ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন:
সৌদি আরবে গিয়ে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের দুই নাগরিক। সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দেশটিতে যাওয়ার পর তাঁদের একজন ছিলেন জেদ্দার সংশোধনাগারে, অন্যজন নারী কারাগারে। পরিবারও জানত, তাঁরা কারাগারে আছেন। কিন্তু কী অভিযোগে আটক, তাঁদের বিরুদ্ধে কী মামলা চলছিল কিংবা বিচারপ্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে—এসব বিষয়ে পরিবারের কাছে স্পষ্ট তথ্য ছিল না। অন্যদিকে, বাংলাদেশের কনস্যুলেটের কাছে থাকা বন্দিদের তালিকাতেও তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের তথ্য উল্লেখ ছিল না বলে সরকারি নথিতে উঠে এসেছে।
এরপর ১৪ অক্টোবর মক্কায় কার্যকর হয় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড। তাঁদের পরিচয়, আটকের সময়, মামলার বিবরণ এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সামনে আসে একাধিক প্রশ্ন। সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনকে অবহিত করেছিল কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে গুরুতর উদ্বেগ।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের পাঠানো একটি ‘গোপনীয়’ নথি এবং নিহত নারীর পরিবারের বক্তব্য এই ঘটনার বিভিন্ন দিক সামনে এনেছে। নথি অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তার ২০২৩ সালের আগস্টে পৃথক অভিযোগে আটক হন। কিন্তু বন্দিদের যে তালিকা কনস্যুলেট পেয়েছিল, তাতে তাঁদের কারও মৃত্যুদণ্ডের কথা উল্লেখ ছিল না।
প্রশ্ন উঠছে—বিদেশের কারাগারে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের মামলা, সাজা ও নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা কতটা কার্যকর? আর মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট নাগরিকের পক্ষে আইনি সহায়তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত হয়েছিল কি না, তা জানার উপায় কী?
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিসংখ্যানও বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির মঙ্গলবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরে দেশটিতে ১৯০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১১৬ জন মাদক চোরাচালানের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এই ১১৬ জনের মধ্যে ৮০ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক।
এএফপি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য সংরক্ষণ করে এই হিসাব দিয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশি নাগরিকদের দেশভিত্তিক পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ফলে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডিত ওই ৮০ বিদেশির মধ্যে কোনো বাংলাদেশি ছিলেন কি না, তা এ তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না। একইভাবে, মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি ওই ১৯০ জনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত কি না, এএফপির প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট নয়।
সম্প্রতি সৌদি আরবে সন্ত্রাসবাদের দায়ে ইস্টার্ন প্রভিন্সে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ইউসেফ আল-মানাসিফ (৩০) নামে সৌদি আরবের আরেক নাগরিকও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি কিশোর বয়সে আরব বসন্তের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।
এএফপির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রেক্ষাপটেও সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য মৃত্যুদণ্ডকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করে। দেশটির দাবি, আপিলের সুযোগ শেষ হওয়ার পরই এ শাস্তি কার্যকর করা হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীন ও ইরানের পর সৌদি আরব ছিল বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশ। গত জানুয়ারি থেকে সৌদি আরবে সন্ত্রাসবাদের দায়ে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা। আগের বছর একই অঞ্চলে ৪০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি উঠে এসেছে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের পাঠানো নথিতে।
রোববার, ১৮ অক্টোবর, কনস্যুলেটের শ্রম উইং থেকে পাঠানো একটি ‘গোপনীয়’ চিঠি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়। চিঠিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির পরিচয় হিসেবে নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তারের নাম উল্লেখ করা হয়।
নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সৌদি আরবের সাইবার অপরাধ আইনে নজরুল ইসলামকে আটক করা হয়েছিল। পরদিন, ২ আগস্ট, ব্যভিচারের অভিযোগে আটক হন সুইটি আক্তার। গত ৩০ সেপ্টেম্বর কনস্যুলেট যে বন্দিদের তালিকা পেয়েছিল, সেখানে তাঁদের আটকের তথ্য ছিল।
নজরুল ছিলেন জেদ্দা সংশোধনাগারে এবং সুইটি ছিলেন জেদ্দা মহিলা কারাগারে। দুজনই ‘আল মাজাল কোম্পানিতে’ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে তালিকাটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি ছিল। ৯৭ জন বন্দির অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলেও নজরুল ও সুইটির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কলামে কোনো তথ্য ছিল না। তাঁদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছে—এমন তথ্যও ওই তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি।
কনস্যুলেটের নথিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে সাইবার অপরাধ কিংবা ব্যভিচারের অভিযোগে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের নজির তাদের জানা নেই। তবে এ বক্তব্যকে সৌদি আরবে এ ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের কোনো নজির নেই—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার আগে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও বিচারিক রায় যাচাই করা প্রয়োজন।
নথি থেকে যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হলো—দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলা ও সাজা সম্পর্কে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন কতটা তথ্য পেয়েছিল? বন্দিদের তালিকায় মৃত্যুদণ্ডের তথ্য না থাকলে সেই তথ্য হালনাগাদ করার দায়িত্ব কার ছিল? আর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের পক্ষে আইনি সহায়তা বা কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ ছিল কি না, তা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া রায়ের অনুলিপি, অভিযোগপত্র, আদালতের কার্যবিবরণী এবং সাজা কার্যকরের সরকারি নথি প্রয়োজন।
কনস্যুলেটের পাঠানো নথিতে বলা হয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা কিংবা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস বা জেদ্দার কনস্যুলেট জেনারেলকে আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেনি।
এমন দাবি সত্য হলে তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের তথ্যপ্রাপ্তি ও নাগরিক সুরক্ষার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কোন পর্যায়ে কনস্যুলেটকে অবহিত করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
ঘটনার পর কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি ‘নোট ভার্বাল’ পাঠিয়েছে। এতে দুই বাংলাদেশির মামলার রায়ের অনুলিপি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
কনস্যুলেট জানিয়েছে, রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
অর্থাৎ, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনকে মামলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তি কার্যকরের আগে বাংলাদেশের নাগরিকদের আইনি অবস্থান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও সহায়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির মামলার জন্য নয়, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে কারাবন্দি বাংলাদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা ব্যবস্থার মূল্যায়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁরা সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিবন্ধিত রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন।
বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য সরকারি প্রক্রিয়ায় যাওয়া কর্মীদের পরিচয়পত্র দেয় জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো—বিএমইটি। নজরুল ও সুইটি, দুজনেরই এ ধরনের পরিচয়পত্র ছিল বলে জানানো হয়েছে।
এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে অন্তত বোঝা যায়, তাঁরা বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে যাত্রা করার সময় সরকারি ব্যবস্থার আওতায় ছিলেন। তবে বৈধভাবে বিদেশে যাওয়া মানেই পরবর্তী সময়ে কোনো অপরাধে জড়িত ছিলেন না—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে, কোনো অভিযোগে আটক হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত—এমনটিও নয়। এ ক্ষেত্রে বিচারিক রায় ও মামলার প্রমাণই নির্ণায়ক।
নথি অনুযায়ী, সৌদি আরবে যাওয়ার আগে সুইটির পাসপোর্ট ইস্যু করা হয় ২০২২ সালের মে মাসে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য তাঁকে বিএমইটির ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
সরকারি লোগো সংবলিত পরিচয়পত্রে বলা হয়েছে, কার্ডধারী ব্যক্তি বিমা-সুবিধা এবং কল্যাণসেবা পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু বিদেশে কর্মরত অবস্থায় কারাগারে আটক হওয়ার পর তাঁর পরিবার কতটা সহায়তা পেয়েছিল, কীভাবে মামলা সম্পর্কে জানতে পেরেছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
সুইটি আক্তারের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সৌদি আরবে তাঁর কারাবন্দি থাকার কথা তাঁরা জানতেন। কিন্তু ঠিক কী অপরাধে তিনি আটক হয়েছিলেন, কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে মামলার বিচার কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তা তাঁরা জানতেন না।
পরিবারের দাবি, সুইটি সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম ছয় মাস নিয়মিত যোগাযোগ করতেন এবং টাকা পাঠাতেন। পরে যোগাযোগ কমে যায়। একপর্যায়ে সৌদি আরবে থাকা আরেক ব্যক্তির মাধ্যমে তাঁরা জানতে পারেন, সুইটি কারাগারে রয়েছেন।
সুইটির বড় বোনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম দিকে তিনি পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। পরে কারাগারে থাকার বিষয়টি জানালেও অভিযোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেননি। পরিবারের সদস্যদের দাবি, তিনি তাঁদের এ বিষয়ে বেশি প্রশ্ন করতে নিষেধ করেছিলেন এবং দেশে ফিরে সব জানাবেন বলেছিলেন।
বড় বোনের বর্ণনায়, সুইটি একবার বলেছিলেন, তাঁরা কয়েকজন নারী একই কক্ষে থাকতেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন গাড়ি কেনার ঘটনায় মালিক তাঁদের ধরিয়ে দিয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন। তবে এই বক্তব্যের অর্থ কী, গাড়ি কেনার অভিযোগের সঙ্গে সুইটির মামলার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, কিংবা এ বক্তব্যের পক্ষে কোনো নথি রয়েছে কি না—তা নিশ্চিত নয়।
পরিবারের এই বর্ণনা থেকে সুইটির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বা মৃত্যুদণ্ডের আইনি ভিত্তি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য আদালতের রায় ও মামলার নথি অপরিহার্য।
সুইটির বড় বোন আরও জানান, পাঁচ বোনের মধ্যে সুইটি ছিলেন সবার ছোট। পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করতে তিনি সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়েছিলেন।
পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। দুই বছর সংসার করার পর বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর ২০২৩ সালে তিনি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান। তাঁর নিজের কোনো সন্তান ছিল না; তিনি নিজের বোনের মেয়েকে লালন-পালন করতেন বলে তাঁর বাবা জানিয়েছেন।
সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম ছয় মাস সুইটি নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। কিন্তু কারাগারে যাওয়ার পর সেই অর্থ পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের জন্য তাঁর উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়া ছিল আর্থিক সংকটের আরেকটি কারণ।
সুইটির পরিবারের দাবি, তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর তাঁরা আগেভাগে জানতে পারেননি। বড় বোন জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর মাধ্যমে তাঁরা প্রথম বিষয়টি জানতে পারেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সুইটির এক বান্ধবী ফোন করে খবরটি জানান এবং পরে একটি ভিডিও পাঠান। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সুইটি কারাগার থেকে সাধারণত ১৫ দিন বা এক মাস পরপর ফোন করতেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগের সপ্তাহেও তিনি ফোন করেছিলেন বলে পরিবারের দাবি। তবে সেদিন টেলিফোন লাইনে সমস্যার কারণে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
পরিবারের আরেক সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগের মঙ্গলবারও সুইটি ফোন করেছিলেন। কিন্তু তখনও পরিবার তাঁর মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানত না।
পরিবারের এই বক্তব্যের সঙ্গে কনস্যুলেটের নথিতে মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে অবহিত না হওয়ার দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। তবে দুটি বক্তব্য একসঙ্গে থাকলেও এর মাধ্যমে সৌদি কর্তৃপক্ষের আইনি দায়িত্ব লঙ্ঘনের বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। সেটি নির্ধারণ করতে হলে সৌদি আইনে প্রযোজ্য বিধান, বিচারপ্রক্রিয়ার নথি এবং দুই দেশের মধ্যে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ যাচাই করতে হবে।
তবু ঘটনাটি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছেছিল কি না, বন্দির সঙ্গে শেষবার যোগাযোগের সুযোগ কী ছিল এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন কী ভূমিকা পালন করতে পেরেছিল?
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া অন্য বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম আব্দুল বশিরের বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত। কনস্যুলেটের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সৌদি আরবের সাইবার অপরাধ আইনে তাঁকে আটক করা হয়। তিনি জেদ্দা সংশোধনাগারে বন্দি ছিলেন এবং ‘আল মাজাল কোম্পানিতে’ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী ছিল, মামলার প্রমাণ কী, কোন আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন এবং আপিলের সুযোগ নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
সুইটি আক্তারের মতো নজরুলের ক্ষেত্রেও বন্দিদের তালিকায় অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ কিংবা মৃত্যুদণ্ডের তথ্য ছিল না বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
দুই ব্যক্তির মামলার প্রকৃতি পৃথক হলেও তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ কী তথ্য পেয়েছিল, তা একই ধরনের জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে, দুই নাগরিকই দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে বলে নথিতে উঠে এসেছে।
কনস্যুলেটের নথিতে সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে কারাবন্দি বাংলাদেশি নাগরিকদের সম্পর্কেও তথ্য রয়েছে।
নথি অনুযায়ী, ওই অঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে ৩০৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জনের কারাদণ্ডের মেয়াদ এক মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত।
এ ছাড়া সাইবার অপরাধের তিনটি পৃথক মামলার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কারাদণ্ডের মেয়াদ ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত ছিল।
এই পরিসংখ্যান প্রবাসী বাংলাদেশিদের কারাবন্দি হওয়ার পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি আংশিক চিত্র তুলে ধরে। তবে শুধু এ তথ্য দিয়ে সৌদি আরবে মোট কতজন বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন, তাঁদের কতজন বিচারাধীন, কতজন সাজাপ্রাপ্ত কিংবা কতজনের বিরুদ্ধে গুরুতর শাস্তির আশঙ্কা রয়েছে—তা নির্ধারণ করা যায় না।
কারাবন্দি নাগরিকদের সংখ্যা ও তাঁদের মামলার অবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ, আইনি সহায়তার প্রাপ্যতা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করা—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি কতটা রয়েছে, তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। তাঁদের কারাবন্দি হওয়ার পর পরিবার প্রায়ই আয়ের পাশাপাশি তথ্যের সংকটেও পড়ে। সুইটির পরিবারের বক্তব্যে সেই সংকটের একটি চিত্র দেখা যায়।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুইটি আক্তারের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে। টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার তিনি ওই নারীর বাড়ি ও বাবার পরিচয় সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। তবে তখন পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা পাননি বলে তিনি জানান।প্রশাসনিক পর্যায়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং মরদেহ দেশে আনার সম্ভাব্য প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে মরদেহ দেশে আনার আবেদন করা হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এদিকে, সুইটির পরিবারের দাবি, তাঁরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর আগে জানতেন না। ফলে মরদেহ দেশে আনার আবেদন, আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের জন্য পরিবারকে কী সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর পেতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলার পূর্ণাঙ্গ নথি, আদালতের রায় এবং সাজা কার্যকরের সরকারি আদেশ সংগ্রহ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁদের আটকের পর থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের যোগাযোগের নথি যাচাই করা দরকার। তৃতীয়ত, তাঁরা আইনজীবী পেয়েছিলেন কি না, আপিল করেছিলেন কি না এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কী ছিল—এসব তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কনস্যুলেটের মধ্যে বন্দিদের তথ্য আদান-প্রদানের প্রক্রিয়াও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বন্দিদের তালিকায় কারও বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের তথ্য না থাকলে তা শনাক্ত ও হালনাগাদ করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, সেটিও তদন্তের বিষয়।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া কেবল একটি গোপনীয় নথি বা পরিবারের বক্তব্যের ভিত্তিতে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। তবে নথিতে বর্ণিত তথ্য ও পরিবারের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে—বিদেশে কারাবন্দি বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে তথ্যপ্রাপ্তি এবং কূটনৈতিক সহায়তার কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অনুমান নয়, নথিভিত্তিক সত্য উদ্ঘাটন।
কোন অভিযোগে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, আদালত কী প্রমাণ পেয়েছিলেন, আপিলের সুযোগ কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনকে কোনো পর্যায়ে জানানো হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট নথি ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে, সুইটির পরিবারের মতো যেসব পরিবার বিদেশে বন্দি স্বজনের বিষয়ে সীমিত তথ্য পায়, তাদের জন্য কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা কতটা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিদেশে কর্মসংস্থানের আগে সরকারি ছাড়পত্র ও পরিচয়পত্র দেওয়া হলেও বিদেশে আটক হওয়ার পর নাগরিকদের সহায়তা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়, সেটিও মূল্যায়ন করা দরকার।
কনস্যুলেট ইতিমধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে রায়ের অনুলিপি ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। সেই নথি হাতে পাওয়ার পর মামলার প্রকৃত অবস্থা, সাজা কার্যকরের প্রক্রিয়া এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হতে পারে।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা তাই শুধু দুটি পরিবারের শোকের বিষয় নয়; এটি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা, কূটনৈতিক সহায়তা এবং সরকারি জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এনেছে। এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সব নথি সংগ্রহ, তথ্যের অসংগতি যাচাই এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সৌদি আরবে গিয়ে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের দুই নাগরিক। সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দেশটিতে যাওয়ার পর তাঁদের একজন ছিলেন জেদ্দার সংশোধনাগারে, অন্যজন নারী কারাগারে। পরিবারও জানত, তাঁরা কারাগারে আছেন। কিন্তু কী অভিযোগে আটক, তাঁদের বিরুদ্ধে কী মামলা চলছিল কিংবা বিচারপ্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে—এসব বিষয়ে পরিবারের কাছে স্পষ্ট তথ্য ছিল না। অন্যদিকে, বাংলাদেশের কনস্যুলেটের কাছে থাকা বন্দিদের তালিকাতেও তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের তথ্য উল্লেখ ছিল না বলে সরকারি নথিতে উঠে এসেছে। এরপর ১৪ অক্টোবর মক্কায় কার্যকর হয় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড। তাঁদের পরিচয়, আটকের সময়, মামলার বিবরণ এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সামনে আসে একাধিক প্রশ্ন। সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনকে অবহিত করেছিল কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে গুরুতর উদ্বেগ। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের পাঠানো একটি ‘গোপনীয়’ নথি এবং নিহত নারীর পরিবারের বক্তব্য এই ঘটনার বিভিন্ন দিক সামনে এনেছে। নথি অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তার ২০২৩ সালের আগস্টে পৃথক অভিযোগে আটক হন। কিন্তু বন্দিদের যে তালিকা কনস্যুলেট পেয়েছিল, তাতে তাঁদের কারও মৃত্যুদণ্ডের কথা উল্লেখ ছিল না। প্রশ্ন উঠছে—বিদেশের কারাগারে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের মামলা, সাজা ও নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা কতটা কার্যকর? আর মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট নাগরিকের পক্ষে আইনি সহায়তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত হয়েছিল কি না, তা জানার উপায় কী? ১৯০ মৃত্যুদণ্ড, ১১৬ জন মাদকসংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডিত সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিসংখ্যানও বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির মঙ্গলবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরে দেশটিতে ১৯০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১১৬ জন মাদক চোরাচালানের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এই ১১৬ জনের মধ্যে ৮০ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক। এএফপি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য সংরক্ষণ করে এই হিসাব দিয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশি নাগরিকদের দেশভিত্তিক পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ফলে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডিত ওই ৮০ বিদেশির মধ্যে কোনো বাংলাদেশি ছিলেন কি না, তা এ তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না। একইভাবে, মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি ওই ১৯০ জনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত কি না, এএফপির প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট নয়। সম্প্রতি সৌদি আরবে সন্ত্রাসবাদের দায়ে ইস্টার্ন প্রভিন্সে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ইউসেফ আল-মানাসিফ (৩০) নামে সৌদি আরবের আরেক নাগরিকও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি কিশোর বয়সে আরব বসন্তের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। এএফপির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রেক্ষাপটেও সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য মৃত্যুদণ্ডকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করে। দেশটির দাবি, আপিলের সুযোগ শেষ হওয়ার পরই এ শাস্তি কার্যকর করা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীন ও ইরানের পর সৌদি আরব ছিল বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশ। গত জানুয়ারি থেকে সৌদি আরবে সন্ত্রাসবাদের দায়ে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা। আগের বছর একই অঞ্চলে ৪০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। গোপনীয় নথিতে কী আছে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি উঠে এসেছে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের পাঠানো নথিতে। রোববার, ১৮ অক্টোবর, কনস্যুলেটের শ্রম উইং থেকে পাঠানো একটি ‘গোপনীয়’ চিঠি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়। চিঠিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির পরিচয় হিসেবে নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তারের নাম উল্লেখ করা হয়। নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সৌদি আরবের সাইবার অপরাধ আইনে নজরুল ইসলামকে আটক করা হয়েছিল। পরদিন, ২ আগস্ট, ব্যভিচারের অভিযোগে আটক হন সুইটি আক্তার। গত ৩০ সেপ্টেম্বর কনস্যুলেট যে বন্দিদের তালিকা পেয়েছিল, সেখানে তাঁদের আটকের তথ্য ছিল। নজরুল ছিলেন জেদ্দা সংশোধনাগারে এবং সুইটি ছিলেন জেদ্দা মহিলা কারাগারে। দুজনই ‘আল মাজাল কোম্পানিতে’ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে তালিকাটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি ছিল। ৯৭ জন বন্দির অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলেও নজরুল ও সুইটির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কলামে কোনো তথ্য ছিল না। তাঁদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছে—এমন তথ্যও ওই তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি। কনস্যুলেটের নথিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে সাইবার অপরাধ কিংবা ব্যভিচারের অভিযোগে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের নজির তাদের জানা নেই। তবে এ বক্তব্যকে সৌদি আরবে এ ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের কোনো নজির নেই—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার আগে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও বিচারিক রায় যাচাই করা প্রয়োজন। নথি থেকে যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হলো—দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলা ও সাজা সম্পর্কে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন কতটা তথ্য পেয়েছিল? বন্দিদের তালিকায় মৃত্যুদণ্ডের তথ্য না থাকলে সেই তথ্য হালনাগাদ করার দায়িত্ব কার ছিল? আর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের পক্ষে আইনি সহায়তা বা কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ ছিল কি না, তা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া রায়ের অনুলিপি, অভিযোগপত্র, আদালতের কার্যবিবরণী এবং সাজা কার্যকরের সরকারি নথি প্রয়োজন। সৌদি কর্তৃপক্ষ দূতাবাসকে জানায়নি: কনস্যুলেটের অভিযোগ কনস্যুলেটের পাঠানো নথিতে বলা হয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা কিংবা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস বা জেদ্দার কনস্যুলেট জেনারেলকে আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেনি। এমন দাবি সত্য হলে তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের তথ্যপ্রাপ্তি ও নাগরিক সুরক্ষার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কোন পর্যায়ে কনস্যুলেটকে অবহিত করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। ঘটনার পর কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি ‘নোট ভার্বাল’ পাঠিয়েছে। এতে দুই বাংলাদেশির মামলার রায়ের অনুলিপি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। কনস্যুলেট জানিয়েছে, রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হবে। অর্থাৎ, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনকে মামলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তি কার্যকরের আগে বাংলাদেশের নাগরিকদের আইনি অবস্থান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও সহায়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির মামলার জন্য নয়, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে কারাবন্দি বাংলাদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা ব্যবস্থার মূল্যায়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বৈধ পথে সৌদি আরব, তারপর কারাগার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁরা সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিবন্ধিত রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য সরকারি প্রক্রিয়ায় যাওয়া কর্মীদের পরিচয়পত্র দেয় জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো—বিএমইটি। নজরুল ও সুইটি, দুজনেরই এ ধরনের পরিচয়পত্র ছিল বলে জানানো হয়েছে। এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে অন্তত বোঝা যায়, তাঁরা বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে যাত্রা করার সময় সরকারি ব্যবস্থার আওতায় ছিলেন। তবে বৈধভাবে বিদেশে যাওয়া মানেই পরবর্তী সময়ে কোনো অপরাধে জড়িত ছিলেন না—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে, কোনো অভিযোগে আটক হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত—এমনটিও নয়। এ ক্ষেত্রে বিচারিক রায় ও মামলার প্রমাণই নির্ণায়ক। নথি অনুযায়ী, সৌদি আরবে যাওয়ার আগে সুইটির পাসপোর্ট ইস্যু করা হয় ২০২২ সালের মে মাসে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য তাঁকে বিএমইটির ছাড়পত্র দেওয়া হয়। সরকারি লোগো সংবলিত পরিচয়পত্রে বলা হয়েছে, কার্ডধারী ব্যক্তি বিমা-সুবিধা এবং কল্যাণসেবা পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু বিদেশে কর্মরত অবস্থায় কারাগারে আটক হওয়ার পর তাঁর পরিবার কতটা সহায়তা পেয়েছিল, কীভাবে মামলা সম্পর্কে জানতে পেরেছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের অজানা ছিল অভিযোগ ও মামলার পরিণতি সুইটি আক্তারের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সৌদি আরবে তাঁর কারাবন্দি থাকার কথা তাঁরা জানতেন। কিন্তু ঠিক কী অপরাধে তিনি আটক হয়েছিলেন, কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে মামলার বিচার কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তা তাঁরা জানতেন না। পরিবারের দাবি, সুইটি সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম ছয় মাস নিয়মিত যোগাযোগ করতেন এবং টাকা পাঠাতেন। পরে যোগাযোগ কমে যায়। একপর্যায়ে সৌদি আরবে থাকা আরেক ব্যক্তির মাধ্যমে তাঁরা জানতে পারেন, সুইটি কারাগারে রয়েছেন। সুইটির বড় বোনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম দিকে তিনি পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। পরে কারাগারে থাকার বিষয়টি জানালেও অভিযোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেননি। পরিবারের সদস্যদের দাবি, তিনি তাঁদের এ বিষয়ে বেশি প্রশ্ন করতে নিষেধ করেছিলেন এবং দেশে ফিরে সব জানাবেন বলেছিলেন। বড় বোনের বর্ণনায়, সুইটি একবার বলেছিলেন, তাঁরা কয়েকজন নারী একই কক্ষে থাকতেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন গাড়ি কেনার ঘটনায় মালিক তাঁদের ধরিয়ে দিয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন। তবে এই বক্তব্যের অর্থ কী, গাড়ি কেনার অভিযোগের সঙ্গে সুইটির মামলার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, কিংবা এ বক্তব্যের পক্ষে কোনো নথি রয়েছে কি না—তা নিশ্চিত নয়। পরিবারের এই বর্ণনা থেকে সুইটির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বা মৃত্যুদণ্ডের আইনি ভিত্তি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য আদালতের রায় ও মামলার নথি অপরিহার্য। সুইটির বড় বোন আরও জানান, পাঁচ বোনের মধ্যে সুইটি ছিলেন সবার ছোট। পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করতে তিনি সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়েছিলেন। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। দুই বছর সংসার করার পর বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর ২০২৩ সালে তিনি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান। তাঁর নিজের কোনো সন্তান ছিল না; তিনি নিজের বোনের মেয়েকে লালন-পালন করতেন বলে তাঁর বাবা জানিয়েছেন। সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম ছয় মাস সুইটি নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। কিন্তু কারাগারে যাওয়ার পর সেই অর্থ পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের জন্য তাঁর উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়া ছিল আর্থিক সংকটের আরেকটি কারণ। মৃত্যুদণ্ডের খবর জানল পরিবার ফেসবুক থেকে সুইটির পরিবারের দাবি, তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর তাঁরা আগেভাগে জানতে পারেননি। বড় বোন জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর মাধ্যমে তাঁরা প্রথম বিষয়টি জানতে পারেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সুইটির এক বান্ধবী ফোন করে খবরটি জানান এবং পরে একটি ভিডিও পাঠান। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছিল। পরিবারের সদস্যরা জানান, সুইটি কারাগার থেকে সাধারণত ১৫ দিন বা এক মাস পরপর ফোন করতেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগের সপ্তাহেও তিনি ফোন করেছিলেন বলে পরিবারের দাবি। তবে সেদিন টেলিফোন লাইনে সমস্যার কারণে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরিবারের আরেক সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগের মঙ্গলবারও সুইটি ফোন করেছিলেন। কিন্তু তখনও পরিবার তাঁর মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানত না। পরিবারের এই বক্তব্যের সঙ্গে কনস্যুলেটের নথিতে মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে অবহিত না হওয়ার দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। তবে দুটি বক্তব্য একসঙ্গে থাকলেও এর মাধ্যমে সৌদি কর্তৃপক্ষের আইনি দায়িত্ব লঙ্ঘনের বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। সেটি নির্ধারণ করতে হলে সৌদি আইনে প্রযোজ্য বিধান, বিচারপ্রক্রিয়ার নথি এবং দুই দেশের মধ্যে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ যাচাই করতে হবে। তবু ঘটনাটি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছেছিল কি না, বন্দির সঙ্গে শেষবার যোগাযোগের সুযোগ কী ছিল এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন কী ভূমিকা পালন করতে পেরেছিল? নজরুলের বিষয়ে এখনো অস্পষ্টতা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া অন্য বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম আব্দুল বশিরের বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত। কনস্যুলেটের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সৌদি আরবের সাইবার অপরাধ আইনে তাঁকে আটক করা হয়। তিনি জেদ্দা সংশোধনাগারে বন্দি ছিলেন এবং ‘আল মাজাল কোম্পানিতে’ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী ছিল, মামলার প্রমাণ কী, কোন আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন এবং আপিলের সুযোগ নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত হয়নি। সুইটি আক্তারের মতো নজরুলের ক্ষেত্রেও বন্দিদের তালিকায় অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ কিংবা মৃত্যুদণ্ডের তথ্য ছিল না বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। দুই ব্যক্তির মামলার প্রকৃতি পৃথক হলেও তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ কী তথ্য পেয়েছিল, তা একই ধরনের জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে, দুই নাগরিকই দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে বলে নথিতে উঠে এসেছে। সৌদি আরবে ৩০৬ বাংলাদেশি বন্দি কনস্যুলেটের নথিতে সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে কারাবন্দি বাংলাদেশি নাগরিকদের সম্পর্কেও তথ্য রয়েছে। নথি অনুযায়ী, ওই অঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে ৩০৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জনের কারাদণ্ডের মেয়াদ এক মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত। এ ছাড়া সাইবার অপরাধের তিনটি পৃথক মামলার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কারাদণ্ডের মেয়াদ ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত ছিল। এই পরিসংখ্যান প্রবাসী বাংলাদেশিদের কারাবন্দি হওয়ার পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি আংশিক চিত্র তুলে ধরে। তবে শুধু এ তথ্য দিয়ে সৌদি আরবে মোট কতজন বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন, তাঁদের কতজন বিচারাধীন, কতজন সাজাপ্রাপ্ত কিংবা কতজনের বিরুদ্ধে গুরুতর শাস্তির আশঙ্কা রয়েছে—তা নির্ধারণ করা যায় না। কারাবন্দি নাগরিকদের সংখ্যা ও তাঁদের মামলার অবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ, আইনি সহায়তার প্রাপ্যতা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করা—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি কতটা রয়েছে, তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। তাঁদের কারাবন্দি হওয়ার পর পরিবার প্রায়ই আয়ের পাশাপাশি তথ্যের সংকটেও পড়ে। সুইটির পরিবারের বক্তব্যে সেই সংকটের একটি চিত্র দেখা যায়। টাঙ্গাইলের পরিবার, প্রশাসনের সীমিত ভূমিকা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুইটি আক্তারের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে। টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার তিনি ওই নারীর বাড়ি ও বাবার পরিচয় সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। তবে তখন পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা পাননি বলে তিনি জানান।প্রশাসনিক পর্যায়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং মরদেহ দেশে আনার সম্ভাব্য প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে মরদেহ দেশে আনার আবেদন করা হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এদিকে, সুইটির পরিবারের দাবি, তাঁরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর আগে জানতেন না। ফলে মরদেহ দেশে আনার আবেদন, আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের জন্য পরিবারকে কী সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মৃত্যুদণ্ডের আগে কূটনৈতিক সহায়তা কতটা কার্যকর ছিল? সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর পেতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলার পূর্ণাঙ্গ নথি, আদালতের রায় এবং সাজা কার্যকরের সরকারি আদেশ সংগ্রহ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁদের আটকের পর থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের যোগাযোগের নথি যাচাই করা দরকার। তৃতীয়ত, তাঁরা আইনজীবী পেয়েছিলেন কি না, আপিল করেছিলেন কি না এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কী ছিল—এসব তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কনস্যুলেটের মধ্যে বন্দিদের তথ্য আদান-প্রদানের প্রক্রিয়াও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বন্দিদের তালিকায় কারও বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের তথ্য না থাকলে তা শনাক্ত ও হালনাগাদ করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, সেটিও তদন্তের বিষয়। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া কেবল একটি গোপনীয় নথি বা পরিবারের বক্তব্যের ভিত্তিতে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। তবে নথিতে বর্ণিত তথ্য ও পরিবারের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে—বিদেশে কারাবন্দি বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে তথ্যপ্রাপ্তি এবং কূটনৈতিক সহায়তার কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি। এখন প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ ও জবাবদিহি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অনুমান নয়, নথিভিত্তিক সত্য উদ্ঘাটন। কোন অভিযোগে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, আদালত কী প্রমাণ পেয়েছিলেন, আপিলের সুযোগ কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনকে কোনো পর্যায়ে জানানো হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট নথি ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে, সুইটির পরিবারের মতো যেসব পরিবার বিদেশে বন্দি স্বজনের বিষয়ে সীমিত তথ্য পায়, তাদের জন্য কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা কতটা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিদেশে কর্মসংস্থানের আগে সরকারি ছাড়পত্র ও পরিচয়পত্র দেওয়া হলেও বিদেশে আটক হওয়ার পর নাগরিকদের সহায়তা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়, সেটিও মূল্যায়ন করা দরকার। কনস্যুলেট ইতিমধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে রায়ের অনুলিপি ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। সেই নথি হাতে পাওয়ার পর মামলার প্রকৃত অবস্থা, সাজা কার্যকরের প্রক্রিয়া এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হতে পারে। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা তাই শুধু দুটি পরিবারের শোকের বিষয় নয়; এটি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা, কূটনৈতিক সহায়তা এবং সরকারি জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এনেছে। এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সব নথি সংগ্রহ, তথ্যের অসংগতি যাচাই এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা।
ইত্তেহাদ নিউজ: যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের লক্ষ্য ইরানের জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু সেই অবরোধের মধ্যেই জাহাজে জাহাজে পণ্য স্থানান্তর, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং সমুদ্রপথের জটিল কৌশল ব্যবহার করে কিছু তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও জেট জ্বালানি বিদেশে পাঠাতে পেরেছে তেহরান। জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট চিত্র এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। একদিকে ইরানের জ্বালানি রপ্তানি ঠেকাতে মার্কিন অবরোধ, অন্যদিকে সেই অবরোধের মধ্যেই সীমিত পরিসরে চালান বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা—দুইয়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন কৌশলগত সমীকরণ। তবে এসব চালানের পরিমাণ ইরানের আগের জ্বালানি রপ্তানির তুলনায় সামান্য। ফলে অবরোধ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোরও সুযোগ নেই। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওমানের উপকূলের কাছে বিভিন্ন জাহাজের মধ্যে পণ্য স্থানান্তরের কার্যক্রম বেড়েছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা খাতের চার ব্যক্তি জানিয়েছেন, এই কার্যক্রমের আড়ালে ইরানের কিছু জ্বালানি চালান গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। অবরোধের মধ্যেও আটটি এলপিজিবাহী ট্যাংকার ইরান-সম্পর্কিত ট্যাংকারের গতিবিধি জাহাজ পর্যবেক্ষণব্যবস্থা ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নজরে রাখে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরান (ইউএএনআই)। সংগঠনটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে অন্তত আটটি গ্যাসবাহী ট্যাংকার ইরানের এলপিজি নিয়ে ওমান উপসাগর ছেড়েছে। ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বন্ধে মার্কিন অবরোধ কার্যকর থাকার সময়েও এসব চালানের কিছু অংশ সমুদ্রপথে বাইরে যাওয়ার ঘটনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ইউএএনআইয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিশ্লেষক জেমিমা শেলির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব এলপিজি চালানের মোট পরিমাণ প্রায় ৪১ লাখ ব্যারেল। তাঁর বিশ্লেষণে, অধিকাংশ চালান মালয়েশিয়ার ইস্টার্ন আউটার পোর্ট লিমিটস এলাকায় গেছে। সেখানে পণ্য আবার অন্য জাহাজে স্থানান্তর করা হয়েছে, সম্ভবত চীনে পাঠানোর উদ্দেশ্যে। শেলি বলেন, ইরানের এলপিজিবাহী হাতে গোনা কয়েকটি ট্যাংকার অবরোধ অতিক্রম করতে পেরেছে। তবে ইরানি পণ্যবোঝাই অধিকাংশ ট্যাংকারকে মার্কিন বাহিনী অন্য পথে পাঠিয়ে দিয়েছে। এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, অবরোধের মধ্যে কিছু চালান বেরিয়ে গেলেও ইরানের জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে না। বরং সীমিতসংখ্যক চালানের ক্ষেত্রে বিকল্প পথ ও জাহাজ ব্যবহারের ঘটনা সামনে এসেছে। ওমান উপকূলে জাহাজ বদলের কৌশল ইরানের কিছু এলপিজিবাহী ট্যাংকার ওমানের উপকূলীয় শহর শিনাস ও সোহারের কাছাকাছি অন্য জাহাজে পণ্য স্থানান্তর করেছে বলে জানিয়েছেন শেলি। অন্য কয়েকটি ট্যাংকার ওমান উপসাগরে অপেক্ষা করার পর মার্কিন অবরোধ অতিক্রম করেছে। সমুদ্রপথে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে পণ্য স্থানান্তরকে বলা হয় শিপ-টু-শিপ (এসটিএস) ট্রান্সফার। আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনে এটি প্রচলিত একটি পদ্ধতি। তবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পণ্যের ক্ষেত্রে এমন স্থানান্তরের মাধ্যমে চালানের উৎস, প্রকৃত গন্তব্য কিংবা সংশ্লিষ্ট জাহাজের পরিচয় আড়াল করার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওমানের উপকূলের কাছে অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জাহাজের মধ্যে পণ্য স্থানান্তরের কার্যক্রম বেড়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের চালানগুলো কীভাবে গন্তব্যে পৌঁছেছে, তা নিয়ে নজরদারি ও বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে প্রতিটি স্থানান্তর যে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কোনো নির্দিষ্ট চালানের ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে জাহাজের গতিপথ, মালিকানা, পণ্যসংক্রান্ত নথি এবং স্যাটেলাইটের তথ্য একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। জেট জ্বালানি পৌঁছেছে মিয়ানমারে ইরানের জ্বালানি রপ্তানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা সিনম্যাক্সের বিশ্লেষণে। সংস্থাটির অতিরিক্ত স্যাটেলাইট চিত্র ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের জেট জ্বালানি বহনকারী একটি ট্যাংকার সেপ্টেম্বরে মিয়ানমারে পৌঁছেছে। জাহাজটির গতিবিধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকা বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানিয়েছে, জেট জ্বালানিবাহী ট্যাংকারটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। এখানে মিয়ানমারের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বেসামরিক মানুষের ওপর সামরিক বিমান হামলার অভিযোগে দেশটির জেট জ্বালানি খাতের ওপর ২০২৩ সালে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে দেশটির সামরিক সরকার বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, অভিযানগুলো সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে ইরান থেকে জেট জ্বালানি মিয়ানমারে পৌঁছানোর তথ্য নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তবে একটি চালানের গন্তব্য জানা গেলেই এর চূড়ান্ত ক্রেতা, ব্যবহারের উদ্দেশ্য কিংবা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকা নিশ্চিত হয়ে যায় না। নিষেধাজ্ঞার আওতায় সাতটি ট্যাংকার রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আটটি এলপিজিবাহী ট্যাংকারের মধ্যে ছয়টি এবং জেট জ্বালানিবাহী ট্যাংকারটি ইরানের পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিবেদনে চিহ্নিত নয়টি ট্যাংকারের মধ্যে সাতটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত। এই তথ্যের তাৎপর্য শুধু জ্বালানি পরিবহনে সীমাবদ্ধ নয়। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জাহাজের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন অব্যাহত থাকলে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের পাশাপাশি জাহাজের মালিকানা, বাণিজ্যিক লেনদেন, মধ্যস্থতাকারী এবং গন্তব্যস্থলে পণ্য গ্রহণকারীদের শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা কোনো জাহাজের চলাচল শনাক্ত হওয়া এবং সেই জাহাজের প্রতিটি লেনদেনের আইনি অবস্থান নির্ধারণ এক বিষয় নয়। এর জন্য সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞার শর্ত, চালানের নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন। ছোট চালান, নাকি বিকল্প রপ্তানি নেটওয়ার্ক? ইউএএনআইয়ের বিশ্লেষক জেমিমা শেলির মতে, এসব চালানের পেছনে ছোট জাহাজ ব্যবহার করে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেয়ে বিদ্যমান পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার বিষয়টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য ইঙ্গিত করে, সাম্প্রতিক চালানগুলোকে ইরানের জ্বালানি রপ্তানির স্থায়ী বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই। বরং অবরোধের মধ্যে যেসব সীমিত সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেগুলো কাজে লাগিয়ে কিছু পণ্য বাইরে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার উপকূলীয় জলসীমায় পণ্য স্থানান্তরের তথ্য থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনে একাধিক ধাপের জাহাজ পরিবর্তন চালানের প্রকৃত গন্তব্য শনাক্ত করাকে জটিল করে তুলতে পারে। এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এসব চালানের পেছনে কতটা সমন্বিত বাণিজ্যিক ব্যবস্থা কাজ করছে, কারা পণ্য গ্রহণ করছে এবং নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা লেনদেনের অর্থনৈতিক সুবিধা শেষ পর্যন্ত কারা পাচ্ছে। প্রকাশিত তথ্য থেকে এসব প্রশ্নের সব উত্তর পাওয়া যায়নি। অবরোধের পরিধি নিয়ে মার্কিন অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরান-পাকিস্তান সীমান্তের কাছে ওমান উপসাগরে অবরোধ কার্যকর রয়েছে। এই অবস্থানের পাশাপাশি কিছু ইরানি জ্বালানিবাহী ট্যাংকারের সমুদ্রপথে চলাচলের তথ্য দেখাচ্ছে, অবরোধ কার্যকর থাকা এবং প্রতিটি চালান সম্পূর্ণভাবে আটকে দেওয়া—দুটি আলাদা বিষয়। সমুদ্রপথে নজরদারি, জাহাজের পরিচয় যাচাই এবং পণ্য স্থানান্তরের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এই ব্যবস্থার কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে অবরোধের সামগ্রিক সাফল্য বা ব্যর্থতা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। এর জন্য ইরানের মোট রপ্তানি, আটকে দেওয়া চালানের সংখ্যা, সফলভাবে বেরিয়ে যাওয়া পণ্যের পরিমাণ এবং অবরোধ বাস্তবায়নের সময়কাল সম্পর্কে তুলনামূলক তথ্য প্রয়োজন। জ্বালানি রপ্তানির খবরের পাশাপাশি নতুন হামলার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের ইরানের জ্বালানি রপ্তানি নিয়ে এই তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাকে ঘিরে নতুন করে সামরিক উত্তেজনার কথাও সামনে এসেছে। নিউজম্যাক্সকে বৃহস্পতিবার রাতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলা চালানোর প্রয়োজন হতে পারে। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো বিপুল পরিমাণ পাহাড়ি মাটির নিচে সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই স্থাপনাগুলোর দিকে নজর রাখছে এবং প্রয়োজন হলে সেখানে হামলা চালাতে পারে। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে দেশটি তা ব্যবহার করত। তবে এটি তাঁর বক্তব্য; ইরানের ভবিষ্যৎ আচরণ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো তথ্য নয়। সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন নেই এবং তিনি তা ব্যবহার করবেন না। ইরানে মার্কিন স্থলসেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন না বলেও আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। ‘মাদার অব অল বম্বস’ ব্যবহারের প্রশ্নে স্পষ্ট করেননি ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় জিবিইউ–৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) বোমা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে ট্রাম্প সরাসরি কিছু বলেননি। এমওএবি বোমাটি ‘মাদার অব অল বম্বস’ নামে পরিচিত। এটি একটি প্রচলিত বিস্ফোরক অস্ত্র, পারমাণবিক বোমা নয়। ট্রাম্পও সাক্ষাৎকারে এ বিষয়টি উল্লেখ করেন। তবে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে সামরিক চাপ আরও বাড়বে কি না এবং জ্বালানি রপ্তানির ওপর অবরোধের সঙ্গে সামরিক পদক্ষেপের সম্পর্ক কীভাবে এগোবে। এ মুহূর্তে ট্রাম্পের বক্তব্যকে সম্ভাব্য হামলার হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখা যেতে পারে; তবে শুধু এই বক্তব্য থেকে হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা নির্দিষ্ট সময়সূচি নিশ্চিত করা যায় না। জ্বালানি, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের ত্রিমুখী সমীকরণ ইরানের এলপিজি ও জেট জ্বালানি রপ্তানির এসব ঘটনা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। প্রথমত, অবরোধের মধ্যেও সীমিত পরিসরে জ্বালানি চালান সমুদ্রপথে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা নজরদারি ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। দ্বিতীয়ত, জাহাজে জাহাজে পণ্য স্থানান্তর এবং মালয়েশিয়ার উপকূলীয় এলাকায় পুনরায় স্থানান্তরের তথ্য আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জটিলতা তুলে ধরছে। তৃতীয়ত, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য দেশটিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার আরেকটি মাত্রা প্রকাশ করছে। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায় না যে ইরান অবরোধকে কার্যত অকার্যকর করে দিয়েছে, কিংবা জ্বালানি রপ্তানির মাধ্যমে বড় পরিসরে নতুন সরবরাহব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। বরং পাওয়া তথ্য বলছে, ব্যাপক বাধার মধ্যে কিছু চালান গন্তব্যে পৌঁছেছে এবং সেই চালানগুলোর গতিপথ, মালিকানা ও চূড়ান্ত গন্তব্য নিয়ে আরও অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই সীমিত রপ্তানি কি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি সফল চালানের ফল, নাকি অবরোধের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ইরান ধীরে ধীরে বিকল্প জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলছে? প্রকাশিত তথ্য এখনো এর চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি। তবে জাহাজ চলাচলের তথ্য, স্যাটেলাইট চিত্র এবং নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণ করে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজার—উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: “আর পারা যাচ্ছে না। বাজারে শাক-সবজি থেকে শুরু করে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বাসভাড়া, ঘরভাড়া—সবকিছু যেভাবে বাড়ছে, তাতে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।” ঢাকার মগবাজারের বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যমসারির কর্মকর্তা আতিকুর রহমানের কথায় ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের বহু পরিবারের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা। তার ভাষ্য, কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বেড়েছে, তার তুলনায় আয় বেড়েছে সামান্যই। সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে আগের সঞ্চয়ও প্রায় শেষের দিকে। “বেতনের টাকা দিয়ে মাস পার হচ্ছে না। এভাবে যদি জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে, তাহলে সংসার কীভাবে চালাব, ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ কীভাবে দেব—সেটাই ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছি না,” বলেন তিনি। আতিকুরের এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে এখন মিলছে বৃহত্তর অর্থনৈতিক চিত্রও। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ লাখ। শুধু গত এক বছরেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন। আর যারা এখন নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে রয়েছেন, তাদের মধ্যেও প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন—একসময় দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে ‘বিশ্বের মডেল’ হিসেবে প্রশংসিত বাংলাদেশ আবার কোন পথে হাঁটছে? দারিদ্র্য কমার গল্প থেকে উল্টো পথে স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। সত্তরের দশকে দেশের দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। এরপর সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে দারিদ্র্যের হার কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ দশকের মধ্যে দারিদ্র্যের হার কমে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে। ২০২০ সালে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে বিশ্বের ‘মডেল’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল বিশ্বব্যাংক। ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে দারিদ্র্যের হার আরও কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ানোর তথ্য পাওয়া যায়। একই সময়ে অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। তখন দারিদ্র্য বিমোচনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারে—এমন প্রত্যাশাও জানিয়েছিলেন পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তারা। কিন্তু এরপর পরিস্থিতির মোড় ঘুরতে শুরু করে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব বলছে, ২০২৫ সালে অতি দারিদ্র্যের হার বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে মোট দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ, বর্তমানে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি বলে অনুমান করছে বিশ্বব্যাংক। কেন এই বিপরীত যাত্রা? বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি বড় কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব; উচ্চ মূল্যস্ফীতি; জ্বালানি সংকট; দুর্বল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান; রাজনৈতিক অস্থিরতা; করব্যবস্থার দুর্বলতা; সামাজিক নিরাপত্তা ও ভর্তুকি ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যভিত্তিকতা না থাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকিং খাতের সংকট, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের মতো বিষয়গুলোও—যেগুলো অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করেছে বলে অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য। প্রবৃদ্ধি কমেছে, কর্মসংস্থানও সংকটে করোনা মহামারির সময় অর্থনীতির বড় একটি অংশ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। শিল্প-কারখানা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় বহু মানুষ চাকরি হারান। কিছু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকলেও কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়। অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, মহামারির সময় যারা চাকরি হারিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই পরে আনুষ্ঠানিক খাতে আর ফিরতে পারেননি। সরকার তখন আশা করেছিল, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। বরং লাগাতার অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচারের অভিযোগে ব্যাংকিং খাতসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ফাহমিদা খাতুন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ, অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানে আগের মতো প্রভাব ফেলছে না—এমন একটি বাস্তবতা সামনে এসেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে যে নাজুকতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব বিনিয়োগ পরিবেশেও পড়েছে বলে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনেকে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাননি। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটও বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হলে নতুন করে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, একদিকে বিনিয়োগ কমছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের আয় ও জীবনযাত্রায়। মূল্যস্ফীতি: আয় বাড়ার আগেই খরচ বাড়ছে বাংলাদেশে টানা চার বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। গত দুই বছরে কিছুটা কমে মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়ালেও অর্থনীতিবিদদের মতে, এটিকে এখনো সহনীয় পর্যায় বলা যায় না। সমস্যাটি শুধু মূল্যস্ফীতির হারেই নয়; দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। করোনার সময়ে চাকরি হারানো বা আয় কমে যাওয়ার পর অনেক পরিবার যখন আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। ফলে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ব্যবধান বাড়ে। ঢাকার এক বাসিন্দা জানান, সংসারের ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাকে জমি-জমাসহ মূল্যবান সম্পদ বিক্রি করতে হচ্ছে। “জায়গা-জমি বিক্রি করে কয়দিন চলা যায়? এখন প্রত্যেক মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকার বেশি দেনা থাকি,” বলেন তিনি। খুলনার বাসিন্দা বিলকিস আকতারও বলছেন একই ধরনের কথা। “সঞ্চয় রাখব কীভাবে? সংসার চালাতেই তো হিমশিম খাচ্ছি।” এ ধরনের পরিস্থিতিতে সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালানো, সম্পদ বিক্রি কিংবা ধারদেনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া—দারিদ্র্যের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। সবচেয়ে বড় সংকট: দরিদ্রদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না সহায়তা বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের সামাজিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে। সংস্থাটির হিসাবে, দেশের প্রায় ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পান না। অন্যদিকে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর যে প্রায় ৩৮ শতাংশ এসব কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছেন, তারাও ধনীদের তুলনায় কম সুবিধা পাচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সমাজের নিচের ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বছরে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পান। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী মানুষরা বছরে গড়ে ১০ হাজার ৪৭২ টাকা সুবিধা পাচ্ছেন। এখানেই সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার লক্ষ্যভিত্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। ভর্তুকির সুফল কারা বেশি পাচ্ছে? বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈষম্যের কথা বলেছে বিশ্বব্যাংক। বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণের সঙ্গে ভর্তুকির সুবিধা বাড়ে। ফলে যারা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি ভর্তুকি পান। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সমাজের ওপরের ২০ শতাংশ ধনী মানুষের জন্য বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যয় হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কর্মসূচি নেওয়া হলে এর সুফল বেশি কার্যকরভাবে তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। করব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় সমস্যা বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের করব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। দুর্বল কর প্রশাসন এবং কর পরিপালনের হার কম থাকার কারণে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ জিডিপির মাত্র ৮ শতাংশ থেকে আনুমানিক ৮ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। রাজস্ব আয় কম হলে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা কিংবা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা বাড়ানোর সক্ষমতাও সীমিত থাকে। এ কারণে করনীতি নির্ধারণ ও কর প্রশাসনকে আলাদা করার পাশাপাশি অধিকতর ডিজিটাল ব্যবস্থা, করদাতাদের সমন্বিত ডেটাবেস এবং শনাক্তকরণ নম্বর চালুর সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। ফ্যামিলি কার্ড কি ঘুরিয়ে দিতে পারবে পরিস্থিতি? দারিদ্র্য মোকাবিলায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি। বিশ্বব্যাংকের মতে, যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই কর্মসূচি দারিদ্র্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মার হিসাবে, বিদ্যমান পদ্ধতিতে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দেওয়া হলে বছরে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে পারবেন। তবে প্রকৃত দরিদ্র মানুষকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে কার্ড দেওয়া গেলে বছরে প্রায় সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন বলে মনে করছে সংস্থাটি। অর্থাৎ, কর্মসূচি থাকা যথেষ্ট নয়—কারা প্রকৃত সুবিধাভোগী, সেটি সঠিকভাবে শনাক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের বক্তব্য কী? সরকার বলছে, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের বড় একটি অংশ তারা আগের সরকারগুলোর কাছ থেকে ‘উত্তরাধিকারসূত্রে’ পেয়েছে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের সংকট, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সমস্যাগুলো বহিঃস্থ কারণ অথবা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। তার ভাষায়, সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। বিশ্বব্যাংকের সংস্কারসংক্রান্ত সুপারিশগুলোও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাহলে সামনে পথ কোনটি? বাংলাদেশের দারিদ্র্য কমানোর গত কয়েক দশকের সাফল্য ছিল ধারাবাহিক। কিন্তু সাম্প্রতিক হিসাব সেই ধারায় বড় ধরনের ছেদ দেখাচ্ছে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল। জ্বালানি সংকট শিল্প উৎপাদনের ওপর চাপ তৈরি করছে। ব্যাংকিং খাতের সংকট অর্থনীতির ভিত দুর্বল করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে লক্ষ্যভিত্তিকতার ঘাটতি। ফলে দারিদ্র্য কমানোর বদলে আবারও মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো—শুধু ৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি মানুষ বর্তমানে দরিদ্র নয়; নিম্ন মধ্যবিত্তের আরও প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষও দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন। অর্থাৎ, এটি কেবল দরিদ্র মানুষের সমস্যা নয়। অর্থনীতির একটি বড় অংশের মানুষের জীবনযাত্রা এখন এমন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে, যেখানে আয় সামান্য কমে যাওয়া কিংবা ব্যয় সামান্য বেড়ে যাওয়াই একটি পরিবারকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিতে পারে। বাংলাদেশ যে একসময় দারিদ্র্য বিমোচনের ‘মডেল’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছিল, সেই অর্জন ধরে রাখতে হলে শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান বাড়ানো নয়—কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার, করব্যবস্থার সংস্কার এবং দরিদ্র মানুষের কাছে সামাজিক নিরাপত্তার অর্থ কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া—এই পাঁচটি জায়গায় একসঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।