতিরিক্ত সৌজন্য নয় বরং আধুনিক পেশাগত যোগাযোগের একটি স্বীকৃত নীতি। একজন লেখকের ন্যায্য প্রত্যাশা থাকে তার লেখা গ্রহণ করা হয়েছে কি না, সেটি প্রকাশযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে কি না, কিংবা আদৌ তা পড়া হয়েছে কি নাÑ এই ন্যূনতম তথ্য জানার। যদি লেখা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে আনুমানিক কবে নাগাদ তা প্রকাশিত হতে পারে, সেই ধারণা দেওয়া পেশাগত স্বচ্ছতারই অংশ। আবার লেখা প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট অনলাইন লিংক কিংবা ই-পেপারের কপি লেখককে পাঠানো কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়; এটি পেশাগত সৌজন্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের স্বাভাবিক পরিধির মধ্যেই পড়ে। দ্বিতীয়ত, লেখকের লেখায় সম্পাদনার নামে অতিরিক্ত বা অযাচিত হস্তক্ষেপ একটি গুরুতর নৈতিক ও আইনি প্রশ্নের জন্ম দেয়। গণমাধ্যমের নীতিমালার অংশ হিসেবে বানান, শব্দচয়ন কিংবা বাক্যগঠনের ত্রুটি সংশোধন করা সম্পাদকীয় দায়দায়িত্বের স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় অংশ এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। বরং এই ধরনের সম্পাদনাই একটি পত্রিকার পেশাগত মানের উৎকর্ষ সাধন এবং তাকে দৃশ্যমান করে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এসব সীমার বাইরে গিয়ে লেখার অংশ বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেটেছেঁটে ফেলা তথা বক্তব্য, কাঠামো বা অন্তর্নিহিত অর্থে প্রভাব পড়ে এমন কোনো পরিবর্তন, সংকোচন কিংবা সংযোজন করা হয়, অথচ তা প্রকাশের আগে লেখককে অবহিত করা হয় না। এটা সম্পূর্ণ পেশাগত নীতির পরিপন্থী, অনৈতিক, বেআইনি ও লেখকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং পত্রিকা কর্তৃপক্ষের স্বৈরাচারী মনোবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ। মনে রাখা জরুরি, একটি লেখা কেবল কিছু শব্দ বা বাক্যের যান্ত্রিক সমষ্টি নয়; এটি লেখকের চিন্তা, শ্রম, মেধা, অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে লেখার বিষয়বস্তু, দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শনের নৈতিক ও আইনি দায়ভারও বহন করেন লেখক নিজেই। সে কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন ও নীতিমালায় লেখকের এই অধিকারকে কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কোনো লেখায় লেখকের সম্মতি ছাড়া মৌলিক পরিবর্তন আনা শুধু অনৈতিকই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা বিদ্যমান আইনি কাঠামোরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অতএব, লেখকের অনুমতি বা অন্তত অবহিতকরণ ছাড়া লেখার বক্তব্যগত পরিবর্তন করা মানে ব্যক্তিগত লেখককে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে পেশাগত নীতিনৈতিকতা, সম্পাদকীয় স্বচ্ছতা এবং গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই খাটো করা। একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমে সম্পাদক ও লেখকের সম্পর্ক হওয়া উচিত সহযোগিতামূলক ও সম্মান-নির্ভর, যেখানে সম্পাদনা হবে মানোন্নয়নের উপায়, কর্তৃত্ব আরোপের অস্ত্র নয়। তৃতীয়ত, লেখকের সম্মানী বা পারিশ্রমিক প্রদানের প্রশ্নটি এখনও আমাদের দেশের গণমাধ্যম জগতে এক ধরনের উপেক্ষিত ও অনানুষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, বহু গণমাধ্যম মালিকের বিরুদ্ধেই নিয়মিতভাবে সময়মতো বেতন-ভাতা পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে, যা আমাদের সংবাদপত্র জগতের একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। তা সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিক, সম্পাদক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের শ্রম, সময় ও মেধার বিনিময়ে পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। এই স্বীকৃত বাস্তবতার আলোকে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে যে লেখকরা সেই পত্রিকার জন্য নিয়মিতভাবে লেখা পাঠান, কনটেন্ট সমৃদ্ধ করেন এবং পাঠক তৈরিতে ভূমিকা রাখেন, তাদের ক্ষেত্রে এই নীতির ব্যতিক্রম কেন ঘটবে? লেখালেখি কোনো শখের কাজ মাত্র নয়; এটি সময়, শ্রম, মনন ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি পেশাগত কর্মকাণ্ড। এর জন্য প্রচুর সময়, শ্রম ও মেধা ব্যয় করতে হয়। সুতরাং লেখকের পারিশ্রমিক প্রদান বা সময়মতো তা পরিশোধ করা কোনো দয়া বা সদিচ্ছার বিষয় নয়; এটি একটি স্পষ্ট নৈতিক ও পেশাগত দায়। একজন পেশাজীবী হিসেবে এই প্রশ্নটি প্রতিদিন নিজেকে করা সাংবাদিক ও সম্পাদকদের নৈতিক দায়িত্ব। স্বৈরাচারমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ কায়েম করতে হলে পেশাজীবীদেরও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। নিজেরা বৈষম্যমূলক ও স্বৈরাচারী আচরণ করে অন্যের কাছ থেকে ন্যায্য ও অস্বৈরাচারী আচরণ আপনি কীভাবে আশা করেন? কারণ গণমাধ্যমে নৈতিকতা কেবল প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুতে সীমাবদ্ধ নয়; তা প্রতিফলিত হয় পেশাগত আচরণ, শ্রমের মূল্যায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বোধের মধ্য দিয়েও। মূলত, আমরা যে সমাজ কল্পনা করি এবং যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখি, সেই মূল্যবোধ যদি আমাদের নিজ নিজ আচার-আচরণ, পেশাগত চরিত্র ও নৈতিক চর্চার ভেতরে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা অন্যের কাছে কিংবা বৃহত্তর সমাজের কাছে প্রত্যাশা করাই অবাস্তব। ব্যক্তিগত ও পেশাগত আচরণের সঙ্গে ঘোষিত আদর্শের এই বিচ্ছিন্নতাই রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের অন্যতম মৌলিক সংকট। গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক পেশাজীবীর দায়িত্ব কেবল লেখা প্রকাশ বা সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং মানবিক ‘সোনালি নীতি’ তথা ‘আপনি আচরি ধর্ম, অপরে শিখাও’, পেশাগত সৌজন্য ও নৈতিক নীতিমালা মেনে চলার মাধ্যমেই তারা একটি কল্যাণমুখী, ন্যায়ভিত্তিক এবং দায়িত্বশীল সমাজ নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। কারণ গণমাধ্যমের প্রকৃত শক্তি শব্দে নয়, বরং সেই শব্দের পেছনে থাকা নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতায় নিহিত। প্রকৃতপক্ষে, আমরা যে সমাজ কল্পনা করি বা যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখি, সেই মূল্যবোধ যদি আমাদের নিজেদের আচার-আচরণ, পেশাগত চরিত্র ও নৈতিক চর্চার ভেতরে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা অন্যের কাছে কিংবা বৃহত্তর সমাজের কাছে প্রত্যাশা করাই অবাস্তব। নৈতিকতা কখনোই কেবল দাবি বা উপদেশের বিষয় নয়; এটি প্রতিদিনের অনুশীলনের মধ্য দিয়েই অর্থবহ হয়ে ওঠে। তাই প্রতিটি পেশাজীবীর বিশেষ করে, গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্তদের মানবিক ‘সোনালি নীতি’র পাশাপাশি নিজ নিজ পেশাগত নীতিনৈতিকতা আন্তরিকভাবে অনুসরণ করা অপরিহার্য। একটি কাঙ্ক্ষিত কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণ কোনো একক গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়; এটি সম্মিলিত নৈতিক অনুশীলনের ফল। সেই অনুশীলনের সূচনা হওয়া উচিত নিজের জায়গা থেকে। নিজ নিজ দায়িত্বের ক্ষেত্রে যদি আমরা পেশাদারত্ব, সৌজন্য ও নৈতিকতার চর্চা নিশ্চিত করতে পারি, তবেই আমাদের গণমাধ্যমগুলো সত্যিকার অর্থে সমাজ ও রাষ্ট্রের অব্যাহত নির্মাণের অগ্রদূত হিসেবে তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম হবে।   ড. মাহরুফ চৌধুরী ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬ 0
রোহিঙ্গা সংকট
রোহিঙ্গা সংকট: নতুন সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা উচিত

