ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন:
সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। দেশটির কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ওই দুই বাংলাদেশিকে আটক করা হয়েছিল। পরে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। কিন্তু এত বড় একটি মামলার বিচার ও শাস্তি কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশের দূতাবাস বা কনস্যুলেট কিছুই জানত না—এমন দাবি ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে, বিদেশে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী মিশনগুলোর ভূমিকা আসলে কতটা কার্যকর।
ঘটনার বিস্তারিত জানতে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ সরকার। রোববার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়। এর আগে সৌদি সরকারের কাছে পাঠানো কূটনৈতিক পত্রের একটি অনুলিপিও রাষ্ট্রদূতের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছেন, রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠানোর ঘটনাটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তলব’ না বলে তথ্য জানার উদ্দেশ্যে বৈঠক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে কূটনৈতিক এই তৎপরতার মধ্যেও বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে—দুই বাংলাদেশির বিচার দীর্ঘদিন ধরে চলার পরও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মিশন তাঁদের বিষয়ে অবগত ছিল না কেন? আর সত্যিই যদি সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে কিছু না জানিয়ে থাকে, তাহলে সেটি কি কেবল যোগাযোগের ঘাটতি, নাকি কনস্যুলার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আরও গভীর কোনো দুর্বলতার ইঙ্গিত?
সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের আটক করেছিল।
খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর বৃহস্পতিবার জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানতে চায়। দুই ব্যক্তির নাগরিকত্ব, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও শনিবার বিকেলে জানান, মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বা তা কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য পায়নি। তবে বিষয়টি জানার জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবের নিজস্ব আইনি কাঠামো রয়েছে। সেই কাঠামো অনুযায়ী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার ও সাজা দেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সংবাদমাধ্যমের খবরের ভিত্তিতে তথ্য চাওয়া কি যথেষ্ট? নাকি বিদেশে বিচারাধীন বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখার যে দায়িত্ব একটি কূটনৈতিক মিশনের রয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন?
সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ মনে করেন, এমন একটি বড় মামলার বিষয়ে দূতাবাসের অজ্ঞতার দাবি সহজে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থায় কোনো মামলার বিচার ও শাস্তি কার্যকর হওয়ার আগে দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। ফলে বিষয়টি জানার সুযোগ একেবারেই ছিল না—এমন দাবি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
বিবিসি বাংলাকে গোলাম মসিহ বলেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশের রিয়াদ দূতাবাস ও জেদ্দা কনস্যুলেটে আইনগত সহায়তা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে কর্মকর্তারা রয়েছেন। তাঁদের কাজের মধ্যে আদালত ও কারাগারে যোগাযোগ রাখা এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের মামলার বিষয়ে খোঁজ নেওয়াও অন্তর্ভুক্ত।
তাঁর বক্তব্য, মিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
গোলাম মসিহের মতে, দুই বাংলাদেশির বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চলার পাশাপাশি স্থানীয় সূত্র থেকেও তথ্য পাওয়ার সুযোগ ছিল। ফলে এমন একটি গুরুতর ঘটনা সম্পর্কে দূতাবাসের কিছুই জানা ছিল না—এ দাবি যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে তাঁর বক্তব্য দূতাবাসের ব্যর্থতা প্রমাণ করে না; বরং দায়িত্ব পালনের ধরন, তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল কি না, তা অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহের বক্তব্যের বিপরীতে আরেক সাবেক কূটনীতিক মাহফুজুর রহমান মনে করেন, বিদেশে কোনো নাগরিক গ্রেপ্তার হলেই তাঁর দেশের দূতাবাসকে জানানো হবে—এমন নিশ্চয়তা সব ক্ষেত্রে নেই।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বিদেশে গ্রেপ্তার হলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি নিজ দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান কি না। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি দূতাবাসকে জানাতে না চান, তাহলে স্বাগতিক দেশের কর্তৃপক্ষ সব পরিস্থিতিতে মিশনকে অবহিত নাও করতে পারে।
তাঁর মতে, সৌদি আরবের এই ঘটনাতেও এমন কিছু ঘটেছে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। বিষয়টি পরিষ্কার করতে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য সামনে আনে। কোনো নাগরিকের গ্রেপ্তারের তথ্য দূতাবাসকে জানানো না হলে সেটি এক ধরনের পরিস্থিতি; আর দীর্ঘদিন ধরে চলা বিচারপ্রক্রিয়া, সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ড এবং শাস্তি কার্যকরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়েও মিশন কোনো তথ্য না পেলে সেটি ভিন্ন প্রশ্ন তৈরি করে।
তবে দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে বাস্তবে কোন পরিস্থিতি ঘটেছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁরা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগে অনীহা জানিয়েছিলেন কি না, সৌদি কর্তৃপক্ষ কোনো পর্যায়ে বাংলাদেশকে জানিয়েছিল কি না, কিংবা মিশন অন্য কোনো সূত্র থেকে তথ্য পেয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, দুই বাংলাদেশির বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চলছিল বলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাধিক সূত্র দাবি করেছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতে বাংলাদেশিরাই দোভাষী হিসেবে কাজ করেছেন।
যদি এসব তথ্য যাচাই করে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তদন্তের প্রশ্ন আরও নির্দিষ্ট হবে: সংশ্লিষ্ট আদালতে বাংলাদেশি দোভাষীদের উপস্থিতি, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রবাসী কমিউনিটির মাধ্যমে তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মিশন কীভাবে পুরোপুরি অজ্ঞাত থাকল?
অবশ্য আদালতে বাংলাদেশি দোভাষী কাজ করেছেন—এ তথ্য একাই প্রমাণ করে না যে দূতাবাস আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার বিষয়ে জানত। একইভাবে প্রবাসীদের মধ্যে খবর প্রচলিত থাকা মানেই রাষ্ট্রীয় মিশনকে তথ্য জানানো হয়েছিল, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।
তবু এ ধরনের তথ্য যাচাই করা জরুরি। কারণ দূতাবাসের দায়িত্ব শুধু স্বাগতিক দেশের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা নয়; বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের গুরুতর আইনি সংকটের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সহায়তার সুযোগ কীভাবে কাজে লাগানো হয়েছে, সেটিও মূল্যায়নের বিষয়।
ঘটনাটি সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, সৌদি আরব কি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে তথ্য না জানিয়ে কূটনৈতিক নিয়ম লঙ্ঘন করেছে?
এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে, কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন, ১৯৬৩-এর ৩৬ অনুচ্ছেদ বিদেশে আটক বা কারাবন্দী বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে কী বলে।
এই অনুচ্ছেদে আটক বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে তাঁর দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের যোগাযোগের অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ ও তাঁকে সহায়তা করার সুযোগের কথা বলা হয়েছে। আটক ব্যক্তি অনুরোধ করলে তাঁকে কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কে অবহিত করা এবং তাঁর দেশের কনস্যুলার পোস্টকে জানানোও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে এই বিধানের প্রয়োগে আটক ব্যক্তির ইচ্ছা, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা এবং ঘটনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নাগরিকের গ্রেপ্তারের খবর না পাওয়া, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত না থাকা এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য না পাওয়া—এগুলো একই আইনি প্রশ্ন নয়।
তাই শুধু বাংলাদেশকে মৃত্যুদণ্ডের খবর আগে জানানো হয়নি—এ তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। এর জন্য জানতে হবে, দুই বাংলাদেশিকে আটক করার সময় তাঁদের কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কে কী জানানো হয়েছিল, তাঁরা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগে সম্মতি দিয়েছিলেন কি না, সৌদি কর্তৃপক্ষ কোনো পর্যায়ে বাংলাদেশি মিশনকে অবহিত করেছিল কি না এবং এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় বাধ্যবাধকতা কী ছিল।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ: কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার থাকলেও তা বিদেশি দেশের বিচারিক সিদ্ধান্ত বাতিল করার ক্ষমতা দেয় না। তবে নাগরিকের অধিকার সম্পর্কে অবহিত থাকা, আইনগত সহায়তার সুযোগ তৈরি করা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা করার মতো বিষয়ে দূতাবাসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সুতরাং ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ নির্ধারণে আবেগ বা অনুমানের পরিবর্তে নথি, যোগাযোগের রেকর্ড এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা নতুন নয়। কয়েক বছর আগে নিয়োগকর্তাকে হত্যার মামলায় প্রায় ছয় বছর কারাগারে থাকার পর বাংলাদেশের নরসিংদীর বাসিন্দা ছিদ্দিক মিয়ার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল।
পরে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে তাঁর শাস্তি মওকুফ হয়। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
এই ঘটনা দেখায়, বিদেশে গুরুতর অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আইনগত সহায়তার উদ্যোগ কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ছিদ্দিক মিয়ার মামলার সঙ্গে মক্কার সাম্প্রতিক ঘটনার সরাসরি তুলনা করার আগে দুই মামলার অভিযোগ, বিচারিক পরিস্থিতি, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং শাস্তির পর্যায় বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি ঘটনায় দূতাবাসের উদ্যোগ সফল হয়েছিল বলে অন্য প্রতিটি ঘটনায় একই ফল সম্ভব—এমন সিদ্ধান্তও টানা যায় না।
তবু অতীতের এই অভিজ্ঞতা নতুন করে প্রশ্ন তোলে: মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ঝুঁকি রয়েছে—এমন মামলাগুলো শনাক্ত করা এবং সেগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশের মিশনগুলোর কী ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে?
সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা ও বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতেও এক দিনে সাতজনের শিরশ্ছেদের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বা নির্দিষ্ট কোনো মামলার বিষয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অবস্থান বিশ্লেষণের সময় নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য ব্যবহার করা জরুরি। একইভাবে মক্কার দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি এবং আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ নথি না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের মামলার আইনি দিক নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয় শুধু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নয়; বরং প্রবাসী নাগরিকদের অধিকার রক্ষা, তাঁদের পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছানো এবং গুরুতর মামলায় যথাসময়ে কনস্যুলার সহায়তার সুযোগ নিশ্চিত করা।
মক্কার দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় দায় নির্ধারণ করতে হলে অন্তত কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রথমত, আটক ও বিচারপ্রক্রিয়ার নথি: দুই বাংলাদেশিকে কবে আটক করা হয়েছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী ছিল এবং বিচার কোন পর্যায়ে কত দিন ধরে চলেছে?
দ্বিতীয়ত, কনস্যুলার যোগাযোগ: আটক হওয়ার সময় তাঁদের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং তাঁরা নিজেরা যোগাযোগে সম্মতি বা অনীহা জানিয়েছিলেন কি না?
তৃতীয়ত, সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্যপ্রদান: সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটকে কোনো পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল কি না। জানিয়ে থাকলে কখন, কীভাবে এবং কী তথ্য দেওয়া হয়েছিল?
চতুর্থত, মিশনের নিজস্ব তৎপরতা: রিয়াদ দূতাবাস ও জেদ্দা কনস্যুলেটের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আদালত, কারাগার, স্থানীয় আইনজীবী, দোভাষী কিংবা প্রবাসী কমিউনিটির মাধ্যমে মামলার বিষয়ে কোনো তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন কি না?
পঞ্চমত, অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি: বাংলাদেশি মিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে আগে কোনো তথ্য এসে থাকলে তা কীভাবে নথিভুক্ত ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল? আর কোনো তথ্য না এসে থাকলে তা শনাক্ত করার বিদ্যমান ব্যবস্থায় ঘাটতি ছিল কি না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া একতরফাভাবে সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক বিধি লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করা কিংবা বাংলাদেশের দূতাবাসকে সরাসরি দায়িত্বে অবহেলার জন্য অভিযুক্ত করা—কোনোটিই যথাযথ হবে না।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে এবং ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপ ঘটনার আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
তবে বৈঠক ও কূটনৈতিক পত্রের মধ্যেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মিশনগুলোর নথি, যোগাযোগের রেকর্ড এবং দায়িত্ব পালনের প্রক্রিয়াও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
যদি দেখা যায়, সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রযোজ্য নিয়ম অনুসরণ করেনি, তাহলে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি উত্থাপন করতে পারে। অন্যদিকে, যদি মিশনের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে তথ্য পৌঁছানোর পরও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া না হয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যর্থতার জবাবদিহিও নিশ্চিত করা দরকার।
আবার যদি প্রমাণিত হয়, আটক ব্যক্তিদের সিদ্ধান্ত বা অন্য কোনো বাস্তব কারণে কনস্যুলার যোগাযোগ সম্ভব হয়নি এবং মিশন যথাযথ চেষ্টা করেও তথ্য পায়নি, তাহলে সেই পরিস্থিতিও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা তাই কেবল সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের কনস্যুলার সুরক্ষা, তথ্য সংগ্রহ, আন্তরাষ্ট্রীয় যোগাযোগ এবং প্রবাসী নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনেরও পরীক্ষা।
মূল প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত একটাই: দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের খবর যখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলো, তখনই কেন তাঁদের বিষয়ে তথ্য জানতে তৎপর হতে হলো বাংলাদেশকে?
এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, বাংলাদেশের মিশনের নথিপত্র এবং একটি নিরপেক্ষ পর্যালোচনার মাধ্যমে। আর সেই উত্তরই নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে—এ ঘটনায় মূল সমস্যা ছিল তথ্য না দেওয়ার, নাকি তথ্য সংগ্রহ ও দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। দেশটির কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ওই দুই বাংলাদেশিকে আটক করা হয়েছিল। পরে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। কিন্তু এত বড় একটি মামলার বিচার ও শাস্তি কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশের দূতাবাস বা কনস্যুলেট কিছুই জানত না—এমন দাবি ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে, বিদেশে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী মিশনগুলোর ভূমিকা আসলে কতটা কার্যকর। ঘটনার বিস্তারিত জানতে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ সরকার। রোববার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়। এর আগে সৌদি সরকারের কাছে পাঠানো কূটনৈতিক পত্রের একটি অনুলিপিও রাষ্ট্রদূতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছেন, রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠানোর ঘটনাটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তলব’ না বলে তথ্য জানার উদ্দেশ্যে বৈঠক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কূটনৈতিক এই তৎপরতার মধ্যেও বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে—দুই বাংলাদেশির বিচার দীর্ঘদিন ধরে চলার পরও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মিশন তাঁদের বিষয়ে অবগত ছিল না কেন? আর সত্যিই যদি সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে কিছু না জানিয়ে থাকে, তাহলে সেটি কি কেবল যোগাযোগের ঘাটতি, নাকি কনস্যুলার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আরও গভীর কোনো দুর্বলতার ইঙ্গিত? মৃত্যুদণ্ডের খবর প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে বাংলাদেশ সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের আটক করেছিল। খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর বৃহস্পতিবার জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানতে চায়। দুই ব্যক্তির নাগরিকত্ব, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও শনিবার বিকেলে জানান, মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বা তা কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য পায়নি। তবে বিষয়টি জানার জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবের নিজস্ব আইনি কাঠামো রয়েছে। সেই কাঠামো অনুযায়ী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার ও সাজা দেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সংবাদমাধ্যমের খবরের ভিত্তিতে তথ্য চাওয়া কি যথেষ্ট? নাকি বিদেশে বিচারাধীন বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখার যে দায়িত্ব একটি কূটনৈতিক মিশনের রয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন? ‘জানি না’ বলেই কি দায় শেষ? সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ মনে করেন, এমন একটি বড় মামলার বিষয়ে দূতাবাসের অজ্ঞতার দাবি সহজে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থায় কোনো মামলার বিচার ও শাস্তি কার্যকর হওয়ার আগে দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। ফলে বিষয়টি জানার সুযোগ একেবারেই ছিল না—এমন দাবি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বিবিসি বাংলাকে গোলাম মসিহ বলেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশের রিয়াদ দূতাবাস ও জেদ্দা কনস্যুলেটে আইনগত সহায়তা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে কর্মকর্তারা রয়েছেন। তাঁদের কাজের মধ্যে আদালত ও কারাগারে যোগাযোগ রাখা এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের মামলার বিষয়ে খোঁজ নেওয়াও অন্তর্ভুক্ত। তাঁর বক্তব্য, মিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গোলাম মসিহের মতে, দুই বাংলাদেশির বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চলার পাশাপাশি স্থানীয় সূত্র থেকেও তথ্য পাওয়ার সুযোগ ছিল। ফলে এমন একটি গুরুতর ঘটনা সম্পর্কে দূতাবাসের কিছুই জানা ছিল না—এ দাবি যাচাই করা প্রয়োজন। তবে তাঁর বক্তব্য দূতাবাসের ব্যর্থতা প্রমাণ করে না; বরং দায়িত্ব পালনের ধরন, তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল কি না, তা অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। ভিন্নমত সাবেক কূটনীতিকের: দূতাবাস সব সময় জানতে পারে না সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহের বক্তব্যের বিপরীতে আরেক সাবেক কূটনীতিক মাহফুজুর রহমান মনে করেন, বিদেশে কোনো নাগরিক গ্রেপ্তার হলেই তাঁর দেশের দূতাবাসকে জানানো হবে—এমন নিশ্চয়তা সব ক্ষেত্রে নেই। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বিদেশে গ্রেপ্তার হলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি নিজ দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান কি না। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি দূতাবাসকে জানাতে না চান, তাহলে স্বাগতিক দেশের কর্তৃপক্ষ সব পরিস্থিতিতে মিশনকে অবহিত নাও করতে পারে। তাঁর মতে, সৌদি আরবের এই ঘটনাতেও এমন কিছু ঘটেছে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। বিষয়টি পরিষ্কার করতে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য সামনে আনে। কোনো নাগরিকের গ্রেপ্তারের তথ্য দূতাবাসকে জানানো না হলে সেটি এক ধরনের পরিস্থিতি; আর দীর্ঘদিন ধরে চলা বিচারপ্রক্রিয়া, সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ড এবং শাস্তি কার্যকরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়েও মিশন কোনো তথ্য না পেলে সেটি ভিন্ন প্রশ্ন তৈরি করে। তবে দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে বাস্তবে কোন পরিস্থিতি ঘটেছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁরা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগে অনীহা জানিয়েছিলেন কি না, সৌদি কর্তৃপক্ষ কোনো পর্যায়ে বাংলাদেশকে জানিয়েছিল কি না, কিংবা মিশন অন্য কোনো সূত্র থেকে তথ্য পেয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া, তবু তথ্য ছিল না? ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, দুই বাংলাদেশির বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চলছিল বলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাধিক সূত্র দাবি করেছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতে বাংলাদেশিরাই দোভাষী হিসেবে কাজ করেছেন। যদি এসব তথ্য যাচাই করে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তদন্তের প্রশ্ন আরও নির্দিষ্ট হবে: সংশ্লিষ্ট আদালতে বাংলাদেশি দোভাষীদের উপস্থিতি, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রবাসী কমিউনিটির মাধ্যমে তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মিশন কীভাবে পুরোপুরি অজ্ঞাত থাকল? অবশ্য আদালতে বাংলাদেশি দোভাষী কাজ করেছেন—এ তথ্য একাই প্রমাণ করে না যে দূতাবাস আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার বিষয়ে জানত। একইভাবে প্রবাসীদের মধ্যে খবর প্রচলিত থাকা মানেই রাষ্ট্রীয় মিশনকে তথ্য জানানো হয়েছিল, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। তবু এ ধরনের তথ্য যাচাই করা জরুরি। কারণ দূতাবাসের দায়িত্ব শুধু স্বাগতিক দেশের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা নয়; বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের গুরুতর আইনি সংকটের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সহায়তার সুযোগ কীভাবে কাজে লাগানো হয়েছে, সেটিও মূল্যায়নের বিষয়। ভিয়েনা কনভেনশন কি লঙ্ঘিত হয়েছে? ঘটনাটি সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, সৌদি আরব কি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে তথ্য না জানিয়ে কূটনৈতিক নিয়ম লঙ্ঘন করেছে? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে, কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন, ১৯৬৩-এর ৩৬ অনুচ্ছেদ বিদেশে আটক বা কারাবন্দী বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে কী বলে। এই অনুচ্ছেদে আটক বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে তাঁর দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের যোগাযোগের অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ ও তাঁকে সহায়তা করার সুযোগের কথা বলা হয়েছে। আটক ব্যক্তি অনুরোধ করলে তাঁকে কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কে অবহিত করা এবং তাঁর দেশের কনস্যুলার পোস্টকে জানানোও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এই বিধানের প্রয়োগে আটক ব্যক্তির ইচ্ছা, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা এবং ঘটনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নাগরিকের গ্রেপ্তারের খবর না পাওয়া, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত না থাকা এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য না পাওয়া—এগুলো একই আইনি প্রশ্ন নয়। তাই শুধু বাংলাদেশকে মৃত্যুদণ্ডের খবর আগে জানানো হয়নি—এ তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। এর জন্য জানতে হবে, দুই বাংলাদেশিকে আটক করার সময় তাঁদের কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কে কী জানানো হয়েছিল, তাঁরা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগে সম্মতি দিয়েছিলেন কি না, সৌদি কর্তৃপক্ষ কোনো পর্যায়ে বাংলাদেশি মিশনকে অবহিত করেছিল কি না এবং এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় বাধ্যবাধকতা কী ছিল। আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ: কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার থাকলেও তা বিদেশি দেশের বিচারিক সিদ্ধান্ত বাতিল করার ক্ষমতা দেয় না। তবে নাগরিকের অধিকার সম্পর্কে অবহিত থাকা, আইনগত সহায়তার সুযোগ তৈরি করা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা করার মতো বিষয়ে দূতাবাসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সুতরাং ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ নির্ধারণে আবেগ বা অনুমানের পরিবর্তে নথি, যোগাযোগের রেকর্ড এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় আগেও উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা নতুন নয়। কয়েক বছর আগে নিয়োগকর্তাকে হত্যার মামলায় প্রায় ছয় বছর কারাগারে থাকার পর বাংলাদেশের নরসিংদীর বাসিন্দা ছিদ্দিক মিয়ার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। পরে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে তাঁর শাস্তি মওকুফ হয়। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। এই ঘটনা দেখায়, বিদেশে গুরুতর অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আইনগত সহায়তার উদ্যোগ কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ছিদ্দিক মিয়ার মামলার সঙ্গে মক্কার সাম্প্রতিক ঘটনার সরাসরি তুলনা করার আগে দুই মামলার অভিযোগ, বিচারিক পরিস্থিতি, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং শাস্তির পর্যায় বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি ঘটনায় দূতাবাসের উদ্যোগ সফল হয়েছিল বলে অন্য প্রতিটি ঘটনায় একই ফল সম্ভব—এমন সিদ্ধান্তও টানা যায় না। তবু অতীতের এই অভিজ্ঞতা নতুন করে প্রশ্ন তোলে: মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ঝুঁকি রয়েছে—এমন মামলাগুলো শনাক্ত করা এবং সেগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশের মিশনগুলোর কী ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে? সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড: বাংলাদেশের উদ্বেগ কোথায়? সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা ও বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতেও এক দিনে সাতজনের শিরশ্ছেদের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বা নির্দিষ্ট কোনো মামলার বিষয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অবস্থান বিশ্লেষণের সময় নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য ব্যবহার করা জরুরি। একইভাবে মক্কার দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি এবং আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ নথি না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের মামলার আইনি দিক নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয় শুধু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নয়; বরং প্রবাসী নাগরিকদের অধিকার রক্ষা, তাঁদের পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছানো এবং গুরুতর মামলায় যথাসময়ে কনস্যুলার সহায়তার সুযোগ নিশ্চিত করা। তদন্তে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি মক্কার দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় দায় নির্ধারণ করতে হলে অন্তত কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন। প্রথমত, আটক ও বিচারপ্রক্রিয়ার নথি: দুই বাংলাদেশিকে কবে আটক করা হয়েছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী ছিল এবং বিচার কোন পর্যায়ে কত দিন ধরে চলেছে? দ্বিতীয়ত, কনস্যুলার যোগাযোগ: আটক হওয়ার সময় তাঁদের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং তাঁরা নিজেরা যোগাযোগে সম্মতি বা অনীহা জানিয়েছিলেন কি না? তৃতীয়ত, সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্যপ্রদান: সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটকে কোনো পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল কি না। জানিয়ে থাকলে কখন, কীভাবে এবং কী তথ্য দেওয়া হয়েছিল? চতুর্থত, মিশনের নিজস্ব তৎপরতা: রিয়াদ দূতাবাস ও জেদ্দা কনস্যুলেটের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আদালত, কারাগার, স্থানীয় আইনজীবী, দোভাষী কিংবা প্রবাসী কমিউনিটির মাধ্যমে মামলার বিষয়ে কোনো তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন কি না? পঞ্চমত, অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি: বাংলাদেশি মিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে আগে কোনো তথ্য এসে থাকলে তা কীভাবে নথিভুক্ত ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল? আর কোনো তথ্য না এসে থাকলে তা শনাক্ত করার বিদ্যমান ব্যবস্থায় ঘাটতি ছিল কি না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া একতরফাভাবে সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক বিধি লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করা কিংবা বাংলাদেশের দূতাবাসকে সরাসরি দায়িত্বে অবহেলার জন্য অভিযুক্ত করা—কোনোটিই যথাযথ হবে না। রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক, এবার কী? বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে এবং ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপ ঘটনার আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে বৈঠক ও কূটনৈতিক পত্রের মধ্যেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মিশনগুলোর নথি, যোগাযোগের রেকর্ড এবং দায়িত্ব পালনের প্রক্রিয়াও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। যদি দেখা যায়, সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রযোজ্য নিয়ম অনুসরণ করেনি, তাহলে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি উত্থাপন করতে পারে। অন্যদিকে, যদি মিশনের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে তথ্য পৌঁছানোর পরও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া না হয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যর্থতার জবাবদিহিও নিশ্চিত করা দরকার। আবার যদি প্রমাণিত হয়, আটক ব্যক্তিদের সিদ্ধান্ত বা অন্য কোনো বাস্তব কারণে কনস্যুলার যোগাযোগ সম্ভব হয়নি এবং মিশন যথাযথ চেষ্টা করেও তথ্য পায়নি, তাহলে সেই পরিস্থিতিও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা তাই কেবল সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের কনস্যুলার সুরক্ষা, তথ্য সংগ্রহ, আন্তরাষ্ট্রীয় যোগাযোগ এবং প্রবাসী নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনেরও পরীক্ষা। মূল প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত একটাই: দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের খবর যখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলো, তখনই কেন তাঁদের বিষয়ে তথ্য জানতে তৎপর হতে হলো বাংলাদেশকে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, বাংলাদেশের মিশনের নথিপত্র এবং একটি নিরপেক্ষ পর্যালোচনার মাধ্যমে। আর সেই উত্তরই নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে—এ ঘটনায় মূল সমস্যা ছিল তথ্য না দেওয়ার, নাকি তথ্য সংগ্রহ ও দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি।
ইত্তেহাদ নিউজ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইয়েমেনের রাজধানী সানায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় শহর দহরানে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবনে হামলা চালিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। হামলায় সৃষ্ট আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও এ ঘটনায় নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো, বেসামরিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সৌদি সরকারি বার্তা সংস্থা এসপিএকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবারের হামলায় ভবনটিতে আগুন ধরে যায়। কর্তৃপক্ষ দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যায়নি। সানায় তেল স্থাপনায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলার পর হুথিদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দহরানে আরামকোর প্রশাসনিক ভবনে হামলার ঘটনা সংঘাতের নতুন মাত্রা সামনে এনেছে। একই সময়ে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ অভিমুখে ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে দেশটি। সৌদি সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিহত করা দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে চারজন আহত হয়েছেন এবং ১৫টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেল স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার হুঁশিয়ারি মঙ্গলবার দিনের শুরুতে হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ আখ্যা দিয়ে সেগুলোর আশপাশ থেকে কর্মচারী ও বেসামরিক লোকজনকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। এর আগে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হুথি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনি অয়েল কোম্পানির আল-সাবাহ কেন্দ্রীয় তেল স্টেশন খালি করার নির্দেশ দিয়েছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। সেই নির্দেশের পরপরই সানায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় বলে জানান আল জাজিরার মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিরা। হুথি-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিমান হামলায় রাজধানীর আল-সাবাহ এলাকার একটি তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জোটের হামলার প্রতিক্রিয়ায় হুথি মুখপাত্র সতর্ক করে বলেন, সানায় যেকোনো ধরনের বিমান হামলা চালানো হলে সৌদি রাজধানী রিয়াদে এর ‘কঠোর ও বেদনাদায়ক’ জবাব দেওয়া হবে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, সৌদি জোট হামলা অব্যাহত রাখলে আগে থেকে খালি করার নির্দেশ দেওয়া এলাকাগুলোতে পাল্টা হামলা চালানো হবে। সানায় তেল স্থাপনায় হামলা এবং দহরানে আরামকোর প্রশাসনিক ভবনে পরবর্তী আক্রমণ—এই ধারাবাহিকতা সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। সানায় বিমান হামলা, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি অভিযোগ করেছেন, হুথিরা সানার তেল স্থাপনা এবং এর ভূগর্ভস্থ জ্বালানি ডিপো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করছিল। তবে হুথি-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, হামলায় তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ বিষয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্যের স্বাধীন যাচাইয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি। আল জাজিরার প্রতিনিধি ইউসেফ মাওরি জানান, সানার কেন্দ্রীয় তেল স্টেশনে বিমান হামলার পরপরই তাঁরা বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান। তিনি আরও জানান, সৌদি আরব লোহিত সাগরের রাস ঈসা বন্দরে বিমান হামলা চালিয়ে জ্বালানি তেলের ট্যাংক ধ্বংস করেছে। এ ছাড়া হুথি নিয়ন্ত্রিত হোদাইদাহ প্রদেশের একটি তেল স্থাপনাতেও আঘাত হানা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ইয়েমেনি অয়েল কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হামলার আগেই তাদের মজুতাগারগুলো খালি করা হয়েছিল। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানি সরবরাহ ও মজুতে তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়বে না বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় সানার বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকলে সরবরাহব্যবস্থা, পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন নতুন করে চাপের মুখে পড়তে পারে। রিয়াদ অভিমুখী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের দাবি সৌদি সরকারি বার্তা সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, রিয়াদ অভিমুখে হুথিদের ছোড়া বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝআকাশে প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী। সৌদি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, প্রতিহত করা দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে চারজন আহত হন। এতে ১৫টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া মঙ্গলবার রিয়াদের উত্তরাঞ্চলে আরও তিনটি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, লক্ষ্যবস্তুর ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রতিটি ঘটনার স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রকাশিত হয়নি। বিমানবন্দর ও তেল শোধনাগার ঘিরে সতর্কতা মঙ্গলবার দহরানে আরামকোর সদর দপ্তর, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাজধানীতে অবস্থিত আরামকোর একটি তেল শোধনাগার থেকে সাধারণ মানুষকে অবিলম্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর আগে গত শনিবার রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরদিন রোববার একই বিমানবন্দরে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে আরও একজন নিহত এবং ১১ জন আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হামলার পর এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম, এয়ার ইন্ডিয়া, ইতিহাদ, লুফথানসা, ডেল্টা, গালফ এয়ার ও কাতার এয়ারওয়েজসহ একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা সৌদি আরব এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে কোন সংস্থা কোন রুটে কত দিনের জন্য ফ্লাইট স্থগিত করেছে, তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাকে ঘিরে হামলার হুমকি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, যাত্রী নিরাপত্তা এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রপ্তানি অঞ্চলের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সৌদি আরবের কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে সৌদি আরব। দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে। বৈঠক থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, এসব হামলার জন্য হুথিদের ‘চড়া মাশুল’ দিতে হবে। অন্যদিকে, মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুথিদের আচরণকে ‘খুবই বাজে’ বলে মন্তব্য করেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, সৌদি আরবের স্বার্থ সুরক্ষায় ইয়েমেন পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপের জন্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের কাছে অনুরোধ জানাতে পারেন। ট্রাম্প বলেন, তাঁর বিশ্বাস, তিনি অনুরোধ করলে এরদোয়ান এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন। তবে তুরস্কের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপের বিস্তারিত তথ্য ওই বক্তব্যে পাওয়া যায়নি। ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান, বাড়ছে স্থলযুদ্ধও ইয়েমেনের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা হুথিদের দখলে যাওয়ার পর সৌদি আরব নতুন করে হামলা শুরু করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের পাল্টা অভিযান ‘ডন অব ইয়েমেন’-এ বিমান সহায়তা দিচ্ছে রিয়াদ। ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীর দাবি, মঙ্গলবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হুথিদের বিভিন্ন ঘাঁটি ও সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে একাধিক বিমান হামলা চালানো হয়েছে। সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, তায়েজ গভর্নরেটে মোট নয়টি বিমান হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে ডুবাব জেলায় পাঁচটি এবং আল-মাসরাখ জেলায় চারটি হামলা অন্তর্ভুক্ত। ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্র জানিয়েছে, তায়েজের দক্ষিণে আল-শাগাব এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথি যোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। এদিকে, ‘ইয়েমেনি নেটওয়ার্ক ফর রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডম’ নামের একটি মানবাধিকার সংস্থা মঙ্গলবার দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তায়েজে হুথিদের গোলাবর্ষণে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুসহ অন্তত পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন। এ সময় অন্তত সাতটি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। সংস্থাটির অভিযোগ, এক দিনেই তায়েজজুড়ে ১৮০টির বেশি গোলা নিক্ষেপ করেছে হুথিরা। এসব হতাহতের সংখ্যা ও হামলার বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযোগগুলো ইয়েমেনের চলমান সংঘাতে বেসামরিক মানুষের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। মোখা ও বাব আল-মানদেব ঘিরে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি ঘিরেও সংঘাতের বিস্তার ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সেপ্টেম্বর মাসে মোখা অভিমুখে আকস্মিক স্থল অভিযান চালিয়ে হুথিরা বন্দরনগরীটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং সরকারি বাহিনীকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। একই মাসে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ারও দাবি করা হয়। এর মধ্যে প্রণালির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মায়্যুন দ্বীপ রয়েছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাব আল-মানদেব আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক সংঘাত বাড়লে জাহাজ চলাচল, পণ্য পরিবহন এবং জ্বালানি সরবরাহের ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রণালি ও সংশ্লিষ্ট দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিবেদনে উল্লিখিত দাবিগুলোর বর্তমান সামরিক অবস্থান স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা ইয়েমেনে সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) সভাপতি মিরজানা স্পোলজারিক। তিনি সংঘাতে জড়িত সব পক্ষকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইয়েমেনের এডেন ও সানাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি ও ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে এবং প্রাণহানি ঘটছে। জাতিসংঘের হিসাবের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ইয়েমেনে অন্তত ৪৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহত ও আহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু রয়েছে। এ ছাড়া সেপ্টেম্বর থেকে দুই লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সানায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলা, দহরানে আরামকোর প্রশাসনিক ভবনে হুথিদের আক্রমণ, রিয়াদ অভিমুখে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং তায়েজে স্থলযুদ্ধ—সব মিলিয়ে ইয়েমেন সংঘাত নতুন করে বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ সংঘাতে জ্বালানি স্থাপনা ও বিমানবন্দরকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি হুমকি শুধু সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়তে পারে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে। সংঘাতের প্রতিটি পক্ষ নিজেদের সামরিক পদক্ষেপকে নিরাপত্তা ও পাল্টা প্রতিরোধের যুক্তিতে ব্যাখ্যা করছে। কিন্তু এসব অভিযানের প্রকৃত লক্ষ্য, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এবং বেসামরিক অবকাঠামো ব্যবহারের অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্ত ছাড়া পরিস্থিতির নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কঠিন। সব পক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো এবং বেসামরিক মানুষের জীবন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা। দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ ও কার্যকর যুদ্ধবিরতি ছাড়া ইয়েমেনের সংকট আরও বড় আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : ইরানের বিরুদ্ধে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অভিযান চালানোর ঘোষণা ও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তেহরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে লক্ষ্য শুধু নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ নয়—বরং ইরানের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও বাণিজ্যিক পথ বিচ্ছিন্ন করে দেশটিকে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা থেকে কার্যত একঘরে করে ফেলা। ওয়াশিংটনের এই অবস্থানের বিপরীতে ইরানও কঠোর প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত অব্যাহত থাকলে অঞ্চল থেকে সব ধরনের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়েও নতুন সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ঘোষণা ও পাল্টা ঘোষণার এই পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সম্ভাব্য প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্য, নৌপরিবহন এবং ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা বিভিন্ন দেশের ওপর। ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’র বার্তা স্কট বেসেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সব ধরনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে এগোচ্ছে। তিনি এই পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বেসেন্টের বক্তব্যের মূল বার্তা—ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকিয়ে রাখতে যেসব অর্থনৈতিক উৎস, বাণিজ্যিক রুট, আর্থিক লেনদেন ও তেল বিক্রির রাজস্ব কাজ করছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন করা। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হলো ইরানের শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা প্রতিটি অর্থনৈতিক ‘লাইফলাইন’ বন্ধ করে দেওয়া, যতক্ষণ না তেহরান আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে নতুন পদক্ষেপের সব খুঁটিনাটি প্রথম দিকে প্রকাশ করা হয়নি। পরে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত ঘোষণার কথা জানানো হয়। ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’: লক্ষ্য কী? প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে যে নতুন অর্থনৈতিক চাপের কথা বলছে, সেটিকে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অভিযানের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে— ইরানের তেল বিক্রির আয়ের পথ বন্ধ করা; আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন সীমিত বা বিচ্ছিন্ন করা; নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে পরিচালিত কথিত গোপন বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা; তৃতীয় দেশ ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরানি তেল ও অন্যান্য পণ্য বাণিজ্যের পথ বন্ধ করা; ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক, সাইবার ও জ্বালানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়ানো। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের তেল পাচার ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন নেটওয়ার্কের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করা হয়েছে। এসব তৎপরতা বন্ধে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর সময়সীমাভিত্তিক চাপ প্রয়োগের কথাও বলা হয়েছে। শুধু ইরান নয়, চাপে পড়তে পারে অন্য দেশও এই নতুন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ওয়াশিংটনের চাপ শুধু ইরানকেন্দ্রিক নাও থাকতে পারে। স্কট বেসেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যেসব দেশ বা প্রতিষ্ঠান ইরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন কিংবা বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, তারাও আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপ কার্যত সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা বা পরোক্ষ অর্থনৈতিক চাপের কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। অর্থাৎ কোনো দেশ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকলেও ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করার কারণে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে জটিলতার মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। বেসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, যারা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে থাকবে তারা সহযোগিতার সুফল পাবে; আর যারা ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, তাদেরও এই বিচ্ছিন্নতার প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজ ঘোষণার অংশ হিসেবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক, সাইবার এবং তেল বিপণন নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সমুদ্রগামী জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং, চীন, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ইরান-সংশ্লিষ্ট কথিত ‘ছায়া নৌবহর’ ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কগুলোকে বিশেষভাবে নজরদারির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া সম্ভাব্য সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসতে পারে— ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল লেনদেন; প্রযুক্তি খাত; সোনা ও মূল্যবান ধাতুর বাণিজ্য; বিমান চলাচল; নৌপরিবহন ও সামুদ্রিক লজিস্টিকস। ইরানে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রেও অতীতে দেওয়া কিছু সাধারণ লাইসেন্স ও সুবিধা স্থগিত করার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাল্টা অবস্থানে ইরান: বন্ধ হতে পারে তেল রপ্তানি ওয়াশিংটনের কঠোর অর্থনৈতিক হুঁশিয়ারির পর ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত অব্যাহত থাকলে অঞ্চল থেকে সব ধরনের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। এই হুমকির গুরুত্ব বোঝার জন্য হরমুজ প্রণালির কৌশলগত অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের দক্ষিণে অবস্থিত এই জলপথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের একটি বড় অংশ পরিবহন হয়। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরুর পর থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হরমুজে নতুন সতর্কতা তেল রপ্তানি বন্ধের হুঁশিয়ারির পাশাপাশি জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রেও নতুন সতর্কতা জারি করেছে ইরান। রয়টার্স জানিয়েছে, দেশটির অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। যদি এই অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কারণ হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। ফলে এই নৌপথে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ, পরিবহন ব্যয়, জাহাজের বীমা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের ওপর চাপ বাড়তে পারে। অর্থনৈতিক যুদ্ধের নতুন অধ্যায়? ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আগের নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সামরিক খাতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। নতুন এই ঘোষণায় সেই কাঠামো আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত মিলছে। এবারের লক্ষ্য শুধু ইরানের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা, অর্থনৈতিক মধ্যস্থতাকারী, জাহাজ, প্রযুক্তি নেটওয়ার্ক এবং বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থাকেও চাপের মধ্যে আনা। প্রশ্ন হলো, বিশ্বের বড় অর্থনীতি ও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলো এই চাপের মুখে কতটা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনুসরণ করবে। কারণ ইরানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা যতটা অর্থনৈতিক, ততটাই কূটনৈতিক। এখন নজর কোথায়? ওয়াশিংটনের নতুন পদক্ষেপের বাস্তব ফল নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর— প্রথমত, ইরানের তেল ক্রেতা ও বাণিজ্যিক অংশীদাররা যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে কি না। দ্বিতীয়ত, নতুন সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা কতটা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি কোন দিকে যায়। সবশেষে, অর্থনৈতিক চাপ ও সামরিক উত্তেজনা—এই দুইয়ের সমান্তরাল সংঘাত শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে পৌঁছায়, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরও গভীর করে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ইরানকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার ওয়াশিংটনের ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ঘটনা হবে না; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের নতুন এক পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।