ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বরিশালের দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতুতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় বা ‘খাস কালেকশন’ নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই সেতু থেকে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা টোল আদায় হলেও সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো হয়েছে ৪২ কোটি টাকা। এই দুই অঙ্কের পার্থক্য ৫৩ কোটি টাকা।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বরিশাল সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম। তাঁর নির্দেশে দৈনিক প্রকৃত টোল আদায়ের তুলনায় কম অর্থ সরকারি হিসাবে জমা দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় মহাসড়কের ১৪৮তম কিলোমিটারে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর দোয়ারিকা সেতু এবং ১৪৬তম কিলোমিটারে অবস্থিত মেজর এম এ জলিল শিকারপুর সেতুর আগের ইজারার মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের ৩০ জুন।
এরপর তিন বছরের জন্য ১০১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ইজারা মূল্যে ‘চাঁদনী ডিপার্টমেন্টাল স্টোরস’কে নতুন ইজারাদার হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল । কিন্তু নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী প্রথম কিস্তির টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় সওজ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির জামানত বাজেয়াপ্ত করে।
এরপর নতুন করে ইজারা কার্যকর না করে সওজের সরাসরি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় শুরু হয়, যা ‘খাস কালেকশন’ নামে পরিচিত। সরকারি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় পদ্ধতিতে প্রতিদিন কত টাকা আদায় হয়েছে, কত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে এবং অবশিষ্ট অর্থ কোন খাতে ব্যয় হয়েছে—এসব তথ্যের স্বচ্ছ হিসাব থাকা জরুরি।
অভিযোগ উঠেছে, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই ব্যবস্থায় টোল আদায়ের হিসাব ও সরকারি জমার অঙ্কের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, খাস কালেকশন চলাকালে দুই সেতু থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ টাকার বেশি টোল আদায় হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি কোষাগারে দৈনিক গড়ে ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা জমা দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উত্থাপিত হিসাব অনুযায়ী—
এই হিসাব সঠিক হলে আদায় করা অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি জমার হিসাবে প্রতিফলিত হয়নি। কিন্তু এই পার্থক্যকে সরাসরি আত্মসাৎ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে টোল আদায়ের রসিদ, ব্যাংক জমার চালান, দৈনিক হিসাববই, ট্রাফিকের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে, ৯৫ কোটি টাকা আদায়ের হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ৪২ কোটি টাকা জমার তথ্য কোন সময়সীমা ও কোন সরকারি হিসাব থেকে নেওয়া হয়েছে, তা যাচাই করা জরুরি। এসব নথি ছাড়া ৫৩ কোটি টাকার পার্থক্যের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব নয়।
এই বিতর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন করে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সওজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চিঠিতে উল্লেখিত রাজস্বের হিসাব।
প্রতিবেদনটির জন্য সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ মার্চ নবম আহ্বানে সর্বোচ্চ দরদাতা ‘আতিক কনস্ট্রাকশন’-এর অনুকূলে তিন বছরের জন্য ৮৫ কোটি টাকায় ইজারা অনুমোদনের সুপারিশ করেন সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী।
ওই চিঠিতে খাস কালেকশনের ভিত্তিতে তিন বছরে সরকারি আয় ৬৩ কোটি টাকা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে আতিক কনস্ট্রাকশনের প্রস্তাবিত ৮৫ কোটি টাকার ইজারা মূল্য এই হিসাবের চেয়ে ২২ কোটি টাকা বেশি। শতকরা হিসাবে ৮৫ কোটি টাকা, ৬৩ কোটি টাকার চেয়ে প্রায় ৩৫.৩৯ শতাংশ বেশি।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তিন বছরের সম্ভাব্য খাস কালেকশনের আয় এবং তিন বছরের ইজারা মূল্য সরাসরি তুলনা করে রাজস্বের সম্ভাব্য ব্যবধান বোঝা গেলেও, সেই ব্যবধানের পুরোটাই নিশ্চিত সরকারি ক্ষতি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ইজারার শর্ত, আদায়ব্যয়, অনুমোদনের সময়, অর্থ জমার নিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।
তবু সরকারি নথিতে উল্লিখিত এই তুলনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: বেশি রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ইজারা কার্যকর হতে দেরি হলে তার আর্থিক প্রভাব কী ছিল এবং এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন?
দুই সেতুর টোল আদায় নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয়ে নথিভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন।
প্রথমত, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিনের টোল আদায়ের রেজিস্টার, টিকিটের হিসাব এবং ব্যাংকে জমা দেওয়ার চালান সংগ্রহ করে মিলিয়ে দেখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো ৪২ কোটি টাকার হিসাবের সঙ্গে সওজের হিসাববই এবং ব্যাংক বিবরণী যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি টোল আদায়ের অর্থ পরিবহন, কর্মীদের পারিশ্রমিক বা অন্য অনুমোদিত খাতে ব্যয় হয়ে থাকলে তার নথিও পরীক্ষা করা দরকার।
তৃতীয়ত, ১০১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকার আগের ইজারা অনুমোদন, প্রথম কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতা, জামানত বাজেয়াপ্তকরণ এবং পরবর্তী ইজারা প্রক্রিয়ার নথি পর্যালোচনা করা জরুরি।
চতুর্থত, ২০২৬ সালের ১২ মার্চের চিঠিতে উল্লেখিত ৬৩ কোটি টাকার হিসাব এবং আতিক কনস্ট্রাকশনের ৮৫ কোটি টাকার প্রস্তাবের ভিত্তি যাচাই করতে হবে। এতে খাস কালেকশন ও ইজারা ব্যবস্থার মধ্যে রাজস্বের প্রকৃত পার্থক্য নির্ণয় করা সহজ হবে।
দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতু দুটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কের অংশ। সেতু দুটির টোল থেকে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি রাজস্বের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে টোল আদায় ও জমার হিসাবে বড় ধরনের পার্থক্যের অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তাঁর বক্তব্য, দায়িত্ব বণ্টন, অনুমোদনসংক্রান্ত নথি এবং আর্থিক হিসাব পরীক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তা ও টোল আদায়ের কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে ৫৩ কোটি টাকার পার্থক্য একটি গুরুতর আর্থিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। কিন্তু সেই অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে কারা দায়ী এবং কীভাবে তা ঘটেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে প্রামাণ্য নথি ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে।
সরকারি রাজস্বের সুরক্ষা এবং জনগণের অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো: দুই সেতুর টোল আদায়, ব্যাংকে জমা এবং ইজারা-সংক্রান্ত সব হিসাব প্রকাশ করে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা।
ঢাকা বরিশাল মহাসড়কের ওপর অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু এবং মেজর এম এ জলিল সেতু দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। বাবুগঞ্জের সুগন্ধা নদীর ওপর ৩৯০ মিটার দীর্ঘ দোয়ারিকা সেতু এবং উজিরপুরের সন্ধ্যা নদীর ওপর ২৯২ মিটার দীর্ঘ শিকারপুর সেতু মিলে প্রায় ১১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়। ২০০৩ সালের ১২ এপ্রিল যান চলাচলের জন্য উদ্বোধন হওয়া এই সেতু দুটির নামকরণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের দুই বীরের স্মরণে। প্রতিদিন এই দুই সেতু দিয়ে চলাচল করে দক্ষিণাঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ এবং পণ্যবাহী যানবাহন।সেতু দুটির টোল ইজারার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক হাজার ছিয়ানব্বই দিনের জন্য মেসার্স রহমান ট্রেডার্সকে ভ্যাট ও আয়করসহ ৫৮ কোটি ৭৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায় সেতু দুটির টোল ইজারা দেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এই সেতু দুটির টোল আয় প্রায় চারগুণ বেড়ে যায়। সে সময় প্রতিদিন ন্যূনতম ৯ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত টোল আদায় হওয়ার তথ্য প্রকাশ পায়। ইজারা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন ইজারার জন্য মূল্যায়ন ছাড়া আগের মূল্যের সঙ্গে মাত্র সাত শতাংশ যোগ করে তা অনুমোদনের চেষ্টা হলে সরকারের প্রায় ৪০ কোটি টাকা রাজস্ব হারানোর শঙ্কার কথা তখনই উঠেছিল।আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ সালের ৫ ধারার অধীনে মামলা হতে পারে, যেখানে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আর দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ অনুযায়ী এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের হাতে ন্যস্ত। ফলে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, অভিযোগকারীকে তা প্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশন বা সওজ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ আকারে উপস্থাপনের আইনি পথও রয়েছে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বরিশালের দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতুতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় বা ‘খাস কালেকশন’ নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই সেতু থেকে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা টোল আদায় হলেও সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো হয়েছে ৪২ কোটি টাকা। এই দুই অঙ্কের পার্থক্য ৫৩ কোটি টাকা। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বরিশাল সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম। তাঁর নির্দেশে দৈনিক প্রকৃত টোল আদায়ের তুলনায় কম অর্থ সরকারি হিসাবে জমা দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। ইজারার মেয়াদ শেষ, শুরু হয় খাস কালেকশন সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় মহাসড়কের ১৪৮তম কিলোমিটারে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর দোয়ারিকা সেতু এবং ১৪৬তম কিলোমিটারে অবস্থিত মেজর এম এ জলিল শিকারপুর সেতুর আগের ইজারার মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের ৩০ জুন। এরপর তিন বছরের জন্য ১০১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ইজারা মূল্যে ‘চাঁদনী ডিপার্টমেন্টাল স্টোরস’কে নতুন ইজারাদার হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল । কিন্তু নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী প্রথম কিস্তির টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় সওজ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির জামানত বাজেয়াপ্ত করে। এরপর নতুন করে ইজারা কার্যকর না করে সওজের সরাসরি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় শুরু হয়, যা ‘খাস কালেকশন’ নামে পরিচিত। সরকারি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় পদ্ধতিতে প্রতিদিন কত টাকা আদায় হয়েছে, কত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে এবং অবশিষ্ট অর্থ কোন খাতে ব্যয় হয়েছে—এসব তথ্যের স্বচ্ছ হিসাব থাকা জরুরি। অভিযোগ উঠেছে, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই ব্যবস্থায় টোল আদায়ের হিসাব ও সরকারি জমার অঙ্কের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। দৈনিক আদায় ১৩ লাখ টাকা, জমা ৫ লাখ ৭৬ হাজার? অভিযোগে বলা হয়েছে, খাস কালেকশন চলাকালে দুই সেতু থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ টাকার বেশি টোল আদায় হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি কোষাগারে দৈনিক গড়ে ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা জমা দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উত্থাপিত হিসাব অনুযায়ী— মোট টোল আদায়: প্রায় ৯৫ কোটি টাকা। সরকারি কোষাগারে জমা: প্রায় ৪২ কোটি টাকা। দুই অঙ্কের পার্থক্য: ৫৩ কোটি টাকা। এই হিসাব সঠিক হলে আদায় করা অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি জমার হিসাবে প্রতিফলিত হয়নি। কিন্তু এই পার্থক্যকে সরাসরি আত্মসাৎ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে টোল আদায়ের রসিদ, ব্যাংক জমার চালান, দৈনিক হিসাববই, ট্রাফিকের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে, ৯৫ কোটি টাকা আদায়ের হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ৪২ কোটি টাকা জমার তথ্য কোন সময়সীমা ও কোন সরকারি হিসাব থেকে নেওয়া হয়েছে, তা যাচাই করা জরুরি। এসব নথি ছাড়া ৫৩ কোটি টাকার পার্থক্যের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব নয়। সওজের চিঠিতে ইজারা মূল্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এই বিতর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন করে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সওজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চিঠিতে উল্লেখিত রাজস্বের হিসাব। প্রতিবেদনটির জন্য সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ মার্চ নবম আহ্বানে সর্বোচ্চ দরদাতা ‘আতিক কনস্ট্রাকশন’-এর অনুকূলে তিন বছরের জন্য ৮৫ কোটি টাকায় ইজারা অনুমোদনের সুপারিশ করেন সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। ওই চিঠিতে খাস কালেকশনের ভিত্তিতে তিন বছরে সরকারি আয় ৬৩ কোটি টাকা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে আতিক কনস্ট্রাকশনের প্রস্তাবিত ৮৫ কোটি টাকার ইজারা মূল্য এই হিসাবের চেয়ে ২২ কোটি টাকা বেশি। শতকরা হিসাবে ৮৫ কোটি টাকা, ৬৩ কোটি টাকার চেয়ে প্রায় ৩৫.৩৯ শতাংশ বেশি। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তিন বছরের সম্ভাব্য খাস কালেকশনের আয় এবং তিন বছরের ইজারা মূল্য সরাসরি তুলনা করে রাজস্বের সম্ভাব্য ব্যবধান বোঝা গেলেও, সেই ব্যবধানের পুরোটাই নিশ্চিত সরকারি ক্ষতি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ইজারার শর্ত, আদায়ব্যয়, অনুমোদনের সময়, অর্থ জমার নিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন। তবু সরকারি নথিতে উল্লিখিত এই তুলনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: বেশি রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ইজারা কার্যকর হতে দেরি হলে তার আর্থিক প্রভাব কী ছিল এবং এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? ৫৩ কোটি টাকার অভিযোগের নিষ্পত্তি কীভাবে সম্ভব? দুই সেতুর টোল আদায় নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয়ে নথিভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন। প্রথমত, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিনের টোল আদায়ের রেজিস্টার, টিকিটের হিসাব এবং ব্যাংকে জমা দেওয়ার চালান সংগ্রহ করে মিলিয়ে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো ৪২ কোটি টাকার হিসাবের সঙ্গে সওজের হিসাববই এবং ব্যাংক বিবরণী যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি টোল আদায়ের অর্থ পরিবহন, কর্মীদের পারিশ্রমিক বা অন্য অনুমোদিত খাতে ব্যয় হয়ে থাকলে তার নথিও পরীক্ষা করা দরকার। তৃতীয়ত, ১০১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকার আগের ইজারা অনুমোদন, প্রথম কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতা, জামানত বাজেয়াপ্তকরণ এবং পরবর্তী ইজারা প্রক্রিয়ার নথি পর্যালোচনা করা জরুরি। চতুর্থত, ২০২৬ সালের ১২ মার্চের চিঠিতে উল্লেখিত ৬৩ কোটি টাকার হিসাব এবং আতিক কনস্ট্রাকশনের ৮৫ কোটি টাকার প্রস্তাবের ভিত্তি যাচাই করতে হবে। এতে খাস কালেকশন ও ইজারা ব্যবস্থার মধ্যে রাজস্বের প্রকৃত পার্থক্য নির্ণয় করা সহজ হবে। জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতু দুটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কের অংশ। সেতু দুটির টোল থেকে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি রাজস্বের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে টোল আদায় ও জমার হিসাবে বড় ধরনের পার্থক্যের অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তাঁর বক্তব্য, দায়িত্ব বণ্টন, অনুমোদনসংক্রান্ত নথি এবং আর্থিক হিসাব পরীক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তা ও টোল আদায়ের কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে ৫৩ কোটি টাকার পার্থক্য একটি গুরুতর আর্থিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। কিন্তু সেই অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে কারা দায়ী এবং কীভাবে তা ঘটেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে প্রামাণ্য নথি ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে। সরকারি রাজস্বের সুরক্ষা এবং জনগণের অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো: দুই সেতুর টোল আদায়, ব্যাংকে জমা এবং ইজারা-সংক্রান্ত সব হিসাব প্রকাশ করে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা। ঢাকা বরিশাল মহাসড়কের ওপর অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু এবং মেজর এম এ জলিল সেতু দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। বাবুগঞ্জের সুগন্ধা নদীর ওপর ৩৯০ মিটার দীর্ঘ দোয়ারিকা সেতু এবং উজিরপুরের সন্ধ্যা নদীর ওপর ২৯২ মিটার দীর্ঘ শিকারপুর সেতু মিলে প্রায় ১১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়। ২০০৩ সালের ১২ এপ্রিল যান চলাচলের জন্য উদ্বোধন হওয়া এই সেতু দুটির নামকরণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের দুই বীরের স্মরণে। প্রতিদিন এই দুই সেতু দিয়ে চলাচল করে দক্ষিণাঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ এবং পণ্যবাহী যানবাহন।সেতু দুটির টোল ইজারার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক হাজার ছিয়ানব্বই দিনের জন্য মেসার্স রহমান ট্রেডার্সকে ভ্যাট ও আয়করসহ ৫৮ কোটি ৭৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায় সেতু দুটির টোল ইজারা দেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এই সেতু দুটির টোল আয় প্রায় চারগুণ বেড়ে যায়। সে সময় প্রতিদিন ন্যূনতম ৯ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত টোল আদায় হওয়ার তথ্য প্রকাশ পায়। ইজারা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন ইজারার জন্য মূল্যায়ন ছাড়া আগের মূল্যের সঙ্গে মাত্র সাত শতাংশ যোগ করে তা অনুমোদনের চেষ্টা হলে সরকারের প্রায় ৪০ কোটি টাকা রাজস্ব হারানোর শঙ্কার কথা তখনই উঠেছিল।আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ সালের ৫ ধারার অধীনে মামলা হতে পারে, যেখানে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আর দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ অনুযায়ী এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের হাতে ন্যস্ত। ফলে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, অভিযোগকারীকে তা প্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশন বা সওজ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ আকারে উপস্থাপনের আইনি পথও রয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চলতি দায়িত্বে থাকা উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. আশরাফুল আলমকে ঘিরে দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি নিয়ন্ত্রণ, কথিত সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা, যন্ত্রাংশ ও টায়ার কেনাকাটায় মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি খরচের হিসাব, টোল-ফেরি ও আনলোডিং ব্যয়ের নথি এবং ডিপো পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারের বিষয়। অভিযোগকারীদের দাবি, ১৯৯৯ সালে ইন্সপেক্টর পদে চাকরিতে যোগ দেওয়া আশরাফুল আলম দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন ডিপো, ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ইউনিট প্রধানদের পদায়ন ও বদলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ডিপোর আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় তাঁর একটি প্রভাববলয় রয়েছে। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে ঢাকা ট্রাক ডিপোতে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কার আর্থিক হিসাব নিয়ে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত যন্ত্রাংশ খাতে প্রায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এবং টায়ার খাতে ১০ কোটি ৪২ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের তথ্য তুলে ধরে অভিযোগকারীরা কয়েকটি কেনাকাটার দামের তুলনা করেছেন। একই সঙ্গে জ্বালানি, টোল-ফেরি, আনলোডিং ও অন্যান্য ব্যয়ের নথি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। চাকরিজীবনের শুরু থেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মো. আশরাফুল আলম ১৯৯৯ সালে বিআরটিসিতে ইন্সপেক্টর পদে যোগ দেন। ২০০৩ সালে সিনিয়র ইন্সপেক্টর থেকে ম্যানেজার (কারিগরি) পদে আত্মীকরণ হন। পরবর্তী সময়ে নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ সীমিত থাকায় ২০১৭ সালে তিনি চলতি দায়িত্বে ডিজিএম পদে দায়িত্ব পান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গাজীপুরে বিআরটিসির কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানায় দায়িত্ব পালন। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, ওই সময়ে একটি প্রকল্পের কাজ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিয়মের প্রশ্ন ওঠে। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে ভলভো বাস মেরামতের জন্য আট কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়। কিন্তু প্রকল্পের আওতায় ভলভো বাসের পরিবর্তে বিআরটিসির অন্য বাস, বিশেষত দ্বিতল বাস মেরামতের কাজে অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যাওয়ার পাশাপাশি আর্থিক অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এ বিষয়ে ২০১৯ সালের ২০ জুন কর্মচারীদের পক্ষে মো. নজরুল ইসলাম একটি অভিযোগ দায়ের করেন। পরে ২১ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একটি চিঠি জারি হয়। চিঠির নম্বর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ৩৫.০০.০০০০.০১৩.৯৯.০২৪.১৮-১৫১। একাধিক ডিপো ও কারিগরি ইউনিটে দায়িত্ব অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আশরাফুল আলম গাজীপুর বাস ডিপো, জোয়ারসাহারা বাস ডিপো, মতিঝিল বাস ডিপো, কল্যাণপুর বাস ডিপো, তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানা, কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ঢাকা ট্রাক ডিপোতে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, এসব কর্মস্থলে ইউনিট প্রধানদের নিয়োগ, বদলি ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব ছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ের বিআরটিসি চেয়ারম্যানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে তিনি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেন। সাবেক চেয়ারম্যান মো. জসিম, মো. মিজানুর রহমান, মো. ফরিদ ভূইয়া, এহসানুল এলাহি ও মো. তাজুল ইসলাম এবং বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখিত মো. আব্দুল লতিফ মোল্লার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আট বছরে বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালনকালে কমপক্ষে ২০ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে, যার সঙ্গে আশরাফুল আলমের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তাঁরা অভিযোগ করছেন। ঢাকা ট্রাক ডিপো: আয়-ব্যয়ের হিসাবেই প্রশ্ন আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বিস্তারিত আর্থিক অভিযোগগুলো ঢাকা ট্রাক ডিপোতে তাঁর দায়িত্ব পালনকাল, অর্থাৎ ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কে কেন্দ্র করে। অভিযোগকারীদের সরবরাহ করা হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ে ডিপোটির মোট রাজস্ব আয় ছিল ২৮৩ কোটি ৮৫ লাখ ২২ হাজার টাকা। এর মধ্যে চলাচল বা সংশ্লিষ্ট একটি খাত থেকে আয় ২৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা এবং বাকি প্রায় ২৫৮ থেকে ২৬০ কোটি টাকা প্রাতিষ্ঠানিক আয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই হিসাবে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৪৮ কোটি ৯ লাখ টাকা। উদ্বৃত্ত বা নিট লাভ দেখানো হয়েছে ৩৫ কোটি ৭৬ লাখ ২২ হাজার টাকা। হিসাব অনুযায়ী, মোট আয়ের ৮৭ দশমিক ৪০ শতাংশ ব্যয় এবং ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ উদ্বৃত্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে। মাসিক গড় নিট লাভের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে এই হিসাবের সঙ্গে পরবর্তী সময়ের লাভের তুলনা করে অভিযোগকারীরা ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অসংগতি থাকার প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে পরবর্তী ইউনিট প্রধানের সময়ে নিট লাভ হয়েছে ৮ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫২ টাকা। মাসিক গড় লাভ প্রায় ৭৭ লাখ ৪১ হাজার ৬৯৬ টাকা। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত আট মাসে নিট লাভের পরিমাণ ৭ কোটি ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মাসিক গড় লাভ প্রায় ৮৯ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা। এই পার্থক্যকে ভিত্তি করে অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, আগের সময়ের তুলনায় পরবর্তী সময়ে মাসিক নিট লাভ বাড়ল কেন? তাঁদের দাবি, বেতন ও অন্যান্য ব্যয়ের পরিবর্তন বিবেচনায় নিলেও আগের সময়ের ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনুসন্ধান হওয়া উচিত। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ঢাকা ট্রাক ডিপোতে বর্তমানে মাসে প্রায় ৫০ লাখ টাকার অনিয়ম ঘটে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট লেনদেন, নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণ কিংবা তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেলে অভিযোগটির আর্থিক ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। যন্ত্রাংশ কেনাকাটা: একই পণ্যের দাম বাড়ল কতটা? ঢাকা ট্রাক ডিপোতে যন্ত্রাংশ কেনাকাটার হিসাবেও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেরামত ও যন্ত্রাংশ খাতে ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ১ হাজার ৮১১ টাকা। এর মধ্যে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের আগের সময়ের ব্যয় ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৮৯ হাজার ৭১১ টাকা। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ কোটি ১১ লাখ ১২ হাজার ১০০ টাকা। এ সময়ে পরিশোধের পরিমাণ ৫ কোটি ৩৪ লাখ ৬১ হাজার ৬২৭ টাকা এবং ভ্যাট-ট্যাক্স ৭৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৩ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কেনাকাটার মূল্য তুলনায় একটি ক্লাচ প্লেটের উদাহরণ তুলে ধরেছেন তাঁরা। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১০ মার্চ ঢাকার বাংলাবাজারের আইচার মটরস থেকে একটি ক্লাচ প্লেট কেনা হয় ৮ হাজার ৫০০ টাকায়। একই বছরের ২৭ মার্চ বাংলাবাজারের মিজান মটরস থেকে একই যন্ত্রাংশ কেনা হয় ১৩ হাজার ৩০০ টাকায়। দ্বিতীয় কেনাকাটিটি টেন্ডার ছাড়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ১৪ জুন একই যন্ত্রাংশের দাম দেখানো হয় ১৬ হাজার ৩৫০ টাকা। অভিযোগকারীদের তথ্য অনুযায়ী, এবার মিজান মটরসের কাছ থেকেই টেন্ডারের মাধ্যমে কেনা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, আশরাফুল আলমের দায়িত্বকালে যন্ত্রাংশ খাতের মোট ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ অনিয়মের মাধ্যমে ব্যয় হয়ে থাকতে পারে। তাঁদের আরও দাবি, বর্তমানে নগদে ভালো মানের একটি ক্লাচ প্লেট ৭ থেকে ৮ হাজার টাকায় কেনা সম্ভব।এ ক্ষেত্রে ক্রয়াদেশ, দরপত্র, সরবরাহকারীর বিল, পণ্য গ্রহণের প্রতিবেদন এবং বাজারদরের তুলনামূলক তথ্য যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। টায়ার কেনাকাটায় মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ যন্ত্রাংশের পাশাপাশি টায়ার কেনাকাটার হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ট্রাক ডিপোতে টায়ার খাতে ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি ৪২ লাখ ৫১ হাজার ৯৮৮ টাকা। এর মধ্যে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের আগের সময়ের ব্যয় ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৩৬ হাজার ৯০০ টাকা। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার ৮৮ টাকা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৫ মার্চ বাংলাবাজারের নোমান এন্টারপ্রাইজ থেকে ১০.০০-২০ মাপের একটি এমআরএফ টায়ার কেনা হয় ২৭ হাজার টাকায়। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই কেনাকাটা টেন্ডার ছাড়াই হয়েছিল। ২০২৩ সালের ২২ জুন একই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একই মাপের টায়ার কেনা হয় ৩৩ হাজার ৫০০ টাকায়। পরে ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ হাজার ১৫০ টাকা। শেষের কেনাকাটিটি টেন্ডারের মাধ্যমে হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, প্রায় আড়াই বছরের ব্যবধানে প্রতিটি টায়ারের দাম ১১ হাজার ১৫০ টাকা বেড়েছে। এ মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা, দরপত্রে প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহকারীর সঙ্গে ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের মতে, যন্ত্রাংশ ও টায়ারের মতো বড় ব্যয়ের খাতগুলোতে ক্রয়প্রক্রিয়া ও বাজারদর যাচাই করা হলে সম্ভাব্য অনিয়ম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। জ্বালানি ব্যয়ে কিলোমিটারের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ঢাকা ট্রাক ডিপোর জ্বালানি খাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি খাতে ব্যয় হয়েছে ১০৭ কোটি ৪৫ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৯ টাকা, যা ওই সময়ের মোট আয়ের প্রায় ৩৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বাসের রক্ষণাবেক্ষণ লগবুক এবং ট্রাফিক বিভাগের জ্বালানি লগবুকে উল্লেখ করা কিলোমিটারের মধ্যে পার্থক্য দেখিয়ে জ্বালানি খরচের হিসাবে অনিয়ম করা হয়েছে। এভাবে চার বছরে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও করেছেন তাঁরা। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, ডিপোর রেকর্ড বইয়ে এ-সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে। এই অভিযোগ যাচাই করতে গাড়ির দৈনিক চলাচলের রেকর্ড, ওডোমিটারের পাঠ, জ্বালানি উত্তোলন ও বিতরণ রেজিস্টার, যানবাহনের মেরামত নথি এবং সংশ্লিষ্ট বিল একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোনো গাড়ি কত কিলোমিটার চলেছে, সেই অনুপাতে কত জ্বালানি বরাদ্দ ও ব্যবহার হয়েছে এবং হিসাবের পার্থক্যের ব্যাখ্যা কী—স্বাধীন তদন্তে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। টোল-ফেরি ও আনলোডিং ব্যয়ের নথি কোথায়? জ্বালানি, যন্ত্রাংশ ও টায়ারের বাইরে টোল-ফেরি, আনলোডিং, ভ্যাট-ট্যাক্সসহ অন্যান্য ব্যয় নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, টোল ও ফেরি খাতে মাসে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হতো। কিন্তু এ ব্যয়ের পক্ষে প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট রেকর্ড পাওয়া যায় না বলে তাঁরা অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, এসব খাতে ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনের পর তার যথাযথ হিসাব রাখা হয়নি। আনলোডিং খাতেও মাসে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর আনলোডিং ব্যয়ও ঢাকা ট্রাক ডিপো থেকে পরিশোধ করা হতো বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, আনলোডিং ব্যয়ের বিবরণী ও প্রকৃত হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে এবং আশরাফুল আলমের দায়িত্বকালীন সময়ে এ খাতে কয়েক কোটি টাকার অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া ভ্যাট-ট্যাক্স, টোল-ফেরি, আনলোডিং ও অন্যান্য খাতে ব্যয়ের নামে নগদ অর্থ উত্তোলন এবং খাতবহির্ভূত চেকের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা। বদলি ও পদায়ন ঘিরে প্রভাববলয়ের অভিযোগ আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি বিআরটিসির বিভিন্ন ডিপোতে ইউনিট প্রধানদের বদলি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি ঢাকার বিভিন্ন ডিপো, ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করলেও ঢাকার বাইরে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইউনিটে পদায়িত হননি। একই সঙ্গে তাঁর আনুষ্ঠানিক কর্মস্থল যেখানেই থাকুক, তিনি প্রায়ই প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, ডিপো প্রধানদের বদলি ও দায়িত্ব বণ্টনে একটি গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে আশরাফুল আলমের যোগাযোগ এবং বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তাদের পারস্পরিক সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিআরটিসির চেয়ারম্যানের পিএস মো. মোহাইমিন সজিব; বরিশাল ডিপোর ম্যানেজার মো. জুলফিকার, ; খুলনা ডিপোর ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামান; টুঙ্গিপাড়া ডিপোর ম্যানেজার মো. জামসেদ আলী; রংপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. জুলফিকার আল ভুঁইয়া; মতিঝিল ডিপোর ম্যানেজার মো. শাহিদুল; দিনাজপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. মোস্তাফিজুর; ময়মনসিংহ ডিপোর ম্যানেজার মো. এনামুল; গাজীপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. মোশাররফ; সোনাপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. রাজু মোল্লা; কুমিল্লা ডিপোর ম্যানেজার মো. আব্দুল কাদের জিলানি; নরসিংদী ডিপোর ম্যানেজার মো. নূর এ আলম; সিলেট ডিপোর ম্যানেজার মো. রুকনুজ্জামান; মিরপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. ওমর ফারুক মেহেদী; কল্যাণপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. শাহরিয়ার বুলবুল; গাবতলী ডিপোর ম্যানেজার মো. নায়েব আলী এবং ঢাকা ট্রাক ডিপোর ম্যানেজার মো. মোশাররফ হোসেন সিদ্দিকি। এ ছাড়া প্রধান কার্যালয়ের আরও ১০ থেকে ১২ জন কর্মকর্তার একটি অংশ ওই বলয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম মো. মনিরুজ্জামানের নামও উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা। মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ অভিযোগকারীদের দাবি, বিআরটিসির বিভিন্ন ইউনিট থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যা তাঁরা মাসোহারা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ অর্থ আদায়ের সঙ্গে চেয়ারম্যানের নাম ব্যবহার করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। এদিকে আশরাফুল আলমের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত মো. মাসুদ তালুকদার বর্তমানে জোয়ারসাহারা বাস ডিপোর ইউনিট প্রধান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মাসুদ তালুকদার একটি পৃথক গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং ইউনিটগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও অর্থ আদায়ের সমন্বয়ে ভূমিকা রাখছেন। এ ছাড়া তেজগাঁওয়ের দপ্তরে বিভিন্ন কর্মকর্তার নিয়মিত যাতায়াতের বিষয়টিও অভিযোগকারীরা সামনে এনেছেন। তাঁদের দাবি, প্রধান কার্যালয়ের মো. মনিরুজ্জামান, মো. ফারুক, মো. নায়েব আলী এবং চেয়ারম্যানের পিএস মো. মোহাইমিন সজিব সেখানে যাতায়াত করেন। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, জোয়ারসাহারা ও চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর ইউনিট প্রধান বদলির কয়েকটি ঘটনায় আশরাফুল আলমের পছন্দের প্রার্থীদের পদায়ন নিশ্চিত করা যায়নি। মো. সুলতান নামের এক কর্মকর্তার বদলির আদেশ দুইবার জারি হলেও তা কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। নারী কর্মীদের নিয়ে গুরুতর অভিযোগ আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে নারী কর্মীদের ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করার অভিযোগও তুলেছেন অভিযোগকারীদের কয়েকজন। তাঁদের দাবি, ২০১৭ সালে চেয়ারম্যান মো. ফরিদ এবং ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলামের দায়িত্বকালেও এ ধরনের অভিযোগের চর্চা ছিল। এ-সংক্রান্ত কয়েকটি ঘটনার নিষ্পত্তি তাঁর দপ্তরে হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বজায় রেখে নিরপেক্ষ তদন্ত করা জরুরি। শ্রমিক-কর্মচারীদের হয়রানি ও অসন্তোষের অভিযোগ অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আশরাফুল আলমের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী হয়রানির শিকার হন। ব্যক্তিগত বিষয়ে আপত্তি তোলার কারণে হেলাল নামের এক কর্মীকে ঢাকা ট্রাক ডিপোতে বদলি করা হলেও পরে তাঁকে আবার আশরাফুল আলমের দপ্তরে কাজ করানো হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা ট্রাক ডিপোতে ইয়ার্ডের উন্নয়নকাজ চলার সময় ডিএলআই পরিদর্শন এবং নির্ধারিত কাজের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে এক কর্মীকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনার সুনির্দিষ্ট সময়, সংশ্লিষ্ট আদেশ ও কর্মীর বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, প্রায় আট থেকে নয় মাস আগে ঢাকা ট্রাক ডিপোতে শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে বিরোধের জেরে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। ওই পরিস্থিতি তৈরিতে আশরাফুল আলমের ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে শ্রমিকদের লিখিত অভিযোগ, ব্যবস্থাপনার বক্তব্য, বৈঠকের কার্যবিবরণী, বদলির আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বর্তমান দায়িত্ব ও তদন্তের দাবি বর্তমানে আশরাফুল আলম কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানার ডিজিএম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি প্রায় প্রতিদিন প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তা ও বদলি-সংক্রান্ত বিষয়ে যোগাযোগ রাখেন। তাঁদের মতে, বিআরটিসির মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি, যন্ত্রাংশ, টায়ার, পরিবহন ব্যয়, মেরামত এবং ইউনিট পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ এসব খাতে অনিয়ম হলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা ও জনসেবার মান—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অভিযোগকারীরা আশরাফুল আলমের দায়িত্বকালীন সব ডিপো ও ওয়ার্কশপের আয়-ব্যয়, প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার, জ্বালানি ও যন্ত্রাংশ কেনাকাটা, টায়ারের দরপত্র, টোল-ফেরি ও আনলোডিং ব্যয়, নগদ অর্থ উত্তোলন, খাতবহির্ভূত চেক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি-সংক্রান্ত নথি স্বাধীনভাবে নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ক্রয়প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, সরবরাহকারী এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিআরটিসির আর্থিক হিসাব ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এখন কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: ঢাকা ট্রাক ডিপোর চার বছরের ব্যয় ও লাভের হিসাব কি স্বাধীনভাবে নিরীক্ষা করা হয়েছে? যন্ত্রাংশ ও টায়ারের ক্রয়মূল্য নির্ধারণে কী পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল? জ্বালানি, টোল-ফেরি ও আনলোডিং ব্যয়ের পক্ষে পর্যাপ্ত নথি রয়েছে কি? আর কর্মকর্তা বদলি ও পদায়নের সিদ্ধান্তগুলো কি নির্ধারিত বিধি অনুসারে নেওয়া হয়েছে? রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থার সম্পদ ও রাজস্ব রক্ষা, কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে।
বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশলে দুর্নীতির অভিযোগ: নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুলের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য ও ভুয়া বিলের প্রশ্ন:২৪ ঠিকাদারের লিখিত অভিযোগ, মানববন্ধন ও টেন্ডার কারসাজির দাবি; প্রায় ৩২ কোটি টাকার টিএসসি প্রকল্পে কমিশন লেনদেনের অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি) জেলার শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান। জেলার স্কুল,কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ, সংস্কার, শ্রেণিকক্ষ সম্প্রসারণ, টয়লেট ও অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজের দায়িত্ব এই দপ্তরের ওপর ন্যস্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই দপ্তর ঘিরে যে চিত্র উঠে আসছে, তা সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে। অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, দীর্ঘদিন ধরে দপ্তরের ভেতরে ঘুষ, অনিয়ম, দরপত্র কারসাজি ও সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ জমতে জমতে এখন পাহাড় হয়ে প্রকাশ্যে আসছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম। কে এই শহিদুল,আটকের দাবি শহিদুল ইসলাম ছাত্র জিবন থেকেই ছাত্রলীগের কর্মকান্ডের সাথে জড়িত।বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জ উপজেলার ঢেপুয়ারপাড় জামুয়া গ্রামে।তার পিতার নাম শেখ রুস্তুম আলী।পিমস আইডি নং ০০০৫৪৩।এন আই ডি নং- এনআইডি নং- ২৬৯০৪১৭১৫৪+++। ডুয়েটে থাকাকালীন সময়ে আবেদ আলী পিএসসি সনদ বানিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। বহুল আলোচিত কেলেঙ্কারি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যানের গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী এবং পিএসসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাসহ একটি শক্তিশালী প্রশ্নফাঁস চক্রের সাথে প্রকৌশলী শহিদুল জড়িয়ে পড়েন। শহিদুলের নিয়োগেও রয়েছে বড় অনিয়ম।তিনি ও তার বন্ধুদের নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের অনিয়ম ফাঁস হয়েছিল।বড় অংকের ঘুসের বিনিময়ে সেই অনিয়ম ধামাচাপা দেয়া হয়।শহিদুলকে আটক করে রিমান্ডে নেয়া হয়ে আবেদআলী পিএসসি প্রশ্নফাঁসে বহু তথ্য বেড়িয়ে আসবে। শহিদুলের গডফাদাররা কারাগারে থাকলেও তিনি এখনো বহাল তবিয়তে: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম তিনি সরকারি দ্বায়িত্বে নিয়োজিতই নন।তিনি এখনো বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর শাখার সদস্যও। ডুয়েটে ছাত্র জিবনে কার্য্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন।২০০৯ ব্যাচের এই প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের চতুরতায় বরিশাল,ঝালকাঠি ও পটুয়াখালীর অসংখ্য ঠিকাদারগন পথে বসেছে। শহিদুলের গডফাদার ঝালকাঠিতে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে ছিলেন আমির হোসেন আমু,বরিশালে তার গডফাদার ছিলেন জাহিদ ফারুক শামিম। আমু ও জাহিদ ফারুক শামিম কারাগারে অথচ প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম দুটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা বরিশাল ও বরগুনার দ্বায়িত্বে বহাল তবিয়তে ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন।শহিদুল ইসলামকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে সাধারন ঠিকাদারগন। ঠিকাদার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং দপ্তরের ভেতরের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রকল্পের ফাইল কার্যত এগোয় না-এমনটাই দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দপ্তরের ভেতরে এমন একটি প্রভাববলয় তৈরি করেছেন, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে অর্থ ছাড় পর্যন্ত প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ধাপ তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে কেউ তাঁর বিরাগভাজন হলে কিংবা তাঁর কথিত নির্দেশনা অনুসরণ না করলে ফাইল আটকে যাওয়াটা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম যখন ঠিকাদার : বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম তিনি নিজ দপ্তরে বসেই চারটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রন করেন।এই চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ নিয়ে সাব কন্ট্যাক্টে কাজ দেন বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।ফলে প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের নিকট জিম্মি থাকে সাব কন্টাক্টে কাজ নেয়া প্রতিষ্ঠানের লোকজন।শহিদুল ইসলাম যে চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রন করেন সেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বরিশালের মেসার্স মোমিন সিকদার,দিনাজপুরের মেসার্স মা এন্টার প্রাইজ,চট্রগ্রামের ইউনুস এন্ড ব্রাদার্স,খুলনার মেসার্স রাফিদ ট্রেডার্স। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ নেওয়ার পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্য ঠিকাদারদের কাছে সাবকন্ট্রাক্টে কাজ দেওয়া হয়। এতে মূল কাজের বরাদ্দ, বাস্তবায়ন এবং আর্থিক লেনদেনের ওপর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রভাব বজায় থাকে বলে তাঁদের অভিযোগ। তাঁদের আরও দাবি, সাবকন্ট্রাক্টে কাজ নেওয়া ঠিকাদারদের বিল, জামানত ও ভবিষ্যৎ কাজের সুযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে অনিয়মের প্রতিবাদ করা বা অভিযোগ প্রকাশ্যে আনা তাঁদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। উল্লিখিত চারটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা, নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে তাদের আর্থিক বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট কাজের বরাদ্দ ও সাবকন্ট্রাক্টের বৈধতা যাচাই করতে দরপত্রের নথি, চুক্তিপত্র, মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য অনুসন্ধান চলছে। নিরাপত্তা জামানত নিয়েও প্রশ্ন: ঠিকাদারদের অভিযোগ, চারটি প্রতিষ্ঠানের নামে সম্পাদিত কাজের বিপরীতে নিরাপত্তা জামানত হিসেবে ৫ শতাংশ অর্থ কর্তন করা হয়েছে, যেখানে তাঁদের দাবি অনুযায়ী প্রযোজ্য বিধিতে ১০ শতাংশ কর্তনের কথা রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, এভাবে জামানত কর্তনের ক্ষেত্রে বিধি অনুসরণ না করা হলে সরকারের আর্থিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অনুসন্ধানের শুরুটা হয় ঠিকাদারদের অসন্তোষ থেকে। বরিশাল জেলার বিভিন্ন স্থানে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজ শেষ করেও একাধিক ঠিকাদার বিল না পাওয়ার অভিযোগ তুলতে থাকেন। কেউ কেউ জানান, কাজ শেষ হওয়ার পর মাসের পর মাস অফিসে ঘুরেও তারা বিল পাচ্ছেন না। আবার কোনো ক্ষেত্রে বিল আংশিক ছাড় করা হলেও বাকি অর্থ আটকে রাখা হচ্ছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখে দেখা যায়, অধিকাংশ ফাইলের শেষ ধাপ গিয়ে থেমে থাকে নির্বাহী প্রকৌশলীর টেবিলে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার জানান, এখানে কাজ করতে হলে শুধু নিয়ম মেনে কাজ করলেই হয় না, বাড়তি কিছু 'ম্যানেজ' করতে হয়। এক ঠিকাদারের ভাষায়, “এখানে কাজ করতে হলে দুইটা জিনিস লাগে-ধৈর্য আর টাকা। টাকা না দিলে ধৈর্য পরীক্ষা নেওয়া হয়।” তাঁর দাবি, অফিসে কেউ সরাসরি ঘুষের কথা বলে না, কিন্তু কথাবার্তার ইঙ্গিত থেকেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রথমে বলা হয় ফাইলে একটু সমস্যা আছে, পরে নতুন কাগজ চাই, এরপর বলা হয় 'উপরে কথা বলতে হবে'। শহিদুলের যত সম্পদ: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল শেয়ারি বরিশাল ও ঢাকায় জমি ক্রয় করে ফ্ল্যাট ব্যবসা,উত্তরায় নিজস্ব ফ্ল্যাট,গাড়িসহ নামে বেনামে শত শত কোটি টাকাসহ সহায় সম্পদ গড়েছেন। ঘুষ,ঠিকাদারি,ঠিকাদারদের থেকে প্রতি বিলে ঘুষ,কমিশন,ঠিকাদারী কাজ বিক্রি, পার্টনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কাজের রিভাইজের মাধ্যমে অতিরিক্ত বিল করে সরকারি টাকা আত্মসাৎ,প্রতি লাইসেন্স থেকে দশ হাজার করে ঘুষ আদায়সহ অনৈতিক ভাবে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন।দুদক তদন্ত করলে বেড়িয়ে আসবে তার সম্পদের পাহাড়ের সকল তথ্য। নারী কেলেঙ্কারির যত অভিযোগ: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল নারীদের প্রতি খুবই দুর্বল।তাকে নারী সাপ্লাই দিত সাবেক এক হিসাব রক্ষক।বর্তমানে এক নারীর সাথে অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অভ্যান্তরে কানাঘুষা চলছে।এছাড়া তার নিজস্ব নিয়োগ দেয়া ব্যক্তিও তাকে সুন্দরী নারী সাপ্লাই দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।একটি নির্জন বাংলোতে নারীদের নিয়ে সময় কাটানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ বা সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার পর বিল ছাড় করাতে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দিতে হয়-এমন অভিযোগ বহু ঠিকাদারের। প্রকল্পের আকার ও বাজেট অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ ভিন্ন হয়ে থাকে বলে তারা জানান। কাজ যত বড়, কথিত লেনদেনের অঙ্কও তত বেশি-এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণত ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয় বলে তারা দাবি করেন। প্রথমে মৌখিক ইঙ্গিত দেওয়া হয়, পরে কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়, সবশেষে সরাসরি 'খরচের কথা' বলা হয়। ঠিকাদারদের অভিযোগ, ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরতেই থাকে। কখনো নতুন করে মাপজোপের কথা বলা হয়, কখনো আগের কাগজে ত্রুটি বের করা হয়। ফলে কাজ শেষ করেও তারা আর্থিক সংকটে পড়েন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ঋণ নিয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু বিল আটকে থাকায় সেই ঋণ শোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিল ছাড়ের পাশাপাশি দরপত্র প্রক্রিয়ায়ও ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যমতে, অনেক ক্ষেত্রে দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারই সুবিধা পায়। প্রকৃত প্রতিযোগী ঠিকাদারদের দরপত্রে কৃত্রিম কারিগরি ত্রুটি দেখিয়ে বাতিল করা হয়-এমন অভিযোগও রয়েছে। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে প্রভাব বিস্তার করে তার চারটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুলের বিরুদ্ধে।এক ঠিকাদার বলেন, "আগেই ঠিক করে দেওয়া থাকে কে কাজ পাবে। দরপত্র শুধু আনুষ্ঠানিকতা। আমরা কাগজ জমা দিলেও পরে বলা হয় টেকনিক্যাল সমস্যা আছে।” তাঁর দাবি, এসব সমস্যার কোনো বাস্তব ভিত্তি থাকে না, বরং পছন্দের ঠিকাদারকে জায়গা করে দিতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।এই অনিয়মের ফলে সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি সরকারের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। প্রতিযোগিতা না থাকায় কাজের মান কমে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অনুসন্ধানে জেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও অর্ধসমাপ্ত ভবন পড়ে আছে, কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, আবার কোথাও কাগজে কাজ শেষ দেখানো হলেও বাস্তবে ভবনের বিভিন্ন অংশ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "ছাদ থেকে পানি পড়ে, দেয়ালে ফাটল। কিন্তু কাগজে নাকি সব ঠিক। আমাদের শিক্ষার্থীরা ঝুঁকির মধ্যে ক্লাস করছে।” অভিভাবকদের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চলায় শিক্ষার্থীদের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। তারা বলছেন, শিক্ষা খাতে অনিয়ম মানে সরাসরি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, দপ্তরের ভেতরে ও বাইরে একটি মধ্যস্থতাকারী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরাসরি লেনদেন এড়িয়ে যোগাযোগ রক্ষা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দপ্তরের কিছু কর্মচারী এবং বাইরের কয়েকজন ব্যক্তি এই যোগাযোগের কাজ করে থাকেন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। এর ফলে মূল অভিযুক্ত সবসময় সরাসরি সামনে না এসে আড়ালে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ, সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) বরিশাল কার্যালয় ঘিরে ঘুষ, দরপত্রে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য, বিল আটকে রাখা এবং ঠিকাদারদের হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ২৪ জন ঠিকাদার। অভিযোগের প্রতিবাদে তাঁর অপসারণ ও তদন্তের দাবিতে মানববন্ধনও করেছেন ভুক্তভোগীরা। ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ পাওয়া থেকে শুরু করে বিল উত্তোলন, জামানত ফেরত এবং দরপত্রের মূল্যায়ন—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপেই একটি প্রভাবশালী বলয়ের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ নেওয়া, পরে অন্য ঠিকাদারের কাছে কাজ হস্তান্তর, নির্ধারিত হারে কমিশন আদায়, কাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ নথি তৈরি এবং পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা। প্রায় ৩২ কোটি টাকার কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্প ঘিরে কমিশন লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। এ ছাড়া বরিশাল নগরীর কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের দরপত্র, নিরাপত্তা জামানত কর্তন এবং ঠিকাদারদের বিল আটকে রাখার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগগুলো সত্য হলে, তা শুধু একটি সরকারি দপ্তরের প্রশাসনিক অনিয়মের প্রশ্ন নয়; বরং শিক্ষা অবকাঠামোর গুণগত মান, সরকারি অর্থের সুরক্ষা এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। বিল ছাড়ে কমিশনের অভিযোগ: কাজ শেষ, তবু অপেক্ষা অনুসন্ধানের উপাদানে উঠে আসা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো কাজ সম্পন্ন করার পরও ঠিকাদারদের বিল আটকে রাখা এবং বিল ছাড়ের জন্য কমিশন দাবি করার অভিযোগ। ঠিকাদারদের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ, সংস্কার কিংবা সম্প্রসারণের কাজ শেষ করার পরও মাসের পর মাস তাঁদের দপ্তরে ঘুরতে হয়। কখনো বিলের একটি অংশ ছাড় করা হয়, আবার কখনো নতুন করে কাগজপত্র চাওয়া বা কাজের পরিমাপ নিয়ে আপত্তি তোলার কারণে ফাইল আটকে থাকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঠিকাদারের অভিযোগ, “এখানে কাজ করতে হলে দুইটা জিনিস লাগে—ধৈর্য আর টাকা। টাকা না দিলে ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া হয়।” ঠিকাদারদের দাবি, বিলের পরিমাণ ও প্রকল্পের আকার অনুযায়ী কথিত কমিশনের অঙ্ক নির্ধারিত হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে ফাইলে সমস্যা থাকার কথা বলা হয়, পরে অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে অর্থের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। আরেকটি অভিযোগ হলো, নিরাপত্তা জামানত ফেরত পেতেও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। তবে এসব লেনদেনের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, অর্থ গ্রহণকারী ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ঠিকাদারদের বক্তব্য, বিল আটকে থাকায় তাঁদের ব্যাংকঋণের সুদ, শ্রমিকের মজুরি ও নির্মাণসামগ্রীর বকেয়া পরিশোধে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপরও। দরপত্রে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয় ঘিরে আরেকটি বড় অভিযোগ হলো দরপত্রের প্রতিযোগিতা প্রভাবিত করা। ঠিকাদারদের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্রের শর্ত ও মূল্যায়নপ্রক্রিয়া প্রভাবিত করা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী ঠিকাদারদের কারিগরি ত্রুটির অজুহাতে বাদ দেওয়া এবং পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এক ঠিকাদারের ভাষায়, “আগেই ঠিক করে দেওয়া থাকে কে কাজ পাবে। দরপত্র শুধু আনুষ্ঠানিকতা। আমরা কাগজ জমা দিলেও পরে বলা হয়, টেকনিক্যাল সমস্যা আছে।” অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সিদ্ধান্তের ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহারও ব্যাহত হতে পারে। কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকার প্রকল্প বরিশাল নগরীর ২০ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্প ঘিরে দরপত্র নিয়ে বিতর্কের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ কোটি ২৯ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৯ সালের ১৯ জুন প্রকল্পটির জন্য প্রথম দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। সে সময় কোহিনূর এন্টারপ্রাইজ কাজটি পায়। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, মহানগর যুবলীগ নেতা ও ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর জিয়াউল হক বিপ্লব এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী জাহিদ কাজটি শুরু করেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পটি পুনঃদরপত্রে যায় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। পরবর্তী দরপত্রে বিভিন্ন স্থান থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় এবং প্রত্যেকেই ১০ শতাংশ ছাড় দিয়ে দরপত্র জমা দেয় বলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম পুনঃদরপত্রে অংশ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, যেটি জিয়াউল হক বিপ্লবের ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করা হয়েছে। ঠিকাদারদের আরও অভিযোগ, দরপত্র প্রক্রিয়া ১২০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও এ ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি। অভিযোগকারীরা বিষয়টিকে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের দাবি, দরপত্রের শর্ত, মূল্যায়নের ফলাফল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণ প্রকাশ করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। প্রায় ৩২ কোটি টাকার টিএসসি প্রকল্প: কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাবুগঞ্জ ও আগৈলঝাড়ায় কারিগরি স্কুল ও কলেজ (টিএসসি) স্থাপন প্রকল্প ঘিরেও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ঠিকাদারদের একাংশ। তাঁদের দাবি, প্রায় ৩২ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ বসুন্ধরা হাউজিং (প্রা.) লিমিটেডের লাইসেন্স ব্যবহার করে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেছেন। পরে প্রকল্পের কাজ ৭ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে অন্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রকল্পের কার্যাদেশ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও প্রতিনিধিত্ব, চুক্তির শর্ত, কাজের বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং অর্থ পরিশোধের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সরকারি কাজের চুক্তি অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়ে থাকলে সেটি অনুমোদিত সাবকন্ট্রাক্ট কি না, তা-ও যাচাই করতে হবে। ৩৫ লাখ টাকা ও কম্পিউটার অপারেটর রাশেদকে ঘিরে অভিযোগ টিএসসি প্রকল্পের কমিশন লেনদেন নিয়ে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে প্রধান কার্যালয়ের প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বরিশালে আসার পর সার্কিট হাউসে ঠিকাদার প্রতিনিধিরা প্রকল্পের অগ্রিম কমিশন হিসেবে ৩৫ লাখ টাকা তাঁর দপ্তরের কম্পিউটার অপারেটর রাশেদের কাছে জমা দেন। ঠিকাদারদের অভিযোগ, টাকা গ্রহণের পর রাশেদকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে তাঁকে খুঁজতে নির্বাহী প্রকৌশলীর সরকারি গাড়িতে করে তাঁর স্ত্রী, সন্তান ও ভাইকে বরিশালে আনা হয় এবং গভীর রাত পর্যন্ত তাঁদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে রাশেদের স্ত্রীর আপত্তির মুখে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।অভিযোগটি সত্য হলে তা সরকারি প্রকল্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও দপ্তরের জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলবে। এ কারণে ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। ছয় থেকে আট ঠিকাদারের সিন্ডিকেটের অভিযোগ ঠিকাদারদের একাংশের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলীর আশপাশে ছয় থেকে আটজন ঠিকাদারকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের বরাদ্দ, কার্যাদেশ, বিল ছাড় এবং জামানত ফেরতের মতো বিষয়ে এই বলয় বাড়তি সুবিধা পায় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে কয়েকজন কর্মকর্তার নামও এসেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বড় প্রকল্পের কাজ বণ্টন ও কমিশনভিত্তিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া ঢাকায় দায়িত্ব পালন করা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক এক প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে শহিদুল ইসলামের ঘনিষ্ঠতা এবং তাঁকে নিয়মিত বরিশালের ইলিশ পাঠানোর অভিযোগও ঠিকাদারি মহলে আলোচিত বলে দাবি করা হয়েছে। ২৪ ঠিকাদারের লিখিত অভিযোগ: কী প্রতিকার চাওয়া হয়েছে? সচিবের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে ২৪ জন ঠিকাদার নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, দুর্নীতি, ভুয়া বিল উত্তোলন, দরপত্রে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের প্রধান বিষয়গুলো হলো— কমিশন দাবি: নির্ধারিত হারে কমিশন না দিলে সম্পন্ন কাজের বিল অনুমোদন না করার অভিযোগ। জামানত ফেরতে হয়রানি: নিরাপত্তা জামানত ফেরত পেতে অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ। ভুয়া অগ্রগতির নথি: মাঠপর্যায়ে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও কাগজে অগ্রগতি দেখিয়ে বিল ছাড়ের অভিযোগ। দরপত্রে প্রভাব বিস্তার: নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ। হুমকি ও অশালীন আচরণ: ঠিকাদারদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ। কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি: কর্মদিবসে দপ্তরের একাধিক প্রকৌশলীর অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ। সরকারি বিশ্রামাগারের ব্যবহার: দপ্তরের রেস্ট হাউস ব্যক্তিগত ও অনৈতিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্তের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। ঠিকাদারকে ফোনে হুমকির অভিযোগ, থানায় সাধারণ ডায়েরি নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঠিকাদার ফারুক হোসেনকে ফোনে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর এ ঘটনা ঘটে। পরদিন ৩০ নভেম্বর বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় এ বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়, যার নম্বর ২০৭৬ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঠিকাদারদের আরও দাবি, প্রকাশ্যে অভিযোগ জানালে তাঁদের চলমান প্রকল্পের বিল আটকে দেওয়া হতে পারে কিংবা কাজের সাইটে নতুন করে ত্রুটি খোঁজা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেকে পরিচয় গোপন রাখতে চান। ‘রাসেল’ ছদ্মনামে পরিচিত এক ঠিকাদারের দাবি, নির্ধারিত কমিশন না দিলে ফাইল স্বাক্ষর হয় না। ‘অয়ন’ ছদ্মনামে আরেক ঠিকাদার বলেন, মাঠপর্যায়ে কাজের নিরপেক্ষ পরিদর্শন ও নথি যাচাই করা হলে ভুয়া বিলের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। নির্মাণকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন দরপত্র ও বিলসংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনের উপাদানে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অর্ধসমাপ্ত ভবন, নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে অসন্তোষ এবং কাগজে কাজ শেষ দেখানো হলেও বাস্তবে কিছু অংশ অসম্পূর্ণ থাকার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক অভিযোগ করেন, ভবনের ছাদ থেকে পানি পড়ে এবং দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। অথচ নথিতে কাজ ঠিকঠাক সম্পন্ন হওয়ার কথা বলা হয়েছে বলে তাঁর দাবি। অভিভাবকদের উদ্বেগ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চলতে থাকলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। তবে কোন বিদ্যালয়ের ভবনে কী ধরনের ত্রুটি পাওয়া গেছে, কাজের চুক্তিমূল্য কত, নির্মাণকাজের দায়িত্বে কোন প্রতিষ্ঠান ছিল এবং প্রকৌশলগত পরীক্ষায় কী ফল এসেছে—এসব তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। শিক্ষা অবকাঠামোর গুণগত মান নিশ্চিত করতে নির্মাণকাজের পরিমাপ, উপকরণের পরীক্ষার ফল, প্রকৌশলগত পরিদর্শন এবং ত্রুটি সংশোধনের নথি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত দায়িত্ব নিয়েও বিতর্ক শহিদুল ইসলামকে ঘিরে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর শাখার সদস্য ছিলেন এবং ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) শিক্ষাজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার ঢেপুয়ারপাড় জামুয়া গ্রামে এবং তাঁর পিতার নাম শেখ রুস্তুম আলী । অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনের সময় আমির হোসেন আমু এবং বরিশালে দায়িত্ব পালনকালে জাহিদ ফারুক শামীমের রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বর্তমানে কারাগারে থাকলেও শহিদুল ইসলাম বরিশাল ও বরগুনার দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। পিএসসির প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার দাবি শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) প্রশ্নফাঁসসংক্রান্ত আলোচিত ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ডুয়েটে শিক্ষাজীবনের সময় তিনি পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যানের গাড়িচালক সৈয়দ আবেদকে ঘিরে আলোচিত প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া তাঁর নিয়োগ এবং একই সময় নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন বন্ধুর নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ঘুষের বিনিময়ে এসব অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। পটুয়াখালীতেও অনিয়মের অভিযোগ ছিল বলে দাবি ঠিকাদারদের একাংশের দাবি, পটুয়াখালীতে দায়িত্ব পালনকালেও শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। মানববন্ধনে অপসারণ ও শাস্তির দাবি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে অধিদপ্তরের ভবনের সামনে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগীরা বলে প্রতিবেদনের উপাদানে উল্লেখ রয়েছে। আয়োজকদের দাবি, সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট অনিয়মের প্রতিবাদ দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তদন্ত চলাকালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়িত্বে বহাল রাখা তদন্তের স্বচ্ছতায় প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সেটিও কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। প্রধান প্রকৌশলীর আশ্বাস, তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন বরিশাল কার্যালয় ঘিরে অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে, “দুর্নীতি-অনিয়ম কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে অভিযোগকারীদের দাবি, আশ্বাসের পরও দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপের তথ্য তাঁরা পাননি। এ কারণে অভিযোগ তদন্তের অগ্রগতি, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না এবং কোনো অডিট বা বিভাগীয় অনুসন্ধান চলছে কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে। এ প্রতিবেদনের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বক্তব্য সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। প্রকৌশলী শহীদুলের অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়েছে বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। দুর্নীতি-অনিয়ম কোন ভাবেই বন্ধ হচ্ছে না বরিশাল শিক্ষা প্রোকৌশলী অধিদপ্তর। বিভিন্ন উপায়ে অতিরিক্ত ব্যয় প্রাক্কলন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, প্রকৌশলীদের অনৈতিক সুবিধা আদায়সহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, একাধিক ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এই দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম কাজ পাইয়ে দেওয়া, বিল ও জামানতের চেক পরিশোধের ক্ষেত্রে গুনে গুনে বুঝে নেন কমিশন। ২৬ কোটি টাকার কাজ দুইটি ৭% কমিশনে অন্য ঠিকাদারের কাছে বিক্রী করে দেন। অবশ্য তিনি বরিশালে যোগদানের পর থেকেই অতিরিক্ত ব্যয় প্রাক্কলন এবং বাছাই করা উন্নয়ন কাজগুলো নিজেই বিভিন্ন কৌশলে ভাগিয়ে নিয়ে ঠিকাদারদের কাছে বিক্রী করে আসছেন। এখন প্রয়োজন নথিভিত্তিক, নিরপেক্ষ তদন্ত বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সচেতন নাগরিকদের একাংশ। প্রথমত, নির্বাহী প্রকৌশলী ও অভিযোগে উল্লিখিত চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রায় ৩২ কোটি টাকার টিএসসি প্রকল্প এবং কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪ কোটি ২৯ লাখ ৩৪ হাজার টাকার প্রকল্পের দরপত্র, কার্যাদেশ ও বিলের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, ২৪ ঠিকাদারের লিখিত অভিযোগ, নিরাপত্তা জামানত কর্তনের হার, বিল আটকে রাখার কারণ এবং কথিত কমিশন লেনদেনের বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্ত করা দরকার। চতুর্থত, ৩৫ লাখ টাকা হস্তান্তরের অভিযোগ, কম্পিউটার অপারেটর রাশেদের ভূমিকা এবং ঠিকাদার ফারুক হোসেনের জিডির তথ্য যাচাই করতে হবে। পঞ্চমত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোর নির্মাণমান পরীক্ষা করে ত্রুটি পাওয়া গেলে দায়ী ঠিকাদার ও তদারক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে বিলম্ব, নথি গোপন রাখা কিংবা তদন্তের ফল প্রকাশ না করা হলে দপ্তরের ওপর আস্থার সংকট আরও বাড়তে পারে। মূল প্রশ্ন এখন একটাই: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি, নাকি ২৪ ঠিকাদারের অভিযোগ, দরপত্র বিতর্ক ও কমিশন বাণিজ্যের দাবিগুলোও প্রশাসনিক ফাইলের ভেতরেই আটকে থাকবে? অনুসন্ধান প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্বে বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অনিয়ম,দুর্নীতি, এবং নতুন অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হবে।