এ এইচ এম ফারুক:   ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক বাহিনী তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’-এর নামে রোহিঙ্গাদের ওপর যে বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ চালায়, তা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি এবং আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সময় হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং অসংখ্য নারীকে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এমএসএফ-এর পরিসংখ্যান বলছে, অভিযানের প্রথম এক মাসেই অন্তত ৯,৪০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৭৩০ জনই ছিল শিশু। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো একে মানবাধিকারে চরম বিপর্যয় হিসেবে গণ্য করেছে এবং তুর্কি সংবাদমাধ্যমগুলো এই সংকটকে মুসলিম উম্মাহর ওপর এক পরিকল্পিত জাতিগত নিধন হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছে।   এই ভয়াবহ হামলা ও নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা আজ আর কেবল মানবিক সংকট নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম বাস্তব হুমকি। বিভিন্ন তথ্যমতে প্রায় ১০ লক্ষ নিবন্ধিতসহ প্রায় ১৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। স্থানীয় কোনো কোনো সংস্থার ধারণা এ সংখ্যা আরও বেশি।     পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত অঞ্চল ঘেঁষে কক্সবাজারে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান আমাদের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জনতাত্ত্বিক কাঠামো, অর্থনীতি এবং পরিবেশকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। এই ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি থ্রেট’ মোকাবিলায় এবং একটি টেকসই সমাধানের পথ খুঁজতে এখন দল-মতনির্বিশেষে ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য এবং সরাসরি সরকার প্রধান তথা নির্বাচন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর অধীনে একটি ‘বিশেষ কমিশন’ বা বিশেষ সেল গঠন করা সময়ের দাবি। দীর্ঘদিনের প্রথাগত ও মন্থর কূটনীতি থেকে বেরিয়ে এসে এখন আমাদের ‘বাস্তব সক্ষমতা’ এবং কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।   এই সংকটের অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৭ সালে যে মানবিকতাকে কেন্দ্র করে আমরা সীমান্ত খুলে দিয়েছিলাম, সেই সংকটের সমাধান না হওয়ায় বাংলাদেশ এখন এক ভয়াবহ চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে আছে। নির্যাতনের আগুনের মুখ থেকে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে আসা লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীর এই বোঝা এখন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকির এক চরম বাস্তব পরীক্ষা। এ বিষয়ে দেশি বিদেশী সংস্থা কাজ করছে।       এই সংকটের বহুমাত্রিক ঝুঁকি এবং সমাধানের নতুন কৌশলগুলো নিয়ে সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব গ্লোবাল স্টাডিজ (আইআইজিএস) রাজধানী ঢাকায়— ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: নির্বাচন–পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শিরোনামে আয়োজন করে এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার।   উক্ত সেমিনারে নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব একমত হয়েছেন যে, রোহিঙ্গা সংকট এখন বাংলাদেশের অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমহ্রাসমান সহায়তার প্রেক্ষাপটে এই উপস্থাপনাটি স্পষ্ট করে যে, বিদ্যমান গৎবাঁধা উপায়ে আর সমাধান সম্ভব নয়। সেমিনারে উত্থাপিত প্রস্তাবনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেবল শরণার্থী সমস্যা হিসেবে দেখার দিন শেষ; একে এখন জাতীয় নিরাপত্তার এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার নতুন সমন্বয় প্রয়োজন।   গবেষণা ও সেমিনারের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর একটি অসহনীয় ও ক্রমবর্ধমান বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভরণপোষণে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয়ের পরিমাণ বছরে ১০০ কোটি ডলারের (১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি) মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে। সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর ইউক্রেন বা ফিলিস্তিন সংকটের দিকে সরে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের জন্য ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান’ (জেআরপি)-এর তহবিল দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। ২০১৭ সালে যেখানে তহবিলের জোগান ছিল ৭৩%, ২০২৩-২৪ সালে তা ৫০%-এর নিচে নেমে এসেছে। ফলে এই বিপুল ব্যয়ের সিংহভাগ এখন বাংলাদেশের নিজস্ব রাজস্ব বাজেট এবং সাধারণ করদাতার ওপর চাপ হিসেবে জেঁকে বসছে, যা দেশের জাতীয় উন্নয়ন বাজেটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।       অর্থনৈতিক এই রক্তক্ষরণের সমান্তরালে কক্সবাজার ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলে চলছে অপূরণীয় পরিবেশগত বিপর্যয়। সেমিনারে আলোচিত তথ্যানুযায়ী, রোহিঙ্গাদের আবাসনের জন্য উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় ৮ হাজার একরের বেশি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ইতিমধ্যেই বিলীন হয়ে গেছে। পাহাড় কাটার ফলে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে এবং বর্ষাকালে পাহাড় ধসের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়েছে। এর চেয়েও ভয়ঙ্কর চিত্র হলো ভূ-গর্ভস্থ পানি নিয়ে। অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় কৃষিজমিকে মরুভূমিতে রূপান্তর করতে পারে। গবেষকদের মতে, এটি এখন আর স্থানীয় সমস্যা নেই, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানের জন্য একটি ‘ইকোলজিক্যাল সিকিউরিটি থ্রেট’ বা পরিবেশগত নিরাপত্তাহীনতায় পরিণত হয়েছে। এই বিপুল পরিবেশগত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য এক নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।   ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। ওআইসি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক উত্থাপিত এই প্রস্তাবে ১০৫টি দেশ সমর্থন জানালেও গত আট বছরে প্রত্যাবাসনে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশ আর ১৩ লাখ রোহিঙ্গার এই বিশাল বোঝা বহন করতে পারছে না। গত আট বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও নিরাপদে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি, যা বৈশ্বিক কূটনীতির এক চরম ব্যর্থতা। আন্তর্জাতিক লবিং যখন লক্ষ্য অর্জনে ধীরগতি সম্পন্ন হয়, তখন রাষ্ট্রকে তার নিজস্ব নিরাপত্তা কৌশল ও ‘হার্ড পাওয়ার’ ব্যবহারের কথা ভাবতে হয়।   রোহিঙ্গা সংকটের চলমান স্থবিরতার মধ্যে সম্প্রতি এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল, যা এখন অনেকটা ধূম্রজালে পরিণত হতে চলেছে।       পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মিয়ানমার জান্তা সরকার কিংবা আরাকান আর্মির (এএ) অসহযোগিতামূলক মানসিকতা এবং রাখাইনের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘদিনের সংকট। তবে ড. ইউনুসের যে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব রয়েছে, তা ব্যবহার করে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর বৈশ্বিক চাপ প্রয়োগের এক অনন্য সুযোগ তাঁর ছিল এবং আছে। সাধারণ কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়েও ড. ইউনুস অনেক বেশি সাহসিকতা ও ক্ষমতা নিয়ে এই ইস্যুতে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারতেন। যেখানে বিশ্বনেতারা তাঁর একটি ডাকে সাড়া দেন, সেখানে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে না পারাটা এক ধরণের ব্যর্থতা হিসেবেই রয়ে যাবে। যদি রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ঈদ করতে পারতেন, তবে আন্তর্জাতিক মহলে ড. ইউনুসের এই আশ্বাস কেবল একটি ‘রাজনৈতিক অলঙ্কার’ হিসেবেই নাথেকে বরং মর্যাদার হয়ে উঠতে পারতো।   পাশাপাশি বাস্তবিক অর্থে এটি স্পষ্ট যে, কেবল ব্যক্তিগত প্রভাব নয়, বরং সেই প্রভাবকে ‘বাস্তব সক্ষমতা’ (Hard Power) ও কার্যকর দ্বিপাক্ষিক দরকষাকষিতে রূপান্তর করতে না পারলে এই মানবিক ট্র্যাজেডির অবসান সম্ভব নয়। রোহিঙ্গাদের দেওয়া এই বিশাল আশ্বাসের বাস্তবায়ন না হওয়া বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক নৈতিক অবস্থানকেও দুর্বল করে দিতে পারে। উপরন্তু নতুন সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর জন্য এক বিশাল পরীক্ষা হিসেবে তোলা রেখে গেলেন এই বিষফোড়াবিবেচ্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুটি।   সেমিনারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও এই জাতীয় ঐক্যের সুরে সংহতি প্রকাশ করেন। মামুনুর রশিদ খান (বিএনপি অঙ্গসংগঠন কৃষক দল), এ কে এম রফিকুন নবী (জামায়াতে ইসলামী), হুমায়রা নূর (এনসিপি), আবু হানিফ (গণ অধিকার পরিষদ), শামসুল আলম (ইসলামী ঐক্যজোট), অধ্যাপক মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এবং সামরিক-বেসামরিক বিশেষজ্ঞগণ প্রত্যেকেই সংকটের বহুমাত্রিকতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে ইস্পাতকঠিন ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেন।     আইআইজিএস আয়োজিত সেমিনারে অংশগ্রহণকারী নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকদের বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ এতদিন যে ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করেছে, তা এখন অকার্যকর। এই সংকট সমাধানে সামরিক, কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক—তিনটি ফ্রন্টেই নতুন ও সাহসী কৌশল প্রণয়ন জরুরি।   নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ প্রস্তাব করেন যে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ‘ডেস্ক’ দিয়ে ১১ লাখ মানুষের এই বিশাল ও জটিল সংকট সমাধান সম্ভব নয়। তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে একটি ‘বিশেষ রোহিঙ্গা কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দেন, যেখানে ২৪ ঘণ্টা কেবল এই ইস্যু নিয়ে কাজ করার মতো একটি ডেডিকেটেড বিশেষজ্ঞ দল থাকবে। আইআইজিএস-এর চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান সামরিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে একটি সঠিক ও যুগোপযোগী ‘নিরাপত্তা নীতি’ (Security Policy) প্রণয়নের ওপর জোর দেন।   এফএসডিএস-এর চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান না হলে ‘বাস্তব সক্ষমতা’ ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পথে এগোতে হবে। তিনি সরকারের জন্য একটি আলাদা ‘টাস্কফোর্স’ গঠনের পরামর্শ দেন। তিনি সতর্ক করেন যে, ক্যাম্পে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার নতুন শিশু যুক্ত হচ্ছে, অথচ আন্তর্জাতিক অর্থায়নে এক ধরণের ক্লান্তি তৈরি হয়েছে।     সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির এবং মিয়ানমারে বাংলাদেশ মিশনে দায়িত্বপালনকারি মেজর (অব) এমদাদুল ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘রিয়েলিটি চেক’-এর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁদের মতে, রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রক এখন ‘আরাকান আর্মি’ (এএ)। সুতরাং, কেবল নেপিডো বা জান্তা সরকারের সাথে আলোচনা করে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না; যারা মাঠ পর্যায়ে ভূমি নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের সাথে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বা ‘ট্র্যাক-টু ডিপ্লোম্যাসি’ স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি।   সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট ও সাহসী পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। যেমন-   আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা: আলোচকরা রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বিষয়টি পুনরায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জোরালোভাবে উত্থাপন এবং নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে প্রয়োজনে মিয়ানমারের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) আরোপের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেন।     কৌশলগত বিভ্রান্তি নিরসন: বাংলাদেশের বিদ্যমান নীতিতে ‘কৌশলগত বিভ্রান্তি’ চিহ্নিত করে বিশেষজ্ঞগণ উল্লেখ করেন যে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী দেশটির ওপর বাংলাদেশের যে ধরণের প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ ছিল, তা আমরা যথাযথভাবে নিতে পারিনি। তাঁরা ‘ধীরে চলো’ নীতির পরিবর্তে আরও সক্রিয় ও আক্রমণাত্মক কূটনীতি গ্রহণের তাগিদ দেন।   অপরাধ দমনে প্রযুক্তি: রোহিঙ্গা সংকটকে বর্তমানে বাংলাদেশের ‘নম্বর ওয়ান ন্যাশনাল সিকিউরিটি থ্রেট’ হিসেবে অভিহিত করে সতর্ক করা হয় যে, ক্যাম্পগুলো এখন ‘ট্রান্স-ন্যাশনাল ক্রাইম’ বা আন্তর্জাতিক অপরাধের ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা দমনে কেবল প্রথাগত পুলিশি ব্যবস্থা নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। আইআইজিএস-এর ভাইস চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আখতার শহীদ এ ক্ষেত্রে দলীয় বিভাজনের বাইরে গিয়ে একটি ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।   তথ্যসূত্র: ১. ‘জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পথেই এগোতে হবে’, প্রথম আলো, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬। ২. ‘রোহিঙ্গাসংকট সমাধানে বিশেষ কমিশন ও টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব’, কালের কণ্ঠ, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬। ৩. ‘রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরাতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব গৃহীত’, বাসস, ২০ নভেম্বর ২০২৫। ৪. ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: নির্বাচন–পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারের কার্যবিবরণী, আইআইজিএস, জানুয়ারি ২০২৬। ৫. ‘ড. ইউনুস ও জাতিসংঘ মহাসচিবের রোহিঙ্গা শিবির সফর এবং প্রত্যাবাসন প্রতিশ্রুতি’, আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি, ২০২৫-২৬।   সেমিনারের আলোচকদের সমন্বিত মতামতের ভিত্তিতে এই সংকট উত্তরণে নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ বিবেচনা করা যেতে পারে:   ১. ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল অন রোহিঙ্গা: প্রস্তাবিত বিশেষ কমিশন ও টাস্কফোর্সকে একীভূত করে একটি শক্তিশালী ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল অন রোহিঙ্গা’ গঠন করা। ২. নিরাপত্তানীতি পুনর্মূল্যায়ন: মিয়ানমার ইস্যুকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা। ৩. আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক লবিং: প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সামরিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনা তথা নিবিড় লবিং চালিয়ে যাওয়া। ৪. জাতীয় ঐক্য সনদ: সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি ‘জাতীয় ঐক্য সনদ’ তৈরি করা, যাতে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন আসলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের জাতীয় অবস্থানে কোনো পরিবর্তন না ঘটে।   পরিশেষে বলা যায়, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার বিষয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্বের ওপর এক গভীর ক্ষত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের গতানুগতিক প্রস্তাবনাগুলো যে প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, ২০ নভেম্বরের সাধারণ পরিষদের রেজোলিউশন ও পরবর্তী আট বছরের স্থবিরতা তার বড় প্রমাণ। আইআইজিএস সেমিনারের আলোচকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে এবং এই সংকট সমাধানে কালক্ষেপণ করার অর্থ হলো জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও বিপন্ন করা।   এই কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে কেবল সুবিধাই দিচ্ছে। তাই সময় এসেছে ঘরের রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তিকে এক টেবিলে বসে একটি 'জাতীয় ঐক্য সনদ' তৈরি করার। একইসাথে, প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘বিশেষ কমিশন’ বা টাস্কফোর্সের মাধ্যমে সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার সমন্বিত প্রয়োগ ঘটাতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৪ লক্ষাধিক মানুষের এই বিশাল বোঝা চিরস্থায়ী করার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। বাংলাদেশের উচিত তার বাস্তব সক্ষমতা ও জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে বিশ্বকে এই স্পষ্ট বার্তা দেওয়া যে—আমরা আর এই বোঝা বয়ে বেড়াতে চাই না। এখন যদি আমরা কঠোর ও কৌশলী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হই, তবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে ‘জাতীয় ঐক্য’ ও ‘বিশেষ কমিশন’ গঠনই এখন আমাদের সামনে একমাত্র কার্যকরী বিকল্প।   লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। [email protected]

