ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নগর পরিকল্পনা বিভাগে শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালনকারী দুই কর্মকর্তার নিয়োগ ও যোগ্যতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সদ্য প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম এবং বর্তমানে ওই পদে চলতি দায়িত্ব পাওয়া মো. নজরুল ইসলাম। তাঁদের বিরুদ্ধে যথাক্রমে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সনদসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নজরুল ইসলামের নিয়োগের সময় দাখিল করা সাভার পৌরসভার অভিজ্ঞতার সনদটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাভার পৌরসভায় সংশ্লিষ্ট সময়ে সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ বা সহকারী অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ পদই ছিল না। এমনকি ওই পৌরসভায় নজরুল ইসলামের চাকরির তথ্যও পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। অথচ পাঁচ বছরের প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল যে পদে নিয়োগের জন্য, সেই নগর পরিকল্পনাবিদ পদে তিনি নিয়োগ পান এবং পরে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের চলতি দায়িত্বও পান।
অন্যদিকে, সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে জাল শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সনদ ব্যবহার করে স্থপতি পদে নিয়োগ নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ প্রায় ২২ বছর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, অভিযোগ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তদন্তের পর সিরাজুল ইসলামকে পদটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথির স্বাধীন যাচাই এবং আইনগত পদক্ষেপের বর্তমান অবস্থা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের নিয়োগবিধিতে নগর পরিকল্পনাবিদ পদে নিয়োগের জন্য নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সহকারী নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাও ওই শর্তের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, মো. নজরুল ইসলাম নগর পরিকল্পনাবিদ পদে নিয়োগের আবেদনের সঙ্গে সাভার পৌরসভায় কাজ করার একটি অভিজ্ঞতার সনদ দাখিল করেন। কিন্তু সনদে উল্লিখিত সময়কালে পৌরসভাটিতে সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ বা সহকারী অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ নামে কোনো পদ ছিল না। আরও দাবি করা হয়েছে, তিনি ওই সময়ে সাভার পৌরসভায় অন্য কোনো পদেও চাকরি করেননি।
সাভার পৌরসভার রেকর্ডপত্রে তাঁর চাকরির গ্রহণযোগ্য তথ্য নেই বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এই দাবি সত্য হলে নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ হয়েছিল কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দেয়।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে অভিযোগ করা হয়েছে, ঢাকা সিটি করপোরেশনে নজরুল ইসলামের নিয়োগের সময়ই তাঁর অভিজ্ঞতার সনদ নিয়ে আপত্তি উঠেছিল। এ বিষয়ে অভিযোগও জমা পড়ে বলে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে তাঁর নিয়োগপত্র দীর্ঘদিন আটকে ছিল এবং তিনি তাৎক্ষণিকভাবে চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছাত্রলীগের পরিচয় ও বড় অঙ্কের ঘুষের মাধ্যমে তিনি চাকরিতে যোগদানের সুযোগ পান—এমন অভিযোগও রয়েছে।
নজরুল ইসলামের নিয়োগের সময় সনদ যাচাইয়ের দায়িত্বে কারা ছিলেন, আপত্তি ওঠার পর কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোন নথি বিবেচনা করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়োগের নথি যাচাই করা হলে প্রশাসনিক দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
ডিএসসিসির নগর পরিকল্পনা বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের আকস্মিক মৃত্যুর পর পদটি শূন্য হয়। সে সময় স্থপতি পদে দায়িত্ব পালনকারী মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা তাঁর ছিল না। এমনকি স্থপতি পদে তাঁর নিয়োগ নিয়েও জাল শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সনদ ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। এরপরও তিনি অতিরিক্ত দায়িত্বে দীর্ঘ প্রায় ২২ বছর বহাল থাকেন।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, সাময়িকভাবে কোনো কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট পদের জন্য যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও স্থায়ী নিয়োগের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের দাবি।
এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মেয়র, প্রশাসক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল, কেন পদটিতে নিয়মিত নিয়োগ দেওয়া হয়নি এবং দায়িত্ব বণ্টনের সিদ্ধান্তগুলো কোন প্রশাসনিক যুক্তিতে নেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকার সুযোগে তিনি বিভিন্ন কাজে প্রভাব বিস্তার করেছেন।
সিরাজুল ইসলামকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও ডিএসসিসির কাছে তদন্তের অগ্রগতি, অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া প্রয়োজন।
সিরাজুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়ার পর গত ৫ সেপ্টেম্বর মো. নজরুল ইসলামকে ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি নগর পরিকল্পনাবিদের মূল পদেও দায়িত্ব পালন করছেন।
কিন্তু তাঁর নিয়োগের অভিজ্ঞতার সনদ নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি না হলে নতুন করে প্রশাসনিক প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। কারণ, যে পদে নিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার শর্ত ছিল, সেই শর্ত পূরণ হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে নিয়োগের বৈধতা, দায়িত্ব পালনের প্রশাসনিক ভিত্তি এবং পরবর্তী পদায়নের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়নের প্রশ্ন উঠতে পারে। এ
নগর পরিকল্পনা বিভাগ একটি সিটি করপোরেশনের ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামো উন্নয়ন, নগর সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত। এ বিভাগের শীর্ষ পদে নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা শুধু প্রশাসনিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকে না; নগর উন্নয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়া সম্পর্কেও প্রশ্ন তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও প্রকল্পভিত্তিক তথ্য ছাড়া ডিএসসিসির নগর পরিকল্পনায় নির্দিষ্ট ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে যোগ্যতা যাচাইয়ের দুর্বলতা, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত দায়িত্বে পদ পরিচালনা এবং নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া—এসব বিষয় প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহির জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
নগরবাসীর স্বার্থে তাই প্রয়োজন নিয়োগের নথি যাচাই, সনদের সত্যতা নির্ধারণ, দায়িত্ব পালনের বৈধতা পর্যালোচনা এবং প্রকল্পসংক্রান্ত অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত।
ডিএসসিসির নগর পরিকল্পনা বিভাগে নিয়োগ ও পদায়নসংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তিতে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ:
১. মো. নজরুল ইসলামের সাভার পৌরসভার অভিজ্ঞতার সনদটি কে যাচাই করেছিলেন এবং কীভাবে তা গ্রহণ করা হয়েছিল?
