Brand logo light
বিশেষ সংবাদ

৩৪২ কোটি টাকার সরকারি কেনাকাটা: দরপত্র ছাড়াই চুক্তি, মান পরীক্ষায় ব্যর্থ হুইলচেয়ার

নিজস্ব প্রতিবেদক অক্টোবর ১৯, ২০২৬ 0

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুটি ক্রয়চুক্তি ঘিরে স্বজনপ্রীতি, অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ ও বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ। নথি অনুযায়ী, নৌবাহিনী পরিচালিত ডিইডব্লিউয়ের সঙ্গে চুক্তির পর বেসরকারি অংশীদারদের মধ্যে মুনাফা বণ্টনের ব্যবস্থা; আন্তর্জাতিক মান যাচাইকারী সংস্থা এসজিএসের পরীক্ষায় হুইলচেয়ারের চালান ‘মানদণ্ডবহির্ভূত’ হিসেবে চিহ্নিত।

ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন:

সরকারি কেনাকাটায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের বদলে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি, বাজারদরের তুলনায় বেশি মূল্য নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক মান যাচাইকারী সংস্থার পরীক্ষায় ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত পণ্য আমদানির অভিযোগ উঠেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুটি বড় ক্রয়চুক্তি ঘিরে। চুক্তি দুটির মোট মূল্য ৩৪২ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

নথিপত্রের বরাতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের (ডিইডব্লিউ) মাধ্যমে ৩২০ কোটি ৭১ লাখ টাকার অ্যান্ড্রয়েড ট্যাবলেট এবং ২১ কোটি ৯৯ লাখ টাকার হুইলচেয়ার ও সেলাই মেশিন কেনার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, পণ্যের প্রকৃত মূল্য, সরবরাহকারীদের সক্ষমতা এবং সরকারি অর্থের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী কারা—এসব প্রশ্ন।

বিশেষ করে ট্যাবলেট সরবরাহের সরকারি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ডিইডব্লিউ, স্যালস্ট্রা লিমিটেড ও বুরাক ব্রেক লিমিটেডের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ত্রিপক্ষীয় ব্যবসায়িক চুক্তি নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ওই চুক্তির বর্ণনা অনুযায়ী, সরকারি কাজ এনে দেওয়ার বিনিময়ে ডিইডব্লিউ চুক্তিমূল্যের ৪ শতাংশ পাবে। অন্যদিকে, পণ্য সরবরাহের ব্যয় ও নির্ধারিত খরচ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট মুনাফা পাওয়ার কথা বুরাক ব্রেকের।

বুরাক ব্রেকের মালিকানায় রয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াৎ হোসেন বকুলের ভাই সরদার তোফাজ্জল হোসেন লিয়াকতের ছেলে ও মেয়ে। ফলে সরকারি ক্রয়চুক্তির আর্থিক সুবিধা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি পরিবারের প্রতিষ্ঠানের কাছে যাওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।

 

চুক্তির পর গোপন ব্যবসায়িক সমঝোতা

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও ডিইডব্লিউয়ের মধ্যে ৩২০ কোটি ৭১ লাখ টাকার একটি চুক্তি হয়। চুক্তির আওতায় প্রতিটি ৪৮ হাজার টাকা দরে ৬৬ হাজার ৮১৫টি অ্যান্ড্রয়েড ট্যাবলেট সরবরাহের দায়িত্ব পায় ডিইডব্লিউ।

চুক্তি স্বাক্ষরের পরদিন, ২৪ আগস্ট, ডিইডব্লিউ, ঢাকাভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্যালস্ট্রা লিমিটেড এবং বুরাক ব্রেক লিমিটেডের মধ্যে ছয় পৃষ্ঠার একটি ত্রিপক্ষীয় যৌথ ব্যবসায়িক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

চুক্তির বিবরণ অনুযায়ী, ডিইডব্লিউ কোনো মূলধন বিনিয়োগ করবে না, পরিচালন ব্যয় বহন করবে না এবং ব্যবসার লাভ-ক্ষতির দায়ও নেবে না। সরকারি চুক্তি এনে দেওয়ার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি মোট চুক্তিমূল্যের ৪ শতাংশ পাওয়ার কথা—যার পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, ট্যাবলেট আমদানি ও সরবরাহের জন্য স্যালস্ট্রা লিমিটেডের বরাদ্দ ১৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সব কর, নির্ধারিত পরিশোধ ও ব্যাংক চার্জ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট মুনাফা বুরাক ব্রেক লিমিটেডের দুটি পৃথক ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার কথা বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় ২০ শতাংশ করের একটি আনুমানিক হিসাব ধরে বুরাক ব্রেকের সম্ভাব্য আয় দেখানো হয়েছে ৬৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। তবে এটি চূড়ান্ত নিরীক্ষিত মুনাফা নয়; প্রকৃত আয় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাব, ব্যয়, কর ও ব্যাংক লেনদেন যাচাই প্রয়োজন।

এখানে মূল প্রশ্ন হলো, সরকারি ক্রয়চুক্তিতে ডিইডব্লিউয়ের ভূমিকা ঠিক কী ছিল, বেসরকারি অংশীদার নির্বাচনের ভিত্তি কী এবং সরকারি কাজ এনে দেওয়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট হারে অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থাটি প্রযোজ্য ক্রয়বিধি ও চুক্তির শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

অভিজ্ঞতাহীন প্রতিষ্ঠানের হাতে বিপুল মুনাফার সুযোগ?

বুরাক ব্রেক লিমিটেড নিবন্ধিত হয় ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর। নথিতে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে—অ্যাপার্টমেন্ট সি-২, বাড়ি ১-এ, রোড ৭৯, গুলশান-২, ঢাকা।

নিবন্ধনের সময় প্রতিষ্ঠানটির দুই পরিচালক সরদার রাফিন এস এ হোসেন ও অনিকা রাইদা লিয়ার বয়স যথাক্রমে ১৯ ও ২৩ বছর ছিল বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াৎ হোসেন বকুলের ভাতিজা ও ভাতিজি। তাঁদের বাবা সরদার তোফাজ্জল হোসেন লিয়াকত নরসিংদী জেলা বিএনপির সহসভাপতি এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছোট ভাই।

আইটি সরঞ্জাম বা ট্যাবলেট সরবরাহে প্রতিষ্ঠানটির পূর্ব অভিজ্ঞতা, নিজস্ব ওয়েবসাইট কিংবা আগের কাজের রেকর্ড পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানী তথ্যে দাবি করা হয়েছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য শতকোটি টাকার সরকারি ক্রয়চুক্তি থেকে বিপুল মুনাফা পাওয়ার ব্যবস্থা কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের পূর্ব অভিজ্ঞতা সীমিত থাকা নিজে থেকেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে নির্বাচিত হয়েছে, তার কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে এবং চুক্তির আর্থিক শর্তগুলো অনুমোদিত নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

সরকারি দপ্তরে লিয়াকতের উপস্থিতি, বৈঠকের ছবি

চুক্তি ও ক্রয়নথিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বকুল বা তাঁর ভাই লিয়াকতের নাম সরাসরি নেই বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। তবে ক্রয়প্রক্রিয়া চলাকালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ এবং নৌবাহিনীর পোশাক পরা কর্মকর্তাদের সঙ্গে লিয়াকতকে একই টেবিলে বসে আলোচনা করতে দেখা গেছে—এমন ছবি সামনে এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

চুক্তি সম্পাদনের আগে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের দপ্তরেও লিয়াকতের বৈঠকের ছবি রয়েছে বলে জানা গেছে।

সরকারি দপ্তরে তাঁর উপস্থিতি এবং ক্রয়চুক্তিতে পরিবারের প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি একই সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, ওই বৈঠকগুলোর উদ্দেশ্য কী ছিল এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করা হয়েছিল কি না।

লিয়াকত চুক্তিতে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বকুলও এ প্রক্রিয়ায় নিজের প্রত্যক্ষ প্রভাব বা সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, বৈঠকের কার্যবিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও সচিবের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। তবে অভিযোগের পক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য তাঁদের বক্তব্য, অনুমোদন-সংক্রান্ত নথি এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার দায়িত্ব বণ্টন পরীক্ষা করা জরুরি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা কি উপেক্ষিত হয়েছে?

অনুসন্ধানী তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকে ৪০টিরও বেশি মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থায় একটি গোপন চিঠি পাঠানো হয়। এতে সশস্ত্র বাহিনী বা সামরিক বাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি সরকারি কেনাকাটায় যুক্ত করার আগে প্রধানমন্ত্রীর পূর্বানুমোদন নেওয়ার নির্দেশনা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও নৌবাহিনী প্রধানের কাছে পাঠানো ওই নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কারণ, অভিযোগ অনুযায়ী, সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘স্ট্রেংদেনিং সোশ্যাল প্রোটেকশন ফর ইমপ্রুভড রেজিলিয়েন্স, ইনক্লুশন অ্যান্ড টার্গেটিং’ বা এসপিআইআরআইটি (SPIRIT) প্রকল্পের ৩২০ কোটি ৭১ লাখ টাকার ট্যাবলেট চুক্তি এবং প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের ২১ কোটি ৯৯ লাখ টাকার হুইলচেয়ার ও সেলাই মেশিনের চুক্তির ক্ষেত্রে ওই পূর্বানুমোদনের নথি পাওয়া যায়নি।

নির্দেশনার প্রকৃত ভাষা, প্রযোজ্যতার পরিধি এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির অনুমোদন-নথি পরীক্ষা ছাড়া একে নিশ্চিতভাবে নির্দেশনা লঙ্ঘন বলা যায় না। তবে প্রয়োজনীয় পূর্বানুমোদন না থাকলে তা ক্রয়প্রক্রিয়ার বৈধতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলতে পারে।

বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে ট্যাবলেট?

সরকারি চুক্তিতে প্রতিটি এক্সট্রা এক্সটি ওয়ান (Xtra XT1) ট্যাবলেটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ হাজার টাকা। কীবোর্ড ও স্টাইলাসসহ ট্যাবলেটটির জন্য এই মূল্য ধরা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

অন্যদিকে, ডিইডব্লিউ, স্যালস্ট্রা ও বুরাক ব্রেকের মধ্যকার যৌথ ব্যবসায়িক চুক্তিতে স্যালস্ট্রার সরবরাহমূল্য দেখানো হয়েছে প্রতিটি ২৬ হাজার ৮২৮ টাকা।

প্রতিবেদনে তুলনার জন্য আরও দুটি মডেলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে—কীবোর্ডসহ স্যামসাং গ্যালাক্সি ট্যাব এ৯ প্লাসের দাম ৩৪ হাজার টাকা এবং লেনোভো ট্যাব এম১১-এর দাম ২৬ হাজার ৫০০ টাকা।

এই তুলনার ভিত্তিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের ব্যবধান প্রায় ৯৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট মডেল, কনফিগারেশন, ওয়ারেন্টি, সফটওয়্যার, সিম-সুবিধা, জিও-ট্যাগিং, আমদানি ব্যয়, কর ও সরবরাহ-পরবর্তী সেবার খরচ এক কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। 

তা সত্ত্বেও সরকারি চুক্তিমূল্য ও যৌথ চুক্তিতে উল্লেখিত সরবরাহমূল্যের ব্যবধান কেন এত বেশি, তার ব্যাখ্যা চাওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারি অর্থে কেনা প্রতিটি ডিভাইসের প্রকৃত ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রাপ্য অর্থ এবং চূড়ান্ত সুবিধাভোগীদের হিসাব প্রকাশ করা হলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।

হুইলচেয়ারের দাম নিয়েও প্রশ্ন

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ডিইডব্লিউয়ের মাধ্যমে মোট ২৬ হাজার হুইলচেয়ার সরবরাহের কার্যক্রম নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২১ হাজার প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহারের জন্য বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিটি হুইলচেয়ারের নির্ধারিত মূল্য ৮ হাজার ১৭৫ টাকা।

অন্যদিকে, অনুসন্ধানী তথ্যে বলা হয়েছে, ঢাকার খুচরা বাজারে সাধারণ প্রাপ্তবয়স্কদের একটি ফোল্ডিং হুইলচেয়ার ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়। চীনের বিভিন্ন কারখানা থেকে ১০টির বেশি হুইলচেয়ার একসঙ্গে অর্ডার করলে প্রতিটির দাম ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে হতে পারে।

এই ব্যবধান থেকে সরকারি কেনাকাটায় অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সরকারি সরবরাহের হুইলচেয়ারের উপকরণ, ধারণক্ষমতা, মান, ওয়ারেন্টি, পরিবহন, আমদানি শুল্ক ও অন্যান্য সেবা খুচরা পণ্যের সঙ্গে তুলনীয় কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি।

একই ক্রয়কার্যক্রমে ২ হাজার পা-চালিত সেলাই মেশিন কেনা হয়েছে প্রতিটি ১৪ হাজার ৫০০ টাকা দরে। পণ্যের বিবরণে প্রতি মিনিটে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার সেলাইয়ের গতির দাবি করা হলেও উল্লেখিত সিঙ্গার ১৫সিএইচ১ মডেলের সর্বোচ্চ গতি ১ হাজার বলে অনুসন্ধানী তথ্যে দাবি করা হয়েছে।

মডেলের প্রকৃত কারিগরি বিবরণ, প্রস্তুতকারকের স্পেসিফিকেশন এবং সরবরাহকৃত মেশিনের পরীক্ষার ফলাফল যাচাই করলে এই অসামঞ্জস্যের প্রকৃতি বোঝা যাবে।

ছয় দিনের মধ্যে কার্যাদেশ

নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৪ মার্চের নির্দেশনার পরও হুইলচেয়ার ও সেলাই মেশিন কেনার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়। ডিইডব্লিউ ৪ জুন প্রস্তাব জমা দেয় এবং মাত্র ছয় দিনের মাথায়, ১০ জুন সরবরাহের কার্যাদেশ পায়।

এত অল্প সময়ে প্রস্তাব যাচাই, পণ্যের মান মূল্যায়ন, মূল্য বিশ্লেষণ, অনুমোদন ও চুক্তির শর্ত নির্ধারণ কীভাবে সম্পন্ন করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দ্রুত কার্যাদেশ দেওয়া নিজে থেকেই অনিয়মের প্রমাণ নয়; কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া না থাকা এবং পণ্যের মান নিয়ে পরবর্তী অভিযোগের সঙ্গে সময়রেখাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় হুইলচেয়ার ‘মানদণ্ডবহির্ভূত’

হুইলচেয়ার কেনাকাটার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি এসেছে আন্তর্জাতিক মান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান এসজিএসের (SGS) পরীক্ষার প্রতিবেদন থেকে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর এসজিএস ১ হাজার ৫৪৮টি হুইলচেয়ারের একটি চালান থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ১২৫টি নমুনা পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় ১২৫টির মধ্যে ৩০টিতে গুরুতর ত্রুটি পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ত্রুটির মধ্যে ছিল অনিরাপদ চাকা ও ব্রেক।

এ ছাড়া পরীক্ষার সময় ৬৮ শতাংশ হুইলচেয়ারের আসন ও পেছনের অংশে লোহার তারের উন্মুক্ত অংশ পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে। নমুনাগুলোর আসনের কিনারায় ধারালো ও বিপজ্জনক ধাতব অংশও ছিল, যা ব্যবহারকারীদের আঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চাকার মান পরীক্ষা করতে কারখানা কর্তৃপক্ষ বাধা দেয় এবং ডিইডব্লিউ পণ্যের স্পেসিফিকেশন সরবরাহ করেনি। এসজিএসের প্রতিবেদনে নমুনাগুলোতে উন্মুক্ত ধাতব অংশের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ রয়েছে।

ক্রয়সংক্রান্ত মানদণ্ড অনুযায়ী, ১২৫টি নমুনার মধ্যে সাতটির বেশি ত্রুটিপূর্ণ পাওয়া গেলে চালান বাতিল করার কথা বলে অনুসন্ধানী তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই মানদণ্ড প্রযোজ্য হলে ৩০টি গুরুতর ত্রুটিপূর্ণ নমুনা পাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।

এসজিএস ওই ১ হাজার ৫৪৮টি হুইলচেয়ারের চালানকে ‘Not-Conform’ বা নির্ধারিত মানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরে ইমেইলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

এই প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ কপি, নমুনা নির্বাচনের পদ্ধতি, পরীক্ষার মানদণ্ড এবং এসজিএসের ইমেইল সরাসরি যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বা ডিইডব্লিউকে পরীক্ষার ফলাফলের জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।

অভিযোগ অনুযায়ী, এসজিএসের ছাড়পত্র না থাকা সত্ত্বেও ত্রুটিপূর্ণ চালানের হুইলচেয়ার বাংলাদেশে আনা হয়েছে এবং শাহীনবাগে নৌবাহিনীর একটি ভবনের নিচে রাখা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য কেনা পণ্যের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ সত্য হলে তা কেবল আর্থিক অনিয়মের বিষয় নয়; ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

পুরোনো বিধিমালার ধারা, এক দিনে মূল্যায়ন

ট্যাবলেট কেনার চুক্তিতে ২৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০০৮’-এর ৫৪ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে বলে নথিতে দাবি করা হয়েছে। একই তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০২৫ কার্যকর হওয়ায় আগের বিধিমালা বাতিল হয়েছিল।

এখানে দুটি বিষয় যাচাই করা জরুরি: সংশ্লিষ্ট তারিখে কার্যকর বিধিমালার সঠিক নাম ও কার্যকারিতা এবং চুক্তিতে উল্লিখিত ৫৪ ধারার প্রকৃত প্রয়োগ। বিধিমালার কার্যকর হওয়ার তারিখ বা ধারা ভুলভাবে উল্লেখ করা হয়ে থাকলে তা নথি প্রস্তুত ও আইনি যাচাইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে শুধু ধারার উল্লেখ দেখে পুরো চুক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করা যায় না।

নথিতে আরও বলা হয়েছে, ১০ আগস্ট সকাল ১১টায় মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়। এরপর এক দিনের মধ্যে একক উৎস থেকে দরপ্রস্তাব খোলা, মূল্যায়ন এবং প্রস্তাবিত ৪৯ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৪৮ হাজার টাকা নির্ধারণের মাধ্যমে চুক্তির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়।

এক হাজার টাকা কমানোর এই পদক্ষেপকে অনুসন্ধানী তথ্যে লোকদেখানো মূল্যছাড় বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি, বাজার যাচাই, কারিগরি মূল্যায়ন ও অনুমোদনের নথি পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে, এই ছাড় প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়নের ফল ছিল, নাকি কেবল আনুষ্ঠানিকতা।

সরকারি টেশিসের প্রস্তাব বাতিল কেন?

সরকারি টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস) ৯ জুলাই সরাসরি ট্যাবলেট সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল বলে অনুসন্ধানী তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। সেই প্রস্তাব বাতিল করে ডিইডব্লিউ ও তার বেসরকারি অংশীদারকে সুযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

যদি সরকারি প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে সক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে তার প্রস্তাব বাতিলের কারণ কী ছিল—তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। মূল্য, কারিগরি সক্ষমতা, সময়মতো সরবরাহ, ওয়ারেন্টি এবং প্রকল্পের শর্তের ভিত্তিতে তুলনামূলক মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, সেই নথি প্রকাশ করা হলে সিদ্ধান্তটির যৌক্তিকতা যাচাই করা সম্ভব হবে।

ব্যাংক গ্যারান্টি নিয়েও অস্বাভাবিকতা

সরকারি চুক্তিতে ডিইডব্লিউ সরবরাহকারী হিসেবে থাকলেও চুক্তি স্বাক্ষরের চার দিন আগে, ১৯ আগস্ট, স্যালস্ট্রার অনুরোধে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ৩২ কোটি ৭০ লাখ টাকার পারফরম্যান্স গ্যারান্টি দেয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

হুইলচেয়ার চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলামার্ক লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নৌবাহিনীর পক্ষ হয়ে ২ কোটি ২০ লাখ টাকার গ্যারান্টি দেয় বলেও দাবি করা হয়েছে।

এই দুই ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি, গ্যারান্টির শর্ত, সুবিধাভোগী, দায় বহনের কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ক্রয়চুক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এসব ব্যবস্থা প্রচলিত নিয়মের বাইরে ছিল কি না, তা নির্ধারণে প্রযোজ্য বিধি ও মূল ব্যাংক নথি অপরিহার্য।

নতুন ক্রয়বিধিতে চূড়ান্ত সুবিধাভোগী মালিকানার তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও অনুসন্ধানী তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ডিইডব্লিউ সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তার সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি অংশীদারদের প্রকৃত মালিকানা ও আর্থিক সুবিধাভোগীর তথ্য সরকারি নথিতে যথেষ্ট স্পষ্ট নয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরকারি চুক্তিতে নাম থাকা সরবরাহকারী এবং বাস্তবে পণ্য সরবরাহ, অর্থ গ্রহণ ও মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্ক পরিষ্কার না হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ট্যাবলেট সরবরাহে বিলম্ব

৬৬ হাজার ৮১৫টি ট্যাবলেটের মধ্যে মাত্র ৯ হাজারটি সরবরাহ করা হয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিটি ট্যাবলেটে সিম কার্ড, জিও-ট্যাগিং, গ্রামীণফোনের স্টিকার এবং প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার সংযোজন করতে প্রায় ২২ মিনিট সময় লাগছে বলে দাবি করে ডিইডব্লিউ সরবরাহের সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে।

এই অগ্রগতি প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সূচির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা জানতে কার্যাদেশের সময়সীমা, সরবরাহের ধাপ, বিলম্বের কারণ এবং সময় বাড়ানোর আবেদন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীদের কাছে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা পৌঁছে দেওয়া। তাই সময়মতো পণ্য সরবরাহ না হলে বা যন্ত্রের মান ও কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে সরকারি ব্যয়ের প্রত্যাশিত সুফল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

১০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফার অভিযোগ

অনুসন্ধানী নথির ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে, ৩৪২ কোটি ৭০ লাখ টাকার দুটি ক্রয়চুক্তিতে মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা অন্তত ১০০ কোটি টাকা হতে পারে। এর মধ্যে বুরাক ব্রেক লিমিটেডের সম্ভাব্য অংশ প্রায় ৬৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, কর-ভ্যাট-সংক্রান্ত অনু

Popular post
বাংলাদেশে ঐতিহাসিক নির্বাচন: বিএনপি এগিয়ে, জামায়াতের উত্থান ও তরুণ ভোটারদের প্রভাব

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ফারুকীর সম্পদ কমেছে, তিশার বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি: সম্পদ বিবরণী ঘিরে আলোচনা

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।

গাজায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনে

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ।  ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী।    ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে,  স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ  বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”

সংসার সামলাতে অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন রোজিনা

বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।

কুড়িগ্রামের তাজু ভাই ২.০: ‘সরকারি রেটে জিলাপি’ প্রশ্নে ভাইরাল এক নির্মাণশ্রমিকের গল্প

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে।  কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে।  কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।  কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি।  মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশেষ সংবাদ

View more
৩৪২ কোটি টাকার সরকারি কেনাকাটা: দরপত্র ছাড়াই চুক্তি, মান পরীক্ষায় ব্যর্থ হুইলচেয়ার

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুটি ক্রয়চুক্তি ঘিরে স্বজনপ্রীতি, অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ ও বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ। নথি অনুযায়ী, নৌবাহিনী পরিচালিত ডিইডব্লিউয়ের সঙ্গে চুক্তির পর বেসরকারি অংশীদারদের মধ্যে মুনাফা বণ্টনের ব্যবস্থা; আন্তর্জাতিক মান যাচাইকারী সংস্থা এসজিএসের পরীক্ষায় হুইলচেয়ারের চালান ‘মানদণ্ডবহির্ভূত’ হিসেবে চিহ্নিত। ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সরকারি কেনাকাটায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের বদলে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি, বাজারদরের তুলনায় বেশি মূল্য নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক মান যাচাইকারী সংস্থার পরীক্ষায় ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত পণ্য আমদানির অভিযোগ উঠেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুটি বড় ক্রয়চুক্তি ঘিরে। চুক্তি দুটির মোট মূল্য ৩৪২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। নথিপত্রের বরাতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের (ডিইডব্লিউ) মাধ্যমে ৩২০ কোটি ৭১ লাখ টাকার অ্যান্ড্রয়েড ট্যাবলেট এবং ২১ কোটি ৯৯ লাখ টাকার হুইলচেয়ার ও সেলাই মেশিন কেনার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, পণ্যের প্রকৃত মূল্য, সরবরাহকারীদের সক্ষমতা এবং সরকারি অর্থের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী কারা—এসব প্রশ্ন। বিশেষ করে ট্যাবলেট সরবরাহের সরকারি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ডিইডব্লিউ, স্যালস্ট্রা লিমিটেড ও বুরাক ব্রেক লিমিটেডের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ত্রিপক্ষীয় ব্যবসায়িক চুক্তি নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ওই চুক্তির বর্ণনা অনুযায়ী, সরকারি কাজ এনে দেওয়ার বিনিময়ে ডিইডব্লিউ চুক্তিমূল্যের ৪ শতাংশ পাবে। অন্যদিকে, পণ্য সরবরাহের ব্যয় ও নির্ধারিত খরচ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট মুনাফা পাওয়ার কথা বুরাক ব্রেকের। বুরাক ব্রেকের মালিকানায় রয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াৎ হোসেন বকুলের ভাই সরদার তোফাজ্জল হোসেন লিয়াকতের ছেলে ও মেয়ে। ফলে সরকারি ক্রয়চুক্তির আর্থিক সুবিধা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি পরিবারের প্রতিষ্ঠানের কাছে যাওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।   চুক্তির পর গোপন ব্যবসায়িক সমঝোতা নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও ডিইডব্লিউয়ের মধ্যে ৩২০ কোটি ৭১ লাখ টাকার একটি চুক্তি হয়। চুক্তির আওতায় প্রতিটি ৪৮ হাজার টাকা দরে ৬৬ হাজার ৮১৫টি অ্যান্ড্রয়েড ট্যাবলেট সরবরাহের দায়িত্ব পায় ডিইডব্লিউ। চুক্তি স্বাক্ষরের পরদিন, ২৪ আগস্ট, ডিইডব্লিউ, ঢাকাভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্যালস্ট্রা লিমিটেড এবং বুরাক ব্রেক লিমিটেডের মধ্যে ছয় পৃষ্ঠার একটি ত্রিপক্ষীয় যৌথ ব্যবসায়িক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। চুক্তির বিবরণ অনুযায়ী, ডিইডব্লিউ কোনো মূলধন বিনিয়োগ করবে না, পরিচালন ব্যয় বহন করবে না এবং ব্যবসার লাভ-ক্ষতির দায়ও নেবে না। সরকারি চুক্তি এনে দেওয়ার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি মোট চুক্তিমূল্যের ৪ শতাংশ পাওয়ার কথা—যার পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে, ট্যাবলেট আমদানি ও সরবরাহের জন্য স্যালস্ট্রা লিমিটেডের বরাদ্দ ১৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সব কর, নির্ধারিত পরিশোধ ও ব্যাংক চার্জ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট মুনাফা বুরাক ব্রেক লিমিটেডের দুটি পৃথক ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার কথা বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ২০ শতাংশ করের একটি আনুমানিক হিসাব ধরে বুরাক ব্রেকের সম্ভাব্য আয় দেখানো হয়েছে ৬৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। তবে এটি চূড়ান্ত নিরীক্ষিত মুনাফা নয়; প্রকৃত আয় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাব, ব্যয়, কর ও ব্যাংক লেনদেন যাচাই প্রয়োজন। এখানে মূল প্রশ্ন হলো, সরকারি ক্রয়চুক্তিতে ডিইডব্লিউয়ের ভূমিকা ঠিক কী ছিল, বেসরকারি অংশীদার নির্বাচনের ভিত্তি কী এবং সরকারি কাজ এনে দেওয়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট হারে অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থাটি প্রযোজ্য ক্রয়বিধি ও চুক্তির শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। অভিজ্ঞতাহীন প্রতিষ্ঠানের হাতে বিপুল মুনাফার সুযোগ? বুরাক ব্রেক লিমিটেড নিবন্ধিত হয় ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর। নথিতে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে—অ্যাপার্টমেন্ট সি-২, বাড়ি ১-এ, রোড ৭৯, গুলশান-২, ঢাকা। নিবন্ধনের সময় প্রতিষ্ঠানটির দুই পরিচালক সরদার রাফিন এস এ হোসেন ও অনিকা রাইদা লিয়ার বয়স যথাক্রমে ১৯ ও ২৩ বছর ছিল বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াৎ হোসেন বকুলের ভাতিজা ও ভাতিজি। তাঁদের বাবা সরদার তোফাজ্জল হোসেন লিয়াকত নরসিংদী জেলা বিএনপির সহসভাপতি এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছোট ভাই। আইটি সরঞ্জাম বা ট্যাবলেট সরবরাহে প্রতিষ্ঠানটির পূর্ব অভিজ্ঞতা, নিজস্ব ওয়েবসাইট কিংবা আগের কাজের রেকর্ড পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানী তথ্যে দাবি করা হয়েছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য শতকোটি টাকার সরকারি ক্রয়চুক্তি থেকে বিপুল মুনাফা পাওয়ার ব্যবস্থা কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের পূর্ব অভিজ্ঞতা সীমিত থাকা নিজে থেকেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে নির্বাচিত হয়েছে, তার কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে এবং চুক্তির আর্থিক শর্তগুলো অনুমোদিত নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। সরকারি দপ্তরে লিয়াকতের উপস্থিতি, বৈঠকের ছবি চুক্তি ও ক্রয়নথিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বকুল বা তাঁর ভাই লিয়াকতের নাম সরাসরি নেই বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। তবে ক্রয়প্রক্রিয়া চলাকালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ এবং নৌবাহিনীর পোশাক পরা কর্মকর্তাদের সঙ্গে লিয়াকতকে একই টেবিলে বসে আলোচনা করতে দেখা গেছে—এমন ছবি সামনে এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। চুক্তি সম্পাদনের আগে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের দপ্তরেও লিয়াকতের বৈঠকের ছবি রয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারি দপ্তরে তাঁর উপস্থিতি এবং ক্রয়চুক্তিতে পরিবারের প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি একই সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, ওই বৈঠকগুলোর উদ্দেশ্য কী ছিল এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করা হয়েছিল কি না। লিয়াকত চুক্তিতে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বকুলও এ প্রক্রিয়ায় নিজের প্রত্যক্ষ প্রভাব বা সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, বৈঠকের কার্যবিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন। সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও সচিবের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। তবে অভিযোগের পক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য তাঁদের বক্তব্য, অনুমোদন-সংক্রান্ত নথি এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার দায়িত্ব বণ্টন পরীক্ষা করা জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা কি উপেক্ষিত হয়েছে? অনুসন্ধানী তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকে ৪০টিরও বেশি মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থায় একটি গোপন চিঠি পাঠানো হয়। এতে সশস্ত্র বাহিনী বা সামরিক বাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি সরকারি কেনাকাটায় যুক্ত করার আগে প্রধানমন্ত্রীর পূর্বানুমোদন নেওয়ার নির্দেশনা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও নৌবাহিনী প্রধানের কাছে পাঠানো ওই নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ, অভিযোগ অনুযায়ী, সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘স্ট্রেংদেনিং সোশ্যাল প্রোটেকশন ফর ইমপ্রুভড রেজিলিয়েন্স, ইনক্লুশন অ্যান্ড টার্গেটিং’ বা এসপিআইআরআইটি (SPIRIT) প্রকল্পের ৩২০ কোটি ৭১ লাখ টাকার ট্যাবলেট চুক্তি এবং প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের ২১ কোটি ৯৯ লাখ টাকার হুইলচেয়ার ও সেলাই মেশিনের চুক্তির ক্ষেত্রে ওই পূর্বানুমোদনের নথি পাওয়া যায়নি। নির্দেশনার প্রকৃত ভাষা, প্রযোজ্যতার পরিধি এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির অনুমোদন-নথি পরীক্ষা ছাড়া একে নিশ্চিতভাবে নির্দেশনা লঙ্ঘন বলা যায় না। তবে প্রয়োজনীয় পূর্বানুমোদন না থাকলে তা ক্রয়প্রক্রিয়ার বৈধতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলতে পারে। বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে ট্যাবলেট? সরকারি চুক্তিতে প্রতিটি এক্সট্রা এক্সটি ওয়ান (Xtra XT1) ট্যাবলেটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ হাজার টাকা। কীবোর্ড ও স্টাইলাসসহ ট্যাবলেটটির জন্য এই মূল্য ধরা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, ডিইডব্লিউ, স্যালস্ট্রা ও বুরাক ব্রেকের মধ্যকার যৌথ ব্যবসায়িক চুক্তিতে স্যালস্ট্রার সরবরাহমূল্য দেখানো হয়েছে প্রতিটি ২৬ হাজার ৮২৮ টাকা। প্রতিবেদনে তুলনার জন্য আরও দুটি মডেলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে—কীবোর্ডসহ স্যামসাং গ্যালাক্সি ট্যাব এ৯ প্লাসের দাম ৩৪ হাজার টাকা এবং লেনোভো ট্যাব এম১১-এর দাম ২৬ হাজার ৫০০ টাকা। এই তুলনার ভিত্তিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের ব্যবধান প্রায় ৯৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট মডেল, কনফিগারেশন, ওয়ারেন্টি, সফটওয়্যার, সিম-সুবিধা, জিও-ট্যাগিং, আমদানি ব্যয়, কর ও সরবরাহ-পরবর্তী সেবার খরচ এক কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।  তা সত্ত্বেও সরকারি চুক্তিমূল্য ও যৌথ চুক্তিতে উল্লেখিত সরবরাহমূল্যের ব্যবধান কেন এত বেশি, তার ব্যাখ্যা চাওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারি অর্থে কেনা প্রতিটি ডিভাইসের প্রকৃত ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রাপ্য অর্থ এবং চূড়ান্ত সুবিধাভোগীদের হিসাব প্রকাশ করা হলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। হুইলচেয়ারের দাম নিয়েও প্রশ্ন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ডিইডব্লিউয়ের মাধ্যমে মোট ২৬ হাজার হুইলচেয়ার সরবরাহের কার্যক্রম নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২১ হাজার প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহারের জন্য বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিটি হুইলচেয়ারের নির্ধারিত মূল্য ৮ হাজার ১৭৫ টাকা। অন্যদিকে, অনুসন্ধানী তথ্যে বলা হয়েছে, ঢাকার খুচরা বাজারে সাধারণ প্রাপ্তবয়স্কদের একটি ফোল্ডিং হুইলচেয়ার ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়। চীনের বিভিন্ন কারখানা থেকে ১০টির বেশি হুইলচেয়ার একসঙ্গে অর্ডার করলে প্রতিটির দাম ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে হতে পারে। এই ব্যবধান থেকে সরকারি কেনাকাটায় অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সরকারি সরবরাহের হুইলচেয়ারের উপকরণ, ধারণক্ষমতা, মান, ওয়ারেন্টি, পরিবহন, আমদানি শুল্ক ও অন্যান্য সেবা খুচরা পণ্যের সঙ্গে তুলনীয় কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি। একই ক্রয়কার্যক্রমে ২ হাজার পা-চালিত সেলাই মেশিন কেনা হয়েছে প্রতিটি ১৪ হাজার ৫০০ টাকা দরে। পণ্যের বিবরণে প্রতি মিনিটে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার সেলাইয়ের গতির দাবি করা হলেও উল্লেখিত সিঙ্গার ১৫সিএইচ১ মডেলের সর্বোচ্চ গতি ১ হাজার বলে অনুসন্ধানী তথ্যে দাবি করা হয়েছে। মডেলের প্রকৃত কারিগরি বিবরণ, প্রস্তুতকারকের স্পেসিফিকেশন এবং সরবরাহকৃত মেশিনের পরীক্ষার ফলাফল যাচাই করলে এই অসামঞ্জস্যের প্রকৃতি বোঝা যাবে। ছয় দিনের মধ্যে কার্যাদেশ নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৪ মার্চের নির্দেশনার পরও হুইলচেয়ার ও সেলাই মেশিন কেনার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়। ডিইডব্লিউ ৪ জুন প্রস্তাব জমা দেয় এবং মাত্র ছয় দিনের মাথায়, ১০ জুন সরবরাহের কার্যাদেশ পায়। এত অল্প সময়ে প্রস্তাব যাচাই, পণ্যের মান মূল্যায়ন, মূল্য বিশ্লেষণ, অনুমোদন ও চুক্তির শর্ত নির্ধারণ কীভাবে সম্পন্ন করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দ্রুত কার্যাদেশ দেওয়া নিজে থেকেই অনিয়মের প্রমাণ নয়; কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া না থাকা এবং পণ্যের মান নিয়ে পরবর্তী অভিযোগের সঙ্গে সময়রেখাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় হুইলচেয়ার ‘মানদণ্ডবহির্ভূত’ হুইলচেয়ার কেনাকাটার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি এসেছে আন্তর্জাতিক মান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান এসজিএসের (SGS) পরীক্ষার প্রতিবেদন থেকে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর এসজিএস ১ হাজার ৫৪৮টি হুইলচেয়ারের একটি চালান থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ১২৫টি নমুনা পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় ১২৫টির মধ্যে ৩০টিতে গুরুতর ত্রুটি পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ত্রুটির মধ্যে ছিল অনিরাপদ চাকা ও ব্রেক। এ ছাড়া পরীক্ষার সময় ৬৮ শতাংশ হুইলচেয়ারের আসন ও পেছনের অংশে লোহার তারের উন্মুক্ত অংশ পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে। নমুনাগুলোর আসনের কিনারায় ধারালো ও বিপজ্জনক ধাতব অংশও ছিল, যা ব্যবহারকারীদের আঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চাকার মান পরীক্ষা করতে কারখানা কর্তৃপক্ষ বাধা দেয় এবং ডিইডব্লিউ পণ্যের স্পেসিফিকেশন সরবরাহ করেনি। এসজিএসের প্রতিবেদনে নমুনাগুলোতে উন্মুক্ত ধাতব অংশের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ রয়েছে। ক্রয়সংক্রান্ত মানদণ্ড অনুযায়ী, ১২৫টি নমুনার মধ্যে সাতটির বেশি ত্রুটিপূর্ণ পাওয়া গেলে চালান বাতিল করার কথা বলে অনুসন্ধানী তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই মানদণ্ড প্রযোজ্য হলে ৩০টি গুরুতর ত্রুটিপূর্ণ নমুনা পাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এসজিএস ওই ১ হাজার ৫৪৮টি হুইলচেয়ারের চালানকে ‘Not-Conform’ বা নির্ধারিত মানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরে ইমেইলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ কপি, নমুনা নির্বাচনের পদ্ধতি, পরীক্ষার মানদণ্ড এবং এসজিএসের ইমেইল সরাসরি যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বা ডিইডব্লিউকে পরীক্ষার ফলাফলের জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। অভিযোগ অনুযায়ী, এসজিএসের ছাড়পত্র না থাকা সত্ত্বেও ত্রুটিপূর্ণ চালানের হুইলচেয়ার বাংলাদেশে আনা হয়েছে এবং শাহীনবাগে নৌবাহিনীর একটি ভবনের নিচে রাখা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য কেনা পণ্যের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ সত্য হলে তা কেবল আর্থিক অনিয়মের বিষয় নয়; ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। পুরোনো বিধিমালার ধারা, এক দিনে মূল্যায়ন ট্যাবলেট কেনার চুক্তিতে ২৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০০৮’-এর ৫৪ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে বলে নথিতে দাবি করা হয়েছে। একই তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০২৫ কার্যকর হওয়ায় আগের বিধিমালা বাতিল হয়েছিল। এখানে দুটি বিষয় যাচাই করা জরুরি: সংশ্লিষ্ট তারিখে কার্যকর বিধিমালার সঠিক নাম ও কার্যকারিতা এবং চুক্তিতে উল্লিখিত ৫৪ ধারার প্রকৃত প্রয়োগ। বিধিমালার কার্যকর হওয়ার তারিখ বা ধারা ভুলভাবে উল্লেখ করা হয়ে থাকলে তা নথি প্রস্তুত ও আইনি যাচাইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে শুধু ধারার উল্লেখ দেখে পুরো চুক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করা যায় না। নথিতে আরও বলা হয়েছে, ১০ আগস্ট সকাল ১১টায় মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়। এরপর এক দিনের মধ্যে একক উৎস থেকে দরপ্রস্তাব খোলা, মূল্যায়ন এবং প্রস্তাবিত ৪৯ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৪৮ হাজার টাকা নির্ধারণের মাধ্যমে চুক্তির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়। এক হাজার টাকা কমানোর এই পদক্ষেপকে অনুসন্ধানী তথ্যে লোকদেখানো মূল্যছাড় বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি, বাজার যাচাই, কারিগরি মূল্যায়ন ও অনুমোদনের নথি পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে, এই ছাড় প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়নের ফল ছিল, নাকি কেবল আনুষ্ঠানিকতা। সরকারি টেশিসের প্রস্তাব বাতিল কেন? সরকারি টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস) ৯ জুলাই সরাসরি ট্যাবলেট সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল বলে অনুসন্ধানী তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। সেই প্রস্তাব বাতিল করে ডিইডব্লিউ ও তার বেসরকারি অংশীদারকে সুযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। যদি সরকারি প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে সক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে তার প্রস্তাব বাতিলের কারণ কী ছিল—তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। মূল্য, কারিগরি সক্ষমতা, সময়মতো সরবরাহ, ওয়ারেন্টি এবং প্রকল্পের শর্তের ভিত্তিতে তুলনামূলক মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, সেই নথি প্রকাশ করা হলে সিদ্ধান্তটির যৌক্তিকতা যাচাই করা সম্ভব হবে। ব্যাংক গ্যারান্টি নিয়েও অস্বাভাবিকতা সরকারি চুক্তিতে ডিইডব্লিউ সরবরাহকারী হিসেবে থাকলেও চুক্তি স্বাক্ষরের চার দিন আগে, ১৯ আগস্ট, স্যালস্ট্রার অনুরোধে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ৩২ কোটি ৭০ লাখ টাকার পারফরম্যান্স গ্যারান্টি দেয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। হুইলচেয়ার চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলামার্ক লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নৌবাহিনীর পক্ষ হয়ে ২ কোটি ২০ লাখ টাকার গ্যারান্টি দেয় বলেও দাবি করা হয়েছে। এই দুই ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি, গ্যারান্টির শর্ত, সুবিধাভোগী, দায় বহনের কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ক্রয়চুক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এসব ব্যবস্থা প্রচলিত নিয়মের বাইরে ছিল কি না, তা নির্ধারণে প্রযোজ্য বিধি ও মূল ব্যাংক নথি অপরিহার্য। নতুন ক্রয়বিধিতে চূড়ান্ত সুবিধাভোগী মালিকানার তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও অনুসন্ধানী তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ডিইডব্লিউ সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তার সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি অংশীদারদের প্রকৃত মালিকানা ও আর্থিক সুবিধাভোগীর তথ্য সরকারি নথিতে যথেষ্ট স্পষ্ট নয় বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি চুক্তিতে নাম থাকা সরবরাহকারী এবং বাস্তবে পণ্য সরবরাহ, অর্থ গ্রহণ ও মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্ক পরিষ্কার না হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ট্যাবলেট সরবরাহে বিলম্ব ৬৬ হাজার ৮১৫টি ট্যাবলেটের মধ্যে মাত্র ৯ হাজারটি সরবরাহ করা হয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিটি ট্যাবলেটে সিম কার্ড, জিও-ট্যাগিং, গ্রামীণফোনের স্টিকার এবং প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার সংযোজন করতে প্রায় ২২ মিনিট সময় লাগছে বলে দাবি করে ডিইডব্লিউ সরবরাহের সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে। এই অগ্রগতি প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সূচির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা জানতে কার্যাদেশের সময়সীমা, সরবরাহের ধাপ, বিলম্বের কারণ এবং সময় বাড়ানোর আবেদন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীদের কাছে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা পৌঁছে দেওয়া। তাই সময়মতো পণ্য সরবরাহ না হলে বা যন্ত্রের মান ও কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে সরকারি ব্যয়ের প্রত্যাশিত সুফল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ১০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফার অভিযোগ অনুসন্ধানী নথির ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে, ৩৪২ কোটি ৭০ লাখ টাকার দুটি ক্রয়চুক্তিতে মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা অন্তত ১০০ কোটি টাকা হতে পারে। এর মধ্যে বুরাক ব্রেক লিমিটেডের সম্ভাব্য অংশ প্রায় ৬৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, কর-ভ্যাট-সংক্রান্ত অনু

নিজস্ব প্রতিবেদক অক্টোবর ১৯, ২০২৬ 0

ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগে দুর্নীতি: ডিডি ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে দৈনিক ১০ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ

ভারতে হিন্দুত্ববাদী জঙ্গিদের অনলাইন হেনস্থার শিকার মুসলিম বিচারককে নিরাপত্তা দেয়ার নির্দেশ

বিচারকের নিরাপত্তা জোরদার: গণপিটুনি রায়ের পর হুমকির ঘটনায় মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের কঠোর নির্দেশ

দোহা আলোচনায় ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’, হরমুজ দিয়ে নিরাপদে বেরিয়ে গেল থাইল্যান্ডের ১০ জাহাজ

কুয়াকাটায় সেঞ্চুরি গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ: ১০ বছরেও প্লট নয়, রেজিস্ট্রেশন ও উন্নয়ন ফি'র নামে কোটি টাকা আদায়

  ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পর্যটন সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে আবাসন ও হোটেল প্রকল্পের স্বপ্ন দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহের পরও এক দশক পেরিয়ে নির্ধারিত প্লট বুঝিয়ে না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সেঞ্চুরি গ্রুপের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, 'সেঞ্চুরি কুয়াকাটা মডেল টাউন', 'সেঞ্চুরি গোল্ড কোস্ট হোটেল অ্যান্ড স্পা' এবং 'সেঞ্চুরি ট্রেজার আইল্যান্ড অ্যান্ড বাটার ফ্লাই পার্ক'—এই তিন প্রকল্পে জমি, হোটেলের মালিকানা ও ভবিষ্যৎ লাভের প্রলোভন দেখিয়ে বিনিয়োগ নেওয়া হলেও অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি আজও বাস্তবায়ন হয়নি। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমজিআর নাসির মজুমদার। এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—প্লটের পুরো মূল্য পরিশোধের পরও নির্দিষ্ট জমি বুঝিয়ে না দেওয়া, সরকারি ফি'র তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ আদায়, চুক্তির বাইরে ভিন্ন মৌজার জমি দলিলে অন্তর্ভুক্ত করা এবং দফায় দফায় নতুন অর্থ দাবির মতো একাধিক অভিযোগ। পুরো টাকা পরিশোধের ১০ বছর পরও প্লট নেই ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রাহকদের কাছে কাঠাপ্রতি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৫০ টাকা দরে পাঁচ কাঠার প্লট বিক্রির ঘোষণা দেয় সেঞ্চুরি গ্রুপ। ২০১১ সালের মে মাসে গ্রাহকদের হাতে চুক্তিপত্র তুলে দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, মাসে ১১ হাজার ২৫ টাকা করে ৭২ কিস্তিতে ২০১৬ সালের জুন মাসে মোট ৭ লাখ ৯৩ হাজার ৮০০ টাকা পরিশোধ করেন ক্রেতারা। কিন্তু ২০২৬ সালেও অধিকাংশ ক্রেতা তাদের নির্ধারিত প্লট বুঝে পাননি। কিস্তিতে সামান্য দেরি, এরপর জরিমানা ও ঘুষের অভিযোগ একাধিক গ্রাহক জানিয়েছেন, কিস্তি পরিশোধে সামান্য বিলম্ব হলেই বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা হতো। একজন ভুক্তভোগীর দাবি, জরিমানা কমিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে কোম্পানির এক কর্মকর্তাকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। এরপরও তার কাছ থেকে ৩১ হাজার ১৬৩ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।   উন্নয়ন ও রেজিস্ট্রেশনের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ২০১৬ সালে প্লটের সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধের পরও ২০২১ সালে গ্রাহকদের কাছ থেকে ডেভেলপমেন্ট চার্জ হিসেবে প্লট মূল্যের ১৫ শতাংশ হারে ১ লাখ ১৯ হাজার ৭০ টাকা নেওয়া হয়। এরপর ২০২৪ সালে জমির রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে প্রতিটি গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া হয় ২ লাখ ৩০ হাজার ৯১২ টাকা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দলিলে উল্লেখিত মূল্যের ভিত্তিতে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন ফি সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ হওয়ার কথা। সেই হিসাবে সরকারি ফি দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ হাজার ৮৭৫ টাকা। অর্থাৎ সরকারি নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় দুই লাখ টাকা বেশি আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ। রেজিস্ট্রেশনের পর সামনে আসে নতুন জালিয়াতির অভিযোগ রেজিস্ট্রেশনের পর অনেক গ্রাহক জানতে পারেন, চুক্তিতে উল্লেখ করা প্লট বাস্তবে দেখাতে পারছে না কোম্পানি। ভুক্তভোগী আনিসুর রহমান (ছদ্মনাম) জানান, তাকে গঙ্গামতি মৌজার নির্দিষ্ট একটি প্লট দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দলিল পাওয়ার পরও সেই প্লট আজ পর্যন্ত বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, "২০১৬ সালে পুরো টাকা পরিশোধ করেছি। ২০২৪ সালে দলিল পেয়েছি। কিন্তু ২০২৬ সালেও প্লট পাইনি। উল্টো বিভিন্ন অজুহাতে এখনো টাকা দাবি করা হচ্ছে।" তার অভিযোগ, কিস্তিতে বিলম্বের কারণে প্রায় এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং জরিমানা কমানোর জন্য প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তাকে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। প্লট নেই, তবু নতুন করে অর্থ দাবি ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এখন জমির নামজারি করার জন্য প্রতিটি প্লটের বিপরীতে ৬০ হাজার টাকা দাবি করছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ সরকারি হিসাবে পাঁচ কাঠা জমির নামজারির ব্যয় প্রায় ১ হাজার ১৩০ টাকা। এ ছাড়া সীমানা প্রাচীর নির্মাণের নামে আরও দেড় লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। মাঠে গিয়ে মিলল না বিজ্ঞাপনের প্রকল্প সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে আধুনিক আবাসন প্রকল্পের কোনো দৃশ্যমান অবকাঠামো পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞাপনে দেখানো রাস্তা, পরিকল্পিত প্লট, নাগরিক সুবিধা কিংবা আধুনিক টাউনশিপের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব চোখে পড়েনি। প্রকল্পের বড় অংশ এখনও কৃষিজমি হিসেবেই রয়েছে। হোটেল প্রকল্পেও প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক সেঞ্চুরি গোল্ড কোস্ট হোটেল অ্যান্ড স্পা প্রকল্পে শুরুতে ৫০ শতাংশ জমির ওপর ১৬ তলা ভবন নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হলেও বর্তমানে ১৪ তলা পর্যন্ত নির্মাণ হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি— ৫০ শতাংশ নয়, বাস্তবে ভবন নির্মাণ হয়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ জমিতে। অবশিষ্ট জমি কার পার্কিং হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০২১ ও পরে ২০২২ সালে হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ২০২৬ সালেও প্রকল্প শেষ হয়নি। বিনিয়োগকারীরা এখনো সাব-কবলা বা দলিল পাননি। শেয়ারের দাম বেড়েছে, কিন্তু প্রকল্প এগোয়নি ২০১৬ সালে প্রতি শেয়ারের মূল্য ছিল ১ লাখ ৫১ হাজার টাকা। পরবর্তীতে তা ধাপে ধাপে বেড়ে— ২০১৮ সালে ১.৯৯ লাখ টাকা, ২০২১-২২ সালে ৩.৫০ লাখ টাকা, ২০২৬ সালের শুরুতে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ওঠে। পরে তা কমিয়ে ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। দ্বিতীয় হোটেল প্রকল্পেও একই অভিযোগ সেঞ্চুরি ট্রেজার আইল্যান্ড অ্যান্ড বাটার ফ্লাই পার্ক প্রকল্পে ৮১ শতাংশ জমির ওপর ১৪ তলা হোটেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেয়ার বিক্রি করা হলেও অনুসন্ধানে প্রকল্পের বাস্তব কোনো নির্মাণকাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বর্তমানে প্রতিটি শেয়ার ৭ লাখ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক জমির শেয়ার দুই প্রকল্পে বিক্রির অভিযোগ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গোল্ড কোস্ট হোটেলের বাইরে থাকা ৩৩ শতাংশ কার পার্কিংয়ের জমির শেয়ার একই সঙ্গে দুটি পৃথক প্রকল্পে বিক্রি করা হয়েছে। পরে দুই প্রকল্পের সংযোগ ঘটিয়ে এক শেয়ারে দুই হোটেলের মালিকানার অফার দেওয়া হয়। এ ছাড়া শুরুতে প্রচারপত্রে বছরে পাঁচ রাত ছয় দিন বিনামূল্যে থাকার সুবিধা উল্লেখ থাকলেও পরে সেই সুবিধা বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ যা বলছেন কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মো. সবুজ হোসাইন বলেন, হোটেল বা রিসোর্ট প্রকল্পের নামে নির্দিষ্ট জমি বা চৌহদ্দি ছাড়া ক্ষুদ্র অংশের জমির শেয়ার বিক্রির কোনো আইনগত সুযোগ নেই। তার ভাষায়, "এ ধরনের কার্যক্রম প্রতারণার শামিল।" তিনি আরও বলেন, কোম্পানি আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন ছাড়া কোনো কোম্পানি সাধারণ জনগণের কাছ থেকে শেয়ার বিক্রি করে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে না। সেঞ্চুরি গ্রুপের বক্তব্য অভিযোগ অস্বীকার করে সেঞ্চুরি গ্রুপের ডিজিএম তৌফিক চৌধুরী বলেন, "এসব মিথ্যা কথা।" অন্যদিকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমজিআর নাসির মজুমদার প্রথমে ফোনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। পরে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তায় তিনি লেখেন, "আপনি যা বলছেন বা ভাবছেন, আমি বা আমরা সে রকম খারাপ মানুষ না। আমি অসুস্থ। দোয়া করবেন, মৃত্যুর আগে যেন মানুষের পাওনা বুঝিয়ে দিতে পারি।"

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ৩০, ২০২৬ 0
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গে পরাজয়ের পর তৃণমূলে ভাঙন: মমতা নেতৃত্বে আস্থাহীনতা, দলত্যাগ ও আই-প্যাক বিতর্কে সংকট ঘনীভূত

শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়ক

শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়ক প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে দুর্নীতির অভিযোগ, ‘ভূতুড়ে’ স্থাপনায় কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ

আদালতের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ উঠেছে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প
ডিপিএইচই’র উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ: মোহাম্মদ হানিফকে ঘিরে টেন্ডার সিন্ডিকেট ও সরকারি অর্থ অপচয়ের প্রশ্ন

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায়। সংস্থাটির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের আধিপত্য এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ডিপিএইচই’র কর্মকর্তা মোহাম্মদ হানিফের নাম। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত আদালতে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি, তবু একের পর এক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ এবং তাঁর অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান তাঁকে ঘিরে বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ডিপিএইচই দেশের বিভিন্ন এলাকায় নলকূপ স্থাপন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রকল্পে কাজের মান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। সিলেট বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মোহাম্মদ হানিফের কর্মকাণ্ড স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দেয়। অভিযোগ ওঠে, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশেষ সুবিধা দেওয়া হতো। এতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রকৃত প্রতিযোগিতা ব্যাহত হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। যদিও সে সময় এসব অভিযোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক মামলা হয়নি, তবে একাধিক প্রকল্পের মান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। নলকূপ ও পানি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ পেকুয়া, ইন্দুরকানী এবং লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় বাস্তবায়িত নলকূপ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত গভীরতায় নলকূপ খনন না করেই পূর্ণ বিল উত্তোলন করা হয়েছে। কোথাও নিম্নমানের পাইপ ও যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কারণে কয়েক মাসের মধ্যেই নলকূপ অকেজো হয়ে পড়ে। কিছু এলাকায় পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে সরকারি নথিতে এসব প্রকল্পকে “শতভাগ সফল” হিসেবে দেখিয়ে বিল ছাড় করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সুবিধাভোগীদের কাছ থেকেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন এলাকায় সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি সুবিধা পাওয়ার জন্য দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছ থেকে গোপনে টাকা নেওয়া হয়েছে। যেখানে সরকারিভাবে বিনামূল্যে নলকূপ স্থাপনের কথা, সেখানে একটি প্রভাবশালী চক্র সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। টেন্ডার সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ মোহাম্মদ হানিফের প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিনি উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর অধীনস্থ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন সিকদারের বিরুদ্ধে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য এবং কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা হতো। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসব অভিযোগের কিছু বিষয়ে বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান করছে। ডিপিএইচই’র একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রকল্পভিত্তিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিল। তাদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হতো এবং বিনিময়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ হানিফ সরাসরি জড়িত ছিলেন কি না, তা তদন্তের বিষয়; তবে তাঁর দায়িত্বাধীন সময়ে এসব কার্যক্রম চলমান থাকা প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কাগজে অগ্রগতি, মাঠে ভিন্ন বাস্তবতা অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রকল্পের প্রাক্কলন ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়িয়ে দেখানো হতো যাতে অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয়। মাঠপর্যায়ের কাজের বাস্তব অগ্রগতি ও সরকারি নথির তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য থাকার অভিযোগও উঠেছে। কিছু ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ কাজকে সম্পন্ন দেখিয়ে বিল ছাড় করা হয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের। সরেজমিনে দেখা গেছে, কিছু এলাকায় স্থাপিত নলকূপ কয়েক মাসের মধ্যেই অকেজো হয়ে পড়ে। কোথাও আবার পানি ওঠেনি। কিন্তু সরকারি রেকর্ডে সেসব প্রকল্পকে সফলভাবে বাস্তবায়িত হিসেবে দেখানো হয়েছে। “বিশেষ বলয়” তৈরির অভিযোগ মোহাম্মদ হানিফের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি অধিদপ্তরের ভেতরে ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্প অনুমোদন, বিল পাস এবং মাঠপর্যায়ের তদারকির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারাই নিয়োজিত ছিলেন। ফলে একই গোষ্ঠীর প্রভাব ক্রমশ বাড়তে থাকে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, যারা অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন, তাঁদের প্রশাসনিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হতো। একই ঠিকাদারের বারবার কাজ পাওয়ায় প্রশ্ন একাধিক প্রকল্পে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পুনরাবৃত্ত উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রে অংশ নেওয়া অন্যান্য ঠিকাদারদের বিভিন্নভাবে নিরুৎসাহিত করা হতো। ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা না থাকায় সরকারের ব্যয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিযোগিতাহীন দরপত্র ব্যবস্থা দুর্নীতির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। মাঠ পরিদর্শন ছাড়াই বিল তোলার অভিযোগ প্রকল্প পরিদর্শনের নামে অতিরিক্ত ভাতা ও ভ্রমণ বিল তোলার অভিযোগও রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, অনেক প্রকল্পে কাজ শুরু হওয়ার আগেই কাগজে অগ্রগতি দেখানো হয়েছে। অথচ বাস্তবে প্রকল্প এলাকা নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অনিয়ম সরকারি অর্থের বড় ধরনের অপচয়ের ইঙ্গিত দেয়। জবাবদিহির প্রশ্ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিপিএইচই’র মতো জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যারা বিশুদ্ধ পানির জন্য সরকারি প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের মতে, এসব অভিযোগ শুধু কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলোর কাছে এখন দাবি উঠেছে, প্রকল্পভিত্তিক আর্থিক লেনদেন, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব কাজ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। সচেতন মহলের মতে, শুধু নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের নয়, প্রকল্প অনুমোদন ও তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবি বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে। তাঁরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন অডিট, নিয়মিত মনিটরিং এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় জনগণের জন্য বরাদ্দ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণেই থেকে যাবে এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না।  

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ১২, ২০২৬ 0
কাস্টমসের ঝাড়ুদার সৈয়দ আলীর ৪০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ

কাস্টমস ট্রাইব্যুনালের নৈশপ্রহরী থেকে কোটিপতি: সম্পদের রহস্য ঘিরে অনুসন্ধান

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখল,নেতৃত্ব পরিবর্তন, ও ট্রাস্টি বোর্ড গঠন নিয়ে বিতর্ক: মব, অভিযোগ ও পাল্টা দাবি

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ভাঙন: নেতৃত্ব সংকট, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা

অর্থনীতি

ইসলামী ব্যাংক,

ইসলামী ব্যাংকে আস্থা সংকট কেন কাটছে না?: দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে ঘিরে নতুন প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ২২, ২০২৬ 0




অপরাধ

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর বিরুদ্ধে ৩০ বিলিয়ন ডলার জালিয়াতি ও অর্থপাচার অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২৪, ২০২৬ 0




কৃষি ও জলবায়ু

ধান

শেরপুরে বোরো ধানের দাম কমে লোকসানে কৃষকরা, উৎপাদন খরচও উঠছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ৬, ২০২৬ 0