ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সরকারি দপ্তরে বদলি ও পদায়ন কি প্রশাসনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে হয়, নাকি গুরুত্বপূর্ণ পদে বসতে গুনতে হয় লাখ লাখ টাকা? শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ইইডি) দরপত্র, নিয়োগ ও নির্মাণকাজের অনিয়মের অভিযোগের ক্ষেত্রে জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত হচ্ছে? আর অধিদপ্তরের প্রধানের দায়িত্বই বা কতটা কার্যকর? শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে ওঠা একাধিক অভিযোগ এসব প্রশ্ন সামনে এনেছে। তাঁর বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেন, দরপত্র অনুমোদনে কথিত পার্সেন্টেজ আদায়, ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে প্রভাব বিস্তার এবং অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগে অনিয়ম এবং অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগগুলো বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগ করেছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বদলি ও পদায়ন ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তারেক আনোয়ার জাহেদী শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় থেকেই বদলি ও পদায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একটি বদলি আদেশে কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে বদলি এবং কয়েকজনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ওই আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতার অভিযোগ সামনে আসে। সে সময় তারেক আনোয়ার জাহেদীকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগেও এই গোষ্ঠী বদলি-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের আশ্বাস দিয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ নেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের সুযোগে দ্রুতগতিতে বড় অঙ্কের বদলি-বাণিজ্য হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের তালিকা, তাঁদের আগের ও পরের কর্মস্থল, বদলির আবেদন, আদেশ জারির সময় এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলীর দাবি, উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি এসব নথি পর্যালোচনা করলে বদলি ও পদায়ন ঘিরে অনিয়মের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। অধিদপ্তরসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বদলি ও পদায়নের কারণে কর্মকর্তারা বিভিন্ন বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়ন ঘিরে প্রভাবশালী কর্মকর্তা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি নেটওয়ার্ক কাজ করছে বলেও তাঁরা দাবি করেছেন। ওই নেটওয়ার্কের সঙ্গে প্রধান প্রকৌশলীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে একই ধরনের প্রশ্ন বদলি আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন ২০২৫ সালের নভেম্বরেও সামনে আসে। সে সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বদলি আদেশ বাস্তবায়নে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভেতরে বাধা তৈরির অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো তখন একটি বদলি-সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার কথা বলেছিল। ওই সময় তারেক আনোয়ার জাহেদীর সঙ্গে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বদলি ও পদায়ন ঘিরে বারবার একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, আদেশ বাস্তবায়নের নথি এবং কর্মকর্তাদের কর্মস্থল পরিবর্তনের পেছনের কারণগুলো খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। নিচের সারির কর্মীদের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরাসরি অর্থ গ্রহণের ঝুঁকি এড়াতে নিচের পর্যায়ের কর্মীদের ব্যবহার করে অর্থ আদায় করা হতো। প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে কর্মরত জসিম নামের এক কর্মচারীকে ঘিরেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, স্ত্রীর নামে লাইসেন্স খুলে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা এবং নামে-বেনামে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁদের আরও দাবি, বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলীর নজরে আসার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি এ ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে। সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগে অনিয়মের প্রশ্ন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ নিয়েও আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় কয়েকজন সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কারা কীভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষার ফল, নিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদন, অভিযোগের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নির্মাণকাজে বিলম্ব, নিম্নমানের উপকরণ ও অর্থ পরিশোধের অভিযোগ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, যেসব প্রকল্পের কাজ নয় মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা, সেগুলোর কোনো কোনোটি চার বছরেও শেষ হয়নি। অথচ এসব প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশ পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, এসব অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই চিঠির জবাবে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়নি বলেও তাঁদের অভিযোগ। এসব দাবি যাচাইয়ের জন্য প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয়, কার্যাদেশ, নির্ধারিত সময়সীমা, ঠিকাদারকে দেওয়া বিল, কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন, গুণগত মান পরীক্ষার ফল এবং মন্ত্রণালয়ের চিঠিপত্র পর্যালোচনা করা জরুরি। প্রকল্পের কাজ দেরিতে শেষ হওয়া কিংবা নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা থেকেই দুর্নীতি প্রমাণিত হয় না। তবে দীর্ঘদিন কাজ অসমাপ্ত থাকা এবং অগ্রগতির তুলনায় অর্থ পরিশোধের অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। অধিদপ্তরের অতীতের নিয়োগ ও দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত একটি সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় রয়েছে বলেও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তাধীন থাকার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। অধীনস্থদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ: নথিতে যা আছে তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে অভিযোগের পাশাপাশি অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপের নথিও সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত আবেদন করা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে তারেক আনোয়ার জাহেদী তদন্তের নির্দেশ দেন এবং সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন চাওয়া হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অধিদপ্তরের অনিয়মের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগের বিপরীতে অন্তত একটি ঘটনায় তাঁর স্বাক্ষরিত তদন্ত-নির্দেশের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে ভিডিও, তদন্ত কমিটিতে প্রধান প্রকৌশলী ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের দপ্তরে অর্থ লেনদেনের একটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিডিওতে টেবিলের ওপর টাকা রাখা দেখা যায় এবং একজনকে ‘স্যারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা রেখে যান’ বলতে শোনা যায়। হাসান শওকত অর্থগুলো ঠিকাদারদের বলে দাবি করেন এবং এ ঘটনায় নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন। একই প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে আরও কিছু অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির সভাপতি করা হয় অতিরিক্ত সচিব ড. সরদার মো. কেরামত আলীকে। সদস্য হিসেবে রাখা হয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী এবং উপসচিব এ এস এম শাহরিয়ার জাহানকে। অর্থাৎ, অধিদপ্তরের একজন প্রকৌশলীর দপ্তরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের জন্য গঠিত কমিটিতে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান সেই অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, যাঁকে ঘিরেও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তাকে তদন্ত কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার কারণে তদন্তটি পক্ষপাতদুষ্ট—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোরও অবকাশ নেই। কমিটির কার্যপরিধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, সংশ্লিষ্ট সদস্যদের ভূমিকা এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেই এ বিষয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। হাসান শওকতের দপ্তরের অর্থ লেনদেনের ভিডিও নিয়ে তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেছিলেন, ভিডিওটি তখনও তাঁর নজরে আসেনি। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন। দরপত্র বাতিল ও পুনঃদরপত্রে ঘুষের অভিযোগ ২০২৬ সালের আগস্টে সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে বাড্ডার রহিমুল্লাহ মোল্লা মাদরাসার উন্নয়নকাজের দরপত্র ঘিরে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও ওঠে। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, প্রথম দরপত্রে ক্লাস ওয়ান ট্রেডার্স ২ কোটি ২ লাখ ৮ হাজার ৬১ টাকা দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজটি পায়। পরে দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয় এবং তালুকদার এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারী ঠিকাদারের দাবি, তাঁদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কাজ দেওয়া হয়নি এবং অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি। মনিরুজ্জামান অভিযোগ অস্বীকার করেন। এ ঘটনায়ও তারেক আনোয়ার জাহেদী তদন্তের নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে। দরপত্র বাতিল ও পুনঃদরপত্র আহ্বান নিজে থেকেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। এ জন্য দরপত্র বাতিলের লিখিত কারণ, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, পুনঃদরপত্রের শর্ত, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা এবং অর্থ লেনদেনের প্রমাণ যাচাই করা জরুরি। এই ঘটনাগুলো থেকে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে তারেক আনোয়ার জাহেদীর নেওয়া তদন্তের নির্দেশগুলো কি কার্যকর অনুসন্ধান ও জবাবদিহিতে রূপ নিচ্ছে, নাকি অভিযোগগুলো তদন্তের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকছে?এর উত্তর পেতে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন, গৃহীত ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দরপত্রের পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ বা যাচাই করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সম্পদ নিয়ে অভিযোগ তারেক আনোয়ার জাহেদীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে পদে বহাল থাকার চেষ্টা করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের পদ ধরে রাখতে তিনি সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও তদবির করেছেন। তাঁর নিজ এলাকার কয়েকজন ব্যক্তির বক্তব্যের বরাত দিয়ে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁর পরিবার রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিল এবং ওই সময়ে তিনি বিপুল সম্পদ গড়ে তোলেন। তাঁর নামে-বেনামে সম্পদ এবং বিদেশে সম্পদ থাকার দাবিও করেছেন অভিযোগকারীরা। আরেক কর্মকর্তার দাবি, তারেক আনোয়ার জাহেদী দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলি বা পদায়ন পেয়েছেন। দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে প্রত্যাশা তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একজন দুদক কর্মকর্তার বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। তারেক আনোয়ার জাহেদীর বিষয়েও অভিযোগ পাওয়া গেলে অনুসন্ধানের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। জবাবদিহির প্রশ্নে যে নথিগুলো জরুরি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এ প্রতিষ্ঠানের বদলি-পদায়ন, নিয়োগ, দরপত্র ও নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ তাই শুধু প্রশাসনিক বিতর্ক নয়; এর সঙ্গে সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর মানও জড়িত। তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে অন্তত কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: বদলি ও পদায়নের পূর্ণাঙ্গ নথি, কথিত অর্থ লেনদেনের আর্থিক প্রমাণ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও লাইসেন্স, নিয়োগপ্রক্রিয়ার কাগজপত্র, প্রকল্পের অগ্রগতি ও বিল পরিশোধের হিসাব এবং অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন। এসব নথি যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব। প্রশ্নটি তাই শেষ পর্যন্ত জবাবদিহির: শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিয়োগ ও দরপত্রপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? অভিযোগের তদন্তগুলো কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? আর অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এসব প্রশ্নের নথিভিত্তিক উত্তরই নির্ধারণ করবে, অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি আরও বিস্তৃত প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অনিয়মের ইঙ্গিত।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।