২. সনদে উল্লেখ করা পদ ও চাকরির মেয়াদের সঙ্গে সাভার পৌরসভার মূল নথির মিল রয়েছে কি না?
৩. নিয়োগের সময় অভিযোগ বা আপত্তি উঠলে তা কীভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছিল?
৪. মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম কী ভিত্তিতে ২০০৪ সাল থেকে দীর্ঘ সময় প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন?
৫. তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা প্রকল্পসংক্রান্ত অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে কোনো নিরীক্ষা বা তদন্ত হয়েছে কি না?
৬. দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে ডিএসসিসি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ অবস্থান কী?
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনা বিভাগে নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি এখন গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগাম অপরাধী সাব্যস্ত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগের যোগ্যতা ও সনদের সত্যতা যাচাই না করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সাভার পৌরসভার নথি, ডিএসসিসির নিয়োগ ফাইল, সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তদন্তসংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করেই প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
মূল প্রশ্নটি তাই শুধু কে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্বে আছেন, তা নয়; বরং নিয়োগের যোগ্যতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, অভিযোগ ওঠার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ কী করছে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ২৯২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার একটি মেগা প্রকল্পের কেনাকাটা, দরপত্র প্রক্রিয়া, যন্ত্রপাতির মান এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো. ইব্রাহিম খলিল। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন কেনাকাটায় নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্ত, ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং বিল-ভাউচার নিয়ে প্রশ্নের কারণে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের কিছু কেনাকাটায় পণ্যের উৎস, সরবরাহকারীর অভিজ্ঞতা এবং দরপত্রের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের আরও অভিযোগ, বিএডিসি চেয়ারম্যানের প্রভাব কাজে লাগিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। প্রকল্পের মূল নথি, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, সরবরাহ ও গ্রহণসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং আর্থিক নিরীক্ষার তথ্য পর্যালোচনা করেই অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব। প্রকল্পটির আর্থিক পরিসর যেমন বড়, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষি উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—উন্নত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ। ফলে কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ শুধু সরকারি অর্থের হিসাব-নিকাশের প্রশ্ন নয়; মাঠপর্যায়ে যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা এবং বীজের গুণগত মান নিয়েও তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে। চুক্তির শর্ত উপেক্ষা করে ফিউমিগেশন শিট কেনার অভিযোগ প্রকল্পের ফিউমিগেশন শিট কেনাকাটা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে পণ্যের উৎস ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা যাচাইয়ের বিষয়কে কেন্দ্র করে। অভিযোগকারীদের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়া থেকে উচ্চমানের ফিউমিগেশন শিট আমদানির কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে চীন থেকে শিট সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘জাহানারা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার সনদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির দাখিল করা নথিপত্রের সত্যতা যথাযথভাবে যাচাই না করেই কাজ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিষ্পত্তি করতে দরপত্রে দাখিল করা অভিজ্ঞতার সনদ, সংশ্লিষ্ট কাজের পূর্ববর্তী রেকর্ড এবং নথির সত্যতা যাচাই জরুরি। এসব নথি পরীক্ষা ছাড়া অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে হারভেস্টার নিয়ে ভোগান্তি, ধান অপচয়ের অভিযোগ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন বীজ খামারে সরবরাহ করা কম্বাইন হারভেস্টারের কার্যকারিতা নিয়েও অসন্তোষের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক চিঠিতে যন্ত্রের কর্মক্ষমতা, ধান অপচয় এবং বীজের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ঝিনাইদহের সাধুহাটি খামারে সরবরাহ করা ‘বাংলামার্ক’ ব্র্যান্ডের MARKSAN Model MS-1000 কম্বাইন হারভেস্টারটি নিয়ে অভিযোগ বিশেষভাবে গুরুতর। সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক আবেদনে বলা হয়েছে, যন্ত্রটি ব্যবহারের সময় খড়ের সঙ্গে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ধান অপচয় হচ্ছে। পাশাপাশি, যন্ত্রের ট্যাংকে সংগৃহীত ধানের একটি অংশের খোসা ভেঙে চাল বেরিয়ে আসার অভিযোগও রয়েছে। আবেদনে উল্লিখিত তথ্য সঠিক হলে, বিষয়টি শুধু যন্ত্রের কার্যকারিতার সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকে না; বীজ হিসেবে সংরক্ষণের জন্য সংগৃহীত ধানের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে অপচয়ের হার, যন্ত্রের ত্রুটির ধরন এবং বীজের মানের ওপর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা, উৎপাদন ও অপচয়ের পরিমাপ এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি প্রতিবেদন প্রয়োজন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাধুহাটি খামারের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আবদুল হাই তাঁর আবেদনে যন্ত্রটি পরিবর্তন করে নতুন, সচল ও কার্যকর হারভেস্টার সরবরাহের সুপারিশ করেছেন। ওই আবেদনের মূল কপি, তারিখ, স্মারক নম্বর এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যাচাই করা গেলে সমস্যাটির ব্যাপ্তি ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। হবিগঞ্জেও হারভেস্টার সচল না হওয়ার অভিযোগ হবিগঞ্জের ইটাখোলা খামারেও সরবরাহ করা হারভেস্টার নিয়ে একই ধরনের