নিজস্ব প্রতিবেদক ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬ 0
ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ
নিরাপদ পানির অধিকার ও স্যানিটেশন

ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ: একটি উন্নত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো জনস্বাস্থ্যের টেকসই উন্নয়ন। বর্তমানে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল যখন সরগরম, তখন অত্যন্ত মৌলিক একটি বিষয়—নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (WASH)— নির্বাচনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আসা অপরিহার্য ছিল।   সম্প্রতি ‘নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কস’ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তাদের ৮ দফা সংবলিত একটি স্মারকলিপি প্রদান করেছে। ২০২৫ সালের ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (MICS) অনুযায়ী, দেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ বেসিক স্যানিটেশনের আওতায় এলেও গুণগত মান, টেকসই ব্যবস্থাপনা ও বৈষম্যহীন প্রাপ্যতা এখনও একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।   জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও মানবিক পুনর্গঠনের একটি রূপরেখা। সরাসরি ‘ওয়াশ’ শব্দটির কারিগরি ব্যবহার এখানে কম হলেও, এর সংস্কার প্রস্তাবগুলো পানি ও স্যানিটেশন অধিকার নিশ্চিত করতে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে।   সনদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার কথা (পয়েন্ট ১৮ ও ১৯) বলা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE) বা ওয়াসার মতো সংস্থাগুলোর মাঠ পর্যায়ের কাজ যদি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অধীনে থাকে, তবে বরাদ্দ ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা আসবে।   গবেষণায় দেখা যায়, ‘বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকারের অংশগ্রহণ পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে’ (World Bank, 2021)। সনদে মৌলিক অধিকারের তালিকা সংশোধন ও সম্প্রসারণের কথা ((পয়েন্ট ৯) বলা হয়েছে। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে যদি সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে এটি রাষ্ট্রের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে।   নেটওয়ার্কের অন্যতম দাবি ছিল জাতীয় বাজেটে ওয়াশ খাতে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং ভৌগোলিক বৈষম্য কমাতে একটি ‘WASH Equity Index’ তৈরি করা। বিএনপি তাদের ইশতেহারে বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য উন্নত পানি ও স্যানিটেশনের কথা বলেছে। এবি পার্টি প্রান্তিক পর্যায়ে সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।   তবে জুলাই সনদের মূল সুর —বৈষম্যহীন সাম্য— অনুসরণ করে কোনও দলই সুনির্দিষ্ট ‘ইক্যুইটি ইনডেক্স’ বা বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন জিডিপির ১ শতাংশ) ওয়াশ খাতের জন্য বরাদ্দের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। অথচ এসডিজি ৬ অর্জনে বাংলাদেশের জন্য বর্ধিত বিনিয়োগ অপরিহার্য।   নেটওয়ার্ক আর্সেনিক, লবণাক্ততা ও বন্যারোধী টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের আহ্বান জানানো হয়েছিল। সনদে (পয়েন্ট ৬.১) জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ শব্দবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত করেছে। জামায়াতে ইসলামী উপকূলীয় অঞ্চলে লোনা পানি প্রবেশ রোধে শক্তিশালী টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।   বিএনপি ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের কথা বলেছে, যা ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করবে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বরেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পৃষ্ঠস্থ পানি সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে। এটি ‘ওয়াটার স্ট্রেস’ মোকাবিলায় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।   নেটওয়ার্কের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে নারী ও কিশোরীদের জন্য বিনামূল্যে ও মানসম্মত মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী নিশ্চিত করা। বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রধান দলগুলোর ইশতেহারে এই বিষয়টি প্রায় অনুপস্থিত। মাসিক স্বাস্থ্যবিধি কেবল একটি নারী স্বাস্থ্য ইস্যু নয়, এটি কিশোরীদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে প্রায় ৪১ শতাংশ কিশোরী মাসিকের সময় স্কুলে অনুপস্থিত থাকে (World Bank, 2018)। এই ‘পিরিয়ড পভার্টি’ নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা হতাশাজনক।   নেটওয়ার্ক ফিক্যাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছিল। বিএনপি ‘সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ প্রবর্তন এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও সার উৎপাদনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সিপিবি শহরগুলোকে পরিচ্ছন্ন ও বসবাসযোগ্য করতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা বলেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সকল শিল্পকারখানায় ইটিপিস্থাপন বাধ্যতামূলক করার অঙ্গীকার করেছে। এটি জলাশয়ের দূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।   অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়াশ খাতে বিনিয়োগ একটি উচ্চফলনশীল পদক্ষেপ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ওয়াশ পরিষেবাগুলিতে বিনিয়োগকৃত প্রতি ১ ডলারের বিপরীতে স্বাস্থ্য খরচ হ্রাস এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ৪.৩ ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক লাভ ফিরে আসে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে এই অর্থনৈতিক লাভজনক দিকটি তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা ওয়াশকে কেবল একটি ‘সামাজিক সেবা’ হিসেবে দেখেছে, যা আদতে একটি ‘অর্থনৈতিক বিনিয়োগ’।   জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর মূল চেতনা হলো বৈষম্যহীনতা। বাংলাদেশে বর্তমানে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার বিশাল ফারাক বিদ্যমান। জুলাই সনদের ৯ নম্বর পয়েন্টের আলোকে যদি ‘নিরাপদ পানির অধিকার’ মৌলিক অধিকারে উন্নীত হয়, যা ইতোমধ্যেই হাইকোর্ট বিভাগ নিশ্চিত করেছে, তবে রাষ্ট্র এই বৈষম্য দূর করতে বাধ্য থাকবে।   রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার ও জুলাই সনদের এই তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, দলগুলো ভৌত অবকাঠামো (নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ) নিয়ে যতটা সচেতন, গুণগত মান ও জেন্ডার সংবেদনশীলতা (মাসিক স্বাস্থ্যবিধি, ইক্যুইটি ইনডেক্স) নিয়ে ততটাই উদাসীন।   জুলাই সনদের সংস্কার অনুযায়ী স্থানীয় সরকারকে ওয়াশ বাজেটের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দিতে হবে। পিরিয়ড পভার্টি দূর করতে করছাড় ও বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসামগ্রী বিতরণের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে। জলবায়ু অর্থায়নের একটি বড় অংশ উপকূলীয় ওয়াশ অবকাঠামোতে বরাদ্দ করতে হবে।   নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (WASH) সবার মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করা হবে এবং শহর–গ্রাম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে বলে কথা দিয়েছে এনসিপি তাদের ইশতেহারে। তারা আরও বলেছে যে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য জেন্ডার–সংবেদনশীল WASH ও মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সুবিধা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হবে।   আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের উচিত হবে জুলাই সনদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রার্থীদের প্রশ্ন করা—আপনার উন্নয়ন পরিকল্পনায় আমার নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা কোথায়? রাজনৈতিক অঙ্গীকার যখন কেবল কাগজের ইশতেহার থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তখনই কেবল আমরা একটি প্রকৃত ‘মানবিক রাষ্ট্র’ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো।   লেখক: আইনজীবী এবং উন্নয়নকর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬ 0
আমীন আল রশীদ
ইতিহাসের সেরা না হোক, অন্তত ‘ভালো’ নির্বাচন হোক

জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রথম এবং দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ দুই নেত্রীকে (খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা) ছাড়া প্রথম নির্বাচন—যেটি ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হবে বলে একাধিকবার আশ্বাস দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস—সেই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলছে। আপনি যখন লেখাটি পড়ছেন, ততক্ষণে অনেকেই ভোট দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আগামীকাল অর্থাৎ শুক্রবার দুপুরের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পাওয়া যাবে।   গত ৮ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও আধুনিক অটোমেশন সিস্টেম ও একাধিক ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের কারণে দ্রুততম সময়ে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। যদিও দুর্গম কিছু এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে ফলাফল পেতে সামান্য বিলম্ব হতে পারে, তবে কোনোভাবেই তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে না। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনি পরিবেশ অনেক বেশি চমৎকার ও শান্তিপূর্ণ রয়েছে।   একই দিনে দুই ভোট   এবারের নির্বাচনে ফলাফল হবে দুটি। কারণ এবার একই দিনে দুটি নির্বাচন হচ্ছে। একটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অন্যটি জুলাই সনদ প্রশ্নে গণভোট।   ভোটারদের হাতে দুটি ব্যালট পেপার দেওয়া হচ্ছে। একটিতে তিনি জাতীয় নির্বাচনে তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন। আরেকটি জুলাই সনদে উল্লিখিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোয় তার সম্মতি আছে কিনা, সেই প্রশ্নে হ্যাঁ বা না সিল মারবেন। যদিও এই গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি ও সংশয়ের অন্ত নেই। এমনকি বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য সরকারের তরফে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া কাঙ্ক্ষিত ছিল, তাও চোখে পড়েনি। বরং ব্যালট পেপারে হ্যাঁ ও না দুটি অপশন থাকলেও সরকার শুরু থেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে প্রধান উপদেষ্টা নিজে এবং তার উপদেষ্টাগণ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর সাফাই গেয়েছেন, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি কর্মচারীদের হ্যাঁ বা না ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোকে আইনত দণ্ডনীয় বলেছে। তার মানে হ্যাঁ-না ভোটের প্রশ্নে সরকারের মধ্যেই দ্বিধা ও বিভ্রান্তি ছিল, আছে।   বাংলাদেশে অতীতের তিনটি গণভোটের অভিজ্ঞতা বলছে, গণভোটের ফলাফল আসলে পূর্বনির্ধারিতই থাকে। অর্থাৎ হ্যাঁ না ভোটে সাধারণত হ্যাঁ জয়ী হয়। কারণ ‘হ্যাঁ’ জিতলেই কেবল সরকার তার লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারে বা নিজের কর্মকাণ্ডে জনগণের বৈধতা বা সম্মতি আদায় করতে পারে।   তবে এবারের গণভোট যেহেতু হচ্ছে অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে এবং একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে, সুতরাং এবার গণভোটের ফলাফল নির্ধারিত নয় বা গণভোটের জনগণের মতামতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে, এটিই প্রত্যাশিত। যেসব প্রশ্নে গণভোট হচ্ছে, আশা করা যায় দেশের অধিকাংশ মানুষই সেসব সংস্কারের পক্ষে। সংস্কার মানে যদি হয় ইতিবাচক পরিবর্তন, তাহলে সেই পরিবর্তন কে না চায়? কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় এই সংস্কারের পক্ষে জনগণের মতামত নেওয়া হচ্ছে সেটি ত্রুটিপূর্ণ। অথচ এই ত্রুটি এড়িয়ে আগে নির্বাচন, তারপর সংসদে সংস্কার প্রস্তাবগুলো পাস করে গণভোটে দিলে এই বিতর্ক এড়ানো যেতো। তার আগে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ব্যাপারে জনগণকে সুস্পষ্টভাবে জানানো এবং এগুলো যে সত্যিই দেশের কল্যাণের জন্য করা হচ্ছে, সেই বিশ্বাস জনমনে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত ছিল। কেননা অধিকাংশ মানুষের কাছেই সংস্কার প্রস্তাবগুলো পরিষ্কার নয়। উপরন্তু এই ধারণাও জনমনে আছে যে, জুলাই সনদের মূল লক্ষ্য মুক্তিযেুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানকে পাল্টে দেওয়া এবং জুলাই অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। জুলাইযোদ্ধাদেরকে মুক্তিযাদ্ধাদের সমান করে তোলার চেষ্টা ইত্যাদি। সেইসাথে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ফ্যাক্টগুলোর বাইরে গিয়ে নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা গত দেড় বছর ধরে চলছে, সেটির আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্য গণভোট নেওয়া হচ্ছে—এমন ধারণাও জনমনে আছে। কিন্তু সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধভাবে জুলাই সনদ বা গণভোটের ব্যাপারে মানুষের মনে পরিষ্কার ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এটা ধারণা করাই যায় যে, বিপুল সংখ্যক মানুষ না বুঝেই গণভোটে হ্যাঁ বা না দেবেন। অনেকে পরিচিতজনের কথায় হ্যাঁ বা না দেবেন। অর্থাৎ সেখানে তার নিজের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে না। অনেকে হয়তো জটিলতা এড়ানোর জন্য গণভোটে অংশই নেবেন না। কেবল জাতীয় নির্বাচনের ব্যালটে সিল দেবেন।   এবার জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট নেওয়ার পেছনে সরকারের হয়তো এরকম একটি উদ্দেশ্য ছিল যে, জাতীয় নির্বাচনের পরে আবার একটি গণভোটে খুব বেশি মানুষ সাড়া দেবে না। তাই যেহেতু জাতীয় নির্বাচনের মানুষ ভোট দিতেই যাবে অতএব একই দিনে গণভোটের ব্যপারেও তাদের মতামত নেওয়া যায়। কিন্তু কাজটা সহজ করতে গিয়ে একটা বড় ধরনের ত্রুটি জিইয়ে রাখা হলো যা ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে পারে।   তারপরও দেশ ও মানুষের কল্যাণেই এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে—এই বিশ্বাস থেকে প্রত্যাশা করা যায় যে, প্রধান উপদেষ্টার ভাষায় এবার ‘ইতিহাসের সেরা নির্বাচন’ না হলেও অন্তত একটা ভালো নির্বাচন হবে। প্রসঙ্গত, গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ভবনে উন্নয়ন সহযোগীদের জন্য আয়োজিত ব্রিফিং শেষে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলারও বলেছিলেন, ‘এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন।’   ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন   ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন বলতে আসলে কী বুঝায়—সেটি অনেক বড় তর্ক। সেই তর্কে না গিয়েও এটা বলা যায় যে, ভালো নির্বাচন মানে হলো তফসিল ঘোষণার পর আগ্রহী সব প্রার্থী নির্বিঘ্নে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তারা রাজনৈতিক কারণ বা অন্য কোনোভাবে প্রভাবিত হবেন না। প্রতীক বরাদ্দের পরে প্রার্থীরা আচরণবিধি মেনে প্রচার-প্রচারণা চালাবেন এবং সেখানে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে যা নিশ্চিত করবে নির্বাচন কমিশন। কোনও প্রার্থীকে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার বা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে সরকারের কোনও বাহিনী চাপ প্রয়োগ করবে না। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ভোটের একটি সুন্দর ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় থাকবে। ভোটের দিন ভোটাররা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্ভয়ে ফিরবেন। জাল ভোট, কেন্দ্রদখল বা সহিংসতা হবে না। ভোট গণনায় কোনও ধরনের কারচুপি হবে না। কোনও নির্দিষ্ট প্রার্থীকে জয়ী করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা উৎসাহ দেখাবেন না বা এ বিষয়ে তাদের ওপর কোনও ধরনের রাষ্ট্রীয় চাপ থাকবে না। ভোটের ফলাফল ঘোষণার পরে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থী সেটি মেনে নেবেন।   অনেক সময় ভোট সুষ্ঠু বা শান্তিপূর্ণ হলেও সেখানেও কারচুপি হতে পারে। ভোটের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। সুতরাং সহিংসতামুক্ত নির্বাচন মানেই সেটি গ্রহণযোগ্য ভোট নাও হতে পারে। একটি নির্বাচনকে তখনই ভালো নির্বাচন বলা যায় যখন সেটি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশে বিগত দিনে হওয়া ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া আর কোনও নির্বাচনই বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। ওই তিনটি নির্বাচন নিয়েও পরাজিত দলের পক্ষ থেকে কিছু অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু ভালো নির্বাচনের সংজ্ঞা অনুযায়ী সেগুলো ছিল গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য।   গত তিনটি নির্বাচনে যে মানুষেরা ভোট দিতে পারেনি বা ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি, তারা এবার নিজের পছন্দের প্রার্থীকে কোনও ধরনের ভয়-ভীতি ও চাপমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পারলেই খুশি হবে। কেননা সংবিধান যে জনগণকে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক বলে ঘোষণা করেছে, সেই মালিকানা প্রয়োগের প্রধান উপায় যে ভোট—সেই ভোট দিতে না পারার ক্ষোভও যে আওয়ামী লীগের পতনের পেছনে বিরাট ভূমিকা রেখেছে, সে বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ কম। অতএব এবারও যদি মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে না পারে বা এবারও যদি সরকার নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে এবং কোনও একটি দল বা জোটকে জিতিয়ে আনার ব্যাপারে ভূমিকা রাখে—তাহলে দেশ যে সংকটের ভেতরে ছিল, তার চেয়ে বড় সংকটে পতিত হবে।   নির্বাচন কমিশন যতই নিরপেক্ষ থাকুক, নির্বাচন কেমন হবে সেটা পুরোপুরি নির্ভর করে ডিসি-এসপিদের ওপরেই। বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষে শতভাগ নিরপেক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব কিনা—সেটি অনেক পুরনো তর্ক। কেননা নির্বাচন কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যতই দলনিরপেক্ষ, সৎ, সাহসী ও যোগ্য হোন না কেন; মাঠ প্রশাসন যদি না চায়, তাহলে ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়। ভোট কেমন হবে, সেটি নির্ভর করে যে সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে; তারা কেমন ভোট চায়, তার ওপর। মাঠ প্রশাসন যেহেতু সরকার তথা নির্বাহী বিভাগের অধীন এবং নির্বাচন কমিশনের কথা না শুনলে যেহেতু তাদের কোনও শাস্তির ভয় নেই কিংবা শাস্তি হলেও নির্বাহী বিভাগ থেকে তার ‘সুরক্ষা’ ব্যবস্থার যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে; মাঠ প্রশাসন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশের বাইরে যাবে না। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন কী নির্দেশনা দিল, তার চেয়ে বড় কথা- সরকার বা নির্বাহী বিভাগ তাকে কী বলছে?   নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নেই। ভোট পরিচালনায় যে বিপুল সংখ্যক জনবল দরকার, সে পরিমাণ লোক তার নেই। ফলে তাকে পুরো নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্ভর করতে হয় নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারের ওপর। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ বলছে, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন ভোট পরিচালনার জন্য সরকারের কাছে যে সহায়তা চাইবে, সরকার সেটি দিতে বাধ্য। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে যারা থাকেন তারা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কর্মী নন। বরং তারা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োজিত এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্তা ব্যক্তিরা যা বলবেন, যে নির্দেশনা দেবেন, তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং তারা কতটা নিরপেক্ষভাবে ভয়-ভীতি ও লোভের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন, তার ওপর নির্ভর নির্বাচনটি কেমন হবে। অর্থাৎ মাঠ প্রশাসন যদি ইসিকে সহায়তা না করে; তারা যদি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর মতো আচরণ করে; মাঠ প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ না থাকে বা থাকতে না পারে— তাহলে খুব ভালো নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়।   ধরা যাক, সিইসি ও কমিশনার হিসেবে দেশের সবচেয়ে মেধাবী, যোগ্য, সৎ ও সাহসী মানুষেরাই নিয়োগ পেলেন। কিন্তু একটি নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করে না। পুরো সিস্টেম যদি ভালো নির্বাচনের সহায়ক না হয়, তাহলে একজন সিইসি এবং চারজন কমিশনারের পক্ষে কিছুই করার নেই। তাদের নিয়ত যদি ‘সহিহ’ হোক না কেন, পুরো সিস্টেম যদি তাদেরকে সহযোগিতা না করে তাহলে তাদের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়।   যদি সরকার তথা নির্বাহী বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে পুরোপুরি সহযোগিতা না দেয়; যদি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা আচরণবিধি মেনে দায়িত্বশীল আচরণ না করেন, তাহলে শুধুমাত্র পুলিশিং বা বিচার করে নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক রাখা সম্ভব নয়।   বিগত তিনটি নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত খারাপ নির্বাচন হয়েছে, এ বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ কম। কিন্তু এই খারাপ নির্বাচনের দায় শুধু ওই তিন সিইসির নয়। এটা পুরো নির্বাচনি ব্যবস্থার ত্রুটি।   মনে রাখতে হবে, পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়াটি শান্তিপূর্ণ হওয়ার পরও সেই ভোট গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। যেমন- একটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের ফল ঘোষণা পর্যন্ত কোনও হানাহানি হলো না, কোনও প্রার্থীর প্রচারে বাধা দেওয়া হলো না, কাউকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ দেওয়া হলো না; কিন্তু দেখা গেলো মানুষ ভোটকেন্দ্রে যায়নি বা ভোটার উপস্থিতি খুবই কম।   যেহেতু সংবিধানে ন্যূনতম ভোটের বিধান নেই, অর্থাৎ নির্বাচনে কত শতাংশ ভোট পেতে হবে এবং প্রাপ্ত ভোটের কত শতাংশ না পেলে জয়ী বলা যাবে না—এমন কোনও বিধান যেহেতু সংবিধানে বা নির্বাচনি আইনে (আরপিও) নেই, ফলে অনেক সময় দেখা গেছে ১০ শতাংশ ভোট পেয়েও অনেকে এমপি বা মেয়র নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এটিকে সুষ্ঠু ভোট বলা হলেও কোনও অর্থেই ভালো নির্বাচন বলা যায় না। আবার বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেলে সেখানে কোনও ভোটই হয় না। ভোট না হলে সেখানো কোনও সংঘাত হয় না। তাতে ওই ভোটটি শান্তিপূর্ণ বা সংঘাতমুক্ত হলো বটে, কিন্তু এটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নয়।   পরিশেষে, ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন প্রয়োজন নেই, বরং অন্তর্বর্তী সরকার যদি নির্বাচনে কোনও ধরনের প্রভাব বিস্তার না করে বা করতে না পারে; সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মাঠ প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ ও নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করে—তাহলেই একটা ভালো নির্বাচন করা সম্ভব এবং সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ যাদেরকে চাইবে তারা যদি সরকার গঠন করতে পারে, তাহলে সেটিই হবে দেশ ও জাতির জন্য বিরাট পাওয়া।   লেখক: সাংবাদিক    

নিজস্ব প্রতিবেদক ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬ 0
Popular post
ফারুকীর সম্পদ কমেছে, তিশার বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি: সম্পদ বিবরণী ঘিরে আলোচনা

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।

সংসার সামলাতে অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন রোজিনা

বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।

বাংলাদেশে ঐতিহাসিক নির্বাচন: বিএনপি এগিয়ে, জামায়াতের উত্থান ও তরুণ ভোটারদের প্রভাব

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

গাজায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনে

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ।  ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী।    ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে,  স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ  বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”

কুড়িগ্রামের তাজু ভাই ২.০: ‘সরকারি রেটে জিলাপি’ প্রশ্নে ভাইরাল এক নির্মাণশ্রমিকের গল্প

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে।  কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে।  কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।  কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি।  মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।

অর্থনীতি

ইসলামী ব্যাংক,

ইসলামী ব্যাংকে আস্থা সংকট কেন কাটছে না?: দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে ঘিরে নতুন প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ২২, ২০২৬ 0




অপরাধ

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর বিরুদ্ধে ৩০ বিলিয়ন ডলার জালিয়াতি ও অর্থপাচার অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২৪, ২০২৬ 0




কৃষি ও জলবায়ু

ধান

শেরপুরে বোরো ধানের দাম কমে লোকসানে কৃষকরা, উৎপাদন খরচও উঠছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ৬, ২০২৬ 0