বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকা নিয়ে ক্ষোভ; বদলি-বাণিজ্য, দরপত্রে অনিয়ম, অগ্রিম বিল পরিশোধ ও কমিশন আদায়ের অভিযোগ। প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরেও প্রশ্ন, তদন্ত ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ কর্মকর্তাদের-
ইত্তেহাদ নিউজ | অনুসন্ধানী প্রতিবেদন:
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়নকাজে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি)। অথচ এই অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা, বদলি ও পদায়ন, সরকারি দরপত্র, নিয়োগ এবং নির্মাণকাজের বিল পরিশোধকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ উঠে আসছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের কয়েকজন, এমনকি অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে কিছু বিতর্কিত কর্মকর্তার অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত, লিখিত অভিযোগ কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করার পরও দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, কমিশন বাণিজ্য, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন এবং কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধ —সব মিলিয়ে অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরেও বদলি-বাণিজ্য, পদায়নে অর্থ লেনদেন, দরপত্রে প্রভাব বিস্তার এবং অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি অর্থে পরিচালিত শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ তদন্ত, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও আর্থিক জবাবদিহি কতটা কার্যকর?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরও এর বাইরে নয়।
অধিদপ্তরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে পদোন্নতি, বদলি ও পদায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়েছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ এখনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় দীর্ঘদিনের বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, অগ্রিম বিল পরিশোধ এবং বিভিন্ন প্রকল্পে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ, জাহেদুল করীম, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আবুল হাসেম সরদার এবং সরোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয় মোজাহিদুল ইসলাম আলিফকে। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা হিসেবে পরিচিত। এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে নির্মাণকাজে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে দাবি করা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে রাজধানীর কাফরুল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তাঁর নাম উঠে আসে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ছিল ৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভবনের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সরেজমিন পরিদর্শনে তদন্ত কমিটি দেখতে পায়, ভবনের দ্বিতীয় তলার কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তখন চতুর্থ তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টাকার কাজ সম্পন্ন না করেই অগ্রিম বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। এ ঘটনায় মোজাহিদুল ইসলাম আলিফসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।অর্থাৎ, অভিযোগটি কেবল নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন নয়; বরং কাজের বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে বিল পরিশোধের সামঞ্জস্য ছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।এর আগে সাভার জোনে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনের সময় কেরানীগঞ্জে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮০ কোটি টাকার একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পেও আলিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, কাজের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২০ কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি, আগারগাঁওয়ে নতুন প্রধান কার্যালয়ের প্রায় ১০০ কোটি টাকার নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নের সময় একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে ঢাকা মেট্রো জোনে পদায়ন করা হয়েছে।
বিভাগীয় তদন্তে শাস্তির সুপারিশ করা হয়ে থাকলে তার পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কী ছিল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সেই তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের নিষ্পত্তি ও গৃহীত ব্যবস্থার নথি প্রকাশ না হলে একই কর্মকর্তার নতুন দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর পদ পেতে তৎপর বলে আলোচনায় রয়েছেন জাহেদুল করীম। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। ২০২২ সালের ২৭ জুলাই গঠিত ওই কমিটি ঘোষণার সময় তিনি ঢাকা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
আরও পড়ুন:
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা তাঁকে প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী অবস্থানে রেখেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কাজ শেষ হওয়ার আগে বিল পরিশোধের মতো অভিযোগও রয়েছে।
মূল প্রশ্ন হলো, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি গোপন রেখে পদায়ন করা যেমন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে, তেমনি তদন্ত ছাড়াই অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও ন্যায়সংগত নয়।

বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামকে ঘিরে অভিযোগ আরও বিস্তৃত। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ইইডি শাখার নির্বাহী সদস্য।
তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন সাকিল আহম্মেদ নামের এক ব্যক্তি । অভিযোগে সরকারি দায়িত্বে থেকে বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা, বিল পাসের বিপরীতে কমিশন দাবি, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং দরপত্রপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের কথা বলা হয়েছে।
অভিযোগে মেসার্স মোমিন সিকদার, মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ, ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং মেসার্স রাফিদ ট্রেডার্সের মাধ্যমে কাজ বণ্টন, সাবকন্ট্রাক্ট ও ব্যবসায়িক সুবিধা প্রদানের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।অভিযোগকারীর দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুবিধা দেওয়া এবং বিল পাসের বিপরীতে ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি করার ঘটনা ঘটেছে।
শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, ১৪৪টি কাজের পুনঃদরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে অনিয়ম করা হয়েছে। বাতিল হওয়া দরপত্রের কার্যসম্পাদন জামানত বা পারফরম্যান্স সিকিউরিটি পে-অর্ডার আকারে জমা নেওয়ার পর সেগুলো বিধি অনুযায়ী বাজেয়াপ্ত বা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে নগদায়নের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এভাবে সরকারি অর্থের বড় অঙ্কের ক্ষতি হয়েছে। তবে কতটি পে-অর্ডার নগদায়ন করা হয়েছে, সেগুলোর মোট মূল্য কত এবং অর্থ কোথায় গেছে—তা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যাংক নথি, সরকারি হিসাব, দরপত্র বাতিলের আদেশ ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথি পরীক্ষা করা জরুরি।
প্রায় ৩২ কোটি টাকার কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্প এবং বরিশাল কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণকাজের দরপত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া তাঁর নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে অতীতের অনিয়ম এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আলোচিত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় অভিযুক্ত সৈয়দ আবেদ আলী জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। ঢাকা ও বরিশালে অংশীদারত্বে জমি কেনা, ফ্ল্যাট ব্যবসা এবং শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অসদাচরণসংক্রান্ত অভিযোগও তোলা হয়েছে।
এত অভিযোগের মধ্যে শহিদুল ইসলামকে বরিশালের পাশাপাশি বরগুনা জেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁকে প্রত্যাহার ও তদন্তের দাবিতে বরিশালে মানববন্ধন হয়েছে ।এছাড়া তার বিরুদ্ধে নারী কেলেংকারীরও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, লিখিত অভিযোগ ও প্রতিবাদ কর্মসূচির পরও কেন তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপের তথ্য সামনে আসছে না? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগগুলোর বর্তমান অবস্থা, তদন্তের অগ্রগতি এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার প্রশাসনিক ভিত্তি স্পষ্ট করা।