সমস্যার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বারবার মেরামতের পরও যন্ত্রটি সচল করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা চেয়েছেন খামারটির সিনিয়র সহকারী পরিচালক মো. ওসমান গনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সাধুহাটি ও ঠাকুরগাঁও খামারে সরবরাহ করা যন্ত্রপাতির ত্রুটি এবং হারভেস্টারের চালকের আসনে বসে কার্যকরভাবে যন্ত্র চালাতে অসুবিধার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। বিএডিসির অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (খামার) ড. মো. রফিকুল ইসলাম প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। একাধিক খামারে যন্ত্রপাতি নিয়ে অভিযোগ উঠে থাকলে সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সরবরাহ করা সব হারভেস্টারের কার্যকারিতা পরীক্ষা, ক্রয়াদেশের কারিগরি শর্তের সঙ্গে বাস্তব যন্ত্রের সামঞ্জস্য যাচাই এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নির্ধারণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সিড ড্রায়ার কেনার দরপত্রে তিন প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ার অভিযোগ বীজের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র সিড ড্রায়ার কেনার দরপত্র নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, টেন্ডার আইডি 1178841 ও 1178840-এর আওতায় অভিজ্ঞ তিনটি প্রতিষ্ঠানকে দরপত্র প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এখানে মূল প্রশ্ন হলো, প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কোন শর্তের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল এবং দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সব অংশগ্রহণকারীর জন্য একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগ্যতার নথি, কারিগরি মূল্যায়ন, অযোগ্য ঘোষণার কারণ এবং কার্যাদেশের তথ্য পর্যালোচনা ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। একই সঙ্গে ই-জিপি ব্যবস্থায় দরপত্র আটকে রাখার যে অভিযোগ উঠেছে, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের ডিজিটাল রেকর্ড, সময়সীমা এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়ার তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানকে অন্যায্যভাবে বাদ দেওয়া হয়ে থাকলে তা প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। বিপরীতে, নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করার কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান বাদ পড়লে তার পক্ষে নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। ২০০ কোটি টাকার বিল-ভাউচার নিয়ে গুরুতর অভিযোগ প্রকল্পের অর্থ ব্যয় নিয়েও বড় অঙ্কের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। তাঁদের দাবি, ই-জিপি ব্যবস্থায় দরপত্র আটকে রাখা এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের এই অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের নথি রয়েছে, কোন কোন বিল বা ভাউচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে এবং অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক কী—এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগটিকে প্রমাণিত আর্থিক অপরাধ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রকল্পের অনুমোদিত বরাদ্দ, ক্রয় পরিকল্পনা, দরপত্র ও কার্যাদেশ, সরবরাহের চালান, পণ্য গ্রহণের প্রতিবেদন, বিল পরিশোধের রেকর্ড, ব্যাংক লেনদেন এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদনের মধ্যে সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যেসব পণ্য সরবরাহের বিপরীতে অর্থ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবে সরবরাহ করা হয়েছিল কি না এবং নির্ধারিত মান পূরণ করেছিল কি না, সেটিও যাচাইয়ের অংশ হওয়া উচিত। বিশেষ করে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের হিসাব, সরবরাহ করা যন্ত্রপাতির প্রকৃত মূল্য এবং কার্যাদেশের বিপরীতে পরিশোধিত অর্থের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের কোনো ভিত্তি আছে কি না, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে। প্রকল্প পরিচালককে ঘিরে অভিযোগ, প্রয়োজন নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের প্রকল্প পরিচালক মো. ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষ। অভিযোগকারীদের দাবি, বিএডিসি চেয়ারম্যানের প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রকল্পের কিছু কেনাকাটায় নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং নথিতে থাকা প্রমাণ পর্যালোচনার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিএডিসি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত ও দাপ্তরিক নথির ভিত্তিতে অনুসন্ধান জরুরি। একটি নিরপেক্ষ তদন্তে অন্তত চারটি বিষয় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন: দরপত্রের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সরবরাহ করা যন্ত্রপাতি নির্ধারিত মান পূরণ করেছে কি না, বিল-ভাউচার ও অর্থ পরিশোধের হিসাব সঠিক কি না এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কী ছিল। এসব প্রশ্নের উত্তর নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা গেলে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় নিয়ে তৈরি হওয়া সন্দেহ দূর করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ক্রয়প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে। প্রধানমন্ত্রী ও দুদকের কাছে অভিযোগ, তদন্তের দাবি অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিএডিসি চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দরপত্র, যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হোক। তাঁরা আরও দাবি জানিয়েছেন, তদন্তে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তবে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রাপ্তিস্বীকার, তদন্ত শুরুর অবস্থা এবং এ পর্যন্ত গৃহীত পদক্ষেপের তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কৃষি খাতে সরকারি বিনিয়োগের উদ্দেশ্য হলো উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, উন্নত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে সহায়তা করা এবং কৃষকের জন্য মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। সে কারণে একটি বড় প্রকল্পে যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত কারিগরি ও প্রশাসনিক পর্যালোচনার দাবি রাখে। যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন বিএডিসির ২৯২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রকল্প ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তির জন্য কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ: ফিউমিগেশন শিটের ক্রয়চুক্তিতে উৎপত্তি দেশ ও পণ্যের মান সম্পর্কে কী শর্ত ছিল? ‘জাহানারা এন্টারপ্রাইজ’-এর যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সনদ যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না? সাধুহাটি, ইটাখোলা ও ঠাকুরগাঁও খামারে সরবরাহ করা হারভেস্টারগুলো কারিগরি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল কি না? টেন্ডার আইডি 1178841 ও 1178840-এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দেওয়ার কারণ কী ছিল? প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের পক্ষে কী আর্থিক নথি বা নিরীক্ষা-প্রমাণ রয়েছে? অভিযোগ পাওয়ার পর বিএডিসি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দুদক কোনো তদন্ত শুরু করেছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণে দাপ্তরিক নথি, স্বাধীন কারিগরি পরীক্ষা, আর্থিক নিরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য জরুরি। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। আর অভিযোগের কোনো অংশের পক্ষে প্রমাণ না মিললে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বরিশালের দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতুতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় বা ‘খাস কালেকশন’ নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই সেতু থেকে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা টোল আদায় হলেও সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো হয়েছে ৪২ কোটি টাকা। এই দুই অঙ্কের পার্থক্য ৫৩ কোটি টাকা। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বরিশাল সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম। তাঁর নির্দেশে দৈনিক প্রকৃত টোল আদায়ের তুলনায় কম অর্থ সরকারি হিসাবে জমা দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। ইজারার মেয়াদ শেষ, শুরু হয় খাস কালেকশন সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় মহাসড়কের ১৪৮তম কিলোমিটারে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর দোয়ারিকা সেতু এবং ১৪৬তম কিলোমিটারে অবস্থিত মেজর এম এ জলিল শিকারপুর সেতুর আগের ইজারার মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের ৩০ জুন। এরপর তিন বছরের জন্য ১০১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ইজারা মূল্যে ‘চাঁদনী ডিপার্টমেন্টাল স্টোরস’কে নতুন ইজারাদার হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল । কিন্তু নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী প্রথম কিস্তির টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় সওজ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির জামানত বাজেয়াপ্ত করে। এরপর নতুন করে ইজারা কার্যকর না করে সওজের সরাসরি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় শুরু হয়, যা ‘খাস কালেকশন’ নামে পরিচিত। সরকারি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় পদ্ধতিতে প্রতিদিন কত টাকা আদায় হয়েছে, কত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে এবং অবশিষ্ট অর্থ কোন খাতে ব্যয় হয়েছে—এসব তথ্যের স্বচ্ছ হিসাব থাকা জরুরি। অভিযোগ উঠেছে, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই ব্যবস্থায় টোল আদায়ের হিসাব ও সরকারি জমার অঙ্কের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। দৈনিক আদায় ১৩ লাখ টাকা, জমা ৫ লাখ ৭৬ হাজার? অভিযোগে বলা হয়েছে, খাস কালেকশন চলাকালে দুই সেতু থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ টাকার বেশি টোল আদায় হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি কোষাগারে দৈনিক গড়ে ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা জমা দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উত্থাপিত হিসাব অনুযায়ী— মোট টোল আদায়: প্রায় ৯৫ কোটি টাকা। সরকারি কোষাগারে জমা: প্রায় ৪২ কোটি টাকা। দুই অঙ্কের পার্থক্য: ৫৩ কোটি টাকা। এই হিসাব সঠিক হলে আদায় করা অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি জমার হিসাবে প্রতিফলিত হয়নি। কিন্তু এই পার্থক্যকে সরাসরি আত্মসাৎ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে টোল আদায়ের রসিদ, ব্যাংক জমার চালান, দৈনিক হিসাববই, ট্রাফিকের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে, ৯৫ কোটি টাকা আদায়ের হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ৪২ কোটি টাকা জমার তথ্য কোন সময়সীমা ও কোন সরকারি হিসাব থেকে নেওয়া হয়েছে, তা যাচাই করা জরুরি। এসব নথি ছাড়া ৫৩ কোটি টাকার পার্থক্যের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব নয়। সওজের চিঠিতে ইজারা মূল্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এই বিতর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন করে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সওজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চিঠিতে উল্লেখিত রাজস্বের হিসাব। প্রতিবেদনটির জন্য সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ মার্চ নবম আহ্বানে সর্বোচ্চ দরদাতা ‘আতিক কনস্ট্রাকশন’-এর অনুকূলে তিন বছরের জন্য ৮৫ কোটি টাকায় ইজারা অনুমোদনের সুপারিশ করেন সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। ওই চিঠিতে খাস কালেকশনের ভিত্তিতে তিন বছরে সরকারি আয় ৬৩ কোটি টাকা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে আতিক কনস্ট্রাকশনের প্রস্তাবিত ৮৫ কোটি টাকার ইজারা মূল্য এই হিসাবের চেয়ে ২২ কোটি টাকা বেশি। শতকরা হিসাবে ৮৫ কোটি টাকা, ৬৩ কোটি টাকার চেয়ে প্রায় ৩৫.৩৯ শতাংশ বেশি। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তিন বছরের সম্ভাব্য খাস কালেকশনের আয় এবং তিন বছরের ইজারা মূল্য সরাসরি তুলনা করে রাজস্বের সম্ভাব্য ব্যবধান বোঝা গেলেও, সেই ব্যবধানের পুরোটাই নিশ্চিত সরকারি ক্ষতি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ইজারার শর্ত, আদায়ব্যয়, অনুমোদনের সময়, অর্থ জমার নিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন। তবু সরকারি নথিতে উল্লিখিত এই তুলনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: বেশি রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ইজারা কার্যকর হতে দেরি হলে তার আর্থিক প্রভাব কী ছিল এবং এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? ৫৩ কোটি টাকার অভিযোগের নিষ্পত্তি কীভাবে সম্ভব? দুই সেতুর টোল আদায় নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয়ে নথিভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন। প্রথমত, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিনের টোল আদায়ের রেজিস্টার, টিকিটের হিসাব এবং ব্যাংকে জমা দেওয়ার চালান সংগ্রহ করে মিলিয়ে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো ৪২ কোটি টাকার হিসাবের সঙ্গে সওজের হিসাববই এবং ব্যাংক বিবরণী যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি টোল আদায়ের অর্থ পরিবহন, কর্মীদের পারিশ্রমিক বা অন্য অনুমোদিত খাতে ব্যয় হয়ে থাকলে তার নথিও পরীক্ষা করা দরকার। তৃতীয়ত, ১০১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকার আগের ইজারা অনুমোদন, প্রথম কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতা, জামানত বাজেয়াপ্তকরণ এবং পরবর্তী ইজারা প্রক্রিয়ার নথি পর্যালোচনা করা জরুরি। চতুর্থত, ২০২৬ সালের ১২ মার্চের চিঠিতে উল্লেখিত ৬৩ কোটি টাকার হিসাব এবং আতিক কনস্ট্রাকশনের ৮৫ কোটি টাকার প্রস্তাবের ভিত্তি যাচাই করতে হবে। এতে খাস কালেকশন ও ইজারা ব্যবস্থার মধ্যে রাজস্বের প্রকৃত পার্থক্য নির্ণয় করা সহজ হবে। জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতু দুটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কের অংশ। সেতু দুটির টোল থেকে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি রাজস্বের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে টোল আদায় ও জমার হিসাবে বড় ধরনের পার্থক্যের অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তাঁর বক্তব্য, দায়িত্ব বণ্টন, অনুমোদনসংক্রান্ত নথি এবং আর্থিক হিসাব পরীক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তা ও টোল আদায়ের কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে ৫৩ কোটি টাকার পার্থক্য একটি গুরুতর আর্থিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। কিন্তু সেই অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে কারা দায়ী এবং কীভাবে তা ঘটেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে প্রামাণ্য নথি ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে। সরকারি রাজস্বের সুরক্ষা এবং জনগণের অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো: দুই সেতুর টোল আদায়, ব্যাংকে জমা এবং ইজারা-সংক্রান্ত সব হিসাব প্রকাশ করে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা। ঢাকা বরিশাল মহাসড়কের ওপর অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু এবং মেজর এম এ জলিল সেতু দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। বাবুগঞ্জের সুগন্ধা নদীর ওপর ৩৯০ মিটার দীর্ঘ দোয়ারিকা সেতু এবং উজিরপুরের সন্ধ্যা নদীর ওপর ২৯২ মিটার দীর্ঘ শিকারপুর সেতু মিলে প্রায় ১১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়। ২০০৩ সালের ১২ এপ্রিল যান চলাচলের জন্য উদ্বোধন হওয়া এই সেতু দুটির নামকরণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের দুই বীরের স্মরণে। প্রতিদিন এই দুই সেতু দিয়ে চলাচল করে দক্ষিণাঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ এবং পণ্যবাহী যানবাহন।সেতু দুটির টোল ইজারার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক হাজার ছিয়ানব্বই দিনের জন্য মেসার্স রহমান ট্রেডার্সকে ভ্যাট ও আয়করসহ ৫৮ কোটি ৭৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায় সেতু দুটির টোল ইজারা দেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এই সেতু দুটির টোল আয় প্রায় চারগুণ বেড়ে যায়। সে সময় প্রতিদিন ন্যূনতম ৯ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত টোল আদায় হওয়ার তথ্য প্রকাশ পায়। ইজারা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন ইজারার জন্য মূল্যায়ন ছাড়া আগের মূল্যের সঙ্গে মাত্র সাত শতাংশ যোগ করে তা অনুমোদনের চেষ্টা হলে সরকারের প্রায় ৪০ কোটি টাকা রাজস্ব হারানোর শঙ্কার কথা তখনই উঠেছিল।আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ সালের ৫ ধারার অধীনে মামলা হতে পারে, যেখানে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আর দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ অনুযায়ী এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের হাতে ন্যস্ত। ফলে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, অভিযোগকারীকে তা প্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশন বা সওজ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ আকারে উপস্থাপনের আইনি পথও রয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চলতি দায়িত্বে থাকা উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. আশরাফুল আলমকে ঘিরে দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি নিয়ন্ত্রণ, কথিত সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা, যন্ত্রাংশ ও টায়ার কেনাকাটায় মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি খরচের হিসাব, টোল-ফেরি ও আনলোডিং ব্যয়ের নথি এবং ডিপো পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারের বিষয়। অভিযোগকারীদের দাবি, ১৯৯৯ সালে ইন্সপেক্টর পদে চাকরিতে যোগ দেওয়া আশরাফুল আলম দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন ডিপো, ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ইউনিট প্রধানদের পদায়ন ও বদলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ডিপোর আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় তাঁর একটি প্রভাববলয় রয়েছে। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে ঢাকা ট্রাক ডিপোতে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কার আর্থিক হিসাব নিয়ে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত যন্ত্রাংশ খাতে প্রায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এবং টায়ার খাতে ১০ কোটি ৪২ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের তথ্য তুলে ধরে অভিযোগকারীরা কয়েকটি কেনাকাটার দামের তুলনা করেছেন। একই সঙ্গে জ্বালানি, টোল-ফেরি, আনলোডিং ও অন্যান্য ব্যয়ের নথি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। চাকরিজীবনের শুরু থেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মো. আশরাফুল আলম ১৯৯৯ সালে বিআরটিসিতে ইন্সপেক্টর পদে যোগ দেন। ২০০৩ সালে সিনিয়র ইন্সপেক্টর থেকে ম্যানেজার (কারিগরি) পদে আত্মীকরণ হন। পরবর্তী সময়ে নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ সীমিত থাকায় ২০১৭ সালে তিনি চলতি দায়িত্বে ডিজিএম পদে দায়িত্ব পান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গাজীপুরে বিআরটিসির কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানায় দায়িত্ব পালন। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, ওই সময়ে একটি প্রকল্পের কাজ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিয়মের প্রশ্ন ওঠে। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে ভলভো বাস মেরামতের জন্য আট কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়। কিন্তু প্রকল্পের আওতায় ভলভো বাসের পরিবর্তে বিআরটিসির অন্য বাস, বিশেষত দ্বিতল বাস মেরামতের কাজে অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যাওয়ার পাশাপাশি আর্থিক অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এ বিষয়ে ২০১৯ সালের ২০ জুন কর্মচারীদের পক্ষে মো. নজরুল ইসলাম একটি অভিযোগ দায়ের করেন। পরে ২১ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একটি চিঠি জারি হয়। চিঠির নম্বর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ৩৫.০০.০০০০.০১৩.৯৯.০২৪.১৮-১৫১। একাধিক ডিপো ও কারিগরি ইউনিটে দায়িত্ব অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আশরাফুল আলম গাজীপুর বাস ডিপো, জোয়ারসাহারা বাস ডিপো, মতিঝিল বাস ডিপো, কল্যাণপুর বাস ডিপো, তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানা, কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ঢাকা ট্রাক ডিপোতে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, এসব কর্মস্থলে ইউনিট প্রধানদের নিয়োগ, বদলি ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব ছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ের বিআরটিসি চেয়ারম্যানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে তিনি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেন। সাবেক চেয়ারম্যান মো. জসিম, মো. মিজানুর রহমান, মো. ফরিদ ভূইয়া, এহসানুল এলাহি ও মো. তাজুল ইসলাম এবং বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখিত মো. আব্দুল লতিফ মোল্লার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আট বছরে বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালনকালে কমপক্ষে ২০ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে, যার সঙ্গে আশরাফুল আলমের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তাঁরা অভিযোগ করছেন। ঢাকা ট্রাক ডিপো: আয়-ব্যয়ের হিসাবেই প্রশ্ন আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বিস্তারিত আর্থিক অভিযোগগুলো ঢাকা ট্রাক ডিপোতে তাঁর দায়িত্ব পালনকাল, অর্থাৎ ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কে কেন্দ্র করে। অভিযোগকারীদের সরবরাহ করা হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ে ডিপোটির মোট রাজস্ব আয় ছিল ২৮৩ কোটি ৮৫ লাখ ২২ হাজার টাকা। এর মধ্যে চলাচল বা সংশ্লিষ্ট একটি খাত থেকে আয় ২৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা এবং বাকি প্রায় ২৫৮ থেকে ২৬০ কোটি টাকা প্রাতিষ্ঠানিক আয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই হিসাবে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৪৮ কোটি ৯ লাখ টাকা। উদ্বৃত্ত বা নিট লাভ দেখানো হয়েছে ৩৫ কোটি ৭৬ লাখ ২২ হাজার টাকা। হিসাব অনুযায়ী, মোট আয়ের ৮৭ দশমিক ৪০ শতাংশ ব্যয় এবং ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ উদ্বৃত্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে। মাসিক গড় নিট লাভের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে এই হিসাবের সঙ্গে পরবর্তী সময়ের লাভের তুলনা করে অভিযোগকারীরা ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অসংগতি থাকার প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে পরবর্তী ইউনিট প্রধানের সময়ে নিট লাভ হয়েছে ৮ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫২ টাকা। মাসিক গড় লাভ প্রায় ৭৭ লাখ ৪১ হাজার ৬৯৬ টাকা। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত আট মাসে নিট লাভের পরিমাণ ৭ কোটি ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মাসিক গড় লাভ প্রায় ৮৯ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা। এই পার্থক্যকে ভিত্তি করে অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, আগের সময়ের তুলনায় পরবর্তী সময়ে মাসিক নিট লাভ বাড়ল কেন? তাঁদের দাবি, বেতন ও অন্যান্য ব্যয়ের পরিবর্তন বিবেচনায় নিলেও আগের সময়ের ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনুসন্ধান হওয়া উচিত। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ঢাকা ট্রাক ডিপোতে বর্তমানে মাসে প্রায় ৫০ লাখ টাকার অনিয়ম ঘটে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট লেনদেন, নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণ কিংবা তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেলে অভিযোগটির আর্থিক ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। যন্ত্রাংশ কেনাকাটা: একই পণ্যের দাম বাড়ল কতটা? ঢাকা ট্রাক ডিপোতে যন্ত্রাংশ কেনাকাটার হিসাবেও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেরামত ও যন্ত্রাংশ খাতে ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ১ হাজার ৮১১ টাকা। এর মধ্যে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের আগের সময়ের ব্যয় ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৮৯ হাজার ৭১১ টাকা। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ কোটি ১১ লাখ ১২ হাজার ১০০ টাকা। এ সময়ে পরিশোধের পরিমাণ ৫ কোটি ৩৪ লাখ ৬১ হাজার ৬২৭ টাকা এবং ভ্যাট-ট্যাক্স ৭৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৩ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কেনাকাটার মূল্য তুলনায় একটি ক্লাচ প্লেটের উদাহরণ তুলে ধরেছেন তাঁরা। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১০ মার্চ ঢাকার বাংলাবাজারের আইচার মটরস থেকে একটি ক্লাচ প্লেট কেনা হয় ৮ হাজার ৫০০ টাকায়। একই বছরের ২৭ মার্চ বাংলাবাজারের মিজান মটরস থেকে একই যন্ত্রাংশ কেনা হয় ১৩ হাজার ৩০০ টাকায়। দ্বিতীয় কেনাকাটিটি টেন্ডার ছাড়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ১৪ জুন একই যন্ত্রাংশের দাম দেখানো হয় ১৬ হাজার ৩৫০ টাকা। অভিযোগকারীদের তথ্য অনুযায়ী, এবার মিজান মটরসের কাছ থেকেই টেন্ডারের মাধ্যমে কেনা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, আশরাফুল আলমের দায়িত্বকালে যন্ত্রাংশ খাতের মোট ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ অনিয়মের মাধ্যমে ব্যয় হয়ে থাকতে পারে। তাঁদের আরও দাবি, বর্তমানে নগদে ভালো মানের একটি ক্লাচ প্লেট ৭ থেকে ৮ হাজার টাকায় কেনা সম্ভব।এ ক্ষেত্রে ক্রয়াদেশ, দরপত্র, সরবরাহকারীর বিল, পণ্য গ্রহণের প্রতিবেদন এবং বাজারদরের তুলনামূলক তথ্য যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। টায়ার কেনাকাটায় মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ যন্ত্রাংশের পাশাপাশি টায়ার কেনাকাটার হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ট্রাক ডিপোতে টায়ার খাতে ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি ৪২ লাখ ৫১ হাজার ৯৮৮ টাকা। এর মধ্যে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের আগের সময়ের ব্যয় ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৩৬ হাজার ৯০০ টাকা। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার ৮৮ টাকা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৫ মার্চ বাংলাবাজারের নোমান এন্টারপ্রাইজ থেকে ১০.০০-২০ মাপের একটি এমআরএফ টায়ার কেনা হয় ২৭ হাজার টাকায়। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই কেনাকাটা টেন্ডার ছাড়াই হয়েছিল। ২০২৩ সালের ২২ জুন একই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একই মাপের টায়ার কেনা হয় ৩৩ হাজার ৫০০ টাকায়। পরে ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ হাজার ১৫০ টাকা। শেষের কেনাকাটিটি টেন্ডারের মাধ্যমে হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, প্রায় আড়াই বছরের ব্যবধানে প্রতিটি টায়ারের দাম ১১ হাজার ১৫০ টাকা বেড়েছে। এ মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা, দরপত্রে প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহকারীর সঙ্গে ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের মতে, যন্ত্রাংশ ও টায়ারের মতো বড় ব্যয়ের খাতগুলোতে ক্রয়প্রক্রিয়া ও বাজারদর যাচাই করা হলে সম্ভাব্য অনিয়ম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। জ্বালানি ব্যয়ে কিলোমিটারের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ঢাকা ট্রাক ডিপোর জ্বালানি খাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি খাতে ব্যয় হয়েছে ১০৭ কোটি ৪৫ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৯ টাকা, যা ওই সময়ের মোট আয়ের প্রায় ৩৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বাসের রক্ষণাবেক্ষণ লগবুক এবং ট্রাফিক বিভাগের জ্বালানি লগবুকে উল্লেখ করা কিলোমিটারের মধ্যে পার্থক্য দেখিয়ে জ্বালানি খরচের হিসাবে অনিয়ম করা হয়েছে। এভাবে চার বছরে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও করেছেন তাঁরা। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, ডিপোর রেকর্ড বইয়ে এ-সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে। এই অভিযোগ যাচাই করতে গাড়ির দৈনিক চলাচলের রেকর্ড, ওডোমিটারের পাঠ, জ্বালানি উত্তোলন ও বিতরণ রেজিস্টার, যানবাহনের মেরামত নথি এবং সংশ্লিষ্ট বিল একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোনো গাড়ি কত কিলোমিটার চলেছে, সেই অনুপাতে কত জ্বালানি বরাদ্দ ও ব্যবহার হয়েছে এবং হিসাবের পার্থক্যের ব্যাখ্যা কী—স্বাধীন তদন্তে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। টোল-ফেরি ও আনলোডিং ব্যয়ের নথি কোথায়? জ্বালানি, যন্ত্রাংশ ও টায়ারের বাইরে টোল-ফেরি, আনলোডিং, ভ্যাট-ট্যাক্সসহ অন্যান্য ব্যয় নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, টোল ও ফেরি খাতে মাসে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হতো। কিন্তু এ ব্যয়ের পক্ষে প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট রেকর্ড পাওয়া যায় না বলে তাঁরা অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, এসব খাতে ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনের পর তার যথাযথ হিসাব রাখা হয়নি। আনলোডিং খাতেও মাসে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর আনলোডিং ব্যয়ও ঢাকা ট্রাক ডিপো থেকে পরিশোধ করা হতো বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, আনলোডিং ব্যয়ের বিবরণী ও প্রকৃত হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে এবং আশরাফুল আলমের দায়িত্বকালীন সময়ে এ খাতে কয়েক কোটি টাকার অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া ভ্যাট-ট্যাক্স, টোল-ফেরি, আনলোডিং ও অন্যান্য খাতে ব্যয়ের নামে নগদ অর্থ উত্তোলন এবং খাতবহির্ভূত চেকের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা। বদলি ও পদায়ন ঘিরে প্রভাববলয়ের অভিযোগ আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি বিআরটিসির বিভিন্ন ডিপোতে ইউনিট প্রধানদের বদলি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি ঢাকার বিভিন্ন ডিপো, ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করলেও ঢাকার বাইরে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইউনিটে পদায়িত হননি। একই সঙ্গে তাঁর আনুষ্ঠানিক কর্মস্থল যেখানেই থাকুক, তিনি প্রায়ই প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, ডিপো প্রধানদের বদলি ও দায়িত্ব বণ্টনে একটি গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে আশরাফুল আলমের যোগাযোগ এবং বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তাদের পারস্পরিক সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিআরটিসির চেয়ারম্যানের পিএস মো. মোহাইমিন সজিব; বরিশাল ডিপোর ম্যানেজার মো. জুলফিকার, ; খুলনা ডিপোর ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামান; টুঙ্গিপাড়া ডিপোর ম্যানেজার মো. জামসেদ আলী; রংপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. জুলফিকার আল ভুঁইয়া; মতিঝিল ডিপোর ম্যানেজার মো. শাহিদুল; দিনাজপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. মোস্তাফিজুর; ময়মনসিংহ ডিপোর ম্যানেজার মো. এনামুল; গাজীপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. মোশাররফ; সোনাপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. রাজু মোল্লা; কুমিল্লা ডিপোর ম্যানেজার মো. আব্দুল কাদের জিলানি; নরসিংদী ডিপোর ম্যানেজার মো. নূর এ আলম; সিলেট ডিপোর ম্যানেজার মো. রুকনুজ্জামান; মিরপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. ওমর ফারুক মেহেদী; কল্যাণপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. শাহরিয়ার বুলবুল; গাবতলী ডিপোর ম্যানেজার মো. নায়েব আলী এবং ঢাকা ট্রাক ডিপোর ম্যানেজার মো. মোশাররফ হোসেন সিদ্দিকি। এ ছাড়া প্রধান কার্যালয়ের আরও ১০ থেকে ১২ জন কর্মকর্তার একটি অংশ ওই বলয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম মো. মনিরুজ্জামানের নামও উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা। মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ অভিযোগকারীদের দাবি, বিআরটিসির বিভিন্ন ইউনিট থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যা তাঁরা মাসোহারা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ অর্থ আদায়ের সঙ্গে চেয়ারম্যানের নাম ব্যবহার করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। এদিকে আশরাফুল আলমের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত মো. মাসুদ তালুকদার বর্তমানে জোয়ারসাহারা বাস ডিপোর ইউনিট প্রধান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মাসুদ তালুকদার একটি পৃথক গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং ইউনিটগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও অর্থ আদায়ের সমন্বয়ে ভূমিকা রাখছেন। এ ছাড়া তেজগাঁওয়ের দপ্তরে বিভিন্ন কর্মকর্তার নিয়মিত যাতায়াতের বিষয়টিও অভিযোগকারীরা সামনে এনেছেন। তাঁদের দাবি, প্রধান কার্যালয়ের মো. মনিরুজ্জামান, মো. ফারুক, মো. নায়েব আলী এবং চেয়ারম্যানের পিএস মো. মোহাইমিন সজিব সেখানে যাতায়াত করেন। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, জোয়ারসাহারা ও চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর ইউনিট প্রধান বদলির কয়েকটি ঘটনায় আশরাফুল আলমের পছন্দের প্রার্থীদের পদায়ন নিশ্চিত করা যায়নি। মো. সুলতান নামের এক কর্মকর্তার বদলির আদেশ দুইবার জারি হলেও তা কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। নারী কর্মীদের নিয়ে গুরুতর অভিযোগ আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে নারী কর্মীদের ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করার অভিযোগও তুলেছেন অভিযোগকারীদের কয়েকজন। তাঁদের দাবি, ২০১৭ সালে চেয়ারম্যান মো. ফরিদ এবং ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলামের দায়িত্বকালেও এ ধরনের অভিযোগের চর্চা ছিল। এ-সংক্রান্ত কয়েকটি ঘটনার নিষ্পত্তি তাঁর দপ্তরে হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বজায় রেখে নিরপেক্ষ তদন্ত করা জরুরি। শ্রমিক-কর্মচারীদের হয়রানি ও অসন্তোষের অভিযোগ অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আশরাফুল আলমের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী হয়রানির শিকার হন। ব্যক্তিগত বিষয়ে আপত্তি তোলার কারণে হেলাল নামের এক কর্মীকে ঢাকা ট্রাক ডিপোতে বদলি করা হলেও পরে তাঁকে আবার আশরাফুল আলমের দপ্তরে কাজ করানো হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা ট্রাক ডিপোতে ইয়ার্ডের উন্নয়নকাজ চলার সময় ডিএলআই পরিদর্শন এবং নির্ধারিত কাজের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে এক কর্মীকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনার সুনির্দিষ্ট সময়, সংশ্লিষ্ট আদেশ ও কর্মীর বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, প্রায় আট থেকে নয় মাস আগে ঢাকা ট্রাক ডিপোতে শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে বিরোধের জেরে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। ওই পরিস্থিতি তৈরিতে আশরাফুল আলমের ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে শ্রমিকদের লিখিত অভিযোগ, ব্যবস্থাপনার বক্তব্য, বৈঠকের কার্যবিবরণী, বদলির আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বর্তমান দায়িত্ব ও তদন্তের দাবি বর্তমানে আশরাফুল আলম কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানার ডিজিএম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি প্রায় প্রতিদিন প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তা ও বদলি-সংক্রান্ত বিষয়ে যোগাযোগ রাখেন। তাঁদের মতে, বিআরটিসির মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি, যন্ত্রাংশ, টায়ার, পরিবহন ব্যয়, মেরামত এবং ইউনিট পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ এসব খাতে অনিয়ম হলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা ও জনসেবার মান—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অভিযোগকারীরা আশরাফুল আলমের দায়িত্বকালীন সব ডিপো ও ওয়ার্কশপের আয়-ব্যয়, প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার, জ্বালানি ও যন্ত্রাংশ কেনাকাটা, টায়ারের দরপত্র, টোল-ফেরি ও আনলোডিং ব্যয়, নগদ অর্থ উত্তোলন, খাতবহির্ভূত চেক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি-সংক্রান্ত নথি স্বাধীনভাবে নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ক্রয়প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, সরবরাহকারী এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিআরটিসির আর্থিক হিসাব ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এখন কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: ঢাকা ট্রাক ডিপোর চার বছরের ব্যয় ও লাভের হিসাব কি স্বাধীনভাবে নিরীক্ষা করা হয়েছে? যন্ত্রাংশ ও টায়ারের ক্রয়মূল্য নির্ধারণে কী পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল? জ্বালানি, টোল-ফেরি ও আনলোডিং ব্যয়ের পক্ষে পর্যাপ্ত নথি রয়েছে কি? আর কর্মকর্তা বদলি ও পদায়নের সিদ্ধান্তগুলো কি নির্ধারিত বিধি অনুসারে নেওয়া হয়েছে? রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থার সম্পদ ও রাজস্ব রক্ষা, কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে।