প্রশ্নের ছবি, হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ও লাখ লাখ টাকার চুক্তি—তদন্তে উঠে আসছে নিয়োগ জালিয়াতির কৌশল; সরকারি তিন দপ্তরের পাঁচ কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার দাবি এসআরবির ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১৬০টির বেশি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, প্রবেশপত্র, মূল সনদপত্র, ব্যাংকের চেক, মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। এসআরবির দাবি, চক্রটি সরকারি চাকরির প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির মাধ্যমে প্রার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করত। কিন্তু সাতজনকে গ্রেপ্তারের পরও তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর মেলেনি—যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশ্নপত্রটি তাঁদের কাছে পৌঁছাল কীভাবে? প্রশ্নপত্রের মূল উৎস কে? নিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি কি এর সঙ্গে জড়িত, নাকি অন্য কোনো মাধ্যমে প্রশ্নপত্র তাঁদের হাতে এসেছে? এসআরবির দেওয়া তথ্যে, গ্রেপ্তার সাতজনের কেউই যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মচারী নন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মচারী। বাকি দুজন চাকরিপ্রত্যাশী। ফলে প্রশ্নপত্রের ছবি সংগ্রহ, সেটি স্পষ্ট করা, উত্তর তৈরি এবং পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তাঁরা কীভাবে যুক্ত ছিলেন, সেই সঙ্গে প্রশ্নপত্রের মূল উৎসের পরিচয়—সবই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির এসআরবি-৩-এর আর্টিলারি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন গ্রেপ্তার ও প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় চক্রটির কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরেন। তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস ও চক্রের মূল হোতাকে শনাক্ত করা যায়নি বলে জানান তিনি। সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে তদন্ত চলছে বলে জানানো হয়েছে। ভোর সাড়ে ৪টায় প্রশ্নের ছবি, সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে পাঠানো হয় অন্যজনকে এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিয়োগ পরীক্ষার দিন ভোর সাড়ে ৪টার দিকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ একটি প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে তিনি ছবিটি এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীরের কাছে পাঠান। জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে স্পষ্ট প্রশ্নপত্র পাওয়ার পর নূর মোহাম্মদ উত্তর তৈরি করেন। এরপর বিতরণকারীদের মাধ্যমে সেগুলো পরীক্ষার্থীদের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করেছে এসআরবি। এই বর্ণনায় প্রশ্নপত্রের ছবি পাওয়া থেকে শুরু করে উত্তর তৈরি ও বিতরণের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার কথা উঠে এসেছে। কিন্তু অস্পষ্ট ছবিটি নূর মোহাম্মদ কোথা থেকে পেয়েছিলেন, কে তাঁকে সেটি পাঠিয়েছিলেন এবং জাহাঙ্গীর কীভাবে স্পষ্ট প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন—এসব বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের উৎস শনাক্ত করতে এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রশ্নপত্রের ছবি পাওয়া বা সেটি অন্যের কাছে পাঠানোর তথ্য একাই প্রমাণ করে না, প্রশ্নপত্রটি প্রথম কোথা থেকে ফাঁস হয়েছিল কিংবা নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভেতরে কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না। সরকারি তিন দপ্তরের পাঁচ কর্মচারী, বাকি দুজন চাকরিপ্রত্যাশী সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার সাতজনের পরিচয় প্রকাশ করে এসআরবি। তাঁরা হলেন— ১. মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর। ২. এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর। ৩. নূর মোহাম্মদ (৩০), এনবিআরের অফিস সহায়ক। ৪. জাহাঙ্গীর (৩৮), এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর। ৫. আসাদুল ইসলাম (৩৩), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক। ৬. মো. মফিজুল ইসলাম (২৩), চাকরিপ্রত্যাশী। ৭. মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২), চাকরিপ্রত্যাশী। এসআরবির দাবি, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির সঙ্গে এই চক্রের সদস্যরা গত তিন থেকে চার বছর ধরে জড়িত ছিলেন। তবে কোন কোন নিয়োগ পরীক্ষায় তাঁরা জালিয়াতি করেছেন, কতজন প্রার্থী তাঁদের কাছ থেকে প্রশ্ন বা উত্তর নিয়েছেন এবং এ ঘটনায় আর কারা জড়িত—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এখানে তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরকারি তিনটি দপ্তরের কর্মচারীদের মধ্যে কার কী ভূমিকা ছিল। তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, কে প্রশ্ন সংগ্রহ করেছেন, কে উত্তর তৈরি করেছেন এবং কে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ বা অর্থ লেনদেন করেছেন—এসব পৃথকভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। প্রশ্নের জন্য ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে ২০ লাখ পর্যন্ত এসআরবির ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি চাকরিপ্রত্যাশীদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহের চুক্তি করত। তৃতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির জন্য প্রার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির জন্য ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা নেওয়া হতো বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। চুক্তির শর্ত নিশ্চিত করতে ব্যবহার করা হতো নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও ব্যাংকের চেক। জামানত হিসেবে প্রার্থীদের মূল শিক্ষাগত সনদপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও রেখে দেওয়া হতো বলে জানিয়েছে এসআরবি। অভিযোগ অনুযায়ী, পরীক্ষার হলে উত্তর সরবরাহের জন্য পরীক্ষার্থীদের কানে অথবা চুলের মধ্যে সূক্ষ্ম ইলেকট্রনিক ডিভাইস লুকিয়ে দেওয়া হতো। এসব ডিভাইসের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কাছে উত্তর পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১৬০টির বেশি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, ১৯টি প্রবেশপত্র, ১০টি মূল সনদপত্র, ব্যাংকের চেক, মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা জব্দের কথা জানিয়েছে এসআরবি। পাঁচ এলাকায় অভিযান, কিন্তু মূল উৎসের সন্ধান মেলেনি এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪, ১৫ ও ১৬ অক্টোবর রাজধানীর মতিঝিল, উত্তরখান, মিরপুর, সাভার ও মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া প্রবেশপত্র, সনদপত্র, স্ট্যাম্প ও ব্যাংকের চেক চক্রটির কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। বিশেষ করে, এসব নথিতে থাকা নাম, পরীক্ষার বিবরণ, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং মোবাইল ফোনের যোগাযোগের রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস শনাক্ত না হওয়ায় তদন্তের কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত। প্রশ্নপত্র প্রথম কার হাতে ছিল, কীভাবে সেটির ছবি তৈরি হলো, হোয়াটসঅ্যাপে কারা সেটি আদান-প্রদান করেছেন এবং পরীক্ষার আগে উত্তর কীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল—এসব তথ্যের সমন্বিত ব্যাখ্যা ছাড়া পুরো চক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। এসআরবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে তদন্ত চলছে। ১০ অক্টোবরের পরীক্ষা স্থগিত, নতুন পরীক্ষাতেও আস্থার সংকট যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে এর আগেও উত্তেজনা তৈরি হয়। গত ১০ অক্টোবর পরীক্ষার্থীরা রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরে ওই দিনই পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। পরিবর্তিত তারিখ অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবর শুক্রবার পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং নিয়োগ পরীক্ষার ওপর আস্থার সংকটের কারণে অনেক পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ শুধু পরীক্ষার স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না; এর প্রভাব পড়ে যোগ্য প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ, সরকারি নিয়োগব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির ওপরও। বিশেষ করে, চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা আর্থিক প্রতারণার পাশাপাশি মেধাভিত্তিক নিয়োগের নীতির জন্যও গুরুতর হুমকি। এ কারণে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ তদন্তের পাশাপাশি পরীক্ষা গ্রহণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। তদন্তে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন এসআরবির সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে— প্রশ্নপত্রের মূল উৎস কে? নূর মোহাম্মদ ভোর সাড়ে ৪টার দিকে যে অস্পষ্ট ছবি পেয়েছিলেন, সেটি কে পাঠিয়েছিলেন এবং মূল প্রশ্নপত্র কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল? জাহাঙ্গীর কীভাবে প্রশ্নপত্র স্পষ্ট করলেন? তাঁর কাছে থাকা প্রশ্নপত্রের উৎস কী ছিল এবং সেটি মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে কীভাবে মিলে গেল? যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ভেতরে কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি? গ্রেপ্তার সাতজনের কেউ এই অধিদপ্তরের কর্মচারী নন বলে জানানো হয়েছে। তাহলে প্রশ্নপত্র তাঁদের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাব্য পথ কী ছিল? কতজন প্রার্থী অর্থ দিয়েছেন? ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা নেওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, তার পক্ষে কী ধরনের আর্থিক নথি, যোগাযোগের রেকর্ড বা সাক্ষ্য রয়েছে? আগের তিন থেকে চার বছরের জালিয়াতির অভিযোগ কতটা বিস্তৃত? চক্রটি অন্য কোন কোন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় জড়িত ছিল এবং সেসব ঘটনায় কোনো মামলা বা তদন্ত হয়েছে কি না? নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত হবে? প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পর পরীক্ষা, ফলাফল ও পরবর্তী নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে শুধু সাতজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগই নয়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের নেটওয়ার্কের পরিধি এবং নিয়োগব্যবস্থার সম্ভাব্য দুর্বলতাও স্পষ্ট হতে পারে। সামনে এখন উৎস শনাক্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু গ্রেপ্তারই তদন্তের শেষ ধাপ নয়। প্রশ্নপত্রের উৎস, অর্থ লেনদেনের প্রকৃত চিত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অভিযোগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এসআরবি জানিয়েছে, মূল উৎস ও অন্য জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। সেই তদন্তে প্রশ্নপত্রের ডিজিটাল উৎস, হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগ, উদ্ধার হওয়া নথি এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে পরীক্ষার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরিষ্কার ব্যাখ্যা ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা গেলেও মূল উৎস অজানা থেকে গেলে পুরো নেটওয়ার্কের জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে গ্রেপ্তার সাতজনের বাইরে আর কারা জড়িত, আর সরকারি নিয়োগের প্রশ্নপত্র তাঁদের হাতে পৌঁছাল কীভাবে? তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতিতেই মিলতে পারে সেই উত্তর।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।