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ইইডি শাখার তৎকালীন সদস্যসচিব ও সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল হাসেম সরদারের বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে।
দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য ও অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনা ঘটেছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো অঞ্চলের কর্মকর্তা সরোয়ার হোসেনও আলোচনায় রয়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা এবং ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিসেবে পরিচিত বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
আরও পড়ুন:
রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীতের সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেটি প্রমাণসহ যাচাই করা প্রয়োজন।
অধিদপ্তরসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একই কমিটির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে একই ধরনের পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোও তদন্তের দাবি রাখে। তাঁর বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের বিনিময়ে অর্থ লেনদেন, দরপত্রে কথিত কমিশন আদায় এবং ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন অধিদপ্তরসংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একটি বদলি আদেশে কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে বদলি এবং কয়েকজনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে সময় তারেক আনোয়ার জাহেদী অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পালন করছিলেন।
অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, বদলি ও পদায়ন ঘিরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগেও এই গোষ্ঠী বদলি-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের আশ্বাস দিয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের সুযোগে দ্রুতগতিতে বড় অঙ্কের বদলি-বাণিজ্য হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।২০২৫ সালের নভেম্বরেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বদলি আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা ও একটি বদলি-সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ সামনে এসেছিল।
একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসায় বদলি ও পদায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, আদেশ বাস্তবায়নের নথি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ভূমিকা পর্যালোচনা করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা চালু ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, সরাসরি অর্থ গ্রহণের ঝুঁকি এড়াতে অধস্তন কর্মীদের ব্যবহার করা হতো।
প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে কর্মরত জসিম নামের এক কর্মচারীকে ঘিরেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, স্ত্রীর নামে লাইসেন্স খুলে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা এবং নামে-বেনামে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলীর নজরে আসার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ নিয়েও আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং অর্থের বিনিময়ে সুবিধা দেওয়ার ঘটনা তদন্ত করা প্রয়োজন।
সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষার ফল, মেধাতালিকা, নিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদন এবং অভিযোগের ভিত্তিতে নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা জরুরি।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নয় মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা এমন কোনো কোনো প্রকল্প চার বছরেও শেষ হয়নি। অথচ এসব প্রকল্পে বরাদ্দের বড় অংশ পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কিছু প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। এসব বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অধিদপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে যথাযথ জবাব দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
কাজের অগ্রগতির তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ হয়ে থাকলে কিংবা নির্মাণের মান নিয়ে পরীক্ষায় গুরুতর ত্রুটি পাওয়া গেলে তা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের দপ্তরে অর্থ লেনদেনের একটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিডিওতে টেবিলের ওপর টাকা রাখা দেখা যায় এবং একজনকে ‘স্যারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা রেখে যান’ বলতে শোনা যায়। হাসান শওকত দাবি করেন, টাকাগুলো ঠিকাদারদের এবং এ ঘটনায় নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন। একই প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে আরও কিছু অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির সভাপতি করা হয় অতিরিক্ত সচিব ড. সরদার মো. কেরামত আলীকে। সদস্য হিসেবে রাখা হয় প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী এবং উপসচিব এ এস এম শাহরিয়ার জাহানকে।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়: অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তার দপ্তরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের কমিটিতে একই অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে সদস্য করা হলে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে?
হাসান শওকতের দপ্তরের ভিডিও সম্পর্কে তারেক আনোয়ার জাহেদী জানিয়েছিলেন, ভিডিওটি তখনও তাঁর নজরে আসেনি। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
২০২৬ সালের আগস্টে সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে বাড্ডার রহিমুল্লাহ মোল্লা মাদরাসার উন্নয়নকাজের দরপত্র ঘিরে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
সংশ্লিষ্ট নথির বিবরণ অনুযায়ী, প্রথম দরপত্রে ক্লাস ওয়ান ট্রেডার্স ২ কোটি ২ লাখ ৮ হাজার ৬১ টাকা দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজটি পায়। পরে দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয় এবং তালুকদার এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী ঠিকাদারের দাবি, তাঁদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কাজ দেওয়া হয়নি এবং অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি। মনিরুজ্জামান অভিযোগ অস্বীকার করেন।এ ঘটনায় প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদী তদন্তের নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে।
এ ঘটনাটি একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আনে: প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশে তদন্ত শুরু হলেও তার চূড়ান্ত ফল কী, অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না এবং প্রমাণিত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
অধিদপ্তরসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের একই কমিটির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন।
এই পার্থক্য নিয়ে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা সাংগঠনিক প্রভাবের পরিবর্তে অভিযোগের প্রকৃতি, প্রমাণ, দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং তদন্তের ফলের ভিত্তিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বৈষম্য হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, তদন্তের অবস্থা, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কারণ এবং পদায়নের নথি পাশাপাশি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
যোগাযোগ করা হলে শিক্ষা সচিব সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা চলতে দেওয়া হবে না। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা ফ্যাসিস্ট আমলে সুবিধাভোগী ছিলেন, তাঁদের বাড়তি সুবিধা দেওয়া হবে না।এই বক্তব্যের পর অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো। ফলে এখানে দরপত্রে অনিয়ম, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন কিংবা প্রকল্পের অগ্রগতির তুলনায় অতিরিক্ত বিল পরিশোধের অভিযোগ কেবল প্রশাসনিক বিতর্ক নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারযোগ্যতা এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহারের ওপর।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অধিদপ্তরের ভেতরে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে কোনো কোনো কর্মকর্তা চাপের মুখে পড়েন।
প্রশাসনের দায়িত্ব হলো—অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নথিভিত্তিক সিদ্ধান্ত, প্রয়োজন হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তিতে কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন।
প্রথমত, মোজাহিদুল ইসলাম আলিফের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তে শাস্তির সুপারিশ করা হয়ে থাকলে তার পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী ছিল?
দ্বিতীয়ত, বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুদক ও অধিদপ্তরে দেওয়া অভিযোগগুলোর বর্তমান অবস্থা কী? বরিশালের পাশাপাশি বরগুনার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার প্রশাসনিক ভিত্তি কী?
তৃতীয়ত, জাহেদুল করীম, আবুল হাসেম সরদার ও সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো বিভাগীয় বা দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত চলছে কি না, চললে তার অগ্রগতি কতদূর?
চতুর্থত, প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে বদলি-বাণিজ্য, পদায়নে অর্থ লেনদেন ও দরপত্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হয়েছে কি না? অধস্তন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাঁর দেওয়া তদন্তের নির্দেশগুলোর চূড়ান্ত ফল কী?
পঞ্চমত, নির্মাণ প্রকল্পে অগ্রিম বিল পরিশোধ, অসমাপ্ত কাজের বিপরীতে অর্থ ছাড় এবং পুনঃদরপত্রে অনিয়মের অভিযোগগুলো যাচাই করতে প্রকল্পভিত্তিক নিরীক্ষা করা হয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে বোঝা যাবে, অধিদপ্তরের প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেবল তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে, নাকি অভিযোগের নিষ্পত্তি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর প্রক্রিয়াও চালু রয়েছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি—তবে সেই নিষ্পত্তি হতে হবে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি অর্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে থাকা এই সংস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকা নিয়ে ক্ষোভ; বদলি-বাণিজ্য, দরপত্রে অনিয়ম, অগ্রিম বিল পরিশোধ ও কমিশন আদায়ের অভিযোগ। প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরেও প্রশ্ন, তদন্ত ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ কর্মকর্তাদের- ইত্তেহাদ নিউজ | অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়নকাজে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি)। অথচ এই অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা, বদলি ও পদায়ন, সরকারি দরপত্র, নিয়োগ এবং নির্মাণকাজের বিল পরিশোধকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ উঠে আসছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের কয়েকজন, এমনকি অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে কিছু বিতর্কিত কর্মকর্তার অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত, লিখিত অভিযোগ কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করার পরও দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, কমিশন বাণিজ্য, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন এবং কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধ —সব মিলিয়ে অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরেও বদলি-বাণিজ্য, পদায়নে অর্থ লেনদেন, দরপত্রে প্রভাব বিস্তার এবং অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি অর্থে পরিচালিত শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ তদন্ত, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও আর্থিক জবাবদিহি কতটা কার্যকর? রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও গুরুত্বপূর্ণ পদে কারা? ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরও এর বাইরে নয়। অধিদপ্তরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে পদোন্নতি, বদলি ও পদায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়েছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ এখনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় দীর্ঘদিনের বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, অগ্রিম বিল পরিশোধ এবং বিভিন্ন প্রকল্পে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ, জাহেদুল করীম, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আবুল হাসেম সরদার এবং সরোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা। মোজাহিদুল আলিফের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তে কী উঠে এসেছিল? শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয় মোজাহিদুল ইসলাম আলিফকে। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা হিসেবে পরিচিত। এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে নির্মাণকাজে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে দাবি করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে রাজধানীর কাফরুল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তাঁর নাম উঠে আসে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ছিল ৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভবনের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সরেজমিন পরিদর্শনে তদন্ত কমিটি দেখতে পায়, ভবনের দ্বিতীয় তলার কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তখন চতুর্থ তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টাকার কাজ সম্পন্ন না করেই অগ্রিম বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। এ ঘটনায় মোজাহিদুল ইসলাম আলিফসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।অর্থাৎ, অভিযোগটি কেবল নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন নয়; বরং কাজের বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে বিল পরিশোধের সামঞ্জস্য ছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।এর আগে সাভার জোনে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনের সময় কেরানীগঞ্জে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮০ কোটি টাকার একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পেও আলিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, কাজের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২০ কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি, আগারগাঁওয়ে নতুন প্রধান কার্যালয়ের প্রায় ১০০ কোটি টাকার নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নের সময় একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে ঢাকা মেট্রো জোনে পদায়ন করা হয়েছে। বিভাগীয় তদন্তে শাস্তির সুপারিশ করা হয়ে থাকলে তার পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কী ছিল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সেই তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের নিষ্পত্তি ও গৃহীত ব্যবস্থার নথি প্রকাশ না হলে একই কর্মকর্তার নতুন দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রধান প্রকৌশলীর পদ নিয়ে আলোচনায় জাহেদুল করীম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর পদ পেতে তৎপর বলে আলোচনায় রয়েছেন জাহেদুল করীম। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। ২০২২ সালের ২৭ জুলাই গঠিত ওই কমিটি ঘোষণার সময় তিনি ঢাকা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। আরও পড়ুন: ইইডির শীর্ষ পদ দখলের দৌড়: পদোন্নতি, সিন্ডিকেট ও বিতর্কের অভিযোগে অস্থিরতা অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা তাঁকে প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী অবস্থানে রেখেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কাজ শেষ হওয়ার আগে বিল পরিশোধের মতো অভিযোগও রয়েছে। মূল প্রশ্ন হলো, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি গোপন রেখে পদায়ন করা যেমন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে, তেমনি তদন্ত ছাড়াই অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও ন্যায়সংগত নয়। বরিশালে শহিদুল ইসলাম: দুদকে অভিযোগ, বরগুনায় অতিরিক্ত দায়িত্ব বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামকে ঘিরে অভিযোগ আরও বিস্তৃত। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ইইডি শাখার নির্বাহী সদস্য। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন সাকিল আহম্মেদ নামের এক ব্যক্তি । অভিযোগে সরকারি দায়িত্বে থেকে বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা, বিল পাসের বিপরীতে কমিশন দাবি, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং দরপত্রপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগে মেসার্স মোমিন সিকদার, মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ, ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং মেসার্স রাফিদ ট্রেডার্সের মাধ্যমে কাজ বণ্টন, সাবকন্ট্রাক্ট ও ব্যবসায়িক সুবিধা প্রদানের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।অভিযোগকারীর দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুবিধা দেওয়া এবং বিল পাসের বিপরীতে ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি করার ঘটনা ঘটেছে। আরও পড়ুন: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল যখন ঠিকাদার: ঘুষ দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, ১৪৪টি কাজের পুনঃদরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে অনিয়ম করা হয়েছে। বাতিল হওয়া দরপত্রের কার্যসম্পাদন জামানত বা পারফরম্যান্স সিকিউরিটি পে-অর্ডার আকারে জমা নেওয়ার পর সেগুলো বিধি অনুযায়ী বাজেয়াপ্ত বা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে নগদায়নের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এভাবে সরকারি অর্থের বড় অঙ্কের ক্ষতি হয়েছে। তবে কতটি পে-অর্ডার নগদায়ন করা হয়েছে, সেগুলোর মোট মূল্য কত এবং অর্থ কোথায় গেছে—তা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যাংক নথি, সরকারি হিসাব, দরপত্র বাতিলের আদেশ ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথি পরীক্ষা করা জরুরি। প্রায় ৩২ কোটি টাকার কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্প এবং বরিশাল কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণকাজের দরপত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া তাঁর নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে অতীতের অনিয়ম এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আলোচিত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় অভিযুক্ত সৈয়দ আবেদ আলী জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। ঢাকা ও বরিশালে অংশীদারত্বে জমি কেনা, ফ্ল্যাট ব্যবসা এবং শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অসদাচরণসংক্রান্ত অভিযোগও তোলা হয়েছে। এত অভিযোগের মধ্যে শহিদুল ইসলামকে বরিশালের পাশাপাশি বরগুনা জেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁকে প্রত্যাহার ও তদন্তের দাবিতে বরিশালে মানববন্ধন হয়েছে ।এছাড়া তার বিরুদ্ধে নারী কেলেংকারীরও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, লিখিত অভিযোগ ও প্রতিবাদ কর্মসূচির পরও কেন তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপের তথ্য সামনে আসছে না? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগগুলোর বর্তমান অবস্থা, তদন্তের অগ্রগতি এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার প্রশাসনিক ভিত্তি স্পষ্ট করা। আবুল হাসেম সরদার: ২০০ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ইইডি শাখার তৎকালীন সদস্যসচিব ও সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল হাসেম সরদারের বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে। দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য ও অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। সরোয়ার হোসেনের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো অঞ্চলের কর্মকর্তা সরোয়ার হোসেনও আলোচনায় রয়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা এবং ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিসেবে পরিচিত বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। আরও পড়ুন: শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর: বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা ও সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি সরোয়ার এখনো ঢাকা মেট্রোতে বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীতের সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেটি প্রমাণসহ যাচাই করা প্রয়োজন। অধিদপ্তরসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একই কমিটির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে একই ধরনের পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোও তদন্তের দাবি রাখে। তাঁর বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের বিনিময়ে অর্থ লেনদেন, দরপত্রে কথিত কমিশন আদায় এবং ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন অধিদপ্তরসংশ্লিষ্ট কয়েকজন। ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একটি বদলি আদেশে কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে বদলি এবং কয়েকজনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে সময় তারেক আনোয়ার জাহেদী অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পালন করছিলেন। অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, বদলি ও পদায়ন ঘিরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগেও এই গোষ্ঠী বদলি-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। আরও পড়ুন: ইইডির প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে অভিযোগের স্তূপ, বদলি-বাণিজ্য ও টেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের আশ্বাস দিয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের সুযোগে দ্রুতগতিতে বড় অঙ্কের বদলি-বাণিজ্য হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।২০২৫ সালের নভেম্বরেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বদলি আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা ও একটি বদলি-সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ সামনে এসেছিল। একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসায় বদলি ও পদায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, আদেশ বাস্তবায়নের নথি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ভূমিকা পর্যালোচনা করা জরুরি হয়ে উঠেছে। অধস্তন কর্মীদের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা চালু ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, সরাসরি অর্থ গ্রহণের ঝুঁকি এড়াতে অধস্তন কর্মীদের ব্যবহার করা হতো। প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে কর্মরত জসিম নামের এক কর্মচারীকে ঘিরেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, স্ত্রীর নামে লাইসেন্স খুলে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা এবং নামে-বেনামে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলীর নজরে আসার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ নিয়েও আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং অর্থের বিনিময়ে সুবিধা দেওয়ার ঘটনা তদন্ত করা প্রয়োজন। সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষার ফল, মেধাতালিকা, নিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদন এবং অভিযোগের ভিত্তিতে নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা জরুরি। নির্মাণকাজে বিলম্ব, নিম্নমানের উপকরণ ও অগ্রিম বিল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নয় মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা এমন কোনো কোনো প্রকল্প চার বছরেও শেষ হয়নি। অথচ এসব প্রকল্পে বরাদ্দের বড় অংশ পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। এসব বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অধিদপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে যথাযথ জবাব দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। কাজের অগ্রগতির তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ হয়ে থাকলে কিংবা নির্মাণের মান নিয়ে পরীক্ষায় গুরুতর ত্রুটি পাওয়া গেলে তা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। পাঁচ লাখ টাকার ভিডিও: তদন্ত কমিটিতে প্রধান প্রকৌশলী ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের দপ্তরে অর্থ লেনদেনের একটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিডিওতে টেবিলের ওপর টাকা রাখা দেখা যায় এবং একজনকে ‘স্যারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা রেখে যান’ বলতে শোনা যায়। হাসান শওকত দাবি করেন, টাকাগুলো ঠিকাদারদের এবং এ ঘটনায় নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন। একই প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে আরও কিছু অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির সভাপতি করা হয় অতিরিক্ত সচিব ড. সরদার মো. কেরামত আলীকে। সদস্য হিসেবে রাখা হয় প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী এবং উপসচিব এ এস এম শাহরিয়ার জাহানকে। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়: অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তার দপ্তরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের কমিটিতে একই অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে সদস্য করা হলে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে? হাসান শওকতের দপ্তরের ভিডিও সম্পর্কে তারেক আনোয়ার জাহেদী জানিয়েছিলেন, ভিডিওটি তখনও তাঁর নজরে আসেনি। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন। দরপত্র বাতিল ও পুনঃদরপত্রে ঘুষের অভিযোগ ২০২৬ সালের আগস্টে সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে বাড্ডার রহিমুল্লাহ মোল্লা মাদরাসার উন্নয়নকাজের দরপত্র ঘিরে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট নথির বিবরণ অনুযায়ী, প্রথম দরপত্রে ক্লাস ওয়ান ট্রেডার্স ২ কোটি ২ লাখ ৮ হাজার ৬১ টাকা দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজটি পায়। পরে দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয় এবং তালুকদার এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারী ঠিকাদারের দাবি, তাঁদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কাজ দেওয়া হয়নি এবং অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি। মনিরুজ্জামান অভিযোগ অস্বীকার করেন।এ ঘটনায় প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদী তদন্তের নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনাটি একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আনে: প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশে তদন্ত শুরু হলেও তার চূড়ান্ত ফল কী, অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না এবং প্রমাণিত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? একই সংগঠনের সদস্যদের ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত? অধিদপ্তরসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের একই কমিটির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। এই পার্থক্য নিয়ে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা সাংগঠনিক প্রভাবের পরিবর্তে অভিযোগের প্রকৃতি, প্রমাণ, দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং তদন্তের ফলের ভিত্তিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বৈষম্য হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, তদন্তের অবস্থা, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কারণ এবং পদায়নের নথি পাশাপাশি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষা সচিবের কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস যোগাযোগ করা হলে শিক্ষা সচিব সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা চলতে দেওয়া হবে না। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা ফ্যাসিস্ট আমলে সুবিধাভোগী ছিলেন, তাঁদের বাড়তি সুবিধা দেওয়া হবে না।এই বক্তব্যের পর অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের সুনাম ও শিক্ষার অবকাঠামো—দুই ক্ষেত্রেই জবাবদিহির প্রশ্ন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো। ফলে এখানে দরপত্রে অনিয়ম, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন কিংবা প্রকল্পের অগ্রগতির তুলনায় অতিরিক্ত বিল পরিশোধের অভিযোগ কেবল প্রশাসনিক বিতর্ক নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারযোগ্যতা এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহারের ওপর। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অধিদপ্তরের ভেতরে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে কোনো কোনো কর্মকর্তা চাপের মুখে পড়েন। প্রশাসনের দায়িত্ব হলো—অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নথিভিত্তিক সিদ্ধান্ত, প্রয়োজন হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। এখন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তিতে কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন। প্রথমত, মোজাহিদুল ইসলাম আলিফের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তে শাস্তির সুপারিশ করা হয়ে থাকলে তার পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী ছিল? দ্বিতীয়ত, বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুদক ও অধিদপ্তরে দেওয়া অভিযোগগুলোর বর্তমান অবস্থা কী? বরিশালের পাশাপাশি বরগুনার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার প্রশাসনিক ভিত্তি কী? তৃতীয়ত, জাহেদুল করীম, আবুল হাসেম সরদার ও সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো বিভাগীয় বা দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত চলছে কি না, চললে তার অগ্রগতি কতদূর? চতুর্থত, প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে বদলি-বাণিজ্য, পদায়নে অর্থ লেনদেন ও দরপত্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হয়েছে কি না? অধস্তন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাঁর দেওয়া তদন্তের নির্দেশগুলোর চূড়ান্ত ফল কী? পঞ্চমত, নির্মাণ প্রকল্পে অগ্রিম বিল পরিশোধ, অসমাপ্ত কাজের বিপরীতে অর্থ ছাড় এবং পুনঃদরপত্রে অনিয়মের অভিযোগগুলো যাচাই করতে প্রকল্পভিত্তিক নিরীক্ষা করা হয়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে বোঝা যাবে, অধিদপ্তরের প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেবল তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে, নাকি অভিযোগের নিষ্পত্তি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর প্রক্রিয়াও চালু রয়েছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি—তবে সেই নিষ্পত্তি হতে হবে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি অর্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে থাকা এই সংস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, জমি দখল, বিপুল সম্পদ অর্জন এবং নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অভিযোগ—গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশারকে ঘিরে সামনে এসেছে এমন একাধিক গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজের দায়িত্বে থাকার সময় তিনি রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে জমি দখল ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলাও হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার পরিচয় দেওয়া আবুল বাশার ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপস্থিত হতে শুরু করেন। এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ছবি তোলা এবং অর্থায়নের মাধ্যমে নিজের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা আড়াল করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ধানমন্ডি ৩২-এ প্রায় এক দশকের দায়িত্ব প্রাপ্ত তথ্য ও অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, আবুল বাশার ২০১৫ সালের শুরুর দিক থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল জাদুঘর ও সংশ্লিষ্ট সুদাসদনের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজের দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ এই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সুবাদে তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই পরিচয়কে কেন্দ্র করে নিজ এলাকা বরিশালের বাকেরগঞ্জেও তাঁর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বাকেরগঞ্জ উপজেলার ৭ নম্বর কবাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার কথা অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিছিল, সমাবেশ ও জনসভায় তিনি বিপুল অঙ্কের অর্থ সহায়তা দিতেন এবং এলাকায় দলটির একজন অর্থদাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সরকারি দায়িত্বে অনুপস্থিতি ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের নথি আবুল বাশারকে ঘিরে অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তাঁর কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অভিযোগ। একটি দাপ্তরিক চিঠির বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগের অভিযোগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম ২ নম্বর বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম আবুল বাশারের কাছে কৈফিয়ত তলব করেন। এর জবাবে ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে দেওয়া একটি লিখিত ব্যাখ্যায় আবুল বাশার নির্বাচনী কার্যক্রমে নিজের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেন বলে সরবরাহ করা তথ্যে দাবি করা হয়েছে। ওই চিঠিতে তাঁর বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ রয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি-সংক্রান্ত নির্দেশনার প্রেক্ষাপটে তিনি নিজ এলাকায় ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন। নির্বাচনের পর বিজয়ী প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুল হাফিজ মল্লিকের বিজয় সংবর্ধনা ও বিজয় র্যালিসহ একটি অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত থাকার কথাও তিনি লিখেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন আবুল বাশারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো তাঁর নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজধানীর জুরাইনে পাঁচতলা বাড়ি, নিউ মার্কেট এলাকায় স্বর্ণের দোকান, বরিশাল শহরে বাড়ি, বাকেরগঞ্জের হানুয়া গ্রামে ইটভাটা এবং কয়েকশ বিঘা জমিসহ তাঁর বিপুল সম্পদ রয়েছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ এসব সম্পদের সম্মিলিত মূল্য অর্ধশত কোটি টাকার বেশি বলে দাবি করেছেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তাঁর আয়কর নথি, বার্ষিক সম্পদ বিবরণী, জমির দলিল, ব্যাংক লেনদেন, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সরকারি চাকরির আয় ও ঘোষিত সম্পদের মধ্যে অসংগতি থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয় হতে পারে। আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি—রাজনৈতিক অবস্থান বদলের অভিযোগ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবুল বাশারের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থ সহায়তা দেওয়া আবুল বাশার পরবর্তী সময়ে বিএনপির বিভিন্ন সভা-সমাবেশে উপস্থিত হতে শুরু করেন। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, বিএনপির কিছু নেতার সঙ্গে ছবি তুলে এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থ সহায়তা দিয়ে তিনি নিজেকে বিএনপির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া দুর্নীতির অভিযোগ আড়াল করতে তিনি কিছু সাংবাদিককে অর্থ দিয়ে নিজের পক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুদকের চিঠি: অনুসন্ধানের নথি কোথায় দাঁড়িয়ে? আবুল বাশারের সম্পদ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) যোগাযোগের কথাও সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে দুদক তাঁর বিষয়ে তথ্য চেয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে একটি চিঠি পাঠায়। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মাহাবুব হাসান আবুল বাশারের জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি, পাসপোর্ট, টিআইএন, চাকরির বেতন ও অন্যান্য সুবিধা, চাকরির বিবরণী এবং ঝিগাতলা অফিসার্স কোয়ার্টার নির্মাণ প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করেন বলে দাবি করা হয়েছে। এই তথ্য থেকে দুদক তাঁর বিষয়ে তথ্য চেয়েছিল বলে অভিযোগের একটি দিক সামনে আসে। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, অর্থের বিনিময়ে দুদকের অনুসন্ধান প্রভাবিত বা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এ অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট লেনদেনের প্রমাণ বা কমিশনের কোনো আনুষ্ঠানিক নথি সরবরাহ করা হয়নি। ফলে বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই না করে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। জমি দখলের অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলন ও মামলা ২০২৫ সালের মার্চে বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আবুল বাশারের বিরুদ্ধে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে লিখিত বক্তব্যে কুদ্দুস মিয়া নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় দায়িত্ব পালনের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে আবুল বাশার তাঁর এবং তাঁর বোনের ৭০ শতাংশ জমি ও অন্য প্রতিবেশীদের জমি অবৈধভাবে দখল করেছেন। কুদ্দুস মিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় তিনি গত ১২ মার্চ বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালত তথা স্পেশাল জজ আদালতে আবুল বাশারসহ চারজনকে বিবাদী করে মামলা দায়ের করেন। এ ছাড়া হানুয়া গ্রামের বাসিন্দা খালেক মিয়ার ছেলে জামাল হোসেন মিয়া গত জানুয়ারিতে বরিশাল অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবুল বাশারসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেছেন বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। ইটভাটা ও বেনামি ব্যবসার অভিযোগ সংবাদ সম্মেলনে কুদ্দুস মিয়ার বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, আবুল বাশার তাঁর বাবার নামে বাকেরগঞ্জের হানুয়া গ্রামে একটি ইটভাটা চালু করেন। প্রতিষ্ঠানটি আগে সূর্য ইটভাটা নামে পরিচিত ছিল এবং বর্তমানে এএইচ ব্রিকস নামে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা, সুদে টাকা বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও তোলা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রয়োজন নথিভিত্তিক জবাবদিহি আবুল বাশারকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে: দীর্ঘদিন একই গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পেছনে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কী ছিল? নির্বাচনী সময়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়ে দপ্তরের ব্যবস্থা কী? তাঁর ঘোষিত আয় ও সম্পদের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না? জমি নিয়ে দায়ের করা মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা কী? আর দুদক তাঁর বিষয়ে তথ্য চাওয়ার পর অনুসন্ধান কোন পর্যায়ে রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি কিংবা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সরকারি চাকরির নথি, সম্পদ বিবরণী, ভূমি রেকর্ড, ব্যবসায়িক মালিকানা, ব্যাংক লেনদেন এবং আদালত ও দুদকের নথির সমন্বিত যাচাই। অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন আসতে পারে। আর অভিযোগ অসত্য বা অতিরঞ্জিত হলে সেটিও নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। জনস্বার্থে অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, প্রমাণভিত্তিক প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য প্রকাশই হতে পারে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর পথ।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সরকারি চাকরিতে এক যুগের মতো সময়। অথচ অভিযোগে উঠে এসেছে জমি, বাড়ি, গরুর খামারসহ প্রায় ১৩ কোটি ৭ লাখ টাকার সম্পদের হিসাব। এর বাইরে স্ত্রী ও নিকটজনদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর, সঞ্চয়পত্র ও নগদ অর্থ মিলিয়ে আরও প্রায় ৫ কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে করদাতাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়, ঘুষ বাণিজ্য এবং জমি দখলের অভিযোগও উঠেছে। সব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ঢাকা কর অঞ্চল-৫-এর সার্কেল-৯৯-এ কর্মরত উচ্চমান সহকারী সাইফুল ইসলাম। অভিযোগকারীদের দাবি, করদাতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে কর বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন অজুহাত তৈরি করা হয়। কখনো করসংক্রান্ত জটিলতা, কখনো নথিপত্রের সমস্যা—এ ধরনের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। প্রশ্ন উঠেছে, একজন সরকারি কর্মচারীর চাকরিজীবনের আয় ও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে অভিযোগে উঠে আসা বিপুল সম্পদের সামঞ্জস্য কতটা? এসব সম্পদ তাঁর নিজের, পরিবারের সদস্যদের, নাকি অন্য কারও নামে রয়েছে? ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন, জমির দলিল ও সম্পদ অর্জনের সময়কাল যাচাই করা হলে কি মিলবে অভিযোগের প্রমাণ? অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। করদাতাদের জিম্মি করে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ ঢাকা কর অঞ্চল-৫-এর সার্কেল-৯৯-এ কর্মরত সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে করদাতাদের ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কর কমিশনার ও ডেপুটি কর কমিশনারের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন অজুহাত সৃষ্টি করা হয়। এর মাধ্যমে করদাতাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে বলে দাবি অভিযোগকারীদের। সরকারি রাজস্ব আদায় ও করদাতাদের সেবা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে তা শুধু ব্যক্তিগত অনিয়মের প্রশ্ন নয়; বরং কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়ও সামনে আসে। এক যুগের চাকরিতে ১৩ কোটি টাকার সম্পদ? প্রাপ্ত অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইলের গোপালপুর থানার পলশিয়া পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম (৪৫)। তাঁর বাবা মো. ছোবহান। অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরিজীবনে প্রায় এক যুগের মধ্যে তিনি জমি, বাড়ি ও গরুর খামারসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগে তাঁর নিজের, পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা এবং কথিত বেনামি সম্পদ মিলিয়ে প্রায় ১৩ কোটি ৭ লাখ টাকার সম্পদের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি স্ত্রী ও নিকটজনদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর, সঞ্চয়পত্র ও নগদ অর্থ মিলিয়ে আরও প্রায় ৫ কোটি টাকার সম্পদ থাকার দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে, সম্পদগুলো কখন কেনা হয়েছে, কোন অর্থে কেনা হয়েছে, সেগুলো আয়কর রিটার্নে দেখানো হয়েছে কি না এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের প্রকৃত অর্থদাতা কে—এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান ছাড়া সম্পদের উৎস সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। ১১ শতাংশ জমিতে গরুর খামার অভিযোগ অনুযায়ী, সাইফুল ইসলামের নিজ বাড়ির পাশে প্রায় ১১ শতাংশ জমিতে একটি গরুর খামার রয়েছে। ওই জমির আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। খামারটিতে চারজন কর্মচারী কাজ করেন এবং তাঁদের বেতনসহ মাসে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।খামারের জমির মালিকানা, গবাদিপশুর সংখ্যা, বিনিয়োগের পরিমাণ, পরিচালন ব্যয় এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করা হলে এটি থেকে অর্জিত আয়ের প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে খামারটি কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর মূলধন কোথা থেকে এসেছে, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয়। প্রায় দুই কোটি টাকার বাড়ি সাইফুল ইসলামের একটি বাড়ির মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাড়িটির জমির দলিল, নির্মাণকাল, নির্মাণ ব্যয় এবং বর্তমান বাজারমূল্য সম্পর্কে বিস্তারিত নথি প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে নেই। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর চাকরিজীবনের আয় ও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে বাড়িটির মূল্য এবং নির্মাণ ব্যয়ের হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাড়ির জমি কেনার দলিল, নির্মাণসামগ্রী ও ঠিকাদারি ব্যয়ের নথি, অর্থ পরিশোধের রেকর্ড এবং আয়কর বিবরণী যাচাই করলে সম্পদ অর্জনের উৎস সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ভারারিয়া, মাইজবাড়ী ও পলশিয়ায় জমির হিসাব অভিযোগপত্রে সাইফুল ইসলামের নামে বা তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা বিভিন্ন এলাকার জমির বিবরণ দেওয়া হয়েছে। ভারারিয়া: এখানে প্রায় এক বিঘা জমি রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। জমিটির আনুমানিক মূল্য ৫০ লাখ টাকা। মাইজবাড়ী: এলাকায় প্রায় দুই বিঘা জমি থাকার অভিযোগ রয়েছে। এর মূল্যও প্রায় ৫০ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাড়ির আশপাশে: প্রায় ২০ শতাংশ জমির তথ্য দেওয়া হয়েছে। কবরস্থানসংলগ্ন এলাকা: এখানে প্রায় ১০ শতাংশ জমি থাকার অভিযোগ রয়েছে। পলশিয়া বাজারের প্রধান সড়কের পাশে: প্রায় ১৬ শতাংশ জমির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে এসব জমির মূল্য ও মালিকানা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দেওয়া হলেও সব সম্পদের মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি স্পষ্ট নয়। ফলে জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রকৃত বাজারমূল্য যাচাই করা জরুরি।একই জমি একাধিকবার সম্পদের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, জমিগুলোর প্রকৃত মালিক কে এবং সেগুলো কেনার অর্থ কোথা থেকে এসেছে—এ বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। সম্পদের অভিযোগের পাশাপাশি জমি দখলের মামলা সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগের পাশাপাশি জমি দখল ও জোরপূর্বক জমি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কবরস্থানের পাশে থাকা একটি জমি জোরপূর্বক নেওয়ার দাবি রয়েছে। অন্য একটি ঘটনায় তিন ভাইকে বঞ্চিত করে তাঁদের বাবার কাছ থেকে জমি লিখে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।এ ছাড়া মৃত ছামান আলীর ছেলে মো. দেলোয়ার হোসেনের প্রায় ছয় শতাংশ জমি জোরপূর্বক দখল বা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। মাইজবাড়ীর ১৪ শতাংশ জমি নিয়ে আদালতে বিরোধ জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত বিরোধের একটি ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গোপালপুর থানার আমলি আদালতে মো. হাফিজুর রহমান বাদী হয়ে সাইফুল ইসলামসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। অন্য অভিযুক্তরা হলেন রুহুল আমিন, আবু বকর মিয়া ও শাহজাহান। মামলার নথিতে মাইজবাড়ীর ১৪ শতাংশ জমির মালিকানা ও দখলকে কেন্দ্র করে বিরোধের কথা উল্লেখ রয়েছে। বিরোধের পর আদালতের নোটিশে উভয় পক্ষকে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নালিশি ভূমিতে যে যার দখল বজায় রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং গোপালপুর থানা আমলি আদালতে পৃথক দুটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বাদী হাফিজুর রহমানের অভিযোগ, সাইফুল ইসলাম নিজের সরকারি পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে মামলাগুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি এবং অভিযুক্তের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। স্ত্রী ও নিকটজনদের নামে অর্থ: অনুসন্ধানের আরেক ক্ষেত্র অভিযোগে সাইফুল ইসলামের স্ত্রী ও নিকটজনদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর, পোস্ট অফিসে সঞ্চয়পত্র এবং নগদ অর্থ থাকার দাবি করা হয়েছে। এসব সম্পদের মোট মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তাঁদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব, আমানতের অর্থের উৎস এবং আয়কর নথি যাচাই করলে সম্পদ অর্জনের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে। তবে পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ থাকা নিজে থেকেই কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। এসব অর্থের প্রকৃত মালিকানা, বৈধ আয়ের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় অনুসন্ধান করতে হবে। অভিযোগে স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে আমানত শনাক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত ক্ষমতা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পরিচালিত হওয়া উচিত। আয়কর রিটার্ন ও সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ের দাবি সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো—তাঁর চাকরিজীবনের আয় এবং কথিত সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না। এ প্রশ্নের উত্তর পেতে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন: চাকরিতে যোগদানের সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত বেতন, ভাতা ও অন্যান্য বৈধ আয়ের হিসাব। দাখিল করা আয়কর রিটার্ন এবং তাতে প্রদর্শিত সম্পদ ও দায়ের বিবরণ। নিজের ও সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা জমি, বাড়ি ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির দলিল। ব্যাংক আমানত, এফডিআর, সঞ্চয়পত্র এবং অর্থের উৎসের প্রাসঙ্গিক নথি। গরুর খামারের বিনিয়োগ, পরিচালন ব্যয় এবং আয়ের হিসাব। জমি কেনা ও বাড়ি নির্মাণের সময়কাল এবং অর্থ পরিশোধের রেকর্ড। এসব নথি পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব। দুদক ও এনবিআরের তদন্ত দাবি সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কর গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, শুধু সম্পদের আনুমানিক মূল্য নির্ধারণ করলেই হবে না; সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস, কর নথিতে তার প্রতিফলন এবং অভিযোগে উল্লিখিত ঘুষ লেনদেনের বিষয়ও অনুসন্ধান করতে হবে। ঘুষ গ্রহণ বা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার আগে প্রমাণ সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর এখনো গুরুত্বপূর্ণ: ১. অভিযোগে উল্লেখ করা প্রায় ১৩ কোটি ৭ লাখ টাকার সম্পদের পূর্ণাঙ্গ দলিল ও মূল্যায়ন কোথায়? ২. স্ত্রী ও নিকটজনদের নামে আরও প্রায় পাঁচ কোটি টাকার আমানত থাকার দাবির পক্ষে কী ধরনের নথি রয়েছে? ৩. এসব সম্পদ তাঁর চাকরিজীবনের আয় ও দাখিল করা আয়কর রিটার্নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না? ৪. করদাতাদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট লেনদেন, সাক্ষ্য বা দাপ্তরিক নথি রয়েছে কি না? ৫. জমি নিয়ে বিচারাধীন মামলাগুলোর সর্বশেষ অবস্থা কী এবং সংশ্লিষ্ট আদালত কী আদেশ দিয়েছেন? ৬. অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর কোনো বিভাগীয় তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ সহজ হবে। অভিযোগ নয়, নথিভিত্তিক তদন্তই হোক সিদ্ধান্তের ভিত্তি একজন সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, করদাতাদের হয়রানি এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে, অভিযোগে উল্লিখিত সম্পদের পরিমাণ যদি তাঁর বৈধ আয় ও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে তা যাচাইয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে অনুমান, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা সম্পদের আনুমানিক মূল্যকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। জমির দলিল, ব্যাংক নথি, আয়কর রিটার্ন, অর্থের উৎস এবং আদালতের নথি যাচাই করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে দুদক, এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হলে একদিকে অভিযোগের সত্যতা যাচাই হবে, অন্যদিকে কোনো ভিত্তিহীন অভিযোগ থাকলেও তা স্পষ্ট হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা বজায় রাখতে